Monday, July 26, 2021

 

সমাধির শ্বেতপাথরে লেখা আজও চোখে জল আনে
শৌভিক রায়

লন্ডনে যখন অসমের চা নিলামে উঠছে, সেই ১৮৩৬ সালে অঞ্চলটি ঘন অরণ্যে ঢাকা। ভুটান পাহাড় থেকে সমতলে আসবার গিরিপথগুলি থাকলেও, কেউই এই এলাকাটির দিকে সেভাবে নজর দেয় নি। কারণ, অসমতল এই ভূখন্ড শুধু গভীর অরণ্যে ঢাকা নয়, এখানে হিংস্র শ্বাপদের সঙ্গে ছিল ম্যালেরিয়া, কালাজ্বরের মতো মারণ রোগের প্রাদূর্ভাব। ভুটানের ভেতর দিয়ে তিব্বতে ব্যবসা বিস্তারের পথ খুঁজলেও, তিস্তা থেকে সংকোষ অবধি বিস্তীর্ণ, এই এলাকাটির দিকে ইংরেজদের নেক নজর কখনই ছিল না। আরও কয়েক দশক পরে, দার্জিলিং পাহাড়ে বিভিন্ন চা-বাগান প্রতিষ্ঠা হয়। ১৮৭৪ সালে, গজলডোবা অঞ্চলে, হাউটান সাহেবের তৈরী চা-বাগানের সাফল্যের পর, ইংরেজরা বুঝে যায় যে, ডুয়ার্স হল সবুজ সোনা বা চা-চাষের স্বর্ণভূমি। তৈরী হতে থাকে একের পর এক চা- বাগান। চা-বাগানগুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে থাকে একটি পর একটি জনপদ। প্রথম চা-বাগান প্রতিষ্ঠার পরবর্তী বছর তিরিশের মধ্যে ডুয়ার্সের বিভিন্ন জায়গায় অন্তত উনিশটি জনপদ গড়ে উঠেছিল শুধুমাত্র চা-বাগানকে কেন্দ্র করে। আর সেই সঙ্গেই আগমন ঘটে ছিল ইংরেজ সাহেব থেকে শুরু করে বাঙালি কেরানিকূল, চীনা চা-বিশেষজ্ঞ ও কাঠমিস্ত্রি, পাঞ্জাবি দফাদার, নেপালি প্রহরী ও আদিবাসী শ্রমিকদের।
এই জনপদগুলির অন্যতম, জলপাইগুড়ির মালবাজার ও তার সংলগ্ন অঞ্চল। চা-বাগান প্রতিষ্ঠার সেই শুরুর দিনগুলির এমন কিছু নিদর্শন আজও রয়েছে, যা স্থানিক ইতিহাসকে যেমন অন্যভাবে চিনতে সাহায্য করে, তেমনি জানা যায় ডুয়ার্সের সেই সময়ের অবস্থাটিও। রাঙামাটি চা-বাগানের চাইবাসা বা রাঙাকোট ডিভিশনের পুরোনো সমাধিস্থলটি এরকমই একটি উদাহরণ। সমগ্র ডুয়ার্সে এত পুরোনো সমাধিস্থল খুব সম্ভবত আর নেই। এখানে রয়েছে ১৮৮০ সালে মৃত রোডেরিক ম্যাকলিডের সমাধি। যে সব স্মৃতিসৌধের গায়ে উৎকীর্ণ করা লেখা পড়া যায়, তাদের মধ্যে সম্ভবত এটিই সবচেয়ে প্রাচীন। আবার জানা যাচ্ছে যে, জন উইলিয়াম থমসন ডামডিমে এসেছিলেন এরকম সময়েই । কিন্তু ডুয়ার্সের পরিবেশ তাঁর সহ্য হয় নি। ১৮৮৯ সালে তাঁর মৃত্যু হলে তাঁকে এখানে সমাধিস্থ করা হয় পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে। অন্যদিকে, ১৮৯৫ সালে, মাত্র ২৪ বছর বয়সে, উইলিয়াম কসের মৃত্যু হলে তাঁর সমাধির ওপর শ্বেতপাথরের ফলকে আবেগময় কবিতা লিখেছিলেন তাঁর প্রিয় অচেনা কোনও কবি, যা এখনও চোখে জল আনে। বাগরাকোট চা-বাগানের টি প্ল্যান্টার উইলিয়াম ভ্যালেন্টাইন শিয়ারার ১৯১৮ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে মারা গেলে, ভাই ও বোন, পিটার কালটার ও আবার্ডিন, স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করেন তাঁর সমাধিতে। এই সমাধিস্থলেই রাঙামাটি চা-বাগানের তদানীন্তন ম্যানেজার ডব্লিউ ডি কাউল ১৯১৯ সালে তাঁর পত্নী, মরিয়াম ইডাকে সমাধিস্থ করেন। মরিয়াম মারা যান ৪৯ বছর ১১ মাস বয়সে। তাঁর সমাধির ওপরে কাউল সাহেব তৈরি করেন শ্বেত পাথরের অনিন্দ্যসুন্দর এক পরী, যার চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে অদ্ভুত বিষাদ। বর্তমানে সেই পরীর ডানা দুটি অক্ষত থাকলেও, হাত দুটি ভেঙে গেছে। ফলকে উৎকীর্ণ লেখাটিও কষ্ট করে পড়তে হয়। কিন্তু একশ বছর পেরিয়েও শ্বেতপরী বলে চলেছে এক অমরপ্রেমের কথা। আবার, অন্য অনেকের মতো, ১৯২৩ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে, কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে সমাধিস্থ হন ফ্রেডেরিক চার্লস জর্ডান। তাঁর কর্মস্থল ছিল সাতখাইয়া চা-বাগান। লিস রিভার চা-বাগানের জন অ্যান্ডার্সন পার্থ দম্পতি ১৯৩৪ সালে তাঁদের ২৭ বছর বয়স্ক সন্তান জেমসের জন্য যখন সমাধিটি তৈরি করেন, তখন তাঁদের মানসিক অবস্থাটিও সহজে বোঝা যায় সমাধির ওপর লেখা পড়ে। হয়ত একইরকম মানসিক অবস্থা নিয়ে, মিনগ্লাস চা-বাগানের মালিক জন রাইট তাঁর সন্তান জর্জকে সমাধিস্থ করেন। মৃত্যুর সময় জর্জের বয়স ছিল মাত্র আটাশ বছর। রাঙামাটি চা-বাগানের জন জেমস লিথাল লোগান ৫১ বছর বয়সে মারা যান। ১৯৪৭ সালে তিনি এখানে সমাধিস্থ হন। বড়দিঘি চা-বাগানের সুইনটন থমাস আগাসি সম্ভবত সমাধিস্থ হওয়া শেষ ব্যক্তি। তাঁর মৃত্যু হয় ৪৭ বছর বয়সে ১৯৬৮ সালে। রয়েছে আরও বেশ কিছু সমাধি যেগুলির পরিচয় জানা যায় না। তবে এঁরাও যে চা-বাগানকে কেন্দ্র করে কোনও না কোনও সময় ডুয়ার্সে পা রেখেছিলেন, সেকথা স্পষ্ট বোঝা যায়। এঁরা সকলেই শুয়ে রয়েছেন হিমালয়ের পাদদেশে, দুটি-পাতা একটি কুঁড়ির চা-বাগানের, সবুজ বিস্তারের মাঝে এই বিরাট সমাধিস্থলে।
একদা টাটার অধীনে থাকা চা-বাগানটির মালিকানায় এখন আমালগামেট। দুর্ভাগ্য, সমাধিস্থলটি সংরক্ষণের কোনও প্রচেষ্টাই নেই। ফলে, ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে এটি। রাতে তো বটেই, দিনেরবেলাতেও মাঝে মাঝে বসে নেশার আসর। চা-বাগানের কর্মী দিলবাহাদুর থাপা কয়েকবছর আগে সঙ্গী-সহ সমাধিস্থলের দেখাশোনা করলেও সমাধিস্থল আজ প্রহরীবিহীন। এক সময়ে প্রচুর ঔষধি বৃক্ষ সমাধিস্থলের বিরাট সম্পদ ছিল। কিন্তু বদল তো সর্বত্র।সবুজ চা-বাগানের পাশে ভাঙা প্রাচীরে ঘেরা সমাধিস্থলটি দেখে মন সত্যি খারাপ হয়। ডুয়ার্সের অতীত ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সমাধিস্থলটির সঠিক সংরক্ষণ না হলে ইতিহাসের একটি অনবদ্য অধ্যায় মুছে যাবে অচিরেই।








(প্রকাশিত: উত্তরবঙ্গ সংবাদ, ২৫শে জুলাই, ২০২১)

No comments: