Sunday, August 25, 2019




ত্রয়োদশীর চাঁদ

শৌভিক রায়

মেয়েটাকে কেন জানি চেনা চেনা লাগছে। 
যদিও ঠিক বুঝতে পারছে না মধু। কিন্তু বেশ চেনা। কোথায় দেখেছে? কোথায়? কথাবার্তা বলেও বোঝা যাচ্ছে না ঠিক।

ট্রেন ছাড়ার একটু আগে দৌড়তে দৌড়তে এসেছিল  মেয়েটা। চেপেচুপে বসেও পড়েছিল তাদের পাশে। ট্রেন ছাড়ার পর কথা শুরু হয়েছিল ধীরে ধীরে। শুরু করেছিল মধু নিজেই,
- এলে কোথা থেকে?
- কোথা থেকে আর!! পূজা গো পূজা।
- বুঝলাম। তা পূজা তো শেষ তিনদিন আগেই। তুমি আজকে কেন?
- আর ব'ল না। টাকা তো সব দেয় নি আগে। আজ এসেছিলাম তাই।অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখলো। 
- তা পেলে সব টাকা?
- পেলাম। তবে যা কথা হয়েছিল সেটা দিল না। 
- আমাদের মতোই দশা তবে তোমারও।
- তোমরাও কম পেলে বুঝি!
- কি যে বলি তোমাকে! কম ঠিক না তবে যে কদিন বাজানোর কথা ছিল বাজালাম তো তার চাইতে বেশি! সে হিসাবে তো পয়সা কম দিল। তা আমরা তো ঢাকি। তুমি কি করলে?
- আমি ওই জোগানদার, ঝাড়ুদার সবকিছুই গো! 
- সেটা কিরকম?
- আরে পুরুতকে এটা ওটা এগিয়ে দেওয়া, ভোগ রাঁধা, সকালে মন্ডপটা ঝাঁট দেওয়া, ফাই-ফরমাশ খাটা...বুঝলে না?
- বাপরে! এরকম লোকও লাগে নাকি?
- লাগবে না? এটাও তো কাজ।
- তা তো বটেই। তবে এরকম কাজের জন্যও লোক লাগে সেটা জানতাম না।
- শহরের ব্যাপার গো! নোংরা ফেলতেও লোক চায়। আর এ তো পূজার কাজ। বড় ব্যাপার। বুঝলে না?  
- খুব বুঝলাম। বামনি আর কি তুমি। ওসব ভোগ-টোগ তো বামুন মেয়েরাই করে। তা বাড়িটা কোথায় গো তোমার?
- দাশপাড়া।
- দাশপাড়া? বেশ বেশ। যাক টাকা পেয়েছো তবে সব।
- ওই আর কি। তোমরা তাও একবারে পেয়েছো। আমার মতো ঘুরতে হয় নি!
- তা ঘুরলেই না হয়। কি হল এমন আর! খুব তো দূর না। খানিক বাদেই নেমে যাবে।
- দূর না হলেও কাছেও না। এতো ভাড়া দিয়ে যাতায়াত গায়ে লাগে গো! উপায়ও নেই। অসুস্থ মানুষ বাড়িতে। টাকা কার না লাগে!
- তা ঠিকই।
- তাছাড়া আসতে দেয় নাকি বাড়ি থেকে এতো ঘন ঘন! পূজার কটা দিন তো আসা-যাওয়ার ঠিকই ছিল না। সে কাজে আছি বলে কিছু বলে নি। কিন্তু তারপর কি হয় নাকি! আজ অনেক কষ্টে আব্বাকে বুঝিয়ে...
- কাকে বুঝিয়ে?
- আব্...ওই বাপকে গো।
- আব্বা বললে যে!
- বলেছি নাকি? ও তো মজা করে।
- এরকম মজা কে করে?
- আমি করলাম গো। ছাড়ো ওসব...তোমরা বুঝি ঢাক বাজাও? বাজালে নাকি পূজায়?
- বাজালাম তো।
- খুব বাজালে দেখি। দশমী তো কবে গেছে! আজ ফিরছো। তা তোমার বাড়ি কোথায়? 
- ওই ওদিকেই। দাশপাড়ার দুটো স্টেশন পরে, বকুলবাড়ি।
- নাম শুনেছি, যাই নি....

কথা এগোয় নি এরপর আর। মেয়েটা কেমন চুপ হয়ে যায়! ট্রেন চলতে থাকে ট্রেনের মতো। তারাও দুলতে থাকে ট্রেনের সাথে।
দুলতে দুলতেই চোখ লেগে যায় মধুর। ঠিক ঘুম না। তন্দ্রা মতো। তন্দ্রার মধ্যেই মধুর চোখে ভাসে এই কয়েকদিনের কথা।

... সরকারদের জমিতে নিড়ানি দিতে দিতে চাপা স্বরে সেদিন বলেছিল চরণ,
- তুই কি এবারও চাপাডাঙায় কথা দিলি নাকি?
- কথা দেওয়ার কি আছে! যাবোই তো।
- না করে দে।
- কি? কি বললি?
- না করে দে নাআআ
- কেন না করবো কেন?
- কলকাতায় যাবো।
- কলকাতায়? 
- হ্যাঁ কলকাতায়।
- তুই যাবি তো আমি না করবো কেন চাপাডাঙায়? 
- আমি একা না। তুইও যাবি। মানে আমরা যাবো।
- মতলবটা কি তোর?
- মতলব কিছু না। আমরা কলকাতায় বাজাবো।
- কলকাতায় কোথায় বাজাবো?
- সেটা কিভাবে বলবো? যারা নেবে তাদের ওখানেই বাজাবো।
- কারা নেবে?
- ক্লাবের লোকরা।
- কোন ক্লাব?
- শোন। শেয়ালদায় ঢাকিরা সব জমা হয়। আর নানা ক্লাবের লোকরা এসে তাদের বাজনা শুনে নিয়ে যায়।
- তাই নাকি? তুই জানলি কিভাবে?
- ওই তো...তোকে নিয়ে এইটাই মুশকিল। টিভি দেখিস না। রেডিও শুনিস না। সারাক্ষণ ওই ঢাক!
- সারাক্ষণ আর কোথায়? এই যে নিড়ানি, হাল দেওয়া...এইগুলো কি তবে?
- সে তো কমবেশি সবাই করে রে! শুধু ঢাক বাজিয়ে কি আর সংসার চলে! ঢাকের প্রয়োজন আর ক'দিন! তার ওপর এই গ্রাম দেশ। কিন্তু সে কথা বলি নি। বলছি যে অন্য সময় আমরা তাও এটা ওটা করি। তুই তখন ঢাক নিয়ে পড়ে থাকিস।
- ওটাই আমার নেশা। ঢাক ছাড়া কি বাঁচা যায়?
- সেজন্যই তো চল কলকাতায়।
- কলকাতায় যাবো কেন?
- আরে কলকাতার মন্ডপে না বাজালে কি আর ঢাকি হওয়া যায়? পয়সাও বেশি পাওয়া যায়।
- বেশি পয়সা নিয়ে করবি কি? অভাবটা কিসের তোর?
- ওসব বলিস না। পয়সা সবারই দরকার। তা না হলে তুই চাপাডাঙায় বাজাতে যাস কেন?
- যাই...অভ্যেস হয়ে গেছে। তাছাড়া পুজোটা খুব সাত্ত্বিকভাবে হয় রে। বামুন পুরুতের কি সুন্দর মন্ত্র। আহা...
- একবার কলকাতা চল। ওখানে না বাজালে শিল্পী হবে না।
চরণের এই কথাটাই মধুকে বেঁধে ফেলল শেষ পর্যন্ত। তারপর বাড়িতে বলে-টলে, অভয়াকে অনেক সোহাগ করে এই আসা। অভয়া কি আর আসতে দেয়! পাশের গ্রামে বাজায় বলে পুজোর চারদিন রাত হলেও মধু ফেরে বাড়িতে। কিন্তু কলকাতায় যাওয়া মানে তো একেবারেই না থাকা। তা কি করে হয়? এমনিতেও বাড়িতে থাকলে সারাক্ষণ ওই ঢাক। এই বোল, সেই বোল! এখন আবার কলকাতা! কি দরকাল এতো। এহেন অভয়াকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আসা কি যে সে কথা! আর আসবার পর থেকে বুক দুরুদুরু। কি হয় কি হয় দশা! নাঃ বড্ড ভুলই হল বোধহয়। আর ভাল লাগছে না!

কলকাতায় পৌঁছনো ইস্তক ভয়ে ভয়ে ছিল মধু। চরণ যে চরণ, সেই চরণেরও মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল ভয় খেয়েছে সেও। হবে নাই বা কেন! একজন দুজন? শ'য়ে শ'য়ে ঢাকি...একা, দোকা বা দলে। শিয়ালদা স্টেশনের সামনের চত্বরে সে কি তাদের ঢাক বাজানো! ঢাকের আওয়াজে পিলে চমকে যায়! সবাই নিজের কেরামতি দেখাতে ব্যস্ত। কেউ ঢিমে লয়ে বাজাচ্ছে তো কেউ দ্রুত লয়ে। কেউ কেউ একরকম পোশাক পড়া, কেউ বাজাতে বাজাতে লাফিয়ে উঠে কেরদানি দেখাচ্ছে। সব মিলে মধুর চোখ ছানাবড়া আর তখনই তার মাথায় এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে শিল্পীর অভাব নেই দেশে! অভাব যেটা সেটা হল নিজের শিল্প দেখানোর। এসব সাত-পাঁচ ভেবে নিজের ঢাকেও কাঠি ছুঁইয়েছিল সে আর তারপর
অবশেষে মধু আর চরণ পৌঁছেও গিয়েছিল মন্ডপে। দক্ষিণ কলকাতার এক পুজো পার্টি তাদেরকে নিয়ে গিয়েছিল তাদের। শেয়ালদায় দাঁড়িয়ে থেকে আর সব দেখে-টেখে মধু বুঝেছিল ব্যাপারটা কি আসলে। বড় বড় পুজো কমিটিগুলি আগেই ঢাকি ঠিক করে রাখে। তাদের পুজোর মতো ঢাকিরাও নাম করা। তাদেরকে শেয়ালদায় দাঁড়াতে-টাড়াতে হয় না। যারা দাঁড়ায় তারা ওই মধু-চরণের মতোই নতুন বেশির ভাগ। তবে এটা ঠিক যারা আজ নাম করা তারা অনেকেই একসময় দাঁড়িয়েছে তাদেরই মতো। একদমই দাঁড়াতে হয় নি যাদের তারা হল নামী ঢাকির দলের অন্য বাজিয়েদের। তবে দল ভেঙে গেলে বা দল থেকে বেরিয়ে গেলে হয়তো তাদেরকেও দাঁড়াতে হবে যদি না তারা কারো নজরে পড়ে। আজকাল নাকি দালালও এসেছে এই লাইনে। এইসব শুনেটুনে যখন বেলা গড়িয়ে বিকেল হবে হবে তখন তাদের কপালে এই পুজোটা জুটে গেল। এতক্ষণ ধরে দর কষাকষি দেখে ঝানু হয়ে গেছিল চরণ। তাই খুব একটা কমাতে পারে নি তাদের। দু'জনে ভাগাভাগি করে সে টাকা নিলে এক এক জনের ভাগে যা পড়বে তা চাপাডাঙার তুলনায় অনেকটা বেশি বৈ কি! তাদের থাকা খাওয়াও দেবে কমিটি। তাই সেদিক দিয়ে ভাবনা নেই। থাকবার জায়গা ক্লাবঘর হলেও চলে যাবে ভালই। নিজের বাড়িই বা কি রাজপ্রাসাদ একেবারে! এখানে বাথরুমে বরং কল ঘোরালেই জল পড়ে। তবে বিছানা পাততে হবে ক্লাবের নানা সরঞ্জাম সরিয়ে। সে যাকগে। কতক্ষণই আর শোবে!
সেই পঞ্চমী বিকেলে ঢুকেছিল মধু আর চরণ। আর আজ ত্রয়োদশী। খুব অত্যাচার গেল কদিন ঢাক দুটোর ওপর। মধুরটাতেই বেশী। চরণ ঢাক বাজালেও বাঁধা গতের বাইরে যেতে পারে নি। তাই সমঝদাররা তো বটেই, যারা তেমন বোঝে না তারাও মধুকে নিংড়ে নিয়েছে। মধুও প্রস্তুত ছিল তার সবটা দিতে। দিয়েওছে। যখন যেভাবে বলেছে কমিটির লোকজন সেভাবেই বাজিয়েছে মধু। তার বাজানোতে সব্বাই খুশী। বিরাট মাপের পুজো না হলেও একেবারে ছোটও নয়। লোকজনও ভাল। সব মিলে মধুর প্রথমবারের অভিজ্ঞতা বেশ ভালই।

- কি রে, নামবি না নাকি? কি ঝিমোচ্ছিস?
চমকে চোখ খোলে মধু। চরণ ডাকছে। 
- চল চল আমাদের স্টেশন চলে এসেছে।
তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ায় মধু। চোখটা লেগে গেছিল। পাশে তাকায়। মেয়েটার জায়গায় অন্য লোক। মেয়েটা নেই। কখন যেন নেমে গেছে। ঢাকটা নিয়ে সামনে এগোয় মধু। আর এগোতেই বিদ্যুৎ চমকের মনে পড়ে যায় মেয়েটা আসলে কে!

স্টেশন থেকে বেশ খানিকটা যেতে হয় তাদের গ্রামে পৌঁছতে। একটা ভ্যান রিক্সায় ঢাক দুটো চাপিয়ে চলতে থাকে মধু আর চরণ। মধুর মুখে অনেকক্ষণ ধরে চিলতে হাসিটা দেখে চরণ জিজ্ঞাসা করেই বসে,
- কি রে এতো হাসি কিসের?
মধু উত্তর দেয় না। চরণ নিজেই বলে আবার,
- বুঝেছি। হে হে অনেকদিন পর আজকে বৌদির সাথে দেখা হবে তো!
এবারও উত্তর দেয় না মধু। শুধু মুখ ফিরে তাকায় একবার চরণের দিকে। 
মনে মনে ভাবে, বেচারা! আসলটা জানলে আর এসব বলত না। 
ওই মেয়েটা....নাম বলেছিল রেবা। ওর নাম আসলে রাবেয়া। ব্রাক্ষণ তো দূরের কথা, ও হিঁন্দুই না! এটা মনে পড়াতেই হাসি পাচ্ছে মধুর। রাবেয়ার বাড়ি দাশপাড়াতেও না। দাশপাড়ার দুটো গ্রাম পরের মহম্মদবাজারে। ওখানটায় মুসলিমদের বাস। হতদরিদ্র গ্রাম। একবার একটা কাজে যেতে হয়েছিল মধুকে। তখন রাবেয়ার বাবার কাছে দুটো বোল শিখে এসেছিল সে। মুসলমান হলেও ঢাক বাজানোতে রাবেয়ার বাবার খুব নাম। ইচ্ছে ছিল আরও কিছু বোল শেখার। কিন্তু লোকটা এখন বিছানায় নাকি। অসুস্থ। রাবেয়াকে ওখানেই দেখেছিল সে।  কানাঘুষো শুনেছিল মধু যে অনেক মেয়ে পূজার সময় নানা কাজে কলকাতায় যায়। কিন্তু একেবারে হিঁদু সেজে মন্ডপের কাজ! সাহস আছে মেয়েটার। সত্যি বলতে দুঃসাহস। তা ঠিক করেছে একদম। মা তো সবারই, আল্লা যেমন! মায়ের পূজায় সাহায্য করে কোনও ভুল করে নি। মায়ের মেয়ে মায়ের জন্য কাজ করলে কিসের অশুদ্ধি আর কিসের দোষ? আগে তো পেট! আগে তো বেঁচে থাকা। তারপর তো ওসব। ঠিক করেছে! তার চোখে শুধু ভাসছে না দেখা পুরুতের মুখটা। পুরুত ব্যাটা বুঝতেও পারে নি ফুলটা, বেলপাতাটা, কোষাকুশিটা এগোচ্ছে যে, ভোগ রাঁধছে যে সে আদতে রাবেয়া! রেবা না। 
মা দুর্গা অবশ্য ঠিক চিনবেন। খিলখিল করে হাসবেনও! এটা মনে পড়তেই হো হো করে হেসে ওঠে মধু। তার হঠাৎ হাসিতে চমকে তাকায় চরণ। বলে,
- শালা পাগল হলি নাকি! হেসেই যাচ্ছিস।
মধু এবারেও কোনো উত্তর দেয় না। হেসেই চলে।

ত্রয়োদশীর চাঁদ ঠিক তখনই ধানক্ষেতের শেষে দিগন্ত থেকে উঁকি দেয়।


(প্রকাশিত: ইন্দ্রায়ুধ পূজা সংখ্যা, ২০১৮) 

No comments: