Sunday, April 30, 2023


 

প্রেমের পরিণতি কি নারকীয় হত্যা?
শৌভিক রায় 

প্রেমিকার বিয়েতে, পিঁড়ি ধরে সাত পাক ঘুরিয়ে দেওয়া প্রেমিকদের দেখে এক সময় খুব উপহাস করতাম। এখন তাদের কাছে ক্ষমা চাইতে ইচ্ছে করে। প্রেম বা ভালবাসা আজ যে পথ নিয়েছে, তাতে ওই প্রেমিকদের সত্যিই ভিন্ন গ্রহের জীব বলে মনে হয়।      

প্রসঙ্গ উত্তরের এক জনপদের সাম্প্রতিক মর্মান্তিক ঘটনা। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে প্রেমিকা সহ গোটা পরিবারকে খুন করে ফেলার ঘটনা ওয়েব সিরিজ বা ছায়াছবিতে হয়ত খুব সাধারণ বিষয়। কিন্তু শান্ত উত্তরেও এরকম ঘটনা ঘটবে, কখনও ভাবিনি। এই রাজ্যে এরকম ঘটনা খুব বেশি ঘটেছে সেটাও বলা যাবে না। তবে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে পুরো পরিবার না হোক, প্রেমিকার ক্ষতি করার দৃষ্টান্ত কিন্তু প্রচুর! 

ন্যাশনাল ক্রাইম ব্যুরোর রিপোর্ট বলছে, আমাদের দেশে মাসে অন্তন্ত ১৪টি অ্যাসিড আক্রমণের ঘটনা ঘটে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অ্যাসিডের শিকার প্রেমিকারা। অন্যদিকে, শেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে প্রেমিকাকে হত্যার ঘটনা মোট হত্যার ২.৯৫ শতাংশ। প্রেমিকার সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ভাইরাল করে দেওয়ার পরিসংখ্যানও চমকানোর মতো।   

এই সব তথ্যগুলিই প্রমাণ করে, বর্তমান প্রজন্মের কাছে ভালবাসার সংজ্ঞা আলাদা। আজকাল অনেককেই দেখি প্রেমের ক্ষেত্রে `নাউ ওর নেভার` তত্বে বিশ্বাসী। আর ব্যর্থ হলে তারা চরম কিছু করে ফেলতে প্রস্তুত! অতীতে এরকম ঘটনা একেবারে ঘটত না, সেটা নয়। কিন্তু তার সংখ্যা ছিল নগণ্য। অধিকাংশ ব্যর্থ প্রেমিক মনেপ্রাণে প্রেমিকাকে সুখী দেখতে চাইতেন। আর তার জন্য নিজের ভালবাসাকে জলাঞ্জলিও দিতে পারতেন। তাদের সেই মানসিকতা ছিল।   

কিন্তু আজকের প্রজন্ম এরকম হচ্ছে কেন? কেন তারা বেছে নিচ্ছে এরকম চরম পথ? `আমাদের মনের নানা স্তর। সেই স্তরগুলির মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে বিপদ`, ব্যাখ্যা করলেন মনস্তত্ব নিয়ে পড়া স্বরূপ গুপ্ত, `এই প্রজন্মের অনেকেই `না` শুনতে অভ্যস্ত নয়। সম্ভবত শোনেইনি কোনওদিন। তাই প্রেমিকা না বললেও বুঝতে পারে না। বাড়িতে যেভাবে জেদ করে কিছু আদায় করে, এক্ষেত্রেও একই চেষ্টা করে। ব্যর্থ হলে প্রত্যাঘাত করে। সেটা কখনও চরম আকার নেয়।`

তবে শুধু মন নয়। পাশাপাশি জরুরি হল শিক্ষা, যা আমরা পাই পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বৃহত্তর সমাজ থেকে। এই শিক্ষার সামান্য খামতি কোনও কোনও মানুষের ব্যক্তিত্বে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। সেটি কখনও এতটাই মাত্রা ছাড়া হয়ে যায় যে, তারা সঠিক-বেঠিক অথবা শুভ-অশুভর পার্থক্যটুকুও করতে পারে না। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে ভালবাসার মানুষটির ক্ষতি করার অপরাধে যারা জড়িয়ে পড়ে, তাদের অধিকাংশই এরকম। তাদের বেড়ে ওঠায় বিরাট ফাঁক রয়ে যায়। 

আসলে প্রবল অধিকারবোধের প্রাবল্যে নয়, প্রেমের সাফল্য পারস্পরিক বোঝাপড়ায়। জোর করে কোনও কিছু আদায় করা যায় না। বরং তাতে বিপ্রতীপে থাকা মানুষটির মন আহত হয়। আর এই জোর করা ব্যাপারটি যখন শারীরিক নিগ্রহে বা হত্যার মতো বিষয়ে পরিণত হয়, তখন সেটি অতি অবশ্যই ঘৃণ্য অপরাধ। সেই অপরাধের কোনও ক্ষমা হয় না। হওয়া উচিতও নয়। তাহলে সকলের ওপরেই অবিচার করা হয়। 

* প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা


No comments: