পিএইচডি? পোস্ট ডক্টরেট? অতঃকিম ?
শৌভিক রায়
পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, পদার্থবিদ্যার মতো বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি করে, দেশে ফিরে যে এরকম অবস্থার মধ্যে পড়তে হবে, স্বপ্নেও ভাবেননি তরুণ দম্পতি। সরকারি চাকরি তো নেই-ই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার যা-ও বা সুযোগ হল, তাতে বেতন ছিল মাত্র চল্লিশ হাজার টাকা। অনেক আবেদন-নিবেদন করে সেটি আরও হাজার পাঁচেক বাড়ানো গিয়েছিল। তাও শুধুমাত্র তরুণটির ক্ষেত্রে। তরুণীটিকে সেটিও দেওয়া হয়নি।
কলকাতার নামী প্রতিষ্ঠান থেকে পিএইচডি ও কানপুর আইআইটি থেকে পোস্ট ডক্টরেট করে, পরিচিত এক মেধাবী ছাত্রকে চিন চলে যেতে দেখলাম কিছুদিন আগে। তাঁর গল্পটিও মোটামুটি এক। দুই-একটি জায়গায় ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন। পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ হাজারের ওপর কেউ দিতে চাননি। অন্য একটি আইআইটি অবশ্য আর একটি পোস্ট ডক্টরেট প্রোজেক্টের জন্য ডেকেছিল। কিন্তু স্টাইপেন্ড হিসেবে যে টাকা তারা অফার করেছিল, সেটি অতি নগণ্য। চিনের যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রটি চলে গেলেন, সেখানে পোস্ট ডক্টরেট করবার পর, চাকরির সুযোগ রয়েছে। ছাত্রটি ইংরেজি জানে বলে অগ্রাধিকার পাবে।
এরকম উদাহরণ আরও অনেক দেওয়া যেতে পারে। কিছুদিন আগে ভিনরাজ্যে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের পরীক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত প্রার্থীদের সংখ্যা দেখে চমকে উঠতে হলেও, বাস্তব কিন্তু এটিই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সাম্প্রতিক এক রিপোর্ট বলছে, ভারতে কর্মবিহীন স্নাতকের সংখ্যা ২৯.১ শতাংশ যা লেখাপড়া না জানা ৩.৪ শতাংশের চাইতে নয় গুণ বেশি। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ কর্মহীন যুবকদের ক্ষেত্রে সেটি ছয় গুণ, অর্থাৎ ১৮.৪ শতাংশ। তাহলে চিত্রটি কী দাঁড়াচ্ছে? যত বেশি ডিগ্রি, তত বেশি কর্মহীনতা।
`অবস্থা যা, তাতে আজকাল কাউকে আর বেসিক সায়েন্স নিয়ে পড়বার কথা বলি না, পিএইচডি ইত্যাদি তো অনেক দূরের ব্যাপার`, বললেন রাজ্যের অন্যতম বিখ্যাত কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিজ্ঞানী। সত্যিই তো। পড়ে হবেটা কী? দীর্ঘদিন ধরে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, দাঁতে দাঁত চেপে কঠিন পড়াশোনা শেষে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও যদি চাকরি পাওয়ার নিরাপত্তা না থাকে, বা চাকরি পেলেও দর কষাকষি করতে হয়, তাহলে লাভটা কোথায়?
ভারতের অন্যতম প্রখ্যাত ডিমড ইউনিভার্সিটি গান্ধিগ্রাম রুরাল ইনস্টিটিউটের প্রোফেসর কে সোমসুন্দরম বলছেন যে, পোস্ট ডক্টরেট করবার পর প্লেসমেন্টের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। ফলে যে কোনও ধরণের চাকরিতে ঢুকতে বাধ্য হচ্ছেন মেধাবী এই ছাত্ররা। অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রে উচ্চ ডিগ্রি সম্পন্ন ছাত্রদের চাকরি পাওয়ার হার মাত্রা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে দেখানো হয়েছে যে, কীভাবে ভারতের পিএইচডি ও পোস্ট ডক্টরেটদের ৮০ শতাংশের স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত ভঙ্গ হয়। অনেকেই মাঝপথে ছেড়ে দেন। যাঁরা লড়াই চালিয়ে যান, শেষ পর্যন্ত তাঁরাও ঠিক মতো কর্মসংস্থান পান না। বাকি ২০ শতাংশ চলে যান কর্পোরেট সেক্টরে। কিন্তু সেখানেও কঠিন অবস্থা। কর্পোরেট সেক্টরে প্রথম পছন্দ থাকে কম বয়সী স্নাতক বা স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা। ফলে, তাঁদের পড়তে হয় তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে। অনেক সময় চাকরি পেলেও, নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী বেতন পাওয়া যায় না। বিষয় শিক্ষার প্রয়োগ হয় না। দেখাতে হয় যথেষ্ট পারদর্শিতা। তা না হলে ছাঁটাই হওয়া শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা।
২০২৩ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতে উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে ১১ হাজারের ওপর পদ খালি ছিল। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনীতির টানাপোড়েনে সেগুলি পূরণ করা যায়নি। বর্তমানে এই শূন্য পদের সংখ্যা আরও বেশি। অনায়াসেই সেই পদগুলিতে এই মেধাবী গবেষকদের সুযোগ দেওয়া যায়। তাতে কিছুটা সুরাহা হত। কিন্তু সেটা হয়নি। যেটুকু হয়েছে তাতেও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ করা হচ্ছে যে, বিদেশ থেকে যাঁরা পোস্ট ডক্টরেট করে এসেছেন, তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তাই আজকাল অধিকাংশ গবেষকদেরই পাখির চোখ একটিই। যেভাবে হোক বিদেশ থেকে পিএইচডি বা নিদেনপক্ষে পোস্ট ডক্টরেট করা। ফলে, সারা বিশ্বে ভারতের পরিচয় `ব্রেন ড্রেন`-এর দেশ হিসেবে। কেননা এখানকার গবেষকরা সুযোগ না পেয়ে বিদেশে চলে যাচ্ছেন। গত বছরের তথ্য অনুযায়ী ৩ লক্ষ ৬০ হাজার ছাত্র যাঁরা বিদেশে পড়তে গিয়েছেন। এঁদের ৮৫ শতাংশই আর দেশে ফিরছেন না শুধুমাত্র সুযোগের অভাবে।
এমনিতেই শিক্ষার সর্বোচ্চ এই স্তর প্রচন্ড কঠিন। যাঁরা সেই পথে হাঁটছেন, একমাত্র তাঁরাই জানেন। বিরাট কাজের চাপের সঙ্গে যোগ হয় গাইডের মেজাজ ও মর্জি। একটু এদিক ওদিক হলেই হতে পারে নানা বিপদ। `কারেকশন`-এর নামে গবেষককে ঘোরানো হতে পারে। পেপার প্রকাশে অন্যায় বিলম্ব ঘটতে পারে। বেড়ে যেতে পারে গবেষণা শেষের নির্দিষ্ট সময়সীমা।
এই রাজ্যের এক বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন এক গবেষককে জানি, সাত বছরেও যাঁর পেপার `পাবলিশ` হয়নি। এক বছর সেটা পড়ে ছিল গাইডের টেবিলে। অথচ মেধাবী সেই গবেষক কর্পোরেটের ভাল চাকরি ছেড়ে গবেষণায় এসেছিলেন পরবর্তীতে শিক্ষকতা করবেন বলে। তাঁর এখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। ইউজিসি থেকে প্রতি মাসে বরাদ্দ টাকা বন্ধ হয়ে গেছে পাঁচ বছরের মাথায়। এখন একটি আধা-সরকারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে নামমাত্র বেতনে পড়িয়ে তাঁকে খরচ চালাতে হচ্ছে। তবু তাঁর সহধর্মিণী ব্যাংকে চাকরি করেন বলে, কিছুটা রক্ষে। কিন্তু সবার সেই সৌভাগ্য হয় না। বিদেশে অবশ্য এই চিত্র সচারচর দেখা যায় না। গাইড চেষ্টা করেন ধার্য সময়সীমার মধ্যেই কাজ শেষ করে গবেষককে ছেড়ে দিতে। এতে যেমন তাঁর নিজেরও লাভ, তেমনি ছাত্রটিরও। এখানেও পিছিয়ে আমাদের দেশ। অবশ্য সব গাইডের ক্ষেত্রেই এই অভিযোগ করা যায় না। অনেকেই রয়েছেন, যাঁরা আক্ষরিক অর্থেই গবেষকের `ফ্রেন্ড, ফিলোসোফার ও গাইড` হয়ে ওঠেন।
দুনিয়া দিন-দিন ঝুঁকছে টেকনোলজির দিকে। পড়াশোনা ক্রমশ হয়ে উঠছে প্রোজেক্ট নির্ভর। যে বিষয়গুলি ব্যবহারিক জীবনে সেভাবে কাজে লাগে না, কমছে সেগুলির চাহিদা। ফলে `বেসিক` বিষয়গুলি ক্রমে গুরুত্ব হারাচ্ছে। সারা পৃথিবী জুড়েই এক অখন্ড নেটওয়ার্কের মতো ছড়িয়ে পড়ছে বদলে যাওয়া সময়ের চাহিদা ও যাপন। ফলে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ বিষয়গুলির দিকে আর কেউ ঝুঁকছেন না। অবস্থা এখন এমনই যে, আগামীদিনে যদি কেউ বেসিক সায়েন্স, সাহিত্য, ইতিহাস ইত্যাদি নিয়ে না পড়ে, অবাক হওয়ার কিছু নেই। আর তার সঙ্গে উচ্চ শিক্ষার পর কর্মক্ষেত্রের এই হাল হলে, সেদিকে আর কে মাড়াবে! জেনেশুনে বিষ আর পান করবে কে!
ভবিষ্যত ভেবে তাই শঙ্কিত হতেই হয়। এই দেশে উচ্চ মেধার অভাব নেই। কিন্তু সুযোগের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। নষ্ট হচ্ছে মানব সম্পদ। যাঁদের ওপর নির্ভর করে দেশের অগ্রগতি হবে, তাঁরাই যদি এভাবে হারিয়ে যান, তাহলে তার চাইতে বেদনার আর কিছু হতে পারে না। মুশকিল হল, এই সহজ সত্যটা আমরা বুঝতে পারছি না। কিংবা বুঝেও বুঝছি না। তাই উচ্চ শিক্ষাকে এভাবে অবহেলা করছি। এ যেন অনেকটা সেই কালিদাসের মুর্খামির মতো- যে ডালে বসে আছি, কাটছি সেই ডালটিই ! আর সারা বিশ্ব দেখছে, আমরা সেটাই করছি।
(লেখক শিক্ষক। কোচবিহারের বাসিন্দা)
**** আজকের (অক্টোবর ১৬, ২০২৫) উত্তরবঙ্গ সংবাদের সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত একটি লেখা। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা সম্পাদকীয় দপ্তর ও পত্রিকাকে।

No comments:
Post a Comment