অলৌকিক হেমন্ত ভোরে আজও মন উচাটন
শৌভিক রায়
সে সব ছিল অলৌকিক দিন। ভোরের আলো ফুটবার আগেই ডেকে দিতেন মা। বড়কাকুর ঘরে, ফিলিপসের পাঁচ ব্যাটারির ট্রানজিস্টার থেকে, তখন ভেসে আসছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত গলা। শরত শেষের হাওয়ায় হালকা শিরশিরানি বলছে, হেমন্ত এসে গেল প্রায়!
আগের রাতেই চড়ুইভাতি হয়েছে। রেকর্ড প্লেয়ারে বেজেছে অখিলবন্ধু ঘোষের গান। শিউলির গন্ধে ম ম করেছে বার-উঠোন। অশীতিপর ঠাকুমা স্মরণ করিয়েছেন, উঠতে হবে ভোরে, ঘুমোতে হবে তাড়াতাড়ি! না হলে শোনা যাবে দেবীর স্তব। বৃথা যাবে আরাধনা।
ভোর থেকেই তাই জেগে উঠেছি সবাই। একান্নবর্তী পরিবারের ঠাসাঠাসি ভিড়ে, এ ওর গায়ে হেলান দিয়ে, শুনছি `তব হে অচিন্ত্য`। মিছরিদানার মতো সুর খেলে বেড়াচ্ছে টিনের চালের ঘরে। হঠাৎ হঠাৎ শোনা যাচ্ছে শিশির পড়ার টুপটাপ আওয়াজ। জলতরঙ্গ যেন!
আকাশবাণীর অনুষ্ঠান শেষ না হতেই, হৈ হৈ করে বেরিয়ে পড়ত সবাই। পথ অনির্দিষ্ট হলেও সাক্ষাৎ ছিল নিশ্চিন্ত। আর তাতেই জড়িয়ে ধরা একে অন্যকে। মা আসছেন যে! মা এলে কার না আনন্দ হয়? কার না ` হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে`? তবে ওই জড়িয়ে ধরাতেই নির্দিষ্ট হত বিদায়ের দিন। উঁকি দিত বিজয়া দশমীর কোলাকুলি।
তাই মন খারাপ মহালয়া প্রভাতেই! শুরু হতেই তো শেষ হয়ে যায় প্রতিবার! চলে আসে দিন মায়ের চলে যাওয়ার দিন। আচ্ছা, মা কি সত্যিই চলে যান? পারেন যেতে প্রিয় সন্তানকে ছেড়ে? না। কখনই না। জোর গলায় বলে ওঠে মধু মাখা শরত সকাল। তাই উধাও বিষাদ। চৈ চৈ এগিয়ে যাওয়া পায়ে পায়ে। সামনে আরও সামনে।
উত্তর আকাশে তখন উঁকি দিচ্ছে নীল ভুটান পাহাড়। তার পায়ের কাছে দিগন্তবিস্তৃত সবুজের ঢেউ। ওই দূরে জমির আধিয়ার রাজেনকাকু। মুখে চওড়া হাসি। ধান হয়েছে ভাল। কোজাগরীর ধবধবে রাতে মা লক্ষ্মী বসবেন এসে এখানে। মিষ্টি হেসে করবেন আশীর্বাদ। দুষ্ট দলনের পর, এ আসলে মায়েরই বরাভয়।
বরাভয় থাকতো আরও বেশ কিছুদিন। আলোর রোশনাই নিয়ে ফিরে আসতেন মা আবার। ভয়াল কালো তাঁর রূপ। অথচ কী মধুর! পান্নালাল ভট্টাচার্যের গানে ভেসে যেত চরাচর। আর অন্ধকারের উৎস থেকে জেগে উঠতো নতুন প্রাণের সন্ধান। কালীপুজোর দীপমালা স্পর্শ করে মন উড়ান দিত কোচবিহারের রাসচক্রে। টমটমের আওয়াজ মিশে যেত মদনমোহন মন্দির চত্বরের পুতনা রাক্ষসীর গায়ে। পুতনাও তো মা। অথচ কত দুর্নাম তাঁর!
.... ঘোরে না আর রেডিওর নব। মা আসেন তবু। মায়ের সঙ্গেই ভিন রাজ্য থেকে ফিরে আসেন বাড়ির বধূটি। আবার যাবেন বলে। স্বামী তার শ্রমিক। কাজে ব্যস্ত বড়। সকালের সেই অনির্দিষ্ট পথ আজকাল শেষ হয় শপিং মলে। আমাদের দুর্গা সেখানে নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করে। পাশের বাড়ির লক্ষ্মীকে দেখি ছুটছে ল্যাবে, পরীক্ষার জন্য রুগীদের রক্ত নেবে বলে। আর সরস্বতী তো সেই কবে থেকেই বসে আছে ধর্ণায়, যদি যোগ্য ভাবে এই সমাজ! কখনও মনে হয়, পিতৃপক্ষ শেষে এ কোন মাতৃপক্ষ!
তবু অনির্দিষ্ট পথে হেঁটে যাই আজও। সবুজ ঝরে গিয়ে ধূসর সেই পথে। ধানের শীষের ফাঁকে উঁকি দেয় বহুতল। শিউলির গন্ধে ভেসে আসে নানা আড়াল আবডাল। অনিয়মের। দুর্নীতির।
মা আসবেন আবারও। লেপ্টে থাকব তাঁর কাছেই, পেতে তাঁর স্নেহাশিস। হেমন্ত ভোরে তাই, এখনও মন উচাটন। অনুপস্থিতির মধ্যে, যদিও মায়ের উপস্থিতি, বছর ভর, তবু এইসব দিন, এই এক জীবনে বারবার বলে দেয়, মা অলৌকিকে লৌকিক। সঙ্গী সর্বক্ষণ!
(সিরিজ: মা - ৩১)
প্রকাশিত: প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা

No comments:
Post a Comment