স্বপ্নের অপমৃত্যু ও ছাঁটাই আতঙ্ক
শৌভিক রায়
নতুন বছরের শুরুতে যখন মানুষ নতুন স্বপ্নে বুক বাঁধে, ঠিক তখনই সুপ্রসিদ্ধ বহুজাতিক সংস্থার কর্মী ছাঁটাইয়ের খবর সারা দেশে ভয়ের ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দিয়েছে। যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবে একযোগে কাজ হারাবেন প্রায় পনেরো হাজার কর্মী। ‘হায়ারিং’-এর পরিবর্তে ‘ফায়ারিং’-এর এই দৃষ্টান্ত আধুনিক কর্পোরেট দুনিয়ায় বিরল নয়, কিন্তু প্রশ্ন জাগছে—তবে কি আবার ফিরে আসছে সেই অভিশপ্ত ‘নিউট্রন জ্যাক’ যুগ? ১৯৮০ সালে ‘জেনারেল ইলেকট্রিক’-এর সিইও হয়ে জ্যাক ওয়েলস কয়েক বছরের মধ্যে প্রায় এক লক্ষ কর্মী সংকোচন করেছিলেন। সেই ঘটনা ছিল নিউট্রন বোমা বিস্ফোরণের মতো—যেখানে অট্টালিকা অক্ষত থাকে কিন্তু প্রাণস্পন্দন নিভে যায়। কর্মী সংকোচন করে কোম্পানির মুনাফা বাড়লেও, প্রতি বছর বাধ্যতামূলকভাবে ১০ শতাংশ কর্মীকে ছেঁটে ফেলার সেই নির্মম কৌশল আজও কর্পোরেট দুনিয়ার নিষ্ঠুরতাকে বেআব্রু করে রাখে।
প্রকৃতপক্ষে, কর্মী ছাঁটাইয়ের ইতিহাস দেড় শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। এর সূচনা হয়েছিল ১৮৯৩ সালে আমেরিকার অর্থনীতিতে গভীর মন্দার সময়। সেই সময় বিনা নোটিশে হাজার হাজার মানুষকে পথে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল অসংখ্য সাজানো সংসার, বৃদ্ধি পেয়েছিল বেকারত্ব আর হাহাকার। ইতিহাসের সেই পুনরাবৃত্তি আজও চলছে ভিন্ন নামে, ভিন্ন মোড়কে।
‘লে-অফ’ ও শব্দের আড়ালে ভণ্ডামি
আধুনিক কর্পোরেট পরিভাষায় ‘লে-অফ’ শব্দটিকে সাময়িক কর্মী সংকোচন বলা হলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি কিন্তু স্থায়ী রূপ নেয়। অর্থাৎ এক বার কাজ হারালে সেই কর্মী আর সহজে পুরনো জায়গায় ফিরতে পারেন না। মজার বিষয় হলো, এই ছাঁটাইয়ের ফলে শেষ পর্যন্ত কোম্পানির ব্যালেন্স শিটে লাভের অঙ্ক বাড়লেও, মানুষ হিসেবে একজন কর্মীর অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। এখানে প্রশ্ন ওঠে, সোজাসুজি ছাঁটাই না বলে ‘লে-অফ’ বলবার এই ভাষাগত ভণ্ডামি কেন?
২০২১-২২ সালের পরিসংখ্যান দেখলে শিউরে উঠতে হয়। জার্মানির এক বিশ্ববিখ্যাত ব্যাঙ্ক ১৮ হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করেছিল। আমেরিকার মাত্র চারটি বড় কোম্পানি ১ লক্ষ ২৫ হাজার কর্মীকে পথ দেখিয়ে দিয়েছিল। সংবাদপত্রে কয়েক দিন হইচই হয়, তারপর সব শান্ত। ব্যাপারটিকে কোম্পানির ‘কৌশলগত পরিবর্তন’ হিসেবে চিহ্নিত করে বুদ্ধিজীবীরা আলোচনার ইতি টানেন। কিন্তু সেই মানুষগুলোর ঘর কীভাবে চলছে, তাঁদের সন্তানদের পড়াশোনা বা অসুস্থ বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ কীভাবে জুটছে—সেই খবর রাখার দায় কেউ নেয় না।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও মানসিক চাপ
গণছাঁটাইয়ের সবচেয়ে কুৎসিত দিক হলো কোম্পানির প্রতি সহানুভূতি আর সাধারণ কর্মীর প্রতি চরম উদাসীনতা। যাঁদের নিরলস পরিশ্রমে একটা কোম্পানি সাফল্যের শিখরে পৌঁছল, তাঁদেরই সবার আগে বোঝা মনে করা হয়। এই আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা মানুষকে এতটাই খাদের কিনারায় ঠেলে দেয় যে, আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তও অনেক সময় অস্বাভাবিক মনে হয় না। ‘আগামী মাস কীভাবে চলবে’—এই চিন্তার সঙ্গে যোগ হয় সামাজিক মর্যাদাহানির গ্লানি।
গবেষণা বলছে, বেকার থাকাকালীন নতুন চাকরি খোঁজার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো আবার সেই হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া। অভিজ্ঞ কর্মীরা ছাঁটাইয়ের পর আরও বড় সংকটে পড়েন। কোম্পানিগুলো এখন ‘কম বয়সে বেশি কাজ’ দেওয়ার নীতিতে বিশ্বাসী। ফলে অভিজ্ঞ কর্মীকে তাঁর যোগ্যতা অনুযায়ী বেতন দিতে নারাজ অনেক সংস্থা। বাধ্য হয়ে এই মানুষগুলো অনেক কম মাইনেতে কাজ করতে বাধ্য হন, যা তাঁদের দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রম ও যোগ্যতাকে অপমান করার সামিল।
আত্মপরিচয় ও সম্মানের সংকট
আমাদের সমাজব্যবস্থায় একজন মানুষের আত্মপরিচয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁর পেশার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। বিশেষ করে ‘হোয়াইট কলার জব’ বা উচ্চমানের কারিগরি পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষরা তাঁদের কাজের মাধ্যমেই আত্মমর্যাদা খুঁজে পান। তিলতিল করে গড়ে তোলা সেই জগত যখন এক নিমেষে ধসে যায়, তখন তার মানসিক অভিঘাত বর্ণনা করার ভাষা থাকে না। দক্ষ কাজ করেও যখন ছাঁটাই হতে হয়, তখন সেই মানুষটি নিজের যোগ্যতার ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন।
হোমস-রাহে স্ট্রেস ইনভেন্টরির বিচারে, গণছাঁটাই মানুষের জীবনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনার তালিকার প্রথম দশে স্থান পেয়েছে। ১৯৬৭ সালে ডঃ টমাস হোমস ও ডঃ রিচার্ড রাহে প্রমাণ করেছিলেন যে, এই ধরনের পেশাগত বিচ্যুতি মানুষের স্নায়বিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি করে। এই চাপ সহ্য করার মতো মানসিক কাঠামো সবার থাকে না, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত সমাজে যেখানে চাকরিই হলো একমাত্র সম্বল।
তৃতীয় বিশ্বের রূঢ় বাস্তবতা
উন্নত বিশ্বের ধনী রাষ্ট্রগুলিতে জনসংখ্যা কম এবং কাজের সুযোগ বেশি হওয়ার কারণে ছাঁটাইয়ের প্রভাব কিছুটা কম। আমেরিকার ৭০ শতাংশ মানুষ চাকরির ওপর নির্ভরশীল হলেও তারা দ্রুত অন্য কাজে যোগ দিতে পারেন। কিন্তু ভারত বা তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোতে পরিস্থিতি আকাশ-পাতাল ভিন্ন। এখানে জনসংখ্যার চাপ যেমন বেশি, তেমনি নেই কোনো সামাজিক নিরাপত্তা বলয়। ইউরোপীয় দেশগুলির মতো এখানে কোম্পানির বোর্ডে কর্মীদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই যারা ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে কথা বলবে। ফলে এখানে কর্মী ছাঁটাই অত্যন্ত সাধারণ ও একতরফা একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কর্মীর কোনো কথা বলার অধিকার থাকে না।
ভারতের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ
২০২৩ সাল থেকে ভারতে গণছাঁটায়ের বিষয়টি চরম আকার নিয়েছে এবং এর জন্য অদ্ভুতভাবে দায়ী করা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’-কে। ২০২৫-২৬ সালে শুধুমাত্র তথ্যপ্রযুক্তি জগতেই প্রায় ৬০ হাজার কর্মী ‘লে-অফ’-এর শিকার হয়েছেন। পুরোনো নামী সংস্থা থেকে শুরু করে নতুন স্টার্টআপ—কেউই এই তালিকা থেকে বাদ নেই। বিশ্বের মোট ছাঁটাইয়ের পাঁচ শতাংশ এখন ভারতের ঝুলিতে, যা আমেরিকার পর আমাদের দ্বিতীয় স্থানে তুলে এনেছে।
সরাসরি ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে ‘সাইলেন্ট লে-অফ’—অর্থাৎ পদোন্নতি না করা বা নতুন কর্মী না নেওয়া। ভারতের পরিসংখ্যান মন্ত্রকের হিসেবে অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে শহরাঞ্চলে বেকারত্বের মাত্রা ছিল ৬.৭ শতাংশ। ২০২৬-এর শুরুতে সেই চিত্র পরিবর্তনের কোনো আশা নেই। বরং গিগ অর্থনীতির প্রসারের ফলে স্থায়ী চাকরির ধারণা ক্রমেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নতুন বছরে বহুজাতিক সংস্থাগুলির এই নতুন ছাঁটাইয়ের খবর তাই কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এক আসন্ন সামাজিক বিপর্যয়ের পদধ্বনি।
পরিত্রাণের উপায় আছে কি?
কর্মী ছাঁটাইয়ের এই দীর্ঘ ইতিহাস ও বর্তমান প্রেক্ষাপট বিচার করলে দেখা যায়, রাষ্ট্র যদি এই সময়ে সদর্থক ভূমিকা না নেয়, তবে ভবিষ্যৎ অত্যন্ত অন্ধকার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বর্তমানে সরকারগুলি দান-অনুদান বা বিভিন্ন ভাতা দিতে যতটা আগ্রহী, স্থায়ী কর্মসংস্থান বা কর্মী ছাঁটাই রোধে ততটা উদ্যোগী নয়। রাজকোষের অর্থ দিয়ে সাময়িক সাহায্য করা গেলেও, একজন কর্মীর হারানো সম্মান বা স্থায়ী আর্থিক নিরাপত্তা ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
কর্মী ছাঁটাই রুখতে প্রয়োজন স্থানীয় ও জাতীয় স্তরে কঠোর শ্রম আইন এবং কর্পোরেটদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। কোম্পানি মুনাফা করার সময় কর্মীদের অংশীদার ভাবলে, লোকসানের সময় কেন শুধু কর্মীরাই বলির পাঁঠা হবেন—এই প্রশ্নটি এখন তোলার সময় এসেছে। প্রবল মানসিক চাপ আর উদ্বেগ নিয়ে জীবন কাটানো এই বিপুল সংখ্যক মানুষের পাশে যদি সমাজ ও রাষ্ট্র না দাঁড়ায়, তবে আগামী দিনে দক্ষ শ্রমশক্তির অপচয় এবং সামাজিক অস্থিরতা অনিবার্য। অন্তত এই মুহূর্তে, সাধারণ মানুষের চোখে এর কোনো সহজ পরিত্রাণ ধরা পড়ছে না।
(লেখক প্রাবন্ধিক)
* আজকের (ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬) উত্তরবঙ্গ সংবাদের সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা উত্তরবঙ্গ সংবাদ)

No comments:
Post a Comment