পরিবার
শৌভিক রায়
পরিবার ব্যাপারটি ঠিক কী? জন্মের বা রক্তের সম্পর্কিত মানুষেরা মিলে পরিবার?
শুধুমাত্র সেই অর্থে ধরলে কিন্তু আগামীতে পরিবার নামের প্রতিষ্ঠানটি থাকবে না।
এই বিষয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। থাকাটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু খুব ভুল বোধহয় বলছি না।
একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে দাদা, দিদি, কাকা, পিসি, মাসি ইত্যাদি ডাকগুলি। এই প্রজন্মের মধ্যে তবু যেটুকু আছে, সেটা হারাতেও আর বেশিদিন নেই। যৌথ পরিবার কবেই ভেঙে চৌচির। দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হয় তাদের। ছোট ছোট পরিবারগুলোতে `তুমি আর আমি আর আমাদের সন্তান` ছাড়া কেউ নেই। এরকম পরিবারের সন্তানটি যখন বাবা মা হবে, তখন তার সন্তানটিকে দেখতে আসবে না কোনও পিসি বা মাসি, কাকা বা জ্যাঠা কিংবা মামা।
তাহলে পরিবার কি থাকবে না? সত্যিই?
উত্তর তো দেবে ভবিষ্যত।
তবে ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, পরিবারে আত্মীয়ের জায়গা নেবে বন্ধুরা। ইতিমধ্যে তারা অনেকটাই নিয়ে ফেলেছে। আগামীতে সেই নেওয়াটা হয়ত সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। বৃত্ত পূরণ হবে।
পরিবারের কথা ভাবলে, নিজের পরিবার ছাড়া যে পরিবারের কথা মনে হয় তা ছিল ফালাকাটা হাই স্কুলের অতীতের শিক্ষক-শিক্ষিকা-শিক্ষাকর্মীদের পরিবার।
এক বর্ণ বাড়িয়ে বলছি না। আমরা সত্যিই যেন একটা পরিবারে বড় হয়েছিলাম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লেও, কমবেশি যোগাযোগ সবার সঙ্গেই রয়েছে। তাই কেউ অকালে চলে গেলে সবাই বোধহয় একই রকম মন খারাপে ভুগি।
মজা হল আমাদের সেই পরিবার কিন্তু শুধুমাত্র শিক্ষক-শিক্ষিকা-শিক্ষাকর্মীদের সন্তানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বৃহত্তর পরিবারের সদস্য হিসেবে আমাদের ব্যক্তিগত স্তরের বন্ধু-বান্ধবরাও ছিল আমাদের স্বজন। আমি জানি আমাদের সেই বন্ধুরা (যারা ফালাকাটা হাই স্কুলের সঙ্গে আমাদের মতো সম্পর্কিত নয়) একই রকম কষ্ট পায় কোনও অকালবিয়োগে।
সেসব দিন বোধহয় এরকমই ছিল। একসঙ্গে বেড়ে ওঠা, একসঙ্গে সবকিছু ভাবা। অবশ্যই বয়সের ফারাকে কারও কারও সঙ্গে কিছু দূরত্ব ছিল। সেটা থাকা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু পারস্পরিক সম্মান-ভালবাসা-স্নেহ-শাসনের খামতি ছিল না কখনও। কত অনায়াসে রুমাদি বা রুবিদি বা তুলিদি, বেবিদি বকুনি দিতে পারত, ডাম্পি বা ছোটু আবদার করতে পারত। আজও পারে। সেই অধিকার সবার আছে।
এই মুহূর্তের বড় হয়ে উঠতে থাকা প্রজন্মের কাছেও আজকের দিনগুলি এরকমই থাকবে। যে অনুভূতি নিয়ে এই লেখাটি লিখছি, সেই অনুভূতি নিয়েই আজ থেকে বহু বছর পর কেউ হয়ত লিখবে এরকম কোনও কথা।
আসলে আমরা কেউ তো নতুন কিছু লিখি না। কেননা নতুন কিছু লেখা যায় না। মানুষের অনুভূতি সর্বদেশে সর্বকালে এক থাকে। লেখার ধরণ পাল্টে আমরা সেই একই কথা বলে চলি আজীবন।
বৃত্ত এভাবেই পূর্ণ হয়.... শুধু সেই বৃত্তে কেউ কেউ জলের দাগ রেখে যায় হঠাৎ!






No comments:
Post a Comment