প্রধানমন্ত্রীর সফরে দিশা নেই উত্তরে
শৌভিক রায়
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদির আলিপুরদুয়ার সফর নিয়ে খুব আশাবাদী ছিলাম। সত্যি বলতে পাহাড়, অরণ্য আর চা-বাগানের এই উত্তরবঙ্গে মোদিই একমাত্র প্রধানমন্ত্রী যিনি এতবার এলেন। উদ্দেশ্য যা-ই হোক, তাঁর আগমন সবসময় স্বাগত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে উত্তরবঙ্গবাসী হিসেবে সত্যিই হতাশ হয়েছি। তাঁর দীর্ঘ ভাষণে, উত্তরের জন্য, কোনও দিশা দেখিনি।
প্রশ্ন হল, দেশের অভ্যন্তরে কোথাও সফর করলেই কি দিশা দেখাতে হবে? অন্য কারও ক্ষেত্রে হলে, কথাটা বলবার জন্য হয়তো দুবার ভাবতাম। কিন্তু তিনি নরেন্দ্র মোদি। তাঁর ভাবমূর্তি সবসময় আলাদা। তাই প্রত্যাশা থাকেই। বিশেষ করে সফরের জন্য সেটা যদি আলিপুরদুয়ারের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জনপদ হয়।
এখান থেকে ভুটান ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে। বাংলাদেশ একদম কাছে। নেপাল যেতেও সময় লাগে না। দু`পা এগোলেই সেভেন সিস্টার্স বলে পরিচিত রাজ্যগুলি। ফলে অনুপ্রবেশ এখানে সহজ। আর সেটি যে প্রচুর পরিমাণে হচ্ছে, সেই বিষয়ে সন্দেহ নেই। কেননা এখনও সীমান্তের অনেকাংশ কাঁটাতারহীন।
এরকম সংবেদনশীল এলাকা আজও নির্ভর করে আছে একটি মাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওপরে। কোচবিহারের মতো ছোট শহরে বিমানবন্দর থাকলেও তার কী দশা, আমরা জানি।
আবার দীর্ঘদিনের দাবি থাকলেও উত্তরে এইমস হয়নি। ফলে চিকিৎসা করাতে অধিকাংশের ভরসা রাজ্য রাজধানী কিংবা দক্ষিণ ভারত। আর দক্ষিণগামী ট্রেনে ভিড় দেখলে বোঝা যায় না, কে রুগী, কে পরিযায়ী শ্রমিক। এইসব সমস্যা সমাধানে আমরা কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সদর্থক ভাবনা শুনব আশা করেছিলাম।
উত্তরের একমাত্র শিল্প চা নিয়েও নতুন কিছু শুনলাম না। ভারতের অন্যতম প্রধান এই শিল্প রীতিমতো ধুঁকছে। বন্ধ হচ্ছে চা বাগান। বাড়ছেমানব-পাচারও। চা-বাগানের শ্রমিক, বিশেষ করে মহিলারা, অপুষ্টি-অশিক্ষা-কুসংস্কারের শিকার। বাগানগুলিতে যখন তখন লক আউট নতুন ব্যাপার নয়। এরকম অবস্থায়, প্রধানমন্ত্রীর সামান্য কিছু কথাও কিন্তু বিরাট আশ্বাসবাণী হতে পারত।
`টি-ট্যুরিজম-টিম্বার`-এর উপরে দাঁড়িয়ে উত্তরবঙ্গ। পরিকল্পনাহীন শিল্প যে শেষ পর্যন্ত ক্ষতি ডেকে আনে, তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ উত্তরের পর্যটন। বন্যপ্রাণীর লোকালয়ে আগমন, অরণ্য নিধন করে হোমস্টে আর রিসোর্ট নির্মাণ, নদীগুলির নাব্যতাহীনতা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যিনি সর্ব বিষয়ে খোঁজ রাখেন, তিনি এগুলি জানেন না, সেটা হতে পারে না। যেমন ভাবা যায় না, এই অঞ্চলের দারিদ্র, বেকারত্ব ইত্যাদিও তাঁর অজানা।
একটি বিরাট দেশের নিরিখে এসব হয়ত নিতান্তই আঞ্চলিক সমস্যা। কিন্তু উত্তরের ব্যাপারটি সবসময় আলাদা। তার অবস্থান তাকে আলাদা করেছে। তাই এখানকার বিষয়ে অত্যন্ত মনোযোগী ও সংবেদনশীল না হলে, ক্ষতি সমগ্র দেশের। এই সত্যটি যদি দেশের সর্বোচ্চ শাসককে না বোঝানো যায়, তবে মঞ্চে তাঁর সঙ্গে ছবি তুলে কোনও লাভ হবে না। তাতে বরং বিরোধীদের হাতে অস্ত্রই তুলে দেওয়া হবে।
( শিক্ষক, কোচবিহার )
* প্রকাশিত: আনন্দবাজার পত্রিকা, উত্তরবঙ্গ সংস্করণ, জুন ২, ২০২৫
ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা আনন্দবাজার পত্রিকা

No comments:
Post a Comment