Saturday, November 8, 2025


 

বিশ্ব ব্যাংকের রিপোর্ট যা বলুক না কেন, উত্তরের চা বাগানের অবস্থা সেই তিমিরেই 
শৌভিক রায় 

উত্তুঙ্গ নীল পাহাড়, ঘন অরণ্য, হিংস্র শ্বাপদ, বেগবতী নদী আর জনজাতি - এটুকু থাকলেই উত্তরবঙ্গের ছবিটি যথেষ্ট সুন্দর হত। 

কিন্তু সেই সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে একের পর এক তরঙ্গায়িত সবুজ চা বাগান। উত্তরের অর্থনীতি যে তিন `টি`-এর ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, তার প্রথমটিই হল টি অর্থাৎ চা। কিন্তু চা শিল্পের বর্তমান অবস্থাটি ঠিক কী রকম?  

এই মুহূর্তে উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল ও ডুয়ার্স এলাকা মিলিয়ে প্রায়  ১৫ টি চা বাগান বন্ধ। ডুয়ার্স ও তরাই মিলিয়ে রুগ্ণ চা বাগানের সংখ্যা শতাধিক। পাহাড়ের ক্ষেত্রে তা একশো শতাংশ অর্থাৎ ৮৭-তে ৮৭। ফলে প্রশ্ন উঠছে, বিশ্ব ব্যাংকের সাম্প্রতিক রিপোর্ট উত্তরের চা বাগানগুলির ক্ষেত্রে কতটা প্রযোজ্য? এই রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ২০২২-২৩ সালের অর্থবর্ষে ভারতের দরিদ্র মানুষের হার ২৭.১ শতাংশ থেকে কমে ৫.৩ হয়েছে।  এই রাজ্যে ৬৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে বাস করতেন। সেই হার এখন ৫৪ শতাংশ। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ২৮৩টি চা বাগানের প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ কর্মীর অবস্থার বিশেষ কিছু পরিবর্তন হয়নি। 

সম্প্রতি কালচিনির আটিয়াবাড়ি চা বাগানের এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মীর সঙ্গে কথা হল। দুই বছর আগে অবসর নিয়েছেন। কিন্তু  কোয়ার্টার্সে সস্ত্রীক রয়ে গেছেন। তাঁর বক্তব্য, `যদি কোয়ার্টার্স ছেড়ে চলে যাই, তবে প্রাপ্য গ্রাচুইটি ও পি এফের টাকার কিছুই ঠেকাবে না। ওই টাকা না পেলে যাব বা কোথায়!` শুধু উনি একা নন। ওই চা বাগানের অবসরপ্রাপ্ত পাঞ্জাবি ফিটার সাহেবেরও এক দশা। অন্যান্য চা বাগানগুলিতে খোঁজ নিলে কম বেশি এই একই চিত্র দেখা যাবে। উচ্চ পদে থাকা চা বাগানের বাবুদের যদি এই অবস্থা হয়, তবে সাধারণ শ্রমিকদের অবস্থা সহজেই বোঝা যায়। 

অথচ বিপরীত চিত্র  চায়ের আন্তর্জাতিক বাজারে।  টি বোর্ডের হিসেবে অনুযায়ী ভারতীয় চায়ের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাড়ছে রপ্তানি। কিন্তু তার কোনও সুফল পাচ্ছে না উত্তরের চা বাগানগুলি। বরং দিনের পর দিন বিভিন্ন সমস্যা তাদেরকে এমনভাবে গ্রাস করছে যে, উত্তরণের কোনও পথ খুঁজে পাচ্ছে না তারা। শুধুমাত্র লক আউট নয়। উত্তরের জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তন যেমন চা বাগানের চরিত্র বদলে দিচ্ছে, তেমনি পাওয়া যাচ্ছে না নতুন বিনিয়োগ। অতি সাম্প্রতিক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে যে ক্ষতির মুখে পড়ছে চা বাগানগুলি, তা পূরণ হতেও বহু সময় লাগবে। এর মধ্যে একটিই আশার আলো হল  জলপাইগুড়িতে চা নিলাম কেন্দ্রের পুনরায় চালু হওয়া।

চা বাগানের সেই সোনালী দিন আর নেই। আন্তর্জাতিক সমীক্ষা যতই নির্ধন মানুষের ধনবান হওয়ার কথা বলুক, চা বাগানগুলিতে সেটি আদৌ দেখা যাচ্ছে না। আর তার ফল ভুগতে হচ্ছে এই অঞ্চলের অর্থনীতিকে। কেননা এখনও অবধি উত্তরের একমাত্র শিল্প হল চা। আর সেই শিল্প যদি ধুঁকতে থাকে, তবে একটি বিস্তীর্ণ এলাকার সার্বিক উন্নয়ন হবে কীভাবে? কিন্তু সেটা আমরা বুঝব কবে?

(প্রকাশিত: প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা
 সম্পাদক: শ্রী কৃষ্ণ দেব)


No comments: