Tuesday, December 24, 2024


 

উত্তরের চার্চ নিয়ে চর্চা থেমে যায় যায় বড়দিন চলে গেলেই 
শৌভিক রায় 

দার্জিলিংয়ের অবজারভেটরি হিলসকে ঘিরে থাকা অসম্ভব সুন্দর পথটিতে, একটি  চক্কর কাটতেই, বিরাট, শান্ত, সমাহিত চার্চটি নজরে এলো। প্রামাণ্য তথ্য অনুসারে, এখনও উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে পুরোনো চার্চ এটি। 

সিকিম থেকে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দার্জিলিং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে এলে, শহর গড়ার কাজ শুরু হয়েছিল। তখন ১৮৩৮ সাল। লেফটেন্যান্ট কর্ণেল লয়েড ও একজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়র জন গিলমোর ছিলেন তত্বাবধানে। পাঁচ বছর পর, ৩০ নভেম্বর, ১৮৪৩ সালে, সেন্ট এন্ড্রুজের জন্মদিনে, ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করা হয়েছিল উত্তরের সবচেয়ে প্রাচীন চার্চটির। দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন বিশপ। প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে কাটিয়ে নির্মাণ শেষ হয়েছিল ১৮৭৩ সালে। ব্রিটিশ গথিক শিল্পশৈলীর এই বিরাট চার্চটির `প্যাট্রন সেন্ট` অবশ্যই সেন্ট পিটারের ভাই, সেন্ট এন্ড্রুজ। অতীতে চার্চ থেকে ঘন্টা বাজিয়ে সময় ঘোষণা করা হত। আজ অবশ্য ঘন্টা নেই। কিন্তু দেখলাম ব্রোঞ্জের ফলকে রয়েছে লেফটেন্যান্ট লয়েড ও  তদানিন্তন গভর্ণর লর্ড ক্যানিজ্যের স্ত্রী শার্লট কাউন্টেস ক্যানিংয়ের নাম। শোনা যায়, দার্জিলিংয়ের ৬৭০০ ফুট উচ্চতায় স্থাপিত এই অঞ্চলের প্রাচীনতম আংলিক্যান চার্চের রূপে মুগ্ধ হয়ে, চার্চের ছবি এঁকেছিলেন রানি ভিক্টোরিয়ার সহচরী ও চিত্রশিল্পী শার্লট। 

ইংরেজি `সিরিস` শব্দটি থেকে চার্চ কথাটি কিন্তু শুধুমাত্র উপাসনালয়কেই বোঝায় না। সমগ্র খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে বোঝাতেও এই শব্দের ব্যবহার হয়। আবার খ্রিস্টানদের মধ্যে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে ক্যাথোলিক, প্রোটেস্টান্ট, প্রেসবেটেরিয়ান, অপোস্টলিক, সেভেনথ ডে অফ এডভ্যানটিস্ট, ব্যাপ্টিস্ট, মেথোডিস্ট, সিএনআই ইত্যাদি নানা ধরণের চার্চও দেখা যায়।  

ফ্রান্স ও কানাডা থেকে আসা মিশনারিরা কার্সিয়াংয়ে, ১৯০৫ সালে, তৈরি করেন সেন্ট পল দা অপস্টোল চার্চ। রয়েছে সেন্ট এন্ড্রুজ চার্চও। আছে ডাওহিল চার্চ। অন্যদিকে, ১৮৯০-৯১ সালে নির্মিত কালিম্পঙয়ে আসা প্রথম স্কটিশ মিশনারির নামে নির্মিত হয় ম্যাকফারলেন চার্চ। এখানে আজও লেপচা, চাইনিজ, বোড়ো  ইত্যাদি সহ দশটি ভাষায় `সারমন` দেওয়া হয়। ১৯৩১ সালে প্রতিষ্ঠিত, কালিম্পঙয়ের সেন্ট টেরেজা চার্চ, জেলার রোমান ক্যাথলিক চার্চগুলির `মাদার চার্চ` হিসেবে পরিচিত। উত্তর ভারত ও নেপালের `ক্লুনি কংগ্রেশন`-এর গুরুদায়িত্বও তাদের কাঁধে।
            
উত্তরবঙ্গের সমতলেও প্রাচীন চার্চের সংখ্যা প্রচুর। কোচবিহারের কথা ধরা যাক।  কোচবিহারে খ্রিস্টধর্ম প্রসারিত হয়েছিল সুইডিশ মিশনারিদের হাত ধরে। করদ রাজ্য হলেও, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মের ব্যাপারে কোচবিহারের রাজারা সচেতন ছিলেন। ফলে মিশনারিদের প্রবেশের অনুমতি ছিল না।  মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের সঙ্গে বিবাহের পর সুনীতি দেবী নারী শিক্ষা বিস্তারের জন্য একটি স্কুল তৈরি করেন। মধ্যপ্রদেশ থেকে নিয়ে আসেন সুইডিশ লিডিয়া ম্যাগনুসনকে। সেই সময় মহারাজার ব্যান্ডপার্টিতে কয়েকজন ইউরোপিয়ান ছাড়াও, গারো হিলস থেকে ভাগ্যান্বেষণে আসা কিছু খ্রিস্টান ছিলেন। ধর্মপ্রচারের সুযোগ রয়েছে দেখে, লিডিয়া মহারানি সুনীতি দেবীর সহায়তায় মহারাজার কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি আদায় করেছিলেন। উনবিংশ শতকের শেষদিকে স্থাপিত হয়েছিল একটি হোম স্কুল ও চার্চ। কোচবিহার এয়ারপোর্ট সংলগ্ন হ্যাঙ্গার রোডে সেই চার্চ আজ নর্দার্ন ইভাঞ্জেলিক্যাল লুথারান (এনইএলসি) চার্চ নামে পরিচিত। সম্ভবত কোচবিহারের প্রাচীনতম চার্চ এটি। বর্তমানে দিনহাটার পথে, গারোপাড়াতেও, সেন্ট জন ক্যাথলিক চার্চের পাশাপাশি, এনইএলসি চার্চ রয়েছে।

জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারের চার্চগুলির সঙ্গে কিন্তু `সবুজ সোনা` চায়ের একটি সম্পর্ক আছে।  ১৮৪১ সালে দার্জিলিংয়ে ডক্টর ক্যাম্বেল পরীক্ষামূলকভাবে চা গাছের বীজ পোঁতেন। অচিরেই গাছ হয়। এরপর লেবং অঞ্চলে প্রথম চা বাগান তৈরি করেন  মেজর গ্রামলিন। অসমের পর, খুব দ্রুত, দার্জিলিং পাহাড় চা বাগানে ছেয়ে যায়। কিন্তু ডুয়ার্সের মাটিও যে চা চাষের উপযুক্ত সেটা ব্রিটিশরা বুঝেছিল ১৮৭৪ সালে, যখন গজলডোবায় ব্রুহাম সাহেব প্রথম চা বাগান তৈরি করলেন। তবে প্রচেষ্টা চলছিল তার আগে থেকেই। 

ফলে, ১৮৬৯ সালে জেলা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে থেকেই, জলপাইগুড়ি হয়ে উঠেছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর। সেখানেই ইউরোপিয়ানরা প্রতিষ্ঠা করলেন সমতলের সব চাইতে পুরোনো চার্চটি। জলপাইগুড়ি জেলাশাসকের দপ্তরের উল্টোদিকের সেন্ট মাইকেলস এন্ড অল এঞ্জেলস নামের সেই চার্চ তৈরি হয়েছিল ১৮৬৪ সালে। 

প্রোটেস্টান্টদের এই চার্চে দেখেছি অতীতের বিভিন্ন স্মৃতি। চার্চ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের স্মৃতিসৌধগুলি দেখে মন খারাপ হয়েছিল। চুন সড়কি নির্মিত চার্চটির ভেতরে বেলজিয়াম কাঁচের জানালা আর  ইংল্যান্ড থেকে নিয়ে আসা ঘন্টাটির অক্ষত চেহারা অবশ্য শান্তি দিয়েছিল। নয়াবস্তির ব্যাপ্টিস্ট চার্চের নির্মাণ কালও ১৮৮৩ সাল। প্রাচীনত্বে সেটিও কম নয়। এই জেলার চা বাগান এলাকায় অর্থাৎ মালবাজার, চালসা, মেটেলি, বিন্নাগুড়ি ইত্যাদিতেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বয়সে ও প্রবীণ ও নবীন বহু চার্চ।

আলিপুরদুয়ার জেলার কালচিনিতে রয়েছে  এই অঞ্চলের সবচেয়ে পুরোনো চা বাগান। তাই সেন্ট মেরিস ক্যাথলিক, সেন্ট পিটার্স, আটিয়াবাড়ি ও কালচিনি ব্যাপ্টিস্ট চার্চ ইত্যাদির অনেকেই শতবর্ষ উত্তীর্ণ। তবে সঠিক প্রতিষ্ঠা কাল কেউই বলতে পারলেন না। আলিপুরদুয়ারের শামুকতলার কাছে খোয়ারডাঙার নররথলি প্রেসবেটেরিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্ট চার্চ তৈরি হয়েছিল ১৯১৩ সালে। চার্চের অন্যতম কর্মকর্তা নিবারণ নার্জিনরি বললেন, খুব কাছের মহাকালগুড়িতে আর একটি চার্চ নির্মিত হয় ১৯০৭ সালে। তবে সেটি নররথলির চার্চের চাইতে আকারে ছোট। এখানে সিএনআই ও ব্যাপটিস্ট চার্চও রয়েছে। অসম সংলগ্ন এই অঞ্চলটি চার্চ, মন্দির, গুরুদ্বোয়ারা, মসজিদ নিয়ে যেন এক টুকরো ভারত। 

উত্তরের বহু জায়গায় সেভেনথ ডে অফ এডভ্যানটিস্টদের দেখা যায়। এদের অধীনে সারা বিশ্বে রয়েছে পাঁচ হাজারের বেশি প্রাথমিক এবং প্রায় আড়াই হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রায় সাড়ে তিনশ হাসপাতালের পরিচালনাও করছেন এরা। ফালাকাটায় রেমন্ড মেমোরিয়াল হাই স্কুল ও সংলগ্ন চার্চটি এদের অধীনে। জানলাম, ১৯৪৯ সালে কার্মাটার থেকে এমজি চ্যাম্পিয়ান ও সিজে জেনসন নিজেদের স্কুলকে ফালাকাটায় সরিয়ে নিয়ে আসেন। চার্চও প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এঁদের প্রথম চার্চ তৈরি হয়েছিল ১৯৪১ সালে আলিপুরদুয়ারের চকোয়াখেতিতে। তারও আগে মালদা শহরের কুড়ি কিমি দূরের রোহনপুরে উপেন্দ্রনাথ হালদার ও জিতেন সরকারের হাত ধরে ধর্মপ্রচার শুরু হয়। 

মালদা স্টেশন থেকে সামান্য দূরে কানির মোড়ের কাছে খ্রিস্টান ফেলোশিপ চার্চ অর্ধ-শতাব্দীর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ১৯৭৫ থেকে ভারতে এই চার্চের যাত্রা শুরু। এমনিতে মালদা জেলায় সেভাবে খুব বেশি চার্চ দেখা যায় না। তবে ইংলিশবাজারে ক্যাথলিক চার্চ, এনইএলসি চার্চ দেখেছি। এগুলির মধ্যে এনইএলসি চার্চটি পুরোনো ও আকারে বড়। আদিনা ওল্ড মালদার মাঝেও একটি চার্চ বহুদিনের। রেলপথ থেকেই সেটি দৃশ্যমান। রায়গঞ্জের সেন্ট জোসেফ দা ওয়ার্কার ক্যাথিড্রাল ইতিমধ্যেই বেশ জনপ্রিয়। এই সুদৃশ্য চার্চটি ২০০৭ সালে নির্মিত হয়। গথিক থেকে রেনেসাঁ এবং রোমান থেকে গ্রিক শৈলী ব্যবহৃত হয়েছে নির্মাণে। তিরিশ হাজারের বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন ক্যাথিড্রালের উদ্বোধনের দিন। বালুরঘাটে জয়ফুল ফেলোশিপের চার্চ বাদেও রয়েছে  সিএনআই ক্যাথিড্রাল চার্চ।  ইসলামপুরের ক্যাথলিক ও ব্যাপটিস্ট  চার্চ দুটিও বেশ পুরোনো।    

উত্তরের বেশ কিছু চার্চ হেরিটেজ স্বীকৃতির যোগ্য। দুর্ভাগ্য সেটি আজও সম্ভব হয়নি। শেষ জনগণনা অনুযায়ী, উত্তরের ১৩.৫৩ শতাংশ খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী মানুষের ব্যাপারে আমরা প্রত্যেকেই উদাসীন। ফলে খ্রিস্টমাস ক্যারোল আর বড়দিনের কেকের স্বাদ মিটলেই চার্চ নিয়ে চর্চাও থমকে যায়।  

(লেখক শিক্ষক। কোচবিহারের বাসিন্দা)



** আজকের (ডিসেম্বর ২৪, ২০২৪) উত্তরবঙ্গ সংবাদএর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত। অজস্র ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা উত্তরবঙ্গ সংবাদ ও কার্যকরী সম্পাদককে।

No comments: