উপেক্ষার অন্ধকারে চৈতন্য থেকে বঙ্কিম
শৌভিক রায়
জাম্প কাটে চলে যাই বাঙালির চিরদিনের পুরীতে। ভোর পাঁচটা। জগন্নাথদেবের মন্দিরের সামনে কয়েক হাজার জনতা। দেব দর্শনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তাঁরা। সামনের বিরাট ডিসপ্লে বোর্ডে গতকালের সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, কত সংখ্যক মানুষকে দর্শন দিয়েছেন জগন্নাথদেব। আজও একই অবস্থা। সারাদিন ভিড় চলবে। এই বিপুল জনসমাগমের আশি শতাংশ মানুষই বাঙালি।এঁদের কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, শ্রীগম্ভীরা বা রাধাকান্ত মঠ চেনেন কিনা। কেউই চিনলেন না। কয়েকজনের মুখ দেখে মনে হল, তাঁরা এই কথাটি প্রথম শুনলেন।
অবাক হলাম না। এরকম মুখ দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। যে বাঙালি হোটেলে আছি, তাঁরাও কোনও খবর দিতে পারেননি। দেখিয়ে দিয়েছেন স্থানীয় অটো-চালকদের।
এমনিতে, গম্ভীরা শব্দের অর্থ ঘরের মধ্যে ছোট ঘর। সে রকমই একটি ঘরে, পুরীতে কাশী মিশ্রের বাড়িতে, জীবনের শেষ ১২ বছর কাটান শ্রীচৈতন্য। জগন্নাথ মন্দিরের দক্ষিণ-পূর্বে বালিসাহিতে অবস্থিত এই বাড়িটি রাধাকান্ত মঠ নামেও পরিচিত। এখানে সযত্নে রক্ষিত শ্রীচৈতন্যের পাদুকা, কমণ্ডলু ও গায়ের চাদর।
আলারনাথ মন্দিরের কথাও অজানা অনেকের। পুরীর সামান্য দূরে ব্রহ্মগিরির এই মন্দিরে শ্রীচৈতন্য নাম সংকীর্তন করতেন। সেখানেও তাঁর স্মৃতি-বিজড়িত শিলা রাখা আছে।
এমন নয় যে, এই জায়গাগুলির কোনও দেখভাল হয় না। দর্শনার্থী অবশ্যই আসেন। কিন্তু তাঁদের সংখ্যা নিতান্তই কম। রাধাকান্ত মঠের বাসিন্দারা অত্যন্ত যত্ন নিয়ে নিত্যপূজা থেকে শুরু করে সব কিছু করছেন। আলারনাথ মন্দিরেও তাই। এখানে অবশ্য জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রার পর ভিড় বাড়ে। কেননা পুরীতে জগন্নাথদেবের মন্দির তখন বন্ধ থাকে। আর বিশ্বাস অনুসারে জগন্নাথ দেবের বাস তখন এখানে।
নৈহাটিতে বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মভিটে অত্যন্ত ভালভাবে রক্ষিত। তাঁর ব্যবহৃত পালঙ্ক, আলমারি, পাগড়ি থেকে শুরু বহু কিছু রাখা আছে সেখানে। নৈহাটির আরও দুই প্রখ্যাত মানুষ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও সমরেশ বসুও স্থান পেয়েছেন এখানকার মিউজিয়ামে।
বাংলার প্রথম সমাজ সংস্কারক শ্রীচৈতন্যের জীবনের শেষ অবস্থান ও সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মস্থান সম্পর্কে এই অজ্ঞতায় এখন আর বিস্মিত হই না। স্বাভাবিক বোধহয় এটাই। আমাদের মতো উদাসীন ও আত্মঘাতী জাতি দ্বিতীয়টি নেই। পুরীর ভিড়ে তাই হারিয়ে যান মহাপ্রভু। নৈহাটিতে অজ্ঞতার অন্ধকারে চাপা পড়ে থাকেন সাহিত্যসম্রাট। কোচবিহারে অবহেলায় ভেঙে যায় ভাওইয়া সম্রাট আব্বাসউদ্দিনের বাড়ি। দার্জিলিংয়ে সিস্টার নিবেদিতার সমাধির কথাও আমরা জানি না। উদাহরণ এরকম অনেক।
আসলে যে দেবতাদের চোখে দেখা যায় না, তাঁদের জন্যই আমাদের আকুলতা। কিন্তু যে মানুষেরা তাঁদের সুকর্মের মধ্যে দিয়ে দেবতাদের কাজ করে গেলেন, তাঁদের দিকে আমরা চেয়েও দেখিনা। অথচ তাঁরা না থাকলে, এই বর্তমান আমরা কখনই পেতাম না। তাই প্রশ্ন জাগে মনে, এভাবেই কি ক্রমশ অজ্ঞতার অন্ধকারে ডুবে যাব আমরা? ভুলে যাব নিজেদের সমৃদ্ধ অতীত!
(লেখক শিক্ষক। কোচবিহারের বাসিন্দা)
(প্রকাশিত: উত্তরবঙ্গ সংবাদ/ ৬ জুন, ২০২৫)

No comments:
Post a Comment