আমার ধারণা ছিল ছেলেটির বাড়ি মালদায়। একদিন কথায় কথায় জানতে চাইলাম, মালদার কোন পাড়ায় বাড়ি তার। আমাকে অবাক করে সে বলল, `আরে ভাই তোমার মতো আমি মালদার লোক নই রে! আমার বাড়ি কোচবিহারে।` যখন সে জানল আমার বড় হয়ে ওঠা কোচবিহারের দিনহাটার ও জলপাইগুড়ির ফালাকাটার বাড়িতে, তখন দুজনেই হেসে মরি!
সেই ছেলেটির এই স্মৃতি মনে আছে কিনা জানিনা। কেননা এখন সে ব্যস্ত সাংবাদিক। এবিপি আনন্দের পর্দায় তাকে দেখা যায় প্রায়ই। নাম তার দীপক ঘোষ।
মালদা প্রসঙ্গ বলতে গিয়ে কেন জানি এই ঘটনাটিই সবার আগে মনে এলো! অথচ মারাত্মক গরমের জন্য এই শহরটিকে খুব বেশি পছন্দ কোনোকালেই করতাম না। কিন্তু কেন জানিনা শহরটা ঘুরে ফিরে বারবার এসে যায় আমার জীবনে।
মনে পড়ে যাচ্ছে বাবা-মায়ের হাত ধরে সেই প্রথম মালদা আর গৌর দেখবার স্মৃতি। কত বয়স তখন আমার? ছয়? নাকি সাত? যাঁরা বলতে পারতেন তাঁরা আর নেই বলে নিজেও নিশ্চিত জানিনা আজ। শুধু আগফা ক্যামেরায় বাবার তোলা সাদা কালো ছবিগুলি রয়ে গেছে। সেগিলি দেখলেই মনে পড়ে যায়, টাঙায় চেপে, ঈষৎ লাল মাটির পথে, দাদার পাশে বসে, সেই চলা গৌরের পথে।
মালদা-ফারাক্কা মনের ভেতর রয়ে যায় আরও দুবারের জন্য। কাকভোরে ফারাক্কায় নেমে ঠাকুরদার অস্থি গঙ্গায় ভাসিয়ে আমি আর সেজকাকু মালদা ফিরে এসেছিলাম দুপুর নাগাদ। উ ব রা প সংস্থার ডিপোর ঠিক উল্টোদিকে একটি হোটেলে নিরামিষ মিল খেয়েছিলাম দেড় টাকায়। কাকু ফল খেয়েই ছিলেন। ফিরতি ট্রেন ছিল অনেকটা রাতে। ফলে সারাদিন মালদা স্টেশনে কেটেছিল। আমি অবশ্য স্টেশন লাগোয়া সদ্য তৈরি হওয়া পার্কে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আর এই কিছুদিন আগে, রীনার বাবার নশ্বর দেহকে ফারাক্কায় বিদায় জানিয়ে কাকভোরে মালদা পার করেছিলাম বিষণ্ণ হয়ে। থাকে সে কথা আজ।
কতবার যে শহরটাকে রাতের বেলায় ছুঁয়েছি! ট্রেন তো ট্রেন, বাসেও কি কম বার? কলকাতা ফেরত বাস মালদায় ঢুকলেই তো মনে হত, শিলিগুড়ি বা কোচবিহার চলে এলো! আসলে রাজধানী কলকাতা তো আমাদের মতো মানুষদের কাছে চিরকালই বহুদূরের এক শহর! তাই ওখানে গেলেই জল ছাড়া মাছের মতো দশা হত দু`চারদিনেই। হাঁসফাঁস করতাম কবে ফিরে যাব! সেই ফেরাকেই যেন স্বাগত জানাতো মালদা।
অবশেষে মালদার সঙ্গে আত্মীয়তা হয়েই গেল। আর সেটা হল বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের হাত ধরেই। আমাদের ইংরেজি বিভাগের সহপাঠীরা তো অবশ্যই, অন্যান্য বিভাগের বন্ধুদের কৃতিত্বও কম নয় এই ব্যাপারে। ব্যাপারটা আরও বেশি পোক্ত হল রীনার রুমমেট সুমিতার জন্য। ও মালদার মেয়ে। ওর বর অপ্রতিম আমার রুমমেট না হলেও, এক হোস্টেলে থেকেছি আমরা। ফলে আমাদের চারজনের রসায়ন সবসময় আলাদা। আর সেজন্যই মালদা হয়ে উঠল আমার অন্যতম প্রিয় শহর। এখানেই রয়েছে আজিজুর, আফতাব, অরিন্দম, মনশ্রী, ভবানী, শুভময়, রাজীব সহ আমাদের ইংরেজি ডিপার্টমেন্টের আরও অনেকে। রয়েছে অপরাজিতা, রক্তিম, শাশ্বতী, সলিল। বন্ধু পরিবার বাদেও আজকাল মালদায় রয়েছে আমার বোন বিপাশা। ওর কর্তা নীলাঞ্জন চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট প্রোজেক্ট অফিসার। ওদের সন্তান ছোট্ট তূর্যের কাছে আমি হলাম লাড্ডুগুড্ডু মামা আর রীনা হল 'মহিলা`। তাই এসব কিছু মিলিয়ে মালদা আমার কাছে বেশ জমজমাট।
এবারের মালদা ভ্রমণে তাই তারিয়ে তারিয়ে কানির মোড়, কৃষ্ণপল্লি সাবওয়ে, রতন সুইটস, রাজ হোটেল মোড়, নেতাজি ক্লাব, চিত্তরঞ্জন মার্কেট, জহরা কালীবাড়ি, ৪২০ মোড়, গৌর, আদিনা, পাণ্ডুয়া, ফারাক্কা, ফোয়ারা মোড়, বাঁধ রোড, টাউন হল ইত্যাদি সব একাকার করেছি।
মূল উদ্দেশ্য অবশ্য ছিল আমাদের উ ব সারস্বত সম্মান অর্পণ কমিটির অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া। শান্তিনিকেতন থেকে এসেছিলেন অধ্যাপক অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য। এবার নিয়ে ওঁর সঙ্গে চতুর্থ বা পঞ্চমবার দেখা। ছিলেন অধ্যাপক আনন্দগোপাল ঘোষ সহ বহু গুণীজন। কিন্তু আমার কাছে অনুষ্ঠান গৌণ হয়ে গেছিল। চোখে ভাসছিল অতীতের লক্ষণাবতী নগরী, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংলেজাবাদ, পিয়াস বাড়ি, কদম রসুল আর কোতোয়ালি দরজার ওপারে `রাজশাহী ৮২ কিমি, ঢাকা ৩৩১ কিমি`র মাইলস্টোন......
সহধর্মিণী রীনা, অধ্যাপক অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য (মাঝে) কে নিয়ে
যাদের জন্য আর এক ঘর সেই অপ্রতিম ও সুমিতা সহ আমরা
বোন বিপাশা, বোন জামাই নীলাঞ্জন ও তূর্য
পর্ব-দুই
গাড়ি থেকে নামতেই রোদ-স্নান হয়ে গেল।
এই বছর তো আমাদের ওদিকে মানে কোচবিহারে রোদের মুখ সেভাবে দেখাই যাচ্ছিল না। তাই গৌড়বঙ্গের এই চড়া রোদে নিমেষেই ঘেমে উঠলাম। কিন্তু তাতে কী! চোখের সামনে পবিত্র ভূখন্ড। আগেও এসেছি বাবা-মায়ের হাত ধরে। কিন্তু সেই স্মৃতি মিলিয়ে গেছে কবেই। তাই রামকেলির মাটি স্পর্শ করেই মন চনমনে হয়ে উঠল প্রবল গরমেও। আসলে পবিত্র রামকেলি সম্পর্কে এত কিছু শুনেছি যে, বিশ্বাসই হচ্ছিল না, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যর স্মৃতি বিজড়িত জনপদটিতে চলে এসেছি।
মনে করা হয়, ১৫১৪/১৫১৫ নাগাদ শ্রীচৈতন্য এখানে আসেন। দাক্ষিণাত্য ও ওড়িশায় নিজের ধর্মের প্রচার সেরে তিনি বৃন্দাবন ও মথুরা যাবেন বলে মনস্থির করেছিলেন। সেই যাত্রাপথেই জ্যৈষ্ঠ সংক্রান্তির সময় রামকেলিতে পা রাখেন তিনি। মহামানবের আগমনকে কেন্দ্র করে 'আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে' জনপ্লাবন ঘটেছিল রামকেলিতে। দিন তিনেক এখানে কাটিয়ে নিজের পথে চলে যান গোরা। রেখে যান তাঁর পদচিন্হ এই গ্রামের মাটিতে। তাঁর স্পর্শে বিখ্যাত হয়ে ওঠে অখ্যাত এক গ্রাম। তবে শুধু আসাই নয়, রামকেলিতে মহাপ্রভু কিন্তু আর একটি কাজ করেছিলেন। গৌড়ের তৎকালীন শাসক হুসেন শাহের সাকর মল্লিক ও দবির খাস অর্থাৎ যথাক্রমে প্রধানমন্ত্রী (পূর্বনাম অমর) ও ব্যক্তিগত সহায়ক (পূর্বনাম সন্তোষ)-কে কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষা দেন। তাঁদের নতুন নাম হয় সনাতন গোস্বামী ও রূপ গোস্বামী। ইতিহাস বলছে, রামকেলির ৫০০ বছরের প্রাচীন মেলা রূপ-সনাতনের হাত ধরেই শুরু হয়েছিল মহাপ্রভুর আগমনকে কেন্দ্র করে। কালের নিয়মে একদিন গৌড়ের গরিমা মুছে গেলে, প্রায় ২০০ বছর মেলা অবশ্য বন্ধ ছিল। তারপর থেকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে চলছে সেই মেলা।
রামকেলির মেলা চমকপ্রদ নানা কারণে। অদ্বিতীয়ও বটে! মাতৃপিন্ড দানের জন্য এই মেলা বিখ্যাত। তথ্য বলছে, ভারতে সম্ভবত আর কোথাও এমনটি হয় না। পিতৃপুরুষ পিন্ড পেলেও মা রয়ে যান অন্তরালে। কিন্তু হিন্দু সমাজে মায়ের প্রতি এই অবহেলার যোগ্য জবাব রামকেলি। আরও গুরুত্বপূর্ণ, এই পিন্ড দান করেন মহিলারাই। কথিত, রাজা গণেশের আমলে ফিরোজ মিনারের কাছে থাকা গয়েশ্বরী (দ্বিমতে গৌড়েশ্বরী) মন্দিরে পিন্ডদান করা হত। তখন মন্দিরের পাশেই প্রবাহিত হত জাহ্নবী নদী। মূল মন্দির গঙ্গাবক্ষে বিলীন হলেও অথবা সুলতানি আমলে ধ্বংস হলেও দেবীর পুজো বন্ধ হয়নি। সেই জাহ্নবী নদী না থাকলেও, আজও মন্দিরে পিন্ডদানের রীতি প্রচলিত রয়েছে। তবে তা কেবল মেলার সময়েই।
রামকেলি অনন্যতা আর একটি ব্যাপারে। বৈষ্ণব সমাজের 'কন্ঠি বদল' করে গান্ধর্ব পদ্ধতিতে বিবাহ রীতি এখানে প্রচলিত। অতীতে অবশ্য মিলন উৎসবে শুধুমাত্র অনামিকা দেখে বৈষ্ণবী নির্বাচন করা হত। কেননা বৈষ্ণবীদের চেহারা থাকত কাপড়ে আবৃত। বর্তমানে সেই প্রথা না থাকলেও, বিয়ে হয় মালাবদল করে। সম্ভবত সেজন্যই রামকেলিকে গুপ্ত বৃন্দাবন বলা হয়ে থাকে।
এতসব ইতিহাসের মধ্যে বুঁদ হয়ে দেখে নিলাম তমালতলের ছোট্ট মন্দির। এখানে রক্ষিত মহাপ্রভুর পায়ের ছাপ। সেটি অবশ্য পাথরের ওপরে। বিশ্বাস অবিশ্বাস নিজের কাছে। দুটি তমাল ও কদম গাছকে ঘিরে তৈরি বেদিতে বসতেন শ্রীচৈতন্য। এখানেই দীক্ষা নেন রূপ-সনাতন। অদূরেই মদনমোহন মন্দির। রয়েছে আটটি কুন্ড- রূপসাগর, শ্যামকুন্ড, রাধাকুন্ড, ললিতাকুন্ড, বিশাখাকুন্ড, সুরভীকুন্ড, রঞ্জাকুন্ড ও ইন্দুলেখাকুন্ড।
বৃন্দাবন দাসের `চৈতন্যভাগবত`-এ বলা হয়েছে- `গৌড়ের নিকটে গঙ্গাতীরে এক গ্রাম/ ব্রাহ্মণ সমাজ তার রামকেলি নাম।` একজন প্রশ্ন হল রামকেলি কেন! জনশ্রুতি, মিথিলায় যাওয়ার আগে রামচন্দ্র নাকি এই অঞ্চলে কিছুদিন কাটান। এখানকার সহজাত ফল আম খাওয়ানোর জন্য তিনি স্ত্রী সীতা, ভাই লক্ষ্মণ ও অনুচর হনুমানকে নিয়ে আম বাগানে প্রবেশ করেন। সুস্বাদু ফলের গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে ফলকেলি করেছিলেন বলেই নাকি স্থানটির নাম রামকেলি হয়েছে। এই গল্পও অবশ্য আমার মতে বিশ্বাস অবিশ্বাসের সীমারেখায়। কিন্তু একটি প্রশ্ন মনে সবসময় জাগে। গৌড়ের নিকটবর্তী এই জনপদে মহাপ্রভু কেন পা রেখেছিলেন? দীর্ঘ যাত্রাপথের মাঝে শুধুই কি বিশ্রাম নিতে? নাকি তাঁর অন্য কোনও অভিপ্রায় ছিল?
আমি অবশ্য প্রশ্ন করেই ক্ষান্ত। উত্তর খুঁজবেন পন্ডিতেরা।
তার চেয়ে বরং এগিয়ে চলি। ঢুকে পড়ি ইতিহাসের আর এক অধ্যায়ে।
মহাপ্রভু চৈতন্যের পায়ের ছাপ, রামকেলি
শ্যাম কুন্ড
পর্ব- তিন
দুই দিকে দুই নদী আর মাঝে এক জনপদ। সমৃদ্ধ সেই জনপদ অতীতের স্মৃতি নিয়ে কোনোমতে আজ যেন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। চারদিকের আম বাগান, জলাশয়, মেঠো পথ, সরল জীবন দেখলে কে আর বিশ্বাস করবে যে, এখন থেকেই একসময় শাসন করা হত বঙ্গভূমি! অবশ্য কোনও একসময় এখানে ছিল শবর, পুলিন্দ ইত্যাদি সম্প্রদায়ের মানুষদের বসবাস। নির্ঝঞ্ঝাট সেই ভূখণ্ডে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন শশাঙ্ক। সাম্রাজ্যের নাম হয় গৌড়। জনশ্রুতি, গুড়ের ব্যবসার জন্য বিখ্যাত ছিল এই অঞ্চল। তাই গুড় থেকে গৌড় শব্দটির উদ্ভব। ৬০২ খ্রিস্টাব্দে শশাঙ্কের প্রতিষ্ঠিত রাজ্যের রাজধানী অবশ্য ছিল মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্ণ আর তাঁর রাজ্য অভিষেকের আগে, গৌড় ছিল পুন্ড্রবর্ধন নামে পরিচিত। শশাঙ্কের পর গৌড়ের রাশ চলে যায় হর্ষবর্ধনের হাতে। শুরু হয় বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের রমরমা। এরপর চলে সূর বংশীয় রাজাদের রাজত্ব। কিন্তু একই সঙ্গে সৃষ্টি হয় এক টালমাটাল অবস্থা। রাজনৈতিক এই ডামাডোল চলে অন্তত ১০০ বছর।
গৌড়ের অবস্থা আবার শান্ত হয় যখন গৌড়বাসীরা রাজ্যের হাল ফেরাতে পৌন্ড্রবর্ধনের উত্তরপুরুষ গোপালদেবকে রাষ্ট্রপ্রধান নিয়োগ করেন। শুরু হয় গৌড়ের নতুন অধ্যায়। কালিন্দী নদীর তীরে রাজধানী স্থানান্তরিত হয়। গোপালদেবের কীর্তিকে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দেন তাঁর পুত্র ধর্মপাল ও ধর্মপালের পুত্র দেবপাল। বিস্তৃতি ঘটে রাজ্যের। সমগ্র আর্যাবর্তে গৌড় তখন ঈর্ষা করবার মতো এক অনবদ্য দেশ, যেখানে বাড়িঘর কালো ব্যাসল্ট পাথরে তৈরি আর নকশায় অনবদ্য। গড়ে ওঠে বৌদ্ধবিহার, বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ও। সেই সুন্দর গৌড়ের স্থপতি সে আমলের দুই দিকপাল ভাস্কর ধীমান ও বীটপাল।
এই বংশের শেষ রাজা রামপালের মৃত্যুর পর বৌদ্ধ রাজার হাত থেকে গৌড়ের ক্ষমতা দখল করেন হিন্দু রাজারা। ইতিহাসে সেন বংশ নামে পরিচিত এই রাজাদের রাজত্বকাল শুরু হয় ১২ শতকে। গৌড়ের স্বর্ণযুগ বোধহয় ছিল এই সময়টি। কেননা বল্লাল সেন ও লক্ষ্মণ সেনের হাত ধরে গৌড়ের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বিদেশেও। গৌড় পরিচিত হয় লক্ষ্মণাবতী নামে। শিক্ষা-সংস্কৃতি-শিল্প সব দিক থেকেই গৌড় তখন পথপ্রদর্শকের ভূমিকা নিয়েছে।
কিন্তু সেন বংশেরও পতন হল। ১১৯৮ সালে প্রথম আক্রমণ করে বখতিয়ার খিলজি সাফল্য না পেলেও, ১২০২ থেকে ১২০৪ সালের মধ্যে গৌড়ে শুরু করলেন নবাবী শাসন। লক্ষ্মণাবতী হয়ে গেল লখনৌতি। ১৩৩৯ সালে পাঠান বংশের আফগান নায়ক ফকরুদ্দিন গৌড়ের মসনদে বসলেন। ১৪১৪ থেকে ১৪৩০ অবধি চলে জালালউদ্দিনের রাজত্ব। ইনি ছিলেন হিন্দু রাজা গণেশের পুত্র যদু। পিতৃ আদেশে তিনি মুসলিম ধর্ম নিয়েছিলেন। রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সাক্ষী গৌড়ে এরপর দেখা যায় ইলিয়াসশাহী বংশের রাজত্ব। গৌড়ের শেষ পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে হোসেন শাহের বংশকে। ১৪৯৪ থেকে ১৫২৫ অবধি তাঁরাই ছিলেন গৌড়ের কর্তা। কিন্তু ১৫৩৭ সালে শের শাহের আক্রমণ ও ১৫৭৫ সালের ভয়াবহ প্লেগে গৌড় ধ্বংস হয়ে যায়। একসময়ের সুরম্য হর্ম্য আর প্রশস্ত রাজপথের গর্বের গৌড় আজ ইতস্তত বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে!
রামকেলি থেকে খানিকটা এগিয়ে গৌড়ের অন্যতম বৃহত্তম স্মৃতিসৌধ বারোদুয়ারীর সামনে দাঁড়িয়ে মন খারাপ হয়ে গেল। মনে পড়ে গেল বাবার তোলা সাদা-কালো সেই ছবির কথা যা আজও রয়েছে আমাদের পারিবারিক সংগ্রহে। ১৬৮ x ৭৬ ফুট চওড়া ৪০ ফুট উঁচু মসজিদটির নির্মাণ শুরু করেছিলেন আলাউদ্দিন হুসেন শাহ। শেষ করেন তাঁর পুত্র নাসিরুদ্দিন নসরত শাহ। অবশ্য আজকাল বলা হচ্ছে, 'এ মসজিদটির নির্মাণকাল সঠিক ভাবে জানা যায় না। মেজর ফ্রাঙ্কলিন মসজিদটির কাছে একটি শিলালিপি খুঁজে পান, ধারণা করা হত এটিই এই মসজিদটির শিলালিপি। এতে তারিখ ছিল ৯৩২ হিজরি সন (১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দ), এটি অনুসারে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন সুলতান হোসেন শাহের পুত্র সুলতান নাসিরুদ্দিন নুসরত শাহ। পরে মসজিদের ঠিক বাইরে উত্তর-পশ্চিম কোণে আরেকটি শিলালিপি পাওয়া যায় যা এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। এতে ৯৩০ হিজরি সনে (১৫২৩ খ্রিষ্টাব্দ) নুসরত শাহ কর্তৃক একটি তোরণ নির্মাণের বর্ণনা পাওয়া যায়। যেহেতু এ শিলালিপিটি মসজিদের অধিক কাছে পাওয়া গেছে, তাই এটি মসজিদের তোরণটির শিলালিপি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আর স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের ভবনের তোরণ মূল ভবনের আগে নির্মাণ করা হয় না। মেজর ফ্রাঙ্কলিন প্রাপ্ত শিলালিপিটির তারিখ এ শিলালিপির পরের। তাই সেটি মসজিদের শিলালিপি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তাছাড়া নুসরত শাহ কর্তৃক নির্মিত বাঘা মসজিদের স্থাপত্য শৈলীর সাথে এর অমিল রয়েছে যথেষ্ট। এর ফ্যাসাদগুলোতে অলংকরণ খুবই কম, নেই বললেই চলে। তবে মিহরাবগুলোতে অলংকরণ রয়েছে। বরঞ্চ, আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলের প্রথমার্ধে নির্মিত ছোটো সোনা মসজিদের সাথে এর স্থাপত্য শৈলীর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। স্থাপত্যশৈলীর এই মিল এবং পরে প্রাপ্ত শিলালিপিটির তারিখ থেকে এটা মনে হওয়া অসম্ভব নয় যে মসজিদটি আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলের শেষের দিকে নির্মিত হয়েছিল।'
ইন্দো-আরবি ঘরানার এই মসজিদটি নামে বারোদুয়ারী হলেও এর প্রবেশদ্বার আসলে এগারোটি। মসজিদের মাথায় রয়েছে ১১টি গম্বুজ। অতীতে তাদের সংখ্যা ছিল ৪৪। গম্বুজের সোনালী চিকন কাজের জন্য এই মসজিদের নাম বড় সোনা মসজিদ বলেও পরিচিত। কেননা গৌড়ের কাছে ,ফিরোজপুর গ্রামে, সোনালী চিকনের কাজ করা এরকম আরেকটি মসজিদ ছিল। সেটি ছিল আকারে ছোট। তাই এই মসজিদটিকে বলা হত বড় সোনা মসজিদ, আর ফিরোজপুরেরটিকে বলা হত ছোট সোনা মসজিদ। গবেষণা বলছে, মসজিদের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বে পার্শ্বের মাঝ বরাবর খিলানযুক্ত তোরণ ছিলো। এখন উত্তর ও পূর্বের তোরণ দুটি দেখা যায়। এ তোরণের মাপ ৩৮.৫ফুট x ১৩.৫ ফুট । 'একসময় এটি পাথর আবৃত ছিলো। এতে সাদা, নীল, সবুজ, হলুদ ও কমলা রঙ এর কাচের টাইলের উপর ফুল সদৃশ অলংকরণ ছিল। মসজিদ ভবনটির চারপাশে চারটি এবং মূল প্রার্থণালয় ও করিডোরের সংযোগস্থলে দুটি- মোট ছটি বুরুজ আছে। প্রতিটিই অষ্টকোণাকৃতি।'
যতটা পারি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম গৌড়ের এক অবিস্মরণীয় কীর্তি। অতীতে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব থাকলেও, আজ খানিকটা উন্নতি হয়েছে সেই অবস্থার। তবু মনে হল, এই অতীত স্মৃতি সংরক্ষণে আরও মনোযোগী হওয়ার দরকার রয়েছে আমাদের সকলের। শুধুমাত্র সেলফি তুলে আর সমাজ মাধ্যমে পোস্ট করে 'আমিও দেখেছি` ঘোষণা করবার আগে, সবারই কম বেশি জানা উচিত ঠিক কোন ঐতিহ্য বহন করে চলেছি আমরা। সেই ইতিহাস যদি ধরে রাখতে না পারি তবে পরবর্তী প্রজন্ম কিন্তু আমাদেরকেই দায়ী করবে!
পর্ব- চার
গৌড়ে ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে বারবার। আর তার সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে গৌড়ের ভাগ্যও। আজ গৌড়ে যা অবশিষ্ট তা দেখে কোনও একটি নির্দিষ্ট বংশ বা সময়কে বিচার করা যায় না। বিভিন্ন সময় ও বিভিন্ন বংশের শাসন নিয়েই অতীতের গৌড়।
বড় সোনা মসজিদ বা বারোদুয়ারীর পর, দাখিল দরওয়াজা দেখে মনে হল The Cambridge History of India-এর কর্তাব্যক্তিরা খুব কিছু ভুল বলেননি। তাঁদের মতে দাখিল দরওয়াজা বিশ্বের অন্যতম সুন্দর ইঁটের নির্মাণ। সত্তর ফুট উচ্চতার আর সাড়ে তেরো ফুট দৈর্ঘ্যের, লাল ইঁটে তৈরি এই বিরাট তোরণটি, ১৪২৫ সালে, নির্মাণ করেন বারবাক শাহ। তাঁর প্রাসাদে প্রবেশের মূল এই তোরণটি ছিল পরিখা দিয়ে ঘেরা। আজও তার প্রমাণ মেলে। সম্ভবত সেই আমলে ভাঁজ করা সাঁকো ফেলে পারাপার করা হত সেই পরিখা। পরিখায় ছাড়া হত হিংস্র সরীসৃপ। তোরণ থেকে কামান দাগার ব্যবস্থাও ছিল। ফলে সেলামি দরওয়াজা বলেও পরিচিত এটি। কিছুদিন আগে উত্তরাখণ্ডের রাজধানী দেরাদুনে ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট দেখে এসেছি। সেখানকার ইঁটের তৈরি অনুপম প্রাসাদ মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল। দাখিল দরওয়াজা দেখে হঠাৎই সে কথা মনে পড়ে গেল। দাখিল দরওয়াজা নিঃসন্দেহে তার পাশে কিছুই নয়। কিন্তু প্রাচীনত্বের দিক থেকে এই নিৰ্মাণ অতি অবশ্যই তাকে টক্কর দিতে পারে। আজ থেকে ৬০০ বছর আগেও যে এরকম নির্মাণ সম্ভব ছিল, তা দাখিল দরওয়াজা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।
পনের শতকে গৌড়ের শাসক যদু বা জালালউদ্দিনের মৃত্যুর পর পাঠান সেনাপতি নাসিরুদ্দিন গৌড় দখল করেছিলেন। তাঁর পুত্র ছিলেন বারবাক শাহ। মসনদে বসে তিনি তৈরি করেছিলেন সুরম্য এক প্রাসাদ। সেই প্রাসাদের বিশেষত্ব হল, সেটি ছিল দিঘির ওপর। দাখিল দরওয়াজা পার করে চাঁদ দরওয়াজা আর নিম দরওয়াজা হয়ে পৌঁছনো যেত প্রাসাদের দরবার মহলে। প্রাসাদের আর এক অংশে ছিল খাস মহল। তবে বারবাক শাহ শুধুমাত্র তিনটে তোরণ নির্মাণ করেই প্রাসাদের নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হতে পারেননি। ফলে, তৈরি হয়েছিল আর একটি অভিনব প্রাচীর। ১৫৬০সালে নির্মিত সেই প্রাচীরের নিচের দিক ছিল ১৫ ফুট আর ওপরের দিক সরু হয়ে ৮ ফুট ১০ ইঞ্চি প্রশস্ত করা হয়েছিল। এই প্রাচীরটি বাইশগজী প্রাচীর নামে পরিচিত। আজও এই প্রাচীর দেখে বিস্মিত হতে হয়।
বাইশগজী প্রাচীর আর প্রাসাদের এলাকাটি আমবাগানে ঘেরা। চারদিকে এত আমগাছ আমি আর কোনোদিন দেখিনি। প্রত্যেক গাছের ডাল নুইয়ে পড়েছে আমের ভারে। এদের দেখেই মনে হল, এরাই সেই প্রকৃত জ্ঞান তাপস যাঁরা মাথা নিচু করতে জানে। আমাদের মতো অল্পবিদ্যা নিয়ে লাফালাফি করে না।
আমবাগানে ইতস্তত ঘোরাফেরা করতে করতে আর মাটিতে পড়ে থাকা আম কুড়োতে কুড়োতে পৌঁছে গেলাম জাহাজঘাটায়। ছোট্ট জলাশয়ের পাশে ইঁটের নির্মাণ দেখলে বোঝা যায় না, এখান থেকে একদিন জলপথে যাওয়া যেত দূরে কোথাও। পরিত্যক্ত সেই জাহাজঘাটা দেখে মন বিষণ্ণ হয়ে যায়, যেমন হয় বিরাট সেই প্রাসাদের ভগ্ন অবস্থা দেখে। কিন্তু এটাই প্রকৃতির নিয়ম, এটাই সময়ের সবচেয়ে বড় শত্রুতা। সময় যেমন দেয় অনেককিছু, তেমনি কেড়েও নেয় নিজের মতো করে!
বারবাক শাহকেও সময় অনেককিছু দিয়েছিল। কিন্তু কেড়েও নিল সব একদিন। আর সেই করাল 'একদিনে' হাবসি সুলতান সইফ উদ্দিন ফিরোজ শাহ হত্যা করলেন বারবাক শাহকে। দখল করলেন গৌড়। জয়ের স্মৃতিকে অক্ষয় করতে তুঘলকি শৈলী আর টেরাকোটায় সমৃদ্ধ এক মিনার বানালেন, যা আজ ফিরোজ মিনার নামে পরিচিত। দিল্লির কুতুব মিনারের আদলে তৈরি এই মিনারটি ২৬ মিটার উচ্চতার ও ১৯ মিটার বেড়ের। মোট তল পাঁচটি। প্রথম তিন তল ১২ দিক বিশিষ্ট আর শেষ দুই তল বৃত্তাকার। মোট সিঁড়ি রয়েছে ৭৩টি। সিঁড়িগুলি ঘোরানো। এই মিনার থেকে আলোর সংকেতে খবর আদানপ্রদান করা হত বলে পীর-আশা-মিনার বা চিরাগদানি নামেও পরিচয় রয়েছে ফিরোজ মিনারের। মিনারটি নির্মাণ করে পীরু মিস্ত্রি নাকি ফিরোজ শাহের গলা থেকে মোতির মালা উপহার পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সৌভাগ্য তাঁর সঙ্গে বেশিদিন ছিল না। নিজের বোকামিতে শাস্তি পেয়ে ফিরোজ শাহের আদেশেই মিনারের চুড়ো থেকে মাটিতে পড়ে প্রাণ খোয়াতে হয়েছিল তাঁকে।
ইতিহাসের এই রসিকতায় নিজের মনেই হেসে উঠলাম। ছোট্ট এক জীবনে আমাদের কত মান অভিমান রাগ ক্ষোভ দুঃখ হতাশা! সামান্য কারণে কত বিবাদ, লাঠালাঠি, হানাহানি, হত্যা, গুপ্তহত্যা। কী হয় এতে? একদা গর্বের প্রতীক ওই বিজয়স্তম্ভ আজ সাধারণ মানুষের করুণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সময়ের কালো গহ্বরে কোথায় বারবাক আর কোথায় ফিরোজ! সব ধুয়ে মুছে সাফ। সময় বড্ড নির্মম। ভাবতে ভাবতে এগিয়ে চলি আবার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি নিয়ে ইতিহাসের অন্য আর এক অধ্যায়ে...
দাখিল দরওয়াজা
ফিরোজ মিনার
(পর্ব পাঁচ)
আন্তর্জাতিক সীমান্ত ঘেঁষা জেলা শহর মালদহের নাম আরবি শব্দ 'মাল` বা সম্পদ থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়।
গৌড়বঙ্গে এমনিতেই নদীর সংখ্যা প্রচুর। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে জলাভূমিও রয়েছে অনেক। ফলে কোনও জলাভূমি বা দহ থেকে মাল ওঠানামার তত্বটি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অতীতে সমগ্র অঞ্চলটি রেশম ও সুতি কাপড়ের জন্য বিখ্যাত ছিল। ফলে ইউরোপিয়ান বানিয়াদের এই অঞ্চলে আসতে দেরি হয়নি। ওলন্দাজদের দিয়ে শুরু হয়েছিল সেই আসা। পরে আসে ইংরেজ ও ফরাসিরা। ইতিহাস বলছে ১৬৮০ সালে ইংরেজরা একটি ছোট্ট গ্রাম কিনেছিল। সেখানেই তৈরি হয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুঠি। সেই কুঠিকে ঘিরে যে জনবসতি ধীরে ধীর গড়ে উঠেছিল তার নাম ছিল ইংলেজাবাদ। কালক্রমে সেটিই হয়ে যায় ইংরেজবাজার।
....গৌড়ের গৌরব আজ অস্তমিত। আধুনিক এই সময়ে গৌড়ের কাছে থাকা, ইংরেজবাজার সহ মালদা বা মালদহ বঙ্গদেশের অন্যতম পরিচিত স্থান। যে গৌড়কে ঘিরে একদিন বাংলার রাজনীতি ও সমাজনীতি আবর্তিত হত, আজ সেই গৌড় একা, নিঃসঙ্গ। ইতিহাস এখানে কথা বললেও, বড্ড মৃদু তার কণ্ঠ।
সেলামি দরজা, প্রাসাদ, জাহাজঘাটি ইত্যাদি দেখে পৌঁছে গেলাম কদম রসুল মসজিদে। এখানে রাখা হয়েছে হজরত মহম্মদের পায়ের ছাপ। বলা হয়, সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ মদিনা থেকে এই পায়ের ছাপ নিয়ে আসেন। তবে মহদীপুরের মৌলবী পরিবার এই পায়ের ছাপ দেখাশোনা করেন বলে, দিনশেষে চরণচিন্হ বিশিষ্ট প্রস্তরখন্ড ফিরে যায় সেই গ্রামে। নাসিরুদ্দিন নসরত শাহ নির্মিত অপূর্ব সুন্দর এই মসজিদের একদিকে রয়েছে আওরঙ্গজেবের সেনাপতি দিলওয়ারের পুত্র ফতে খাঁর সমাধি। অলৌকিক নানা কাজে পারদর্শী নেক বিবির সমাধিটিও মসজিদ ঘেঁষা।
মসজিদ থেকে বেরিয়ে আমবাগানের ভেতর দিয়েই পৌঁছে গেলাম চিকা মসজিদে। রূপ সনাতনকে বন্দি করে এখানেই রাখা হয়েছিল। অবশ্য কারারক্ষীকে হাত করে তাঁরা মহাপ্রভুর কাছে চলে গিয়েছিলেন। চিকা মসজিদের কারুকাজ অত্যন্ত সুন্দর। গম্বুজটির আকারও বিরাট। এককালে বাদুড়দের বসবাসের জন্য ৯৫ মি দৈর্ঘ্য-প্রস্থের এই মসজিদটির নাম হয়েছে চিকা মসজিদ। তবে একটু নজর করলেই এই মসজিদে এমন কিছু স্থাপত্য নজরে পড়ে যা হিন্দু স্থাপত্যের পরিচয় দেয়। মসজিদের কাছেই রয়েছে গুমটি দরওয়াজা আর দাতন মসজিদ।
কদম রসুল ও চিকা মসজিদের লাগোয়া লুকোচুরি গেট না দেখলে গৌড় দর্শন অসম্পূর্ণ থাকে। দ্বিতল এই দরজাটি ৬৫x৪২.৪ ফুট। গৌড়ের পূর্বদিকে থাকা এই দরজাটি ১৫২২ সালে হুসেন শাহ তৈরি করেছিলেন। অবশ্য অন্য মতে বলা হয়, ১৬৫৫ সালে শাহ সুজার নির্মাণ করেন এই রাজকীয় দরজা। বেগমদের সঙ্গে নবাবের লুকোচুরি খেলার ব্যবস্থা ছাড়াও এখানে নহবত বসত। দিনরাত্রি পাহারা দিত সশস্ত্র সৈনিকেরা।
রাজকীয় দরজা দেখার নেশায় চলে আসি কোতোয়ালি দরজায়। তিরিশ ফুট উচ্চতার আর ১৭ ফুট প্রস্থের খিলানযুক্ত এই বিরাট দরজাটি গৌড়ের দক্ষিণ দিকে নির্মিত হয়েছিল। পুরাতত্ব বিভাগের লেখায় দেখতে পাচ্ছি- Approximating in style to early Delhi architecture, it was probably built between the earliest inscription found at Gour (1235 AD) and Allauddin Mohammed Khilji`s death (1315 AD) when influence of Delhi predominated at Gour. কোতোয়ালি দরজায় পৌঁছে মনটা অন্যরকম হয়ে গেল। দরজার এপারে সারি সারি ট্রাক দাঁড়িয়ে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখিয়ে তারা গেট পার করে চলে যাচ্ছে ওপারে বাংলাদেশে। সীমান্ত রক্ষীদের অনুমতি নিয়ে দরজার পাশে উঁচু ঢিপির ওপর উঠলাম। জানা গেল ওপারে নবাবচাঁপাইগঞ্জ নামের জনপদ। দেখা গেল `রাজশাহী ৮২ কিমি, ঢাকা ৩৩১ কিমি`র মাইলস্টোন। কত কাছে! কিন্তু কত দূরে....
গৌড় দর্শনের শেষ পর্যায়ে লোটন মসজিদ। ১৪৭৫ সালে সম্ভবত ইউসুফ শাহ এক গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। তবে কিংবদন্তি বলে কোনও এক রাজগণিকা এর নির্মাতা। মনে করা হয়, এই মসজিদের দেওয়াল রঙিন ইঁট দিয়ে নির্মিত ছিল। সবুজ, হলুদ, নীল ও সাদা রঙের মিনা করা তলী অবশ্য আজও দেখা যায়। লোটন মসজিদের কাছে গুণমন্ত আর চামকাটি মসজিদও অত্যন্ত সুন্দর।
শেষ হল গৌড় দর্শন। ইতিহাসকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চললাম এবার দক্ষিণ দিকে। আসলে সভ্যতা মানেই তো নদীমাতৃক। প্রবাহের অস্তিত্ব যেখানে নেই, সেখানে জনপদেরও সেরকম চিহ্ন থাকে না। গৌড়বঙ্গে যদি এত সংখ্যক নদী না থাকত তবে গৌড় হয়ত সৃষ্টিই হত না। আর এই সব নদীদের শ্রেষ্ঠটি অতি অল্প দূরেই রয়েছে। তাই এত কাছে এসে সেই নদীকে স্পর্শ করব না সেটা হয় না।
চললাম তাই ফারাক্কায় আর্যাবর্তের শ্রেষ্ঠ নদী পতিতপাবনী গঙ্গার স্পর্শ নিয়ে নিজেকে একটু পবিত্র করতে। এই তো মাত্র কয়েকদিন আগে ঋষিকেশে এই গঙ্গায় ভাসিয়ে এসেছি আমার নষ্ট আত্মার সব অহংকে। আবার আজ গঙ্গা চোখের সামনে।
মনে মনে বলে উঠলাম তাই- `বারবার নষ্ট হয়ে যাই প্রভু তুমি আমাকে একবার পবিত্র করো...`
চিকা মসজিদের ভেতরে
লোটন মসজিদের কাজ
কোতোয়ালি দরজা
লুকোচুরি গেট
কদম রসূল
চামকাটি মসজিদ
পয়গম্বরের পায়ের ছাপ
লোটন মসজিদ
চিকা মসজিদ
চামকাটি মসজিদ
পর্ব- ছয়
বাবার মুখে শোনা সেই ঘটনার কথা মনে পড়ল। অনেকের সঙ্গে বাবাও সকরিগলিঘাটে খেতে বসেছেন। হোটেলের নিয়ম অনুযায়ী আগেই টাকা দিয়ে মাছ-ভাতের অর্ডার দিয়েছেন। হঠাৎ চিৎকার 'স্টিমার ছাড়ছে, স্টিমার ছাড়ছে।` খাওয়া ফেলে সব্বাই ছুট। বাবাও। স্টিমারে উঠে জানা গেল তখনও স্টিমার ছেড়ে মণিহারিঘাটে যেতে ঢের দেরি। কিন্তু তখন আর হোটেলে ফিরবার উপায় নেই। ফিরলেও তারা তো আর মুখ চিনে রাখেনি। সুতরাং খাবারের আশা জলাঞ্জলি। হরিমটর খেয়েই স্টিমারে নদী পার হওয়া! কালকূটের একটি উপন্যাসে পড়েছিলাম, এখানেই এক মহিলা তাঁর হাত ধরে অনেকটা পথ এসেছিলেন তাঁকে নিজের স্বামী বলে ভুল করে! কেননা নদী তীরের ধুলোবালিতে কালকূট যেমন অচেনা হয়ে গিয়েছিলেন, তেমনি ঘোমটা টানা মহিলাটিও তাঁকে সেভাবে হয়ত লক্ষ্য করেননি!
ফারাক্কা ব্রিজ পার হতে হতে এসবই ভাবছিলাম। ভাগ্যিস এই ব্যারেজ আর ব্রিজটা হয়েছিল! তা না হলে বঙ্গদেশের উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রান্তে যাতায়াত করতে এরকম কত যে ঘটনা ঘটত! আর শুধু ঘটনাই নয়, দূরত্ব আর সময়! সেও কি কম ব্যাপার নাকি? প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, ফারাক্কা সম্পর্কে বলতে গিয়ে মণিহারি আর সকরিগলির প্রসঙ্গ কেন তুললাম হঠাৎ! আসলে ফারাক্কা ব্রিজ তৈরি হওয়ার আগে বঙ্গদেশের উত্তর আর দক্ষিণের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল ওই দুই জায়গা আর ওই স্টিমার। যাঁরা জিম করবেট পড়েছেন তাঁদের নিশ্চয়ই মোকামা আর সামারিয়া ঘাটের কথা মনে আছে। এই দুই ঘাটের মাধ্যমে একসময় উত্তর আর দক্ষিণ বিহারের (কিছু ক্ষেত্রে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের) যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন করা হত। পরবর্তীতে রাজেন্দ্র সেতু যেমন মোকামা আর সামারিয়ার গুরুত্ব কমিয়ে দেয়, তেমনি মণিহারী আর সকরিগলিও আজ বিস্মৃত ফারাক্কার জন্য।
অবশ্য এই বিস্মৃতি হতে পারত ১৮৫০ সালে। সেই সময় ব্রিটিশরা মুর্শিদাবাদ জেলার ফারাক্কায় গঙ্গার ওপর সেতু নির্মাণের প্রস্তাব রেখেছিল। কিন্তু সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। স্বাধীনতার পর, ১৯৬১ সালে ফারাক্কা ব্যারেজ প্রোজেক্ট অথরিটি গঠিত হয়। শুরু হয় ফারাক্কা ব্যারেজের সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গিপুর ব্যারেজ, ফিডার ক্যানেল, নেভিগেশন লক ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য নির্মাণ। ব্যারেজে নির্মিত হয় ১১২টি গেট। এর মধ্যে ১০৮টি মূল গেট আর ৪টি `ফিশ লক` গেট। রেগুলেটর গেট রয়েছে ১১টি। এই গেটগুলি দিয়ে আনুমানিক ৪০,০০০ কিউসেক জল ফিডার ক্যানেলে ছাড়া হয়। নির্মাণ সম্পূর্ণ হলে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তা উৎসর্গ করা হয় ১৯৭৫ সালে। ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের স্বপ্নকে সফল করেন ফারাক্কার অন্যতম স্থপতি দেবেশ মুখার্জি। গড়ে ওঠে নতুন এক ফারাক্কা, যার সৌন্দর্যে মোহিত হতে হয় সবাইকেই। এই ব্যারেজ যেমন কলকাতা বন্দরের জন্য প্রয়োজনীয় জল সরবরাহ করছে, তেমনি ব্যারেজের জন্যই গড়ে উঠেছে ফারাক্কা সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রোজেক্ট। আর এই ব্যারেজ যে সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম সে তো বলা বাহুল্য!
ফারাক্কা ব্রিজ পেরিয়ে, খানিকটা এগিয়ে, ডান দিকে বাঁক নিয়ে, এগিয়ে চললাম। পতিতপাবনী গঙ্গা পাশে পাশে চলছে। তবে সে বিপরীতমুখী। এই বিকেলে গঙ্গার ধারে ভিড় জমেছে। তবে তা বিক্ষিপ্ত। কিছু ঘাট থেকে নৌকো আর ভটভটি চলছে গঙ্গার বুকে। এরকমই এক ঘাটে জানলাম সেই নৌকো যাবে ঝাড়খন্ডে। সময় লাগবে নাকি ঘন্টা দুয়েক। এসব দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেলাম সেই শ্মশানঘাট যেখানে রয়েছে এমন এক স্মৃতি যার বোঝা বইতে হবে সারাজীবন। থাক সে ব্যক্তিগত কথন। আরও খানিকটা এগিয়ে নজরে এলো গুমানী নদী আর গঙ্গার মিলনে সৃষ্ট নীলকুঠি থাকা দ্বীপাকার অঞ্চলটিও।
ক্রমে আলো কমে এলো। গঙ্গার ধারের বাতিস্তম্ভে ধীরে ধীরে আলো জ্বলে উঠল। কানে এলো সাঁঝবাতি শঙ্খের আওয়াজ। ফারাক্কাকে বিদায় জানাবার সময় হয়ে গেছে বুঝতে পেরে ফিরে চললাম আবার মালদায়। পরের গন্তব্য আদিনা আর পাণ্ডুয়া। ইতিহাসের আর এক অধ্যায়কে প্রত্যক্ষ করতে।
পর্ব- সাত
ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ঘোরাঘুরির সুবাদে দেশের বেশ কিছু নামী মসজিদ দেখবার সৌভাগ্য হয়েছে। তাদের গাম্ভীর্য, বিশালত্ব, স্থাপত্য দেখেছি আর বিস্মিত হয়েছি। কিন্তু ঘরের কাছে আর এক ঘরে, এরকম একটি বিরাট ব্যাপার থাকতে পারে, সে সম্পর্কে কোনও ধারণাই ছিল না।
চড়া রোদ আজ। গৌড়বঙ্গের দাবদাহ বেশ টের পাচ্ছি। এত রোদে আমরা, যারা রাজ্যের আরও একটু উত্তরে থাকি, একটু অসুবিধেয় পড়ি আর কি। কিন্তু দামাস্কাসের আট শতকের জুম্মা মসজিদের অনুকরণে তৈরি আদিনা মসজিদটি দেখে সে অসুবিধে নিমেষে গায়েব হল। ইলিয়াস শাহের পুত্র সিকন্দর শাহ এই মসজিদটি নির্মাণ শুরু করেন ১৩৪৭ সালে। তাঁর পুত্র গিয়াসউদ্দিন আজমের আমলে ১৩৬০ সালে (মতান্তরে ১৭৭৩ সাল) সেই নির্মাণ সমাপ্ত হয়। বাংলাদেশের ন্যাশনাল এনসাইক্লোপিডিয়া বলছে, For a sultan like Sikandar Shah, who declared himself to be the 'most perfect of the sultans of Arabia and Persia' in 1369 AD, and eventually the khalifa of the faithful, the building of such a mosque was a natural manifestation of his power and wealth. Needless to say, a sultan who could compare himself with the Khalifas of Damascus, Baghdad, Cordova or Cairo could also erect a mosque comparable in size and grandeur to the great mosques of those capitals. It is curious that the Adina Mosque compares with the mosques of those cities not only in size, but also in plan and standardisation; in fact, it rivals the masterpieces of the world. A mosque, described as 'standard', requires a vast rectangular plan with an open courtyard (sahn) surrounded by cloisters (riwaqs) on three sides and the prayer chamber (zullah) towards the qibla. The Adina Mosque conforms to all these principles, and hence is a standard type of mosque.
বিতর্ক কিন্তু কখনই আদিনা মসজিদের পিছু ছাড়েনি। নামকরণের ব্যাপারটিই ধরা যাক। ফারসি ভাষায় 'আদিনা' অর্থ জুমা বার বা নামাজ পড়ার দিন। কেউ কেউ বলেন, পবিত্র মদিনার সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে মসজিদের নাম রাখা হয়েছিল আদিনা। তবে সবচেয়ে বড় বিতর্ক অন্যত্র। হিন্দুরাজা গণেশের দেবতা আদিনাথ শিবের থেকে এই নামটি এসেছে বলে বিশ্বাস বহুজনের। উড়িয়ে দেওয়া যায় না সেই মত। কেননা মসজিদের গায়ে, উপাসনা বেদির সর্বোচ্চ সোপানে রয়েছে হিন্দু দেবদেবী ও অন্যান্য স্থাপত্য। রয়েছে বৌদ্ধ ও জৈন স্থাপত্যও। আদিনাথ থেকে আদিনা শব্দটির উদ্ভবের কারণ তাই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ইতিহাসবিদ গবেষক ডঃ সুস্মিতা সোম লিখছেন, `সুলতান ইলিয়াস শাহের পুত্র সিকান্দার শাহ এই মসজিদটির নির্মাতা বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। যদিও এটির প্রকৃত স্থাপত্যকাল এবং প্রকৃতপক্ষে এটি কী ছিল সেই বিষয়ে ঐতিহাসিক গবেষকদের অনুসন্ধিৎসা কৌতূহল এবং বিতর্কের অবসান হয়নি আজও … শোনা যায় আদিতে এটি জৈন পথপ্রদর্শক আদিনাথের মন্দির ছিল। পরে পরিণত হয় বৌদ্ধ বিহারে। কেউ বলেছেন এখানে একটি বিশাল মন্দির তৈরির কাজ শুরু হয়।` ১৮৮৭-৮৮ সালে ‘আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ বেঙ্গল’ রিপোর্টে জে ডি বেগলার বলেছিলেন, 'The sanctum of the temple, judging from the remnants of heavy pedestals of statues, now built into the pulpit and the superb canopied trefoil now doing the duty of prayer niche stood where the main prayer nich now stands : nothing world probably so tickle the fancy of a bigot (?) as the power of placing the sanctum of his orthobox cult (in this case the main prayer niche) on the spot where hated infidel had his sanctum.’ অর্থাৎ আদিনা মসজিদ অন্য কোনও ভিত্তি ভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু তিনি নিজে স্বয়ং আদিনা মসজিদের চত্বরে ৫-৬ ফুট গভীরে খনন করেও, কোনও ভিত্তিভূমি পাননি। আবার কোনও কোনও ঐতিহাসিক গৌড়ের মন্দির ও প্রাসাদ ভেঙে আদিনা মসজিদের জন্য উপকরণ আনা হয়েছিল ভাবলেও, এই বিষয়ে প্রামাণ্য কোন নথি নেই।
কী হয়েছিল, কেন হয়েছিল, কীভাবে হয়েছিল ইত্যাদি সবই অতীত আজ। উত্তর খুঁজতে যাওয়াও বৃথা। তার চাইতে বরং দেখে নিই মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের অনন্য এই নিদর্শনটিকে। মসজিদে মোট স্তম্ভের সংখ্যা ৪০০। গম্বুজ রয়েছে ৩৭০টি। মসজিদের আয়তন ৫০৭ x ২৮৫ ফুট। একশ সাতাশটি সমভূজে বিভক্ত মসজিদে বারো হাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারেন। বাদশাহ কা তখত রাখা আছে ৮ ফুট উঁচুতে রথাকৃতি কালো বেদিতে। পশ্চিম দরজা দিয়ে ঢুকে দেখা যায় সিকান্দার শাহের সমাধি। তবে এই বিষয়েও বিতর্ক আছে। বাংলাপিডিয়া বলছে, `এর সহজ যুক্তিগ্রাহ্য প্রমাণ হলো প্রকোষ্ঠের মধ্য দিয়ে বিরাট প্রস্তর স্তম্ভের অবস্থান এবং শবাধারটির অবস্থান প্রকোষ্ঠের মধ্যবর্তী স্থানে নয়, মেঝের পশ্চিম প্রান্তে। বাদশাহদের কবর সাধারণত এক গম্বুজ বিশিষ্ট দালানে হয়ে থাকে এবং শাসকের দেহটি থাকে প্রকোষ্ঠের মাঝখানে এবং গম্বুজটি তার উপরে স্বর্গীয় খিলান ছাদের (vault) নিদর্শন।` আজকের আদিনা মসজিদ এক খন্ডহর যেন! পার্থক্য, সেই ধ্বংসাবশেষকে সাজিয়ে গুজিয়ে রাখা হয়েছে। বিশ্বাস করা কঠিন এক সময় এই মসজিদটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম। এটি সিরিয়ার উমাইয়া মসজিদের আদলে নির্মিত মসজিদে এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে অতীতের নানা চিহ্ন।
আদিনা মসজিদ থেকে চলে আসি একলাখি মসজিদে। হিন্দুরাজা যদু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে জালালউদ্দিন মহম্মদ শাহ নাম নিয়ে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। নির্মাণকালে এর ব্যয় হয়েছিল লক্ষ টাকা। ফলে নাম হয় একলাখি। টেরাকোটা শোভিত এই দুরন্ত মসজিদটিকে অবশ্য অনেকে একলক্ষীও বলে থাকেন। মসজিদে শায়িত স্বয়ং জালালউদ্দিন, বেগম আসমানতারা ও সন্তান আহমেদ। খুব কাছেই দশ ডোমের কুতুবশাহী মসজিদ। সূর্যের আলোয় স্বর্ণাভ দেখাতো বলে ছোট সোনা মসজিদ নামেও পরিচিত এই অপূর্ব স্থাপত্য। বড়ি দরগা, সালামি দরওয়াজা, ছোটি দরগা ইত্যাদিও পাণ্ডুয়া-আদিনার অন্যতম দ্রষ্টব্য। প্রত্যেকেই নিজেদের ঐতিহ্য ও অতীত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সব বৈপরীত্যের বিরুদ্ধে। বড়ি দরগায় দেখা যায় ফকির সৈয়দ শাহের ব্যবহৃত নানা সামগ্রী। অপর সিদ্ধ পীর নুর-কুতুব-আলমের স্মৃতি বিজড়িত মাজার ছোটি দরগাটিও বেশ সুন্দর। তবে ঢুকতে পারলাম না খানিক দূরের ডিয়ার পার্কে। ফলে দেখা হল না সিকন্দর শাহের ২৭ ঘরের ধ্বংসস্তূপ `সাতাশঘরা'।
তাতে অবশ্য খুব কিছু কষ্ট হল না। কেননা সুলতানের বাড়ির ধ্বংসাবশেষ না দেখে চলে গেলাম গ্রামের মাটির বাড়িতে। দুপুর তখন। প্রখর রোদের সেই দুপুরে মাটির বাড়ির স্নিগ্ধ ছায়া মুহূর্তেই টাটকা করে দিল মনকে। কী সুন্দর সাজানো গোছানো বাড়িগুলি। আমাদের এদিকে একদা টিনের বাড়ির জায়গা পাকা দালান বাড়ি দখল করলেও কিংবা খোদ মালদায় ফ্ল্যাটবাড়ি অতীতকে পরাজিত করলেও, এই গ্রামগুলিতে এখনও সাবেকিয়ানার স্পর্শ। কোচবিহার থেকে এসেছি শুনে তারা পিঁড়ি দিলেন বসতে, চা-সরবতে আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। দুপুরের খাবার খেয়ে যেতে বললেন। সবিনয়ে তাদের অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে দিতে ভাবছিলাম, এখনও আতিথেয়তা মুছে যায়নি। তাই অজানা অচেনা পরদেশীর জন্যও গ্রামবাংলায় অপেক্ষা করে ভালবাসা।
ঘরের কাছে আর এক ঘরের এই ছোট্ট পথে, মালদা রামকৃষ্ণ মিশন থেকে সোজা চললাম জহরা কালীবাড়িতে। শহর থেকে পাঁচ/সাত কিমি দূরের এই মন্দির অত্যন্ত বিখ্যাত। মন্দির গাত্রে উল্লিখিত, ১২১৩ বঙ্গাব্দে এখানে শুরু হয়েছিল দেবীর পুজো। অবশ্য বল্লাল সেনের আমলে এই অঞ্চলে বেশ কিছু মন্দির প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। জহরা কালীবাড়ি সম্পর্কে কথিত, ছল্ল তিওয়ারি নামে উত্তরপ্রদেশের এক মাতৃসাধক দেশ ভ্রমণে বেরিয়ে স্বপ্নাদেশে রায়পুর গ্রামের আমবাগানে দেবী জহরা চণ্ডীর বেদী স্থাপন করে। পরবর্তীকালে হীরারাম তিওয়ারি নামের অন্য এক সাধক দিব্যদর্শনে দেবীর রূপ প্রত্যক্ষ করেন। আর সেই অনুযায়ী বৈশাখ মাসে মায়ের অপ্রচলিত মূর্তির রূপরেখা তৈরি করেন। লাল রঙের ঢিবির ওপর রয়েছে এক মুখোশ। ঢিবির দু’পাশে আরও দু’টি মুখোশ দেখা যায়। এছাড়া গর্ভগৃহে আছে শিব আর গণেশের মূর্তি। বৈশাখ মাসে দেবী জহরার পুজো এভাবেই প্রচলিত হয়। অতীতে ডাকাতদের পুজো পেতেন মা। আর আজ ভক্ত সমাগমে একদা নির্জন গ্রাম গমগম করে। তবে পুজো হয় দিনে। মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তির নাম এসেছে `জহর' থেকে।
আদিনা মসজিদ
একলাখি মসজিদ
জহরা কালীবাড়ি
রামকৃষ্ণ মিশন, মালদা
শেষ হল ঘরের কাছে আর এক ঘরের বৃত্তান্ত। এবার ফেরা অন্য ঘরে। সে ঘর আসলে নামেই নিজের। আসলে নিজের বলে তো নির্দিষ্ট কিছু হয় না। সবই নিজের। শুধু ধরতে পারলেই হল! ধরতে পারি না বলেই আমার আমার করি। আর সেই করাতেই মুছে যায় কত স্মৃতি, কত প্রেম, কত কথকতা। দিনের শেষে শুধু দেখি, লোকসানের ঘরেই জমল সব। কিন্তু লাভের পাল্লা যে আরও ভারী বুঝলাম না তা!
(তথ্য সহায়তা: বাংলার ইতিহাস, গৌড়ের অতীত, উইকিপিডিয়া, সববাংলা, সববাংলায় ডট কম)
(সমাপ্ত)