নারী চেহারা বেজায় জটিল
শৌভিক রায়
ভাই-বউয়ের পাশে বসা ভাইঝিকে দেখে বেশ অবাক হলাম। কত্ত বড় হয়ে গেল দেখতে দেখতে! মায়ের পাশে না থাকলে চিনতেও পারতাম না।
না চিনতে পারা এবং রাস্তায় কাউকে না দেখা আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য।
খুব চেনা লোককেও চট করে মনে করতে পারি না আমরা। একটা আবছায়া অন্ধকার একটু আলো কেমন যেন মিলেমিশে সব গুবলেট হয়ে যায়! কোথায় যেন দেখেছি...কবে যেন দেখলাম...নামটা হল গিয়ে....হুমম... হুমমম...জলিল! হ্যাঁ। জলিল। হান্ড্রেড পার্সেন্ট কনফার্ম এবার। চিনে গেছি! উল্টোদিকের 'কেমন আছেন স্যার' প্রশ্নের উত্তরে তাই তেড়েফুঁড়ে উত্তর দিই,
- ঠিকঠাক একদম। তুই কেমন আছিস জলিল?
- ভাল আছি স্যার। কিন্তু আমি তো জলিল না।
আমার হড়বরানির গাড়ি ব্রেক কষে দ্রুত! সিলি মিসটেক। ছ্যা।
- ওহোহো....আরে ধুস! মুখ দিয়ে জলিল বেরিয়ে গেছে তোর নাম বলতে গিয়ে ইয়ে মানে...
- বিষ্ণু...
- ইয়েস ইয়েস... বিষ্ণু। তোদের ক্লাসে জলিল ছিল না, ওর সঙ্গেই গুলিয়ে ফেলেছি।
- স্যার আমাদের ক্লাসে তো জলিল বলে কেউ ছিল না। মঈনউদ্দিন ছিল।
- ওই তো...ওই মঈনউদ্দিনকে জলিল বলে ডাকতাম তো...ওটাই আর কি... হে হে... তো তুই এখন কোথায় থাকিস বাবা!
কিন্তু এভাবে কি আর বেশিদিন ম্যানেজ করা যায়? সেবার তো খুব বিপদে পড়েছিলাম। কল্যাণের সঙ্গে বহু কথা বলে, কুশল বিনিময়ের পরে যখন জানতে চাইলাম ওর বাবা সঞ্জয়দা কেমন আছেন, তখন অস্ফুটে উত্তর এলো, 'বাবা ভালই আছে স্যার। তবে আমি সঞ্জয়। বাবার নাম কল্যাণ। আপনি উল্টো করছিলেন এতক্ষণ স্যার!'
আজকাল তাই পারতপক্ষে কাউকে নাম ধরে ডাকবার ঝুঁকি নিই না। কেউ হেসে বা প্রণাম করে কথাটথা বললে 'হে হে তাহলে সব ভাল তো' বলে সেফ খেলি। বাকিটা খোদা ভরসা!
রাস্তায় লোকজনকে না দেখাটাও উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। উল্টোদিক থেকে আসা বহু পরিচিত জন দাঁত কেলিয়ে সাড়া না পেয়ে রীতিমতো খেপচুরিয়াস হয়ে পরে গালমন্দও করেছে আমাকে। এখন অবশ্য অধিকাংশই জেনে গেছে আমি সোজা মানুষ। এদিক ওদিক অভ্যেস নেই। গিন্নি অবশ্য এসব বোঝেন না। তার ধারণা রাস্তায় আমি সব্বাইকে দেখি, বিশেষ করে বিপরীত লিঙ্গের মানুষদেরকে তো দেখিই। হঠাৎ হঠাৎ বলে ওঠেন, 'ওই যে মেয়েটা গেল, ওর মতো একটা চুড়িদার কিনব।' কোন্ মেয়ে, কখন গেল এসব যে সত্যিই আমি জানিনা সেটা তাকে বোঝায় কার সাধ্য! স্মার্টলি বলে দেয়, 'ন্যাকা... দেখেনি! রাস্তায় মেয়ে দেখলেই তাকিয়ে থাকে আর বলে দিলে দেখিনি! ঢং! বুড়ো হয়ে গেল, মাথায় টাক তাও রস গেল না!'
যাহোক...মূল কথায় আসি। ভাই-বউয়ের পাশে ভাইঝি। দুজনেই গিন্নির সঙ্গে কথা বলছে। যে ভাইঝিকে অন্য সময় দেখলে কোনোভাবেই চিনতাম না, গিন্নির আর মায়ের সঙ্গে তাকে দেখে নিশ্চিন্ত হলাম। পাশে বসে ডান হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বললাম,
- মা তুই কত্ত বড় হয়ে গেলি এই কদিনে! এবার কোন ক্লাস হল?
খিক খিক করে হেসে উঠলো ভাইঝি। ভাই বউ হো হো করে শুরু করে দিল। কিছু বুঝতে না পেরে গিন্নির দিকে তাকিয়ে দেখি তার মুখ রাগে লাল হয়ে গেছে। ভাইঝির কোন ক্লাস জানতে চাওয়ায় হাসি বা রাগের কী হল বুঝতে পারলাম না। বোকার মতো তিনজনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
এবার শুরু হল জেরা। প্রথমে ভাইঝি,
- তুমি আমাকে চেনো?
- কেন চিনব না?
- কে বলো তো?
- খুব পাকা হয়েছিস তো। জেঠুর সঙ্গে ইয়ার্কি?
- বলোই না কে আমি!
- কে আবার! জয়ের মেয়ে। ভাগ!
আবার হাসি। এবার মেয়ে আর মা পাল্লা দিয়ে। ট্যারা চোখে বউয়ের দিকে তাকিয়ে দেখি তার মুখ আরও থমথমে।
ভারী গলায় এবার প্রশ্নবাণ এলো,
- তুমি কি যে কোনও মেয়েকে এভাবে ডান হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরো নাকি!
একি রে বাবা। কী বলে! সবাইকে জড়াতে যাব কেন! কোনোমতে বললাম,
- কী যে বলো! কার সামনে কী বলতে হয় এখনও শিখ...
- চুপ করো। আমার কথার উত্তর দাও।
- ধ্যাত! সবাইকে জড়াতে যাব কেন?
- তাহলে ওকে ধরলে কেন?
- জয়ের মেয়ে। আমার ভাইঝি। কত পুচকি দেখেছি ওকে। দেখেছ কত বড় হয়ে গেছে!
আবার হাসি শুরু হল। ভাইঝি ছোট, ওকে মাপ করতে পারি কিন্তু ভাই বউয়ের ওপর একটু রাগ হল। ভাসুরের সামনে এভাবে কেউ হাসে নাকি! কী দিন এলো!
- ও তোমার ভাইঝি?
- কেন ভাইঝি নয়?
- হ্যাঁ বা না বলো।
- কী আশ্চর্য। এতে হ্যাঁ বা না কী আছে!
- ভাইঝি!!!
শেষটায় ভাইঝিই উদ্ধার করল। অন্যভাবে।
- ও বৌদি। দাদাভাইকে ছেড়ে দাও।
খাবি খেলাম। জেঠিকে বলছে বৌদি। আমাকে দাদাভাই। এটা কে!
- দাদাভাই বুঝতে পারেনি, আমি যে মোম নই।
মোম নয়! সর্বনাশ! কে এ! সীতার মতো বলে উঠলাম মনে মনে ধরণী দ্বিধা হও। কাকে জড়িয়ে ধরেছি মোম ভেবে!
- দাদাভাই আমাকে চেনোনি?
- না...মানে...আমি...তুই, না না তুমি...ধ্যাত, আপনি কে!
- কি তুমি আপনি করছ! আমি ঝিলিক। বোঝনি?
ঝিলিক! ফেসবুকের সেই মেয়েটা। জয়ের কাজিন সিস্টার! হায় হরি। চিনব কী করে। আমি তো শুধু ছবি দেখেছি। ছবির সঙ্গে কোনও মিল নেই।
- ঝি..ঝিলিক! ছ...ছবিতে তো...
- অন্যরকম লাগে। জানি তো। আর মোমের সঙ্গেও আমার মিল আছে। সবাই মোমের দিদি ভাবে, বোঝেই না পিসি আমি!
কী আর বলি! চারদিক দেখেশুনে আজ অপবাদ ঘোচাতে মাঠে নেমে গোল দেব কী, হেরে ভূত হয়ে গেলাম।
অবশ্য ভাই-বউয়ের অনাবিল হাসি আর গিন্নির অকৃত্রিম থমথমে রাগের মাঝে বোনটিকে পেয়ে মনে হচ্ছিল বেশ করেছি ভুল করেছি, করবই তো!
হে হে পারিবারিক ঐতিহ্য বলে কথা! একি ছাড়ে, নাকি ছাড়া যায়!!
(বোকামির এককাল)
No comments:
Post a Comment