অস্তিত্বের অধিকার নয়, সহাবস্থানই মূল
শৌভিক রায়
কবি বলেছিলেন, 'প্রাণ আছে এখনও প্রাণ আছে/ সমস্ত বিধিনিষেধের বাইরেও আছে অস্তিত্বের অধিকার'।
অস্তিত্বের অধিকার নিয়ে পূর্ববর্তী প্রজন্মের সঙ্গে পরবর্তীদের টানাপোড়েন বোধহয় সৃষ্টির শুরু থেকেই। আর সেই সুবাদে পরের প্রজন্মকে দাগিয়ে দেওয়ার জ্যাঠামশাই সুলভ ব্যবহার ব্যবহার, অগ্রজদের এসেই যায়। অনেক সময় নিজেদের অজান্তেও তারা এমনটি করে থাকেন। বুঝিয়ে বললেও বোঝেন না!
অধিকার বোধ কোনও অন্যায় নয়। বরং সেটি থাকা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু তার প্রাবল্য যখন স্বাভিমানে পরিণত হয়, দ্বন্দ্ব আসে তখনই। 'শুরু থেকে আছি, অতএব আজও থাকব, যা বলব সেটিই ঠিক' জাতীয় ভাবনায় জীর্ণ হয় মন। ফল? কখনও হতাশা, কখনও অসহিষ্ণুতা আর শেষ পর্যন্ত সংঘাত।
সংঘাতটা অবশ্য যতটা না অন্যের বিরুদ্ধে, তার চাইতে অনেক বেশি নিজের সঙ্গে। মনস্তত্বের ভাষায় পুরো ব্যাপারটিই এক ধরণের ম্যানিয়া, যা শেষ পর্যন্ত পাল্টে যায় অন্যকে দোষারোপে, 'বিলো দা বেল্ট' আঘাত করায়। এই রোগে আক্রান্ত সমাজের বহু মানুষ। বিস্মিত হই প্রাজ্ঞ বিবেচক বলে পরিচিত সৃজনশীল বয়স্ক মানুষটিও এই মনোভাবের বাইরে নন।
উল্টোদিকে অস্তিত্বের অধিকার ময়দানে নামিয়ে দেয় অপেক্ষাকৃত অনুজদের। পথ চলতি তাই দেখি, শহরের নোংরা দেওয়ালকে নিজেদের সৃষ্টিতে অন্য রূপ দিচ্ছে তারা। কে বলেছিল তাদের ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে? কেউ না। অন্তর্গত ভাবনা থেকে উঠে আসা এই বোধ, নিঃসন্দেহে অদ্ভুত এক মূর্ততা প্রকাশ করে। বুঝিয়ে দেয় সব কিছুর ওপর নিজেদের নিরুচ্চার অস্তিত্ব। এই অস্তিত্ব তাদের কেউ শেখায়নি। নিজেদের মতো খুঁজে নিয়েছে তারা। নিজেদের মগ্ন চৈতন্যে যে চেতনা জেগে উঠেছে তার তুলনা তারা নিজেরাই।
এই চেতনায় জারিত হয়েই একদা তরুণ অ্যালেন গিন্সবার্গ ছুটে এসেছিলেন যশোর রোডে। উদ্বাস্তুদের পাশে দাঁড়াতে। কিছুদিন আগেই সিংঘুতে সমবেত হয়েছিল বর্তমানের হাজারও তরুণ। দাবি ছিল কৃষক বিল প্রত্যাহার। আবার, অতিমারি চলাকালীন লক্ষ লক্ষ যুবক সাহায্যের থলি নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল নিরন্ন জনতার পাশে। বুঝিয়ে দিয়েছিল, সমাজের ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে তারা কখনই পিছপা নয়। সেদিনও তাদের এই ভাবনা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত।
সহজাত এই ভাবনা কি কুর্নিশের নয়? প্রশংসার নয়? সেটা কিন্তু আমরা অগ্রজরা বিশেষ করিনি। কাছে টানিনি তাদের। বরং যখনই বুঝেছি নিজেদের অস্তিত্ব সংকটের মুখে, কখনও বিদ্রুপে ভরিয়ে দিয়েছে, কখনও এক কদম এগিয়ে নিজেদের নাক কেটে তাদের যাত্রা ভঙ্গ করেছি! বাহবা যে একেবারেই দিইনি, সেটা হয়ত নয়। কিন্তু সেই দেওয়ার মধ্যে কতটা আন্তরিকতা ছিল, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
অথচ কোনও ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই তারা। সাহিত্য থেকে শুরু করে শিল্প, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, বিনোদন ইত্যাদি সর্বত্র তাদের উজ্জ্বল অস্তিত্ব প্রমাণিত। সেই অস্তিত্বে ঔদ্ধত্য নেই। আছে লাজুক শ্লাঘা। আছে বাড়িয়ে দেওয়া বন্ধুত্বের হাত। অগ্রবর্তী হিসেবে সেই হাত যদি আমরা না ধরি, যদি না তাদের জন্য জায়গা করে দিই, তবে তার দায় আমাদের। ওদের নয়। কেননা মহাকালের নিয়ম এটাই। স্বতঃসিদ্ধ এই বিষয়টি বুঝতে না পারলে অস্তিত্ব বিপন্ন হবে অগ্রজদেরই।
আসলে সংঘাতে নয়, দুনিয়া চলে সহাবস্থানে।
** শ্রী কৃষ্ণ দেব সম্পাদিত 'প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা' পত্রিকায় প্রকাশিত

No comments:
Post a Comment