নীরবে হারানোর তালিকায় গণসংগীত
শৌভিক রায়
রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ক্ষুদিরামের বিরাট মূর্তি। সকালবেলার অলস সময়ে তেমন লোক চলাচল নেই। হঠাৎই কানে এলো - `জাগো অনশন বন্দী ওঠো রে জাগো..' ঠিক কতদিন পর শুনলাম নজরুল ইসলামের লেখা প্রখ্যাত এই গণসংগীত ? মনে করতে পারলাম না। আজকাল পুরোনো অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে। গণসংগীতও বোধহয় সেই হারিয়ে যাওয়া তালিকায়।
আসলে মনুষ্য-স্মৃতি বড় বিচিত্র বিষয়। কবে, কখন, সেটি কীভাবে মানুষকে আক্রমণ করবে, বা করবে না, তা স্বয়ং স্রষ্টাও জানেন না। নভেম্বর মাসের কথাই ধরা যাক। এক-দেড় দশক আগেও এই মাসটি সাড়ম্বরে পালিত হত এই রাজ্যে। দুনিয়া কাঁপিয়ে, ১৯১৭ সালের এই মাসেই তো মানব ইতিহাসের এক অন্য অভিমুখ সৃষ্টি হয়েছিল। মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিল বিশ্বের নিপীড়িত জনতা। আর তার ঢেউ আছড়ে পড়েছিল সারা পৃথিবীতে। আমাদের দেশে তখন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন চলছে। রচিত হচ্ছে দেশাত্মবোধক সঙ্গীত। দেশবাসীর পাখির চোখ তখন একটাই- স্বাধীনতা। এরকমই উত্তাল সময়ে ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী এই দল স্বপ্ন দেখত, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার। সব ধরণের শোষণ ও বঞ্চনা থেকে শ্রমিকশ্রেণিকে মুক্তি দেওয়া ও শ্রেণিহীন এক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। ফলে, এই মতাদর্শে বিশ্বাসী গীতিকারদের মধ্যে, দেশাত্মবোধক গানের পাশাপাশি, অন্য ধারার সংগীত রচনার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। সেই সংগীতের চরিত্র ও ব্যাপ্তি ছিল বেশ কিছুটা আলাদা। কালক্রমে সেটিই পরিচিত হয়েছিল গণসংগীত নামে। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ভাষায়, `স্বদেশচেতনা যেখানে গণচেতনায় মিলিত হয়ে শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিকতার ভাবাদর্শের সাগরে মিশল, সেই মোহনাতেই গণসংগীতের জন্ম।`
গণসংগীতের বিভিন্ন সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করলে, মূল বক্তব্য হিসেবে কিন্তু একটি বিষয়ই ফুটে ওঠে- অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ। কিন্তু শুধুই কি এটুকু? গবেষক মধুরিমা গুহ রায় বলছেন, ` গণসংগীত দেশ ও কালের বেড়ায় আবদ্ধ নয় কোনওদিনই। যেহেতু সারা পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন জনজাতির মধ্যে শোষক-শোষিতের লড়াই চলেছে, চলছে, সে লড়াইয়ের চরিত্র সর্বত্র এক বলেই, এই লড়াইগুলি থেকে উঠে আসা গান কোনও বিশেষ দেশের নয়, কোনও বিশেষ কালের নয়- আন্তর্জাতিক, কালোত্তীর্ণ; উচ্চমানের ` গণসংগীত '-এর এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।` সেজন্যই বোধহয় কমল সরকারের অনুবাদে পল রোবসনের ` ওরা আমাদের গান গাইতে দেয়না/ নিগ্রো ভাই আমার পল রবসন/ আমরা আমাদের গান গাই, ওরা চায় না` কবে যেন দেশ ও কালের গন্ডি পেরিয়ে একান্ত আমাদের নিজেদের হয়ে যায়। একই কথা বলতে পারি হেমাঙ্গ বিশ্বাসের অনুবাদে, পিট সিগারের সেই প্রবাদপ্রতিম গানের ক্ষেত্রেও। `উই শ্যাল ওভারকাম` গানটিকে `আমরা করব জয়` হিসেবে যখন গাই, তখন কি মনে হয় না, এই কথাগুলি আমাদেরই?
ইতিহাস বলছে, এই বঙ্গে গত শতকের চল্লিশের দশক গণসংগীতের সৃষ্টিকাল। কিন্তু গণসংগীতের বীজ বহু আগেই পোঁতা হয়েছিল। মগ্ন পাঠ দেখিয়ে দেয় যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের মধ্যেও রয়েছে গণসংগীতের সুর। তবে শিবনাথ শাস্ত্রীর `উঠো জাগো শ্রমজীবী জনতা` গানটিকেই প্রথম গণসঙ্গীত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পিছিয়ে ছিলেন না কাজী নজরুল ও মোহিত মৈত্র। তাঁদের তিনজনের একটি মিল রয়েছে। সকলেই অনুবাদ করেছিলেন প্যারি কমিউনের যোদ্ধা ইউজিন পোতিয়ের-এর লেখা `লা ইন্টারন্যাশনালে` গানটি- `জাগো অনশন বন্দী ওঠো রে জাগো..'
কিন্তু চল্লিশের দশক কেন? প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সারা বিশ্বের মানুষের মনোজগতে এক বিরাট ধাক্কা দিয়েছিল। বাহ্যিক ক্ষতির থেকেও অনেক বেশি মানসিক ক্ষতি হয়েছিল। মানুষের এত দিনের লালিত মূল্যবোধ, সংস্কার, চেতনা সব কিছুই ওলোটপালোট হয়ে গিয়েছিল। সুযোগসন্ধানী ধান্দাবাজেরা ক্রমে দখল নিচ্ছিল শাসনকার্যের। বাড়ছিল ফ্যাসিস্ট অত্যাচার। কণ্ঠরোধ হচ্ছিল গণতন্ত্রের। শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছিল রাষ্ট্রশক্তির রক্তচক্ষু। পান থেকে চুন খসলেই বিপদ হচ্ছিল সাধারণ মানুষের। ক্রমশ দেওয়ালে পিঠ ঠেকছিল তাঁদের। বিশ্ব এগোচ্ছিল আর একটা যুদ্ধের দিকে।
ভারত তখন স্বাধীনতা সংগ্রামে উত্তাল। কিন্তু সেই আন্দোলনে এখন আর সমদর্শী মানুষরাই নন, এসে গেছেন অন্য ধারার মানুষেরাও। তাঁদের প্রতিবাদ-আন্দোলন ছিল সাবেক পন্থার চাইতে আলাদা। পার্থক্য ছিল মনন ও চিন্তনে। ফলে, দেশে স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মর্যাদার কথা ভাবতে লাগলেন তাঁরা। সব দিক থেকেই মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন। এই প্রসঙ্গে বাদ গেল না, শিল্প সাহিত্যের মতো সৃজনশীল ব্যাপারগুলিও। তাঁরা চাইলেন এমন শিল্প-সাহিত্য, যা পথ দেখাবে একটি দেশকে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, কাজী নজরুল ছাড়া আর কারও মধ্যেই সংগীতের নতুন পরিভাষা সেভাবে দেখা গেল না।
পরিবর্তন এলো চল্লিশের দশকে। ইতিমধ্যে সারা দেশের লেখক-বুদ্ধিজীবিদের নিয়ে ১৯৩৬ সালে সৃষ্টি হয়েছে `প্রগতি লেখক সংঘ`। মুন্সি প্রেমচাঁদ, হীরেন মুখোপাধ্যায়, সরোজ দত্ত, চিন্মোহন সেহানবীশের মতো প্রখ্যাত মানুষরা যোগ দিয়েছেন তাতে। কলকাতাতেও তার শাখা গড়ে উঠেছে। এরই কাছাকাছি সময়ে, ১৯৪০ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হল ইয়ুথ কালচারাল ইন্সটিটিউট। উচ্চ শিক্ষিত, মেধাবী একদল ছাত্র সাংস্কৃতিক নানা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের মতো গান লিখতে শুরু করলেন। বিভিন্ন কারণে ধুঁকতে থাকা বাংলা গানের জগতে `মায়াভেদী ভূমিকায়` আবির্ভূত হল এক অন্য ধারার সংগীত, যাকে আমরা গণসংগীত বলেই জানি।। ফলে, প্রগতি লেখক সংঘ ও ইয়ুথ কালচারাল ইন্সটিটিউটকে গণসংগীতের জন্মদাতা বলা যেতে পারে।
ইয়ুথ কালচারাল ইন্সটিটিউট ছিল ১৯৪৩ সালে সৃষ্ট ভারতীয় গণনাট্য সংঘর ভিত্তিভূমি। গণনাট্যের প্রতিষ্ঠা বাংলা শিল্প-সাহিত্য জগতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। শুধুমাত্র বাংলা নাটকের বিরাট বাঁকবদলেই আবদ্ধ নয় তাঁদের অবদান। গণসংগীতকেও অন্য মাত্রা দিয়েছিলেন তাঁরা। নাটক, যাত্রা ইত্যাদির মতোই সংগীতের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁরা পৌঁছে দিয়েছিলেন সাধারণ মানুষের মধ্যে। বহু মানুষ গান লিখেছেন, গেয়েছেন। উল্লেখ করতে পারি, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী, দিলীপ রায়, ভুপেন হাজারিকা, প্রীতি রায়চোধুরী, আল্পনা গুপ্ত ভূপতি নন্দী, প্রতুল মুখোপাধ্যায় প্রমুখদের নাম। বিশেষ করে উল্লেখ করছি কোচবিহারের নিবারণ পণ্ডিতের নাম। আজও শোনা যায় তাঁর `আরে ও মোর বন্ধু দরদিয়া/ বুঝি দেখ কায় বানাইল তোমাক নবীন বাউদিয়া`। সমস্যা হল, অনেকে এই গানটি গাইলেও জানেন না, সেটি নিবারণ পণ্ডিতের লেখা।
আধুনিক গানের ক্ষেত্রে গণসংগীতের প্রভাব আমরা দীর্ঘদিন লক্ষ্য করেছি। রুমা গুহঠাকুরতা, অজিত পান্ডে প্রমুখের হাত ধরে হাল আমলের কবীর সুমনও গণসংগীত গেয়েছেন। একসময় শিলিগুড়ি ও ফালাকাটার মুক্তমঞ্চে, পয়লা বৈশাখে দিনহাটার সংহতি ময়দানে গণসংগীত পরিবেশন প্রায় বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু ক্রমে জনমানস থেকে বিস্মৃত হয়ে যাচ্ছে এই ধারাটি। আজকের চটজলদির যুগে যেখানে আমাদের রুচি আটকে গেছে রিলস আর স্থূল মাধ্যমে, সেখানে গণসংগীতের জায়গা কোথায়? `আমি আর তুমি আর আমাদের সন্তান`-এর স্বার্থপর দুনিয়ায়, সাধারণের কথা শুনবার ও বলবার লোক আর নেই বোধহয়। অনস্বীকার্য যে, সময়ের সঙ্গে সব কিছুই পরিবর্তিত হয়। কিন্তু সেই পরিবর্তন যদি উত্তরণ না আনে, তবে আর লাভ কোথায়? তাই গণসংগীতের হারিয়ে যাওয়া আসলে সাধারণ মানুষেরই ক্রমশ হারিয়ে যাওয়া।
(লেখক শিক্ষক। কোচবিহারের বাসিন্দা)
https://uttarbangasambad.com/mass-music-is-also-on-the-list-of-those-who-are-being-silently-lost/
* আজকের (নভেম্বর ১৪, ২০২৫) উত্তরবঙ্গ সংবাদ-এর সম্পদকীয় পাতায় প্রকাশিত। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা কার্যনির্বাহী সম্পাদক ও উত্তরবঙ্গ সংবাদকে।

No comments:
Post a Comment