কথোপকথন- ২
(একান্তই কাল্পনিক ও অর্থহীন)
শৌভিক রায়
- স্যার কি ঘুমোচ্ছেন নাকি?
- কে রে? ওহ ভার্চু...না রে ঘুমোই নি। চোখটা এমনি একটু বন্ধ করে ছিলাম।
- আসলে স্যার আপনার চেয়ারটা বেশ ইয়ে তো...তাই ভাবলাম ঘুমোচ্ছেন।
- চেয়ারটা কী? আর কী হলেই বা চেয়ারে ঘুম আসে?
- আপনার চেয়ারটা হল, মানে স্যার, যাকে বলে আরামকেদারা আর কি...বেশ গা এলিয়ে থাকা যায়।
- তা যায়। সেটা ঠিক বলেছিস।
- বলছিলাম কি স্যার যখন এমনি থাকবেন, মানে ঘুমোবেন না কিন্তু চোখ বুজে থাকবেন, তখন এমন কিছু করবেন যাতে বোঝা যাবে যে ঘুমোন নি।
- তাতে কী হবে?
- তাতে স্যার ওই ভুল বোঝা হবে না। এই যে এখন যেমন আমি চলেই যাচ্ছিলাম। শেষটায় ভাবলুম একবার ডেকেই দেখি। ভয়ও লাগছিল যে, আপনার কাঁচা ঘুমটা না ভাঙিয়ে ফেলি। ঘুম ভেঙে উঠে যদি রেগেটেগে যান। আবার ভাবলাম যে, আমি নগণ্য মানুষ...হয়তো আমার ওপর স্যার রাগবেন না। বড় মানুষেরা আর কি সব বিষয়ে রাগে নাকি? উপেক্ষা করে! এসব সাতপাঁচ ভেবে ডেকেই ফেললুম। আগে তো বুঝিনি আপনি ঘুমোন নি। খামোকা এত ভাবলাম!
- এটা তবে তো একটা সমস্যা। কী করা যায় বল দেখি যাতে লোকে বুঝবে আমি ঘুমোচ্ছি না।
- বলব স্যার? মানে ইয়ে নির্ভয়ে তো?
- আরে বল দেখি...
- স্যার একটা গড়গড়া কিনুন। চোখ বন্ধ করে একটু একটু ধোঁওয়া টানবেন। আর ভাববেন। মৌতাত জমে উঠলে বুঝলেন স্যার ভাবনাগুলোও বেশ খোলতাই হবে।
- বাব্বা। তুই তো বেশ জানিস দেখছি। তোর অভিজ্ঞতা আছে নাকি এই ব্যাপারে?
- কি যে বলেন স্যার! আমার এই চাষাভুষো চেহারা, মাথায় মস্ত টাক, নোয়াপাতি ভুড়ি...পয়সাকড়ি নেই...কোথায় পাবো আপনার মতো ওরকম বাহারী আরামকেদারা! কেদারাই নেই তো ইয়ে...
- কিয়ে?
- স্যার আমার মুদ্রাদোষ ইয়ের মতো আপনারও কিয়ে মুদ্রাদোষ হয়ে যাচ্ছে।
- এটা আসলে সঙ্গদোষ।
- দোষ ধরালাম স্যার তবে আপনাকে? অপরাধী হলাম তো।
- আরে না না। এ কি আর পানদোষ যে অপরাধ হবে? যাকগে এবার বল কী বলতে এসেছিস।
- না স্যার আজ কিছু বলতে আসি নি। এমনিই একটু খোঁজ-টোজ...
- ব্যাপার কি রে! আমার খোঁজ নিচ্ছিস। কেউ তো নেয় টেয় না।
- এটা কি স্যার ঠিক বললেন? কতজন আপনার খোঁজ নেয়...আপনি হলেন একজন ইয়ে...
- কী?
- মুরুব্বী মাতব্বর মানুষ।
- তাই নাকি?
- একশোবার স্যার। আপনি অবশ্যই একজন মুরুব্বী মাতব্বর।
- কিভাবে জানলি তুই?
- এসব কি আর আলাদা করে জানতে হয় স্যার? এই যেমন আপনি যদি একটু হাঁচি দেন তো হাজারে হাজারে লোক এসে হাজির! আপনি যদি...স্যার খারাপ কথা...বলব?
- আরে বল বল...
- মানে দুর্গন্ধ বাতকর্ম করলেও লোকে সুগন্ধ বলে কত সুখ্যাত করে।
- বলিস কী?
- ঠিকই বলি স্যার। আপনি শুধু বুঝতে পারেন না।
- এটা একটু বাড়াবাড়ি হল না?
- না না স্যার বাড়াবাড়ি কেন হবে? আপনার ফেসবুক অ্যাকাউন্টটা দেখুন না!
- আবার ফেসবুক? জ্বালালি।
- তা বললে কি হয় স্যার? আপনি একটা স্ট্যাটাস দিলে হাজার লাইক, পাঁচশ কমেন্ট। আপনি শরীর খারাপ জানালে কত হিতোপদেশ। আপনি ছবি দিলে আপনার চেহারার কত গুণকীর্তন!
- এই আমার চেহারাও তো তোর মতো। মস্ত টাক, নোয়াপাতি ভুড়ি। তোর মতোই চাষাভুষো চেহারা।
- ছি ছি কী যে বলেন! আপনার টাক হল আভিজাত্য, আমারটা হল শালা টাকলু। আপনার ভুড়ি হল সুখী খুশি, আমারটা হল খিদে পেটের গোগ্রাসে খাওয়া হাড়হাভাতে।
- কেন রে, দু'জনেরটা দুরকম ভাগ করছিস কেন?
- এই তো, এই তো হল আপনার নরম উদার মনের পরিচয়। এত উঁচুতে উঠেও আপনার পা মাটিতেই আছে আজও। তবে কি স্যার, আপনি হলেন ইয়ে মানে রইস আদমি...
- বাব্বা! হিন্দিও বলছিস?
- ওটা তো স্যার বাঙালিয়ানা। হিন্দি না বললে বাঙালি হলাম কিসে? তবে সঙ্গে ইংরেজিটাও চালাতে হয়। তবে একেবারে পিওর বেঙ্গলি।
- এখনও কিন্তু বুঝলাম না যে, তুই কেন এলি।
- বোঝেন নি তো?
- না।
- যাক...নিশ্চিন্ত। যত বুঝবেন না তত আমার মঙ্গল।
- মঙ্গল?
- মঙ্গল নয় কি স্যার? আপনাকে তেল দিচ্ছি সেটা বুঝে ফেললে আপনি কি আর তেল খাবেন?
- এবার ভুলটা করলি।
- কিরকম স্যার?
- আমি বাঙালি তো? তোর ভাষায় মুরুব্বী মাতব্বর....
- নির্যস তাই স্যার।
- আমি তাই খাই...
- খান? কী খান স্যার?
- তেল।
- সত্যি তেল খান?
- হ্যাঁ রে, মাতব্বর মুরুব্বী বলেই তো তেল খাই। তেল দিচ্ছে বুঝেও তেল খাই।
- তেল দিচ্ছে বুঝেও তেল খান স্যার? বলেন কি!
- ওরে তেলের বড় মহিমা রে...এ তুই বুঝবি না।
- তা ঠিক স্যার। কিন্তু স্যার কীভাবে বোঝেন যে, তেল দিচ্ছে?
- নিজে দিই যে!
- আপনি তেল দেন? স্যার এটা কী শোনালেন! আপনি কাকে তেল দেন স্যার?
- মহা মাতব্বরকে!
- আর উনি?
- উনি আরও মহা কে!
- এটা তবে সত্যি স্যার?
- বিলকুল সত্যি। একশো ভাগ সত্যি।
- তাই তো বলি আমার আজকাল অনলাইনুকে এত ভাল লাগছে কেন!
- অনলাইনু?
- হ্যাঁ স্যার অনলাইনু আমার প্রতিবেশী।
- তোর তাকে ভাল লাগে?
- হ্যাঁ স্যার ও তো সারাদিন আমাকে তেল দিচ্ছে। এখন টের পাচ্ছি।
- তাহলেই বোঝ।
- তার মানে পদ্ধতিটা...
- পুরোনো। নতুন বোতলে পুরোনো মদ ঢাললে বোতল-সহ মদকে নতুনই লাগবে! কিন্তু মদ সেই একই থাকবে। তেল দেওয়ার পদ্ধতি পালটালেও তেল তো তেলই রে!
(ভার্চু আনমনা হয়ে চলে গেল। মাঝে মাঝে জ্বালায় এরকম। কি করা আর!)

No comments:
Post a Comment