।। নিজের ভাবনায়।।
শৌভিক রায়
ভোট গণনার দিনেই বাবা-মায়ের বাৎসরিক কাজ! নিজের পরিচিত পরিবেশে থাকলেও উদ্বেগ হয়। আর এ তো হরিদ্বারের মতো আধা-পরিচিত জায়গা!
পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাৎসরিকের কাজ করতে হরিদ্বারে এসেছি। কিন্তু এমনটা হবে ভাবিনি। ঠিক বুঝতে পারছিলাম না কী করব। নির্বাচন ঘোষণার আগে থেকে হিংসার তাণ্ডব দেখে অভ্যস্ত আমরা পশ্চিমবঙ্গবাসী। মন তো কূ ডাকবেই!
সব শুনে একগাল হেসে আশ্বস্ত করলেন পুরোহিত দিলীপদা এবং হরিদ্বারে দীর্ঘদিন থাকা দুই ভাই, স্বরূপ ও শিবু। জোর গলায় জানালেন, কোনও নির্বাচনেই ওখানে রাজনৈতিক হিংসা হয় না। ভোট একটি অত্যন্ত সাধারণ বিষয়। পাঁচ বছরে একদিন হয়। তাতে হয় এরা অথবা ওরা জেতে। কখনও রাজনৈতিক পালাবদল হবে। কিন্তু তার সঙ্গে হিংসা? প্রশ্ন নেই।
একই ছবি দেখেছি পশ্চিম ভারতে। ভোটের দিন উপস্থিত ছিলাম। বুঝতে পারিনি আদৌ যে কিছু হচ্ছে। জনজীবন একেবারেই স্বাভাবিক। দোকানপাট সব খোলা। প্রতিদিনের মতোই রাস্তায় যানবাহন চলছে। দেখে কেউ বুঝবে না, সেই রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন হচ্ছে! বুঝলাম, যখন আমাদের ড্রাইভার বিনোদ সেদিন সামান্য দেরিতে এলো। ভোট দিতে ওর একটু দেরি হয়েছে। বুথে ভিড় ছিল।
আবার দক্ষিণ ভারতের ছায়াছবিতে যতটা ভায়োলেন্স দেখা যায়, তার এক শতাংশও বাস্তবে কোনও দিন দেখিনি। দীর্ঘদিন থেকে দক্ষিণে যাই। বছরের সব ঋতুতে গেছি। লোকসভা, বিধানসভা, পঞ্চায়েত ইত্যাদি সব নির্বাচনের সময় থেকেছি। নেতাদের বিরাট বিরাট কাট-আউট ছাড়া ভোটের নামগন্ধ পাইনি। ভোটের সময় হিংসা সেখানে অনেক দূরের কথা!
সম্প্রতি আন্দামানেও দেখে এসেছি কীভাবে বাঙালিরা মিলেমিশে একসঙ্গে রয়েছেন। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হলেও, সেখানেও ভোট হয়। রয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও তাদের সমর্থকেরা। একে অন্যের হাত ধরে দিব্যি রয়েছেন তারা। রাজনৈতিক হিংসা, খুন, পার্টি কার্যালয় দখল ইত্যাদি ভাবতেও পারেন না। আন্দামানে রাজনৈতিক হিংসায় নিহত হয়েছেন এরকম একটিও উদাহরণ নেই। অথচ ওখানের সত্তর শতাংশের ওপর বাঙালি রয়েছেন।
পঞ্চায়েত নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, তত এই ব্যাপারগুলি মনে পড়ছে। ভোট কর্মী হিসেবে সন্ত্রাসের যে চেহারা সম্প্রতি আমাদের রাজ্যে দেখি, তাতে পঞ্চায়েত ভোটে যেতে হতে পারে ভাবতেই ভয় হচ্ছে। অথচ আগে কোনও দিন এমনটি হয়নি। উৎসবের মেজাজে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি, নতুন মানুষদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, গ্রামবাংলা দেখেছি। কিন্তু এখন পশ্চিমবঙ্গের ভোট মানেই সন্ত্রাসের গ্রাফ চড়চড় করে ওপরে ওঠা!
দেশের আর কোথাও নির্বাচনী হিংসা হয় না, সেকথা বলছি না। কিন্তু তা কখনই এই মাত্রায় নয়। যারা সেটা বন্ধ করতে পারত, সেই প্রশাসনও নির্লজ্জতার সব সীমা ছাড়িয়েছে। যেভাবে সমস্ত নিয়মনীতিকে তারা বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে, তাতে তাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। শঠতার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে তারা। সারা দেশের সামনে আমরা যেভাবে আজ নিজেদের উপস্থাপিত করছি, তাতে সত্যি লজ্জা হয়! এই কি সেই বাংলা, যাকে নিয়ে আমরা গর্ব করি!
সব দেখছি, জানছি, বুঝতেও পারছি। কিন্তু কিচ্ছু করতে পারছি না। আমাদের ট্র্যাজেডি এখানেই।
No comments:
Post a Comment