Sunday, July 4, 2021

 

সোল

শৌভিক রায়


উবের থেকে নেমে বরাবরের মতো এগিয়ে গিয়েছি। পাশে যে তিনি নেই সেটা খেয়াল করিনি। আসলে চারপাশের 'নজারা' এত 'খুবসুরত' যে সেসব দেখতে দেখতে বামা আমার ফলোয়ার হয়ে গেছেন বুঝতেই পারিনি। হুঁশ ফিরল তাঁর হিসহিসে গলা শুনে,

- চুল তো কবেই গেছে, এখন কানটাও শেষ! একেবারেই বুড়ো হয়ে গেছে!!


তাঁর কথা শুনে চারদিকের এই চকমকে জিন্দেগীতে নিজেকে সত্যিই কেমন বুড়ো বুড়ো মনে হল! কিন্তু ওই যে, সঙ্গদোষে শিলা ভাসে! এই সুবেশ পরিবেশে নিজেকে বুড়ো ভাবে সাধ্যি কার। তাই মনে মনে বুড্ঢা হোগা তেরা ইয়ে বলে পেছন ফিরেই চমকে উঠলাম। কানে যেন মহিলা কণ্ঠে ভেসে এল 'ছদ্মবেশী' ছবির সেই বিখ্যাত গানের একটি কলি, 'এখন আমি লেঙচে মরি...!'


সত্যিই তো! তিনি তো লেঙচে চলছেন! কেসটা হল কী? দিব্যি তো সেজেগুজে বেরোলেন বাড়ি থেকে। স্মার্ট হেঁটে গাড়িতে উঠলেন। নামলেনও ঠিকঠাক। যতটুকু আমার পাশে হেঁটেছেন, কোনও সমস্যা দেখিনি তো! কী হল? ধরতে গেলাম তাড়াতাড়ি! তিনি গজগজ করে উঠলেন,

- হয়েছে! আমাকে আর ধরতে হবে না! তুমি ওই দেখো চারদিক! 

- কিন্তু তুমি তো খোঁড়চ্ছ! ধরব না?

- বললাম তো, আমাকে টাচ করবে না!


আরিব্বাস এ যে দেখি সপ্তপদীর সুচিত্রা সেন! কিন্তু তাই বলে আমি উত্তমকুমার? এই টেকো মাথায়! নিজের কল্পনায় নিজেকেই থাপ্পড় মেরে 

সাহস করে জানতে চাইলাম,

- কিন্তু খোঁড়াচ্ছ কেন? 

- সোল!

- সোল?

- সোল।

- কীসের সোল?

- মাছের শোল। তোমার আত্মা সোল! সোল আবার কীসের হয়? জুতোর সোল, জুতোর...

- জুতোর?

- দেখো তাও বোঝে না! একে নিয়ে যে কী করি। দিনদিন আরও বোকা হচ্ছে। 

- না, মানে...

- না মানে রাখো, ওটা তোলো।

- কোনটা?


তাঁর আঙুল অনুসরণ করে তাকালাম। দেখি চকচকে কালো পিচ রাস্তায় একখানা সুন্দরপানা সোল। 


ব্যাপারটা এতক্ষণে মাথায় ঢুকল। তাঁর জুতোর সোল খুলে গেছে। ভয়ঙ্কর হাসি পেলেও কোনও মতে চেপে রাখলাম। এই পরিস্থিতিতে একটু এদিক ওদিক হলেই প্রাণহানির সম্ভাবনা আছে। বললাম,

- একি!

- একি আবার কী? একি আবার কী?

- না মানে খুলল কীভাবে?

- সেটা জানলে কি খুলতে দিতাম? 

- তাও তো ঠিক।

- এখন আমার কী হবে!

- কী আবার হবে? কিছুই হবে না!

- এইভাবে লেঙচে যাব?

- তাতে কী?

- সোল লাগিয়ে আনো।

- এখানে কোথায় মুচি পাব?

- আমি কী জানি কোথায় পাবে! লাগিয়ে আনো।

- না মানে...

- না মানে আবার কী। যাও শিগগির। আমি ওখানে বসছি। তাড়াতাড়ি যাও...


তিনি এগোলেন। কিন্ত একি! কী অবাক কান্ড! তিনি ঠিক হয়ে গেলেন। লেঙচানো বন্ধ! 


রাস্তায় তাকিয়ে দেখি অবশিষ্ট পাটিটির সোলটিও খুলে গেছে! 


আর পারলাম না। হো হো করে হেসেও সামলে নিলাম নিজেকে। তাঁর চোখে আগুন জ্বলে উঠেছে। এই বোধহয় অগ্নিবাণ নিক্ষেপ হয়!


তারপর আর কী! সোলহীন জুতোতে তিনি ক্যাট ওয়াক করে এসকেলেটরে চেপে শপিং মলের তিনতলায় উঠলেন। সামনে হাস পাপিজ, উডল্যান্ড, রিবক।


তিনি মিটিমিটি হেসে উঠলেন। 

আমার বুকের ভেতরটা কেমন করতে লাগল.....


(সিরিজ: বোকামির এককাল)


No comments: