Saturday, August 17, 2019

কালিখোলা ভুটান, সঙ্গে কুমারগ্রামদুয়ার, সংকোশ আর নিউল্যান্ডস 
শৌভিক রায়  

এই ছিমছাম পরিবেশে একটু কান পাতলেই শোনা যায় স্বর্ণকোষের বয়ে চলার জলশব্দ। ওপারে ভুটান পাহাড়ের নীলে গাঢ় সবুজের সমাহার। এই টিলার ওপর বসলে সময় যে নিজের মতো কোনদিক দিয়ে চলে যাবে কেউ জানে না!
কালিখোলা ভুটানের অসামান্য পরিবেশে স্বর্ণকোষের কাছেই আসা। এই নদী সংকোশ নামেই পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গ আর অসমের সীমান্তে বয়ে চলা এই নদীর রূপলাবণ্যে মোহিত হতে সময় লাগে না। 
রাজধানী কলকাতা থেকে দূরত্ব বিচারে অন্তিম ব্লক কুমারগ্রামদুয়ার ডুয়ার্সের 'আঠারো দুয়ার'-এর অন্যতম। চা-বাগান, বক্সার গভীর অরণ্য, রায়ডাক-সংকোশ নিয়ে এক অন্যরকম ভ্রমণের সাক্ষী হওয়া যায় এখানে। তবে, টুরিস্টের দৃষ্টিতে নয়, দেখতে হবে ট্রাভেলারের মতো। তবেই মিলবে আসল রস। 
আলিপুরদুয়ার থেকে ৫০ কিমি দূরের কুমারগ্রামদুয়ার পৌঁছনো যায় ঘন্টা দেড়েকের ছোট্ট সফরে। প্রকৃতি, মানুষজন ধীরে ধীরে পাল্টে যায় সফরপথে। কুমারগ্রামদুয়ার পেছনে ফেলে সামনে এগোলে আরণ্যক পরিবেশ আর দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ চা-বাগান। কুমারগ্রাম চা-বাগানের শোভায় বুঁদ হতে না হতেই চলে আসে নিউল্যান্ডস চা-বাগান। আর একদিকে দেখা যায় সংকোশ চা-বাগানের রূপরেখা। টি-ট্যুরিজমের এক অনন্য গন্তব্য এই ত্রয়ী।

নিউল্যান্ডস চা-বাগান ঘেঁষে বয়ে চলেছে রায়ডাক নদী আর নদীর ওপারে বক্সা টাইগার রিজার্ভের ঘন জঙ্গল। এখানে যদি নদীর ওপর সেতু থাকতো তবে সামান্য সময়ে পৌঁছে যাওয়া যেত শামুকতলা, তুরতুরি, হাতিপোতা বা জয়ন্তীতে। কিন্তু সে দুঃখ কেটে যায় নিউল্যান্ডস চা-বাগানের উত্তরপ্রান্তের বনবস্তি আর বক্সার গা ছমছমে অরণ্যের স্পর্শে। ইদানিং কিছু হোম স্টে হয়েছে এখানে। রয়েছে এস এস বি-এর অতন্দ্র প্রহরা।

নিউল্যান্ডস চা-বাগানের উল্টোদিকে গুডরিক কোম্পানির অধীনে থাকা সংকোশ চা-বাগানও কম যায় না। ছিমছাম, পরিচ্ছন্ন এই চা-বাগানটি মুহূর্তেই মন কেড়ে নেয়। হাসপাতাল, বিদ্যালয়, ক্রেশ, শ্রমিক ও বাগানের কর্মচারীদের জন্য সুন্দর কোয়ার্টার আর বিরাট কারখানা মিলে সংকোশ চা-বাগানকে ভালো না বেসে থাকা যায় না। বাগান লাগোয়া জনবসতিতে ডুয়ার্সের কসমোপলিটান ছাপ সুস্পষ্ট। এখনও রয়েছে কাঠের দোতালা জাতীয় ডুয়ার্সের ট্রাডিশনাল বাড়ি। মন্দিরের পাশেই গড়ে ওঠা চার্চ মনে করিয়ে দেয় যে, ডুয়ার্সের নানা জনজাতির মিশ্র সংস্কৃতিতে ধর্ম কোনোদিন বাধা হতে পারে নি। চা-বাগানের একপাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ছটফটে সংকোশ আর নদীর ওপারে অসমের ভূখণ্ড।
 
সংকোশ চা-বাগান থেকে এবার চলা কালিখোলায়। কিছুদিন আগেও এই অঞ্চল গোলমালের জন্য পর্যটকবিহীন ছিল। দু`পাশে দুই চা-বাগানের মাঝ দিয়ে কালো পিচের চকচকে রাস্তায় খানিক এগোলেই শুরু অরণ্যভূমি। সেই অরণ্যভূমির মাঝেই এস এস বি ক্যাম্পে বিশেষ অনুমতি নিয়ে আরও এগিয়ে চলা। কিমি তিন-চারেক এগোতেই শুরু ভুটান সীমান্ত। ভুটানে প্রবেশের জন্য এখানেও বিশেষ অনুমতি প্রয়োজন। অবশ্য অনুমতি পেতে কোনো অসুবিধে হয় না। সোজা পথে খানিকটা এগোলে ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। লামোইজিংঘার এই ছোট্ট জনপদ এক নিমেষে প্রশান্তি নিয়ে আসে মনে। ইতস্তত কিছু বাড়ি, দোকানপাট, মনাস্ট্রি, বিদ্যালয়, হোম স্টে ইত্যাদি সব মিলে সুন্দর প্রকৃতির মাঝে যেন কোনো এক অদৃশ্য শিল্পী এই জনপদের নকশা এঁকে গেছেন। এখানকার উঁচু টিলা থেকে দৃশ্যমান দুই পাহাড়ের মাঝে বেশ খানিকটা নিচে বয়ে চলা সংকোশ। টিলা থেকে পাকদন্ডী বেয়ে নেমে যাওয়া যায় নদী বক্ষে। আর টিলার ওপর বসেও অনন্তকাল কাটিয়ে দেওয়া যায় নদীর দিকে তাকিয়ে, পাখিদের বিজন তানে হারিয়ে যেতে যেতে। 
 
ভুটান কালিখোলার এই জনপদ থেকে পৌঁছে যাওয়া যায় থিম্পু। তবে সে পথ আমাদের মতো ভারতীয়দের জন্য নয়। মোবাইল ফোনেও মিলবে না টাওয়ার। এখানকার আরণ্যক পরিবেশে আজও যেন সময় থমকে আছে। ভাবতে রোমাঞ্চ হয় যে এই পথ ধরেই অতীতে ভুটান পাহাড় থেকে সমতলে আসতেন ভুটানি যোদ্ধা ও ব্যবসায়ীরা। আজ অবশ্য সে সবকিছুই গল্পকথা। বরং সংকোশের বাঁধ নিয়ে অনেক বেশি উচ্চকিত বিবাদ দুই দেশের। কিন্তু ছোট্ট সফরে সেসব কিছু বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। 

টি-ট্যুরিজমের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ কুমারগ্রাম-নিউল্যান্ডস-সংকোশ-কালিখোলা। উপরি পাওনা কালিখোলার অপার সৌন্দর্য্ ও ডুয়ার্সের আদি ফ্লেভার যার মধ্যে মিশে আছে মিশ্র জনজাতি, গহন অরণ্য, সবুজ চা-বাগান আর অবশ্যই অন্য রাষ্ট্র ভুটানের মিষ্টি স্পর্শ। উত্তরবঙ্গের মানুষদের কাছে যেমন ঢিল-ছোঁড়া দূরত্বে এই গন্তব্য, তেমনি দূরের মানুষেরা যাতায়াত বাদে মাত্র দু-তিনদিনে প্রকৃতিকে চেখে নিতে পারেন অনায়াসে। থাকবার জন্য বেছে নেওয়া যায় নিউল্যান্ডস বনবস্তি বা ভুটান কালিখোলার হোম স্টে। 





No comments: