'নাম লিখেছি একটি তৃণে...'
শৌভিক রায়
মা'কে দাদু গান শিখতে দেননি বলে মায়ের চাপা অভিমান ছিল।
সেই আমলের ছাপোষা শিক্ষক, ছোট নাগবাবু নামে পরিচিত, দাদু সম্বোধনের মানুষটি ভাগ্য অন্বেষণে বীরভূমের গ্রাম ছেড়ে কাটিহারে এসেছিলেন।
তাঁর সত্যিই সামর্থ ছিল না, মা'কে গান শেখান। টানাটানির সংসার! নুন আনতে পান্তা না ফুরোলেও বড় মেয়েকে গান শেখানো ছিল নিতান্তই বিলাসিতা।
মা বুঝতেন সেটা। গান না শিখলেও আসলে মা সুর বুঝতেন। ছিলেন সুরেলা।
মায়ের সুর খেলে বেড়াত সারা বাড়িতে। সেলাই, উল বোনা, সকাল সন্ধ্যা ঘরদোর পরিষ্কার রাখা, আলনায় কাপড়চোপড় গুছিয়ে রাখা ইত্যাদি সবেতেই মা সুর ছড়িয়ে যেতেন।
সেজন্যই বোধহয় বিয়ের সময় মায়ের জ্যাঠামশাই আশীর্বাদ করেছিলেন, 'সুরে থাকিস লীলু, সুরেলা করিস সবাইকে।'
মা সবাইকে সুরেলা করেছিলেন। তালহীন, লয়হীন আমার বাবা কাকা ঠাকুরদা দাদা সবাই মায়ের কাছ থেকে সুর শিখেছিলেন। আমি শিখিনি। বেসুরো ছিলাম তাই।
সুরে ভাসতে ভাসতে আমার মা একদিন বৃদ্ধা হলেন।
মা কি বৃদ্ধা হয়েছিলেন? মায়েরা কি বৃদ্ধা হন?
মায়েদের গায়ের গন্ধে এত সুর খেলা করে যে, কখনও মনে হয় না মায়েরা বৃদ্ধা হন।
আমার মাও বৃদ্ধা হননি। বরং আরও সুরেলা হয়েছিলেন বা হচ্ছিলেন দিন দিন...
বেসুরো আমি সুর শিখলাম চিতা জ্বললে। স্পষ্ট দেখলাম লেলিহান সেই আগুনে সুর চুঁইয়ে চুঁইয়ে নামছে আমার চারদিকে।
আসলে আগুনের আসনে বসে মা তাঁর সব সুর শিখিয়ে যাচ্ছিলেন বেসুরো এই আমাকে!
জ্বলছিল প্রবল আগুন। সুরের আগুন।
পুড়তে পুড়তে মায়ের দেওয়া সেই সুরে ভিজে যাচ্ছিলাম ক্রমশ...
ভিজে যাচ্ছি এখনও....
No comments:
Post a Comment