শৌভিক রায়
১
বিয়ের অনেক আগেই মায়ের চোখে পুরু চশমা উঠেছিল। একেই কালো মেয়ে, তার ওপর চশমা! আমার দাদু রীতিমতো দুশ্চিন্তায় থাকতেন। এই মেয়ের বিয়ে হবে তো? হয়েছিল বিয়ে। তবে সে এক ইতিহাস!
মায়ের জন্ম বড় তুড়িগ্রামে। বীরভূম জেলার ছোট্ট সেই গ্রাম থেকে ভাগ্য অন্বেষণে দাদু পশ্চিমে যাত্রা করেছিলেন। খুব বেশি দূর যেতে হয়নি। বিহারের কাটিহারে শিক্ষকতার কাজ পেয়ে যান। বড়মামা, মা এবং পরবর্তীতে আরও চার পুত্র-কন্যা ও দিদাকে নিয়ে সেখানেই থেকে যান তিনি। হরদয়াল টকিজের কাছে দাদুর সেই বাড়ি দেখবার সুযোগ খুব ছোটবেলায় আমার বার কয়েক হয়েছে। অবশ্য সে ছিল ভাড়াবাড়ি। ছোটনাগবাবু নামে পরিচিত দাদুর সেই বাড়ির কাছেই ছিল বনফুলের বাড়ি। যাকগে সে কথা।
মায়ের ভাষায় জাঁদরেল চরিত্রের সেই মানুষটির একটিই চিন্তা ছিল। কালো রঙের চশমা চোখের লীলুর বিয়ে! ইতিমধ্যে দুই পাত্রপক্ষ মা`কে দেখে গেছে। কিন্তু সেই অবধিই। এবার কীভাবে সেই কাটিহার থেকে তিস্তা তোর্ষা পার করে মায়ের বিয়ের সম্বন্ধ দিনহাটায় পৌঁছলো সে ইতিহাস জানা নেই। কিন্তু জানলাম, একদিন আমার ঠাকুরদা তাঁর শ্যালক অর্থাৎ বাবার মামাকে নিয়ে কাটিহারে দাদুর বাড়িতে বসে আছেন মেয়ে দেখবেন বলে।
এখানে কয়েকটা কথা বলবার আছে। দেশভাগের পর ওপার থেকে আমার ঠাকুরদা তাঁর বিরাট পরিবার নিয়ে দিনহাটায় থিতু হয়েছিলেন। নিজের দেশের সম্পন্ন ব্যবসায়ী এদেশে এসে ক্ষুদ্র দোকানদার তখন। একমাত্র মেয়েকে পাত্রস্থ করতে পেরেছেন। এবার বড় পুত্র সন্তান অর্থাৎ আমার বাবাকে সংসারী করতে হবে। বড় পুত্রটি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি নিয়ে পড়ছে। তার মাষ্টারমশাই নাকি অধ্যাপক আশুতোষ সেনের পুত্র। আর এই ছোট সেনবাবু তাঁর পুত্রের চাইতে মাত্র এক বছরের বড়। বিচিত্র কান্ড!
এখন এম এ যখন পড়ে তখন চাকরি নিশ্চিন্ত। তাই বড় ছেলের বিয়ে দেওয়াই যায়।
আমার ঠাকুরদা ছিলেন অন্য মানুষ। কোনোদিনই কারো সমালোচনা করতেন না। চেহারা নিয়ে কিছু বলার তো প্রশ্নই ওঠে না। তাই মা`কে পছন্দ হতে ঠাকুরদার লাগল স্রেফ দুই মিনিট। একটি বালা দিয়ে মা`কে আশীর্বাদও করে ফেললেন। তাঁর একমাত্র প্রিয় শ্যালকের মুখ যে অন্ধকার সেটা খেয়ালই করলেন না।
২
অতঃপর দিনহাটার বাড়িতে বোধহয় এভাবেই কথা হয়েছিল-
- গ দিদি....জামাইবাবুর কান্ড দেখস!
- তর জামাইবাবু তো ওই রহমই...জানোস না?
- বালা দিয়া আশীর্বাদের কি দরকার আছিল হেইডাই তো বুজলাম না। ফিরি, সকলের লগে কথা কই। পরে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া যাইত।
- কী আর করবি এহন। কয়া ফেলাইছে। মাইয়াডাও নাহি বি এ পাস। বাংলায় আবার কী একখান পাস দিছে। কাইলা তো কী! লেহাপড়ার একডা দাম আছে না?
- তোমারও য্যান কথা! ঘরের বৌয়ের অত পড়নের কাম কী। আমাগো পোলা হইল রাজপুত্রর নাহাল ধলা। উচা লম্বা। না এই মাইয়াও লম্বা। কিন্তু গায়ের রঙে মানাবো না।
- অহন আর কী করা! যা হবার হবো।
- না ভাবনের আছে আরও। আগেই কিসু কওনের দরকার নাই।
মাটির মানুষ ঠাকুরদা এখানেই কাত হয়ে গেলেন। আর কোনও খবর দিলেন না কাটিহারে। এদিকে মা আমার অদেখা এক পুরুষের স্বপ্নে বিভোর। জাঁদরেল দাদু আশায় দিন গুনছেন। কিন্তু কোনও খবর নেই।
৩
মেসের কেউ একজন বাবাকে খবর দিলেন এক ভদ্রলোক দেখা করতে এসেছেন। তাঁকে বসানো হয়েছে। ধুতির ওপর পাঞ্জাবিটা পরে বাবা বেরিয়ে এলেন নিজের ঘর থেকে। অচেনা এক মানুষ। মনে হচ্ছে দূর থেকে এসেছেন।
- আপনি...- বাবাজি, তুমিই নীরদ? তুমি করেই বললাম।
- হ্যাঁ, আমিই...কিন্তু আপনাকে ঠিক....
- আমি মৃত্যুঞ্জয় নাগ। কাটিহার থেকে এসেছি। আমাকে ওখানে সবাই ছোট নাগবাবু বলে জানে। - ওহঃ....কিন্তু আমার কাছে....- হ্যাঁ বাবাজি। তোমার বাবা আর মামা আমার বড় মেয়ে লীলাকে দেখে এসেছেন। তোমার বাবা বালা দিয়ে আশীর্বাদ করে গেছেন। কিন্তু তার পর থেকে আর কোনও খবর নেই তোমাদের দিক থেকে। আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না কী হল! কাটিহার থেকে কলকাতায় আসা সহজ বলে তোমার কাছেই এলাম বাবাজি।
- আমার বাবা আর মামা আপনার মেয়েকে দেখতে গিয়েছিলেন? আমি তো কিছুই জানিনা।
- ও...তুমি জানো না! তাহলে তুমি আর বলবে কীভাবে। ঠিক আছে বাবাজি। ভাল থেকো।
- দাঁড়ান, দাঁড়ান। এই দুপুরে কোথায় যাবেন?
- যাই, আর কী। কী বা করব আর।
- আমার মেসে যাহোক একটু কিছু মুখে দিন। তারপর বিশ্রাম নিয়ে যাবেন। দার্জিলিং মেলে ফিরবেন তো? সে অনেক দেরি আছে।
- না না সে হয় না বাবাজি। আর কোন অধিকারেই বা আমি থাকব এতক্ষণ !
- কেন, আমার বাবা তো মেয়েকে আশীর্বাদ করে এসেছেন। এর চাইতে বড় অধিকার আর কী!
- এ কী বলছি তুমি। মেয়েকে না দেখেই!
- বাবা দেখেছেন। আমার আর কিচ্ছু দেখার নেই।
৪
বাবার মামার কোনও ওজর-আপত্তি টেকেনি। পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলায় অনার্স মেয়েটিকে বিয়ে করেছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এম এ পড়া ছেলেটি। বিয়ের তিনদিন পরেই সেই মেয়ে অর্থাৎ আমার মা দিনহাটা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষিকার চাকরি পেয়েছিলেন। ঠাকুরদার টানাটানির সংসারে একটু গতি এসেছিল। বাবাকেও কলকাতায় আর টিউশন করে পড়ার খরচ জোগাড় করতে হয়নি। সেদিনের বেতনের সাঁইত্রিশ টাকার দশ টাকা ছিল বাবার জন্য, পনের টাকা দিনহাটার সংসারের জন্য আর দুই টাকা জমত নিজের মতো।
৫
গৌড়বঙ্গের এক গ্রামে বাড়িগুলির সামনে দাঁড়িয়ে মনে পড়ছিল বড় তুড়িগ্রামের কথা। আমার আসল মামাবাড়ির মাটির বাড়িগুলিও এরকমই ছিল। আর তাতে থাকা মানুষজনও ছিলেন মাটির মতোই।
আমার দাদু ছিলেন মাটির মতোই শক্ত মনের মানুষ। তাই চলে গিয়েছিলেন কলকাতায় বাবার মেসে। ঠাকুরদা মাটির মতো স্নেহময় ছিলেন বলে এক দেখাতেই মা`কে আশীর্বাদ করেছিলেন। আবার মাটির মতো নরম ছিলেন। তাই শ্যালকের আপত্তিতে গলে গিয়েছিলেন।
আমার বাবাও ছিলেন মাটির মতোই শাশ্বত।
মা? বিয়ে ঠিক করতে গিয়ে মায়ের তীব্র আপত্তির মাঝে পড়েছিলেন ঠাকুরদা। মা`কে বুঝিয়ে ঠান্ডা করতে নাকি সবার সময় লেগেছিল। কিন্তু বিয়ের পর আজীবন মা ছিলেন ঠাকুরদার সবচেয়ে কাছের মানুষ। মা ছিলেন সেই মাটি যার ওপর নির্ভর করি আমরা।
মাটি দেখি তাই। এই বয়সে পৌঁছে বুঝি মাটিই সব। মাটিতেই মুক্তি। মাটিতেই জীবন। মৃত্যুও মাটিতেই।


No comments:
Post a Comment