Tuesday, May 2, 2023





প্রাসাদ গ্রামের সাবেক পূজো

শৌভিক রায়


স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে গ্রাম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন “জ আছে তবু নাই”, সেই জন্যই সম্পর্কে একটু আগ্রহ বরাবরই ছিল। তবে শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই উক্তির জন্য নয়। বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও হুগলির এই ছোট্ট গ্রামটি সম্পর্কে যথেষ্ট আগ্রহী ছিলেন। আর হবে না-ই বা কেন! আজকের এই একবিংশ শতকে ভেজালের যুগেও এই জনপদের বিখ্যাত মিষ্টি 'মনোহরা' যদি এত সুস্বাদু হতে পারে, তবে সে আমলে সেটি যে কী ছিল তা বুঝতে অসুবিধে হয় না। এই গ্রামেই 'দেবী', ‘হংসমিথুন' ইত্যাদি ছবির শুটিং হয়েছে। পা রেখেছেন বহু প্রখ্যাত মানুষেরা। কালের নিয়মে অনেক কিছু বদলে গেলেও, আজকের জনাই অত্যন্ত বর্ধিষ্ণু একটি জনপদ এবং এর সর্বত্রই হাত রেখেছে ইতিহাস। তবে বর্তমানে এই জনপদের খ্যাতি তার দুর্গাপূজার জন্য। এই পুজোগুলির অধিকাংশই পারিবারিক পুজো। বারোয়ারি পুজো অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু জনাইয়ের খ্যাতি তার পারিবারিক পুজোর জন্যই। এই পুজোগুলির বেশ কয়েকটি ২০০ বছরের গন্ডি পেরিয়ে গেছে। বনেদি এই পুজোগুলো দেখতে আজও ভিড় করেন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বহু মানুষ ।











কিন্তু জনাইতে এত বনেদি বাড়ি কেন? প্রশ্নটি সঙ্গত। কোনো এক সময় এই জনপদের পাশ দিয়েই বয়ে যেত সরস্বতী নদী। হাওড়া জেলার রাজগঞ্জ অবধি সেই বয়ে চলার বেশ কিছু ঐতিহাসিক নিদর্শন আজও রয়েছে। সেই আমলে নিম্ন বঙ্গের রাজধানী ছিল সপ্তগ্রাম। তখনকার বাণিজ্য চলত সরস্বতী নদীর বুক ধরে, সপ্তগ্রামকে কেন্দ্র করে। শোনা যায় ইতিহাস প্রসিদ্ধ বিজয়সিংহ এই নদী ধরেই শ্রীলঙ্কা যাত্রা করেছিলেন। বর্তমান জনাইয়ের চণ্ডীতলার চণ্ডী দেউলটিও নাকি বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনির সেই চণ্ডী দেউল। তুলনামূলকভাবে অতীত জনাই কিছু উচ্চভূমি হওয়ায় এখানে বাসস্থান গড়ে তোলেন তদানীন্তন সমাজের উঁচুতলার মানুষেরা, বিশেষ করে জমিদাররা। আর সেই সময়কার জমিদারদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন ব্রাহ্মণ। ফলে আজকের জনাইতে পারিবারিক যে পুজোগুলো বনেদি পুজো হিসেবে পরিচিত তাদের অধিকাংশই সেই ব্রাহ্মণ জমিদারদের বংশ। তবে জনাই রাজবাড়ি হিসেবে যে বাড়িটি পরিচিত তার প্রতিষ্ঠাতা মহারাজা কালীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। "পলাশীর যুদ্ধের সময় তৈরি হয় এই রাজবাড়ি। তৎকালীন ব্রিটিশের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল কালীবাবুর। কালীবাবু অনেকদিন ভাগলপুরের দেওয়ান হিসেবে ছিলেন, জন্মস্থান বেনারস। উনি জনাইতেই বসবাস করতেন। এলাকার শ্মাশানের একটি অংশে রাজবাড়ি তৈরি করেন কালীপ্রসাদ। কথিত আছে, সাধনা করে এখানেই তিনি দেবী দুর্গার দর্শন পেয়েছিলেন। তারপরই শুরু করেছিলেন আরাধনা।`` (তথ্য: ওয়েব ডেস্ক, এবিপি আনন্দ) 

কালীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সেদিনের বংশ আজ বেশ কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। ফলে জোনাইয়ের বিভিন্ন জায়গায় তাদের নতুন নতুন বাসস্থান তৈরি হয়েছে। অবশ্য সেগুলিও শতাব্দী প্রাচীন। আর কমবেশি এই প্রত্যেকটি বাড়িতেই প্রতি বছর পুজো হচ্ছে। জনাইয়ের পারিবারিক দুর্গাপুজোগুলির কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সব পরিবারে প্রতিমাই একচালা। গণেশের গায়ে লাল রং, কার্তিকের রং হলুদ। অসুর ও সিংহ যথাক্রমে সবুজ ও সাদা। একচালা প্রতিমার উচ্চতা খুব বেশি নয়। কিন্তু সব প্রতিমাই অনিন্দ্যসুন্দর। প্রত্যেক বাড়িতে আলাদা নাটমন্দির রয়েছে। মূল বাসস্থান থেকে সেটি খানিকটা দূরে। তবে রাজবাড়ীর নাটমন্দির মূল দালানের সঙ্গেই। সাত খিলান ও ধনুকাকৃতি দালান এই নাটমন্দিরের বিশেষত্ব।

রাজবাড়িতে প্রবেশের মুখে বা হাতে রয়েছে ১৮২৭ সালে নির্মিত কালীপ্রসাদের' ও 'খসালেশ্বর` নামে পরিচিত দুটি শিব মন্দির। রাজবাড়িতে প্রবেশের পর একদম সামনেই সাত খিলানের নাটমন্দির আর বাম ও ডান দুই দিকে সারিসারি ঘর। অবশ্য আজ  সেই সব ঘরে আর কেউ থাকেন না। পরিত্যক্ত হয়ে রয়েছে সেসব। বংশ এতটাই বিস্তৃত যে হয়তো আত্মীয়রা নিজেরাই নিজেদেরকে অনেক সময় চিনে উঠতে পারেন না। এই বাড়ির পুজোর ছুটি নিজস্ব নিয়ম আছে। দশমীর দিন দেবীকে বিদায় দেওয়ার আগে অপরাজিতা পুজো হয়ে থাকে এখানে। আর বয়স অনুসারে পরিবারের সকলে দেবীকে যে পুজো করেন তা বীরাঞ্জলি নামে পরিচিত। সেই বিশেষ রীতিতে প্রতিমাকে ঘিরে তিনবার প্রদক্ষিণ চলে। আর তারপর দেবীকে বিদায় দেওয় হয়। এই বাড়ির পুজোয় আমিষ ভোগ হয় না। বৈষ্ণব মতে দেবী এখানে পূজিত হন।





সুদুর অতীতকে ধরে রেখেছে জনাইয়ের সুপরিচিত বাজারবাড়ি। লণ্ঠনের আলোতে আজও সেখানে পুজো হচ্ছে। তবে এই পুজোর সূচনা হয় ষষ্ঠীর দিন থেকে, বোধন পার হয়ে যাওয়ার পর। এই বাড়িটি উমা ভিলা নামেও পরিচিত। বাড়িটিতে ঢুকলেই অতীত যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে। অনেকটা একইরকম কর্তাবাড়ি, আদি মুখার্জি বাড়ি আর মাঝের বাড়ির পুজো। তবে লণ্ঠনের আলোয় পুজোর ব্যাপারটা  এদের নেই। কর্তাবাড়ির নাটমন্দিরের কাছেই রয়েছে একটি শিউলি গাছ। প্রতি পুজোতেই  তাতে নাকি ঝেঁপে ফুল ধরে। বাঁড়ুজ্যে বাড়ি নামে পরিচিত অন্য এক বনেদি বাড়িতে গণেশের অবস্থান উলটো দিকে। বাকি সব একইরকম। তবে এখানে আখ বলি হয়ে থাকে। বাজারবাড়ির পুজো ২৮৫ বছরে পা দিয়েছে। মাঝেরবাড়ির পুজো ৩০০ পার করে দিয়েছে। আদি মুখার্জি বাড়ির বর্তমান প্রজন্ম অবশ্য নিজেদের পুজোর বয়স নিশ্চিন্ত করে বলতে পারলেন না। তবে এই বাড়িতে প্রবেশের আগে, বা হাতে, আজকাল ওই এলাকার মহিলারা পুজো করছেন। আর আদি মুখার্জি পরিবারও দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে  যাওয়ায় অনেকটা বারোয়ারি পুজোর ঢঙে অন্য একটি পুজো চালু হয়েছে। তবে উদ্যোক্তা ওই দ্বিধা-বিভক্ত পরিবারের সদস্যরাই।

জনাইয়ের গাঙ্গুলি পরিবারটিও অন্যতম প্রসিদ্ধ বনেদি পরিবার। এই পরিবারের শ্রীকল্যাণ মঙ্গোপাধ্যায় ছড়া লিখেছেন,

"সপ্তপুরুষ যেথায় মানুষ
সে ভিটে সোনার বাড়া
মাতৃপূজার আজও আয়োজন
আঙিনা  বিতান ভরা
এই ভিটাতেই আসছেন মা
শত শত বছর ধরে
তবু মনে হয় প্রতি বছরই
এবার নতুন করে
নতুন দিনের সূর্য উঠবে
সবার জীবন ভ'রে
গণ দেবতার পদধূলীতে 
মা যে দেবেন ধরা।”

মহাভারতের ইংরেজি অনুবাদক কিশোরীমোহন গঙ্গোপাধ্যায় এই পরিবারেরই মানুষ। চলচ্চিত্র অভিনেতা শৈলেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ও এই পরিবারে জন্ম নেন। বর্তমান কর্তা শিবপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায় জানালেন, তাঁদের পুজো এবার ৩০৫ বছরে পা দিল। মূল বাড়িতে ঢুকতে প্রথমেই রয়েছে মন্দির। গাঙ্গুলি বাড়ির বৈশিষ্ট্য এটিই। অন্যদিকে পুকুরের মাঝখান দিয়ে রাস্তা চলে গেছে নহবতখানা নামে পরিচিত পুরোনো বাড়িটির। জনাইয়ের অন্যান্য বনেদি বাড়ির পুজোর মতোই এটিও একইরকম।








বরং খানিকটা আলাদা বাকসার চৌধুরী বাড়ির পুজো। বাংলার তাজমহল নামে একসময় খ্যাত ছিল এই বাড়ি। অবশ্য সেই অংশটি এখন আর নেই। অতীতে সেই ঝলমলে অভিজাত বাড়ির ছায়া পড়ত সামনের শোন পুকুরে। চৌধুরী বাড়ির প্রবেশটিই অত্যন্ত সুন্দর। মূল প্রবেশ দ্বারের পাশে দুদিকেই দুটো করে জানালা। তারপর দুদিকেই একটা দরজা আর দুটো জানালা। অর্থাৎ মোট তিনটি দরজা আর চারটি জানালা। গৃহে প্রবেশের পরেই খোলা আঙিনায় বিরাট আল্পনা। তারপর নাটমন্দির। চৌধুরী বাড়ির মা দুর্গা কিন্তু চার হাত বিশিষ্ট। জয়া ও বিজয়ার বদলে একচালা প্রতিমায় ঠাঁই পেয়েছেন রাধা ও কৃষ্ণ। রাধা রয়েছেন কার্তিকের ওপরে আর কৃষ্ণের স্থান গণেশের ওপরে। এমন করে তাদের রাখা হয়েছে যে, বলি তারা দেখতে পারেন না। প্রসঙ্গত, আগে প্রাণী বলি হলেও এখন সেটি আর হয় না। আড়াইশো বছর আগে রাজারাম চৌধুরীর হাত ধরে এই পুজো শুরু হয়। আজ বড়ো, মেজো ও ছোটো তিন তরফে পরিবার বিভক্ত। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে তিন তরফের পক্ষেই পুজোর আয়োজন করা হয়। অষ্টমীর দিন সকলের মঙ্গলার্থে কল্যাণী পুজোর রীতি অভিনব। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে মনে রেখে আজও বিসর্জনের যাত্রার সময় দুটি মশাল নিয়ে যাওয়া হয়। বাকসার মিত্র বাড়ির পুজোটিও বহু প্রাচীন।






'প্রাসাদের গ্রাম' জনাইয়ের পুজো দেখার স্বাদ একদম আলাদা। আজ যখন স্পনসররা বিভিন্ন পুজোর আর্থিক অনুদান যোগান দিচ্ছে, যখন বিরাট বিরাট থিম পুজোর ভিড়ে সাবেক পুজো মুছে যেতে বসেছে, তখন জনাই একেবারে ভিন্ন। এখানে সময় যেন থমকে আছে সরু সরু রাস্তায় আর প্রাচীন সব প্রাসাদোপম বাড়িগুলিতে। বারবাড়ি, ভিতরবাড়ি, নাটমন্দির ইত্যাদি নিয়ে সেই বাড়িগুলি এক মুহূর্তেই পৌঁছে দেয় ধূসর অতীতে। ভাবতে ভালো লাগে, এই পরিবারগুলি এখনও নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। হরেক অসুবিধার মধ্যেও নিষ্ঠা নিয়ে বছরের এই কয়েকটি দিন অৰ্চনা করে চলেছেন মহাশক্তির। জানিনা তারা কতদিন এই পরম্পরা ধরে রাখতে পারবেন। সময় দ্রুত পাল্টাচ্ছে। পৃথিবী যত ছোটো হয়ে আসছে, তত আমরা ঝুঁকে পড়ছি অন্যদিকে। নিত্য নতুন আবিষ্কারের এই সময়ে সাবেকিয়ানা ধরে রাখাই চ্যালেঞ্জের। কিন্তু জনাইয়ের বনেদি বাড়ির পুজো যদি হারিয়ে যায়, তবে ইতিহাসের একটি স্বর্ণ অধ্যায় মুছে যাবে।










(প্রকাশিত: লোকমানস/ সম্পাদক: দেবাশিস ভট্টাচার্য) 

No comments: