প্রকাশিত: উত্তরবঙ্গ সংবাদ ৬ অগাস্ট, ২০২১
সূর্যোদয়ের দেশে অলিম্পিকেও নবসৃষ্টির স্বাক্ষর
শৌভিক রায়
প্রথম পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের ছিয়াত্তরতম বর্ষে, জাপানে ২০২০ সালের অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হওয়া নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ । ১৯৪৫ সালের ৬ই অগাস্ট প্রথম পরমাণু বোমা 'লিটল বয়` বিস্ফোরণের জন্য, জাপানের হিরোশিমা শহরে, সৈনিক ও সাধারণ মানুষ মিলে লক্ষাধিক লোক মুহূর্তের মধ্যে নিহত হয়েছিলেন। বিস্ফোরণের অভিঘাতে ট্রেনের মতো ভারী যান রেলওয়ে ট্র্যাক ছেড়ে শূন্যে উঠে বনবন করে ঘুরতে শুরু করেছিল।
বিস্ফোরণের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় দশ কিমি দূরে থাকা বাড়িঘরের কড়িবর্গা ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়েছিল। প্রচন্ড উত্তাপে গবাদি পশু থেকে শুরু করে মানুষের শরীরের চামড়া খসে গিয়েছিল। সকাল থেকে শুরু হওয়া বীভৎস সেই তান্ডব থেমেছিল সন্ধ্যেবেলায়। কেননা ধ্বংস হওয়ার মতো কোনও কিছু আর অবশিষ্ট ছিল না তখন।
বিস্ফোরণের বহু বছর পরেও মারাত্মক গামা রশ্মির প্রভাবে জাপানে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্মগ্রহণ কয়েক দশক আগেও অত্যন্ত সাধারণ বিষয় ছিল! হিরোশিমার তিনদিন পরে নাগাসাকিতে ফেলা দ্বিতীয় বোমাটি এরকমই ক্ষতি করেছিল। অন্যদিকে, বিশ্বযুদ্ধে জাপানের অন্যান্য শহর যেমন টোকিও, ওসাকা, কোবা ইত্যাদিও কমবেশি বিদ্ধস্ত থাকলে,ও দুটি পরমাণু বোমার প্রভাব ছাপিয়ে গিয়েছিল সবকিছু।
হিরোশিমার নারকীয় ঘটনার নয় দিনের মাথায় জাপান আত্মসমর্পণ করে। শেষ হয় রক্তক্ষয়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। মিত্র শক্তি জাপানকে সাত বছরের জন্য দখল করে নেয়। নতুন করে জাপানের সংবিধান লেখা হয়। রাজার ক্ষমতা কাটছাঁট করা হয়। সরকারের বদল হয়। জাপানি সেনাবাহিনী-সহ বহুকিছুর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়।
রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সামরিক সবদিক থেকে প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া সেই দেশ কিন্তু মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছরের মধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৯০ সালে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির মর্যাদা পায় জাপান। আজ, ২০২১ সালে জিডিপির হিসেবে অনুযায়ী জাপান বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি। গড় আয়ুর দিক থেকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ তালিকায় রয়েছে জাপান।
যে দেশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সারা পৃথিবীর করুণার পাত্র ছিল, যার অর্থনীতির ওপর নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছিল, সেই দেশ আজ অন্যদেশের ঈর্ষার পাত্র। শিল্পে তাদের উন্নতি যেমন চোখ ধাঁধানো, তেমনি উন্নততর জীবনযাত্রায় স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশগুলির সঙ্গে টেক্কা দিচ্ছে জাপান।
কিন্তু এর রহস্য কোথায়? আসলে ছিয়াত্তর বছর আগের সেই অপমান ও লাঞ্ছনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আজকের উন্নত জাপানের রহস্য। যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ নতুন করে গড়ার কাজে, জাপান জোর দিয়েছিল 'কাইজেন`-এর ওপর। 'কাইজেন' বলতে জাপানিরা বোঝে যে, ব্যর্থতা কোনও খারাপ ব্যাপার নয়, বরং ব্যর্থতা সাফল্যের পথে একটি পদক্ষেপ মাত্র!
তাই প্রাকৃতিক সম্পদের অপ্রতুলতা, প্রতিকূল আবহাওয়া, দীর্ঘ সমুদ্র তটরেখা, ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হওয়া সত্বেও, সব দুর্বলতাকে নিজেদের শক্তিতে পরিণত করে জাপানের প্রত্যেক নাগরিক নিজেদের শ্রেষ্ঠ শ্রম দিয়ে চলেছেন প্রতিনিয়ত। চলতি অলিম্পিককেও জাপানিরা অন্য মাত্রা দিয়েছেন।
নষ্ট হয়ে যাওয়া মোবাইল ফোনের ধাতু থেকে তৈরি হয়েছে এবারের মেডেল। প্রশান্ত মহাসাগর থেকে প্রাপ্ত প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে পোডিয়াম বানানোর পাশাপাশি, মশাল বাহকদের জন্য প্লাস্টিকের জলের বোতল থেকে টি শার্ট তৈরী করা হয়েছে। তাঁরা প্রমান করেছেন যে, কোনও কিছুই ফেলনা নয়, বরং ছোট ও নষ্ট হয়ে যাওয়া জিনিসের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে প্রচুর সম্ভাবনা।
প্রথম পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের ছিয়াত্তর বছর পর জাপান তাই আবার ইতিহাস লিখল। যুদ্ধের পর চরম দুর্দশা থেকে টালমাটাল পায়ে উঠে দাঁড়ানো একটি দেশ আজ এমন এক রাজসূয় যজ্ঞের দায়িত্বে, যার ভার সবাই নিতে পারে না। কিন্তু জাপান দেখিয়ে দিয়েছে যে, অদম্য জেদ আর কর্তব্য নিষ্ঠার ফলে সবকিছু সম্ভব হয়। যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে জাপান তাই যেন বিশ্ববাসীকে বলে চলেছে নির্মাণেই সভ্যতা, ধ্বংসে নয়! আজ হিরোশিমা দিবসে, অলিম্পিকের শান্তি ও সৌহার্দ্যের বাণী এভাবেই মিশে যাচ্ছে সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের সঙ্গে।
(লেখক পেশায় শিক্ষক)

No comments:
Post a Comment