Thursday, August 12, 2021

বালকের হস্তি বর্ণন

শৌভিক রায়





ফালাকাটার খাসমহল ময়দানে বছর চার-পাঁচ বাদে সার্কাসের আসর বসত। বিএলআরও অফিসের পাশে বিরাট পাকুর গাছটার নিচে ইয়া মোটা মোটা লোহার শেকলে তাদের বেঁধে রাখা হত। স্কুল যাতায়াতের পথে ড্যাবড্যাবে চোখে তাদের দেখতাম আমরা। বন্ধু পুটন ছড়া কাটত, 'হাতি তোর গোদা পায়ে লাথি'।
বালকের প্রথম হস্তি দর্শন এভাবেই হয়েছিল। অবশ্য তার আগেই রাজেশ খান্নার 'হাতি মেরা সাথি' দেখে কেঁদেছি। ধর্মেন্দ্র হেমামালিনির 'মা` দেখেও ওই একই দশা। তবে ফিল্মের হাতিদের ক্যারিশমা ছিল অন্যরকম। কিন্তু বেঁধে রাখা এই হাতিদের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ত। ওভাবেই জল ফেলতে ফেলতে সামনে রাখা খাবার খেত তারা। সে কী খাওয়া! গোটা কয়েক কলাগাছ, পাহাড় প্রমাণ ঘাস ইত্যাদি প্রায়শই দেখতাম। চোখে জল নিয়ে, দিনের তিনটি শো-তে তারা খেলা দেখাত। তখনও সার্কাসে হাতির খেলায় 'সত্যম শিবম সুন্দরম' গানটা আজকের মতো পেটেন্ট হয়ে যায় নি! তবু সেই হাতিরা গণেশ পুজো করত। টুলে বসত বা দাঁড়াত। জোকারের মোটা দাগের ভাঁড়ামির সঙ্গে আরও কিছু কসরৎ দেখাত! ওদের বিরাট শরীরে ঐ পুঁচকে ল্যাজ দেখে বেশ হাসি পেত।
তখন হাতিরা লোকালয়ে এত আসত না। আসলে জঙ্গল ছিল প্রচুর। জঙ্গলে খাবারও ছিল পর্যাপ্ত। তাই তাদের খাবারের জন্য এদিক ওদিক হানা দেওয়ার কোনও প্রয়োজন ছিল না। কদাচিৎ দলছুট কোনও হাতির কথা শোনা যেত। অবশ্য তখন আজকের মতো এত মিডিয়া, নিউজ পোর্টাল ইত্যাদিও ছিল না। লোকের হাতে ছিল না এত সর্বগুণসম্পন্ন সেল ফোন যা বাগিয়ে পটাপট ছবি বা ভিডিও তোলা যেত! তবে উত্তরের নানা রাস্তায়, বিশেষ করে যেগুলি অরণ্যের মধ্যে দিয়ে গেছে, সেসবে মাঝেমাঝে হাতিদের মাস্তানির কথা শোনা যেত লোকমুখে।
এরকমই এক সময় একবার আমাদের কয়েকজন ছাত্রকে স্কুল থেকে সরকারি উদ্যোগে জলদাপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। হাতির পিঠে চাপিয়ে জঙ্গলে ঘোরানো হয়েছিল। বিরাট বিরাট মহীরুহের নিচে ঢেঁকি শাকের বিস্তীর্ণ জঙ্গল দেখে বন্ধু প্রণব খুব কষ্ট পেয়েছিল ফালাকাটা বাজারের বুড়ি শাকওয়ালির জন্য। চারদিকে এত শাক অথচ তোলার কেউ নেই! যাহোক, সেসময় হলং নদীতে ভেসে আসা তিন মাসের বাচ্চা হাতির পরিচর্যা চলছিল বিট অফিসে। বিরাট এক ফিডিং বোতলে তাকে দুধ খাওয়ানো হচ্ছিল। আমাদের সবেধন নীলমণি আগফা ক্যামেরাটা দিয়ে তার ছবি তুলে পেছন ফিরেছি কি ফিরিনি হঠাৎ আমি শুন্য উঠে গেলাম। ল্যান্ড করার পর বুঝলাম যে, আর কেউ নয়, সেই তিন মাসের বাচ্চাটা পেছন থেকে গুঁতো দিয়েছে। হাতি যে কী বিপুল বলশালী বুঝেছিলাম সেদিন। ব্যথা পেলেও আমার কিন্তু বেশ মজা লেগেছিল। পরবর্তী জীবনে ষাঁড়ের গুঁতো, বিছের কামড় ইত্যাদির নানা অভিজ্ঞতা হলেও ছোট্ট শিশুর সেই হালকা ছোঁওয়া আজও ভুলিনি। ও যেন অনেকটা টিনটিনের সেই ছোট্ট হাতিটার মতো....দুষ্টু কিন্তু বড্ড আদুরে!
২০০০ সালের এক বিকেলে কালিম্পঙ থেকে ফিরছিলাম। সঙ্গে বাবা, রীনা আর ছোট্ট ঋতভাষ। সেভক পার করে এসেই দুদ্দাড় ব্রেক চেপে গাড়ি থামিয়ে দিলেন ড্রাইভার। দেখি মহানন্দা অভয়ারণ্য থেকে বেরিয়ে এসেছে এক বিরাট শরীরের হাতি। গাড়ি ব্যাকগিয়ারে অনেকটা পিছিয়ে গেলেও তার কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। সে রাস্তা দখল করে দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে। বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে, দুদিকে গাড়ির সারি জমিয়ে একসময় দুলকি চালে তার যখন প্রস্থান হল ততক্ষণে সন্ধ্যে হব হব করছে। আর একবার এক হাতি পরিবারের দেখা মিলেছিল জয়ন্তীর থেকে ফেরার পথে। কর্তা কর্ত্রী দুজনে মাইল তাদের ছানাপোনাদের সামলাতে এত ব্যস্ত ছিলেন যে, আমাদের মতো অকিঞ্চিৎকরদের দিকে তাকানোর সময় ছিল না তাদের!
ডুয়ার্সের নানা জঙ্গলে ঘুরবার সুবাদে খানিক আগেও তাদের উপস্থিতি টের পেয়েছি বেশ কয়েকবার। কিন্তু চাক্ষুস দেখা মেলে নি। অবশ্য এখন যা দিনকাল তাতে শহর বা শহর ঘেঁষা জনপদেও তাদের দেখা মিলছে। নগর যত বাড়ছে তত কমছে তাদের নিজস্ব এলাকা। টান ধরছে খাদ্যভাণ্ডারে। ফলে, মানুষের মতো তারাও যেন শহরমুখী!
এই সেদিনও জানতাম না যে, হাতিদের জন্য একটা দিন ধার্য করা হয়েছে। অবশ্য 'ওয়ার্ল্ড এলিফ্যান্ট ডে'-এর বয়স বেশি নয়। ক্যানাডিয়ান প্যাট্রিসিয়া সিমস ও থাইল্যান্ডের রানি শিরিকিটের সংস্থা 'এলিফ্যান্ট রিইন্ট্রোডাকশন ফাউন্ডেশন`-এর উদ্যোগে ২০১২ সালের ১২ অগাস্ট দিনটিকে বেছে নেওয়া হয়েছিল হাতিদের সম্পর্কে জন সচেতনতা বাড়াতে। উল্লেখ করতে হয় মাইকেল ক্লার্ক, শিবাপর্নো দারদারানন্দ প্রমুখের কথাও। উইলিয়াম স্যান্টারের কথনে `রিটার্ন টু দা ফরেস্ট` ছবিটিও সেদিন বিশেষ মাত্রা যোগ করেছিল। ধীরে ধীরে এই সচেতনতা উদ্যোগে যোগ দিয়েছে শতাধিক হাতি প্রেমী সংস্থা। সারা পৃথিবী জুড়ে তারা হাতিদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবহিত করে চলেছেন। এদের উদ্যোগে ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে 'ওয়ার্ল্ড এলিফ্যান্ট সোসাইটি'। ২০২১ সালের এই দিনটিতে বাস্তুতন্ত্রে হাতিদের গুরুত্ব বিষয়ে বিশেষ প্রচার অভিযান চালানো হচ্ছে। ১৬ এপ্রিল আলাদা করে পালন করা হয় 'সেভ দা এলিফ্যান্ট ডে'।
আসলে বাস্তুতন্ত্রে একটি পিঁপড়েরও শক্তিশালী অবদান রয়েছে। আমাদের দেশ-সহ পৃথিবীর যেসব দেশে একদা রাজা-গজা ছিলেন, তাদের অত্যাচারে আর আমাদের বোকামিতে বহু প্রাণীই আজ বিপন্ন।তাদের দাঁতের লোভে আজ অবধি কত সংখ্যক হাতিকে খুন হতে হয়েছে তার কোনও হিসেবে নেই। তা বাদেও টিঁকে থাকবার লড়াইয়ে ধূর্ত মানুষের চালাকির শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে বহু হাতি। ইলেকট্রিক শকেও পৃথিবীতে হাতি মৃত্যুর সংখ্যা কম নয়। তাদের গায়ে মশাল ছুঁড়ে, মাটিতে গর্ত করে, বুলেটে বিদ্ধ করে হাতিদের মারবার ঘটনাও বহু। চোরা শিকারিদের অস্ত্রে বহু হাতি ঘায়েল হয়ে চলেছে নিত্যদিন।
এই দীর্ঘ লেখা পড়ে আমাকে হাতি বিশেষজ্ঞ ভেবে ভুল করলে কিন্তু বোকামি হবে। সত্যি বলতে হাতিদের সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানি না আমি।
শুধু ভাল লাগে তাদের যূথবদ্ধ স্বভাব। জঙ্গলের কোন গভীরে নিঃশব্দ চলাফেরায় নির্জনতা গায়ে মেখে তারা সাক্ষী থাকে সেই পূর্ণচন্দ্র রাতের, যে রাতে আকাশ থেকে পরী আসে নেমে এই চরাচরে তাদের কানে ঘুমপাড়ানি গান শোনাযে বলে! ভাল লাগে তাদের বিশালত্ব, সারল্য আর তুচ্ছকে উপেক্ষা করার মানসিকতাকে। ভাল লাগে তাদের জ্ঞান-স্বভাব, শ্লথগতি চলা আর কোনও বাঁধাকেই বাঁধা মনে না করা!
মহাভারতের সহ-রচয়িতা হাতিকে তাই আজকের দিনে বিশেষ ভালবাসা....
ছবি- বন দপ্তরের হাতি, ছিপরা

No comments: