Saturday, December 14, 2024




কচ্ছ নেহি দেখা তো কুছ নেহি দেখা

শৌভিক রায় 


* ছবি- শৌভিক ও রীনা


সানন্দ যখন পার হচ্ছি, চোখ পড়ল রাস্তার সাইনবোর্ডে। সবুজ বোর্ডে সাদায় লেখা `টাটা ন্যানো প্ল্যান্ট`। ফোর লেন রাস্তা থেকে বাঁ হাতে দুই কিমি। আমরা অবশ্য সোজা যাব ধারঙ্গধরার দিকে। এমনিতেই আহমেদাবাদে জ্যামে প্রায় ঘন্টা দেড়েক নষ্ট হয়েছে। হয়ত প্ল্যান্টে ঢুকতে বিশেষ অনুমতিও লাগে। তাই প্রবল ইচ্ছে সত্বেও ন্যানোর প্ল্যান্ট আর দেখা হল না। 



ন্যানো, ও ন্যানো


ভাবতেই পারেন, লেখার শুরু কেন টাটার ন্যানো প্ল্যান্ট দিয়ে করলাম। কারণ কিছুই নয়। আহমেদাবাদ থেকে ভুজের ৩৬৬ কিমির এই পথে সেভাবে দেখবার কিছু নেই। আর টাটার ন্যানো যে আমাদের বাঙালি মননে একটি `ঘটনা` সেটা অস্বীকার করারও কোনও উপায় নেই। অতএব সানন্দে এসে এটুকু উত্তেজিত হতেই হয়। হয়েও ছিলাম। 


আছেন, তিনি আছেন...আহমেদাবাদের একটি পথ

দীর্ঘ রাস্তায় অবশ্য একের পর এক প্ল্যান্ট বা কারখানা পাচ্ছি। উইন্ডমিল প্রচুর। শিল্পপতিরা যে গুজরাটকে যথেষ্ট ভালবাসেন তার প্রমাণ এসবই। এছাড়া রাস্তার দুই পাশে নিচু জমি। ছোট ছোট কার্পাস গাছে তুলো দেখা যাচ্ছে। তবে গুজরাটের মানচিত্রকে যদি বাঘের হাঁ করা মুখের মতো ভাবি, তবে নিচের দিকে অর্থাৎ দক্ষিণদিকে (গান্ধিনগর -পালিতানা-দিউ-সোমনাথ-ভেরাবল-গির-জুনাগড়-পোরবন্দর-দ্বারকা-রাজকোট) যেভাবে বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে বাদাম খেত দেখা যায়, সেরকম কিছু নেই। সুতরাং খেত থেকে বাদাম কেনার যে প্রবল ইচ্ছে ছিল রীনার, অপূর্ণ রয়ে গেল। এর আগের বারে বাদাম কেনা একটা অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। এবার আর সেটা হচ্ছে না। এবার অবশ্য হাতে এমনিতেও কম দিন, কম দ্রষ্টব্য। পুত্র কড়া হুমকি দিয়ে রেখেছে, `বয়স হয়েছে, বেশিদিন ধরে দুজনে মিলে টইটই চলবে না। তোমরা এখন ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট নও। আর কাথিয়াওয়ার দেখা আগেই। আমাকে না জানিয়েই তো কচ্ছ প্ল্যান করে ফেলেছ। আবার তো আজমির-পুষ্কর যাবে ওখান থেকেই।  ওটুকুতেই থাকো। এর বেশি ঝামেলা কর না।` সুতরাং কী আর করা!



কার্পাস খেত 

সবাই বলছিল আহমেদাবাদ থেকে ট্রেনে ভুজ যেতে। সাধারণত সেটাই করে সবাই। কিন্তু আমার ভাবনা উল্টো। ট্রেন চলবে রাতে। পৌঁছবে ভোরে। ফ্লাইট নেওয়া যেত। আহমেদাবাদ থেকে ভুজ। কিন্তু রাতে রাস্তার কী দেখব অন্ধকারে? আর আকাশে থাকলে তো আরও একঘেয়ে ব্যাপার। তাই যায় পয়সা যাক। একটু ধকল হবে, হোক। রাস্তা ধরে চলো দেখতে দেখতে চারধার। 

সেই চলাই চলছি এখন। কলকাতা থেকে আহমেদাবাদ নেমেছি সকাল সাড়ে আটটায়। এয়ারপোর্টে ইকবাল অপেক্ষা করছিল। ওর নিজের ভাষায় `খাতে-পিতে চেহারা`। চটজলদি গাড়িতে উঠে রওনা দিলেও, বিচ্ছিরি জ্যামে ঘন্টা দেড়েক গন উইথ দা উইন্ড। তাতে আমার খারাপ লাগেনি। কিন্তু ইকবালের হা-হুতাশ বাড়ছিল। আসলে গতকাল সারাদিন গাড়ি চালিয়ে আহমেদাবাদ পৌঁছে, বেচারা বন্ধুর বাড়িতে রাত কাটিয়েছে। আজ আবার দীর্ঘ পথ। যতই `স্নেহময়` হোক, শরীর তো। বুঝতে পারছিলাম। তবে কচ্ছের মানুষ। পরিশ্রম এদের প্রতি পদক্ষেপে। ভরসা সেটাই। 


খাতে পিতে ইকবাল আর আদানি 

কচ্ছের আইডিয়া রীনা দিয়েছিল। `আজমিরের কাছাকাছি আর কোথায় কী আছে ভেবে দেখো` বলায় ম্যাপ খুলেছিলাম। আজমির যেতে হবে বিশেষ দরকারে। আগেও গিয়েছি বেশ কয়েকবার। এমনিতে রাজস্থান তো দেখা। অতএব অন্য কী ভাবতে ভাবতেই, কচ্ছ ঝিলিক দিয়েছিল। মনে পড়েছিল সেই ব্যারিটোন গলায় `কচ্ছ নেহি দেখা তো কুছ নেহি দেখা`। তাহলে তো `কুছ` দেখতেই হচ্ছে কচ্ছে গিয়ে। কিন্তু আজমির? হবে। কচ্ছের জেলা সদর ভুজ থেকে আজমিরে ট্রেনে আসা বা যাওয়া যাবে। ভুজ-আহমেদাবাদ-জয়পুর ফ্লাইটও নেওয়া যাবে। জয়পুর থেকে আজমির ১২০ কিমির মামলা। যদিও ফ্লাইটে লে-ওভার বিরাট। অগতির গতি রাস্তা তো আছেই। প্রায় আটশো কিমি। একান্ত দরকারে সেটাও ধরা যাবে। 


আহমেদাবাদ এয়ারপোর্ট

এসব ভাবতে ভাবতেই ভুজ-বেরিলি ট্রেনে টিকিট প্রায় শেষ যখন, তখন আজমিরের রিজার্ভেশন করা গেল। ভুজ থেকে। তার মানে, আগে কচ্ছ তারপর আজমির। সেই অতীতের মতো। পশ্চিম থেকে তখনকার ব্যবসায়ীরা কচ্ছের `রণ` পেরিয়ে থর মরুভূমিতে ঢুকে রাজস্থান হয়ে পূবে যেত। আর পূব থেকে পুণ্যার্থীরা মরুভূমি-লবন মরুভূমি হয়ে পৌঁছতে মরুতীর্থ হিংলাজে। অত্যন্ত প্রাচীন এই অঞ্চল। প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে অপূর্ব বৈচিত্রময়। মন নেচে উঠেছিল তখনই। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। এখনও সেটা শেষ হয়নি। 


আহমেদাবাদ এয়ারপোর্ট

গাড়ি চলছে দ্রুত। সামনে এক বিরাট ব্রিজ। দীর্ঘ অঞ্চল জুড়ে জলাশয়। `স্যারজী, ব্রিজকে উসপার কচ্ছ ডিস্ট্রিক্ট। হামলোগ কচ্ছ মে ঘুস রহে যায়।` কিন্তু ভুজ তো এখনও অনেকটা পথ। এখনই জেলা শুরু? `হোগা না, কচ্ছ তো বহুত বড়া হ্যায়।` বিদ্যুৎ চমকের মতো মনে পড়ে গেল, ঠিকই তো। কচ্ছ তো সত্যিই বড়। শুধু বড় নয়। ভারতের সবচেয়ে বড় এই জেলা হরিয়ানা ও কেরালার মতো রাজ্যের চাইতেও আকারে বড়। এমনকি উত্তর ইউরোপের এস্টোনিয়ার মতো দেশও কচ্ছের চাইতে ছোট। কচ্ছের আয়তন ৪৫,৬৭৪ বর্গকিমি। দশটি তালুক ও ছয়টি পৌরসভার কচ্ছে গ্রামের সংখ্যা ৯৩৯। প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকেই কচ্ছের অস্তিত্ব ইতিহাসে জ্বলজ্বল করছে। 




কিন্তু কচ্ছ কথাটির অর্থ কী? কেনই বা এরকম নাম? কোথায় বা সেটি?

 

(চলবে)




কচ্ছের পথে 



আগে আসি অবস্থানে। ভারতের পশ্চিমে গুজরাট রাজ্যে কচ্ছের অবস্থান। অঞ্চলটির উত্তরে রাজস্থান ও পাকিস্তানের কিছুটা অংশ। পূর্বেও রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশ। আর পশ্চিম ও দক্ষিণে সমুদ্র। কচ্ছ বলতে বোঝায় এমন একটি এলাকা যা মাঝে মাঝে সহজেই জলে ডুবে যায় আবার শুকিয়েও যায়। ভৌগোলিক চরতীরের দিক থেকে এই এলাকাটি কচ্ছপের মতো। `অমরকোষ`-এর `ভাষ্য সঞ্জীবনী`তে এরকমটিই বলেছেন মল্লিনাথি। 



লবন তৈরি হবে। তার আগে আমি ও রীনা 




পুরাণেও এই নামটির উল্লেখ রয়েছে। পাথর ও তামার ওপর খোদাই থেকেও `কচ্ছ` শব্দটিই পাচ্ছি। বিদেশী ভূপর্যটকরাও `কচ্ছ` উল্লেখ করেছেন তাঁদের বর্ণনায়। তবে মহাভারতে বর্তমান পাকিস্তানের সিন্দ ও সৌরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী এই অঞ্চলটি কিন্তু `আভির` নামে পরিচিত। প্রামাণ্য ইতিহাস বলছে কচ্ছ শাসন করেছেন শক, ক্ষত্রপ, গুপ্ত ইত্যাদি বংশের রাজারা। পরবর্তীতে মৈত্রক, গুর্জর, চালুক্য, চভদাস, সোলাঙ্কি, কাথি প্রমুখরা কচ্ছের দখল নিয়েছিলেন।  আলেকজান্ডারের আমলেও এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন প্রথম মিনান্দার। তবে সেটা বেশিদিনের জন্য নয়। তবে এটি প্রমাণ করে যে, জিশুর জন্মের আগে থেকেও কচ্ছ নিয়ে রীতিমত লড়াই চলত রাজায় রাজায়। 


গুজরাটি থালি 

হাতবদল হতে হতে দীর্ঘ তিনশো বছর কচ্ছ ছিল জাদেজাদের তিনটি বংশের অধীনে ছিল। ষষ্ঠদশ শতকে এঁদেরই বংশের প্রথম রাও খেঙগারজি ও তাঁর বংশধরেরা  দুশো বছর রাজত্ব করেছিলেন। গুজরাট রাজ্ ও মুঘলদের সঙ্গে এঁদের বেশ ভাল সম্পর্ক ছিল। ফলে কোনও অসুবিধে হয়নি রাজ্য চালাতে। পরবর্তীতে ওই বংশেরই  প্রথম প্রাগমলজি দায়িত্ব নেন। তাঁরই বংশধরেরা আজও কচ্ছের রাজা বলে পরিচিত। তবে ১৮১৯ সালে কচ্ছ চলে যায় ব্রিটিশদের হাতে। সেই বছরই বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় কচ্ছের। সে ধাক্কা সামলে নিয়ে কচ্ছ ধীরে ধীরে ব্যবসায় প্রভূত উন্নতি করে ক্রমে। স্বাধীনতার পর ১৯৪৭ সালে ভারতভুক্তি হয় কচ্ছের। ১৯৫০ সালে আলাদা রাজ্য হিসেবে ঘোষিত হলেও ১৯৫৬ সালে কচ্ছকে জুড়ে দেওয়া হয় তদানীন্তন বম্বে প্রদেশের সঙ্গে। কিন্তু ১৯৬০ সালে ভাষার ভিত্তিতে যখন মহারাষ্ট্র ও গুজরাট নাম দুটি রাজ্যের সৃষ্টি হয়, তখন কচ্ছকে জেলা হিসেবে নিয়ে আসা হয় গুজরাটের সঙ্গে।   



লবণের স্তুপে 

ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা কচ্ছ। ১৮১৯ সালের প্রবল ভূমিকম্প এই এলাকার ভূগোল পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। ১৯৫৬ সালেও কেঁপে উঠেছিল কচ্ছ। ১৯৯৮ সালের সাইক্লোনের ধাক্কা সামলাতে না সামলাতে ২০০১ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসের ভূমিকম্প সারা দেশকেই স্তম্ভিত করেছিল। কচ্ছের জেলা সদর ভুজে তাই দোতলার বেশি উঁচু বাড়ি তৈরির অনুমতি নেই। যেগুলি আছে সেগুলির নির্মাণ ২০০১-এর আগে। ভূমিকম্পের পর এই দীর্ঘ এলাকা প্রায় নতুন করেই তৈরি হয়েছে বা হচ্ছে। 







গ্রামগুলিতে কচ্ছি ঘরানার পাতা ছাওয়া গোল বাড়ি, মাণ্ডবী, আনজার, রাপার, গান্ধীধাম ইত্যাদি শহরে আধুনিক বাড়ি, ঘাসের বিস্তীর্ণ ফাঁকা বান্নি এলাকা এবং সাদা রণ নিয়ে কচ্ছ এক অদ্ভুত এলাকা। কখনও মনে হয় সময় এখানে থমকে আছে। কখনও মনে হয় অজানা কোনও দেশে চলে এসেছি। সারাদিন পর সন্ধ্যায় যখন ভুজে ঢুকছি তখন কেমন গা ছমছম করছিল। মনে হচ্ছিল, অভিশপ্ত শহর এটি। ভূমিকম্পে কত লোক যে এখানে মারা গেছেন বিভিন্ন সময়ে তার ইয়ত্তা নেই। প্রশ্ন জাগছিল মনে, তাঁদের অতৃপ্ত আত্মারা কি আজও ঘুরে বেড়ান ভুজ সহ সম্পূর্ণ কচ্ছে? যে রকম `বিরান` এলাকা দেখছি কচ্ছ জেলায় প্রবেশের পর থেকেই, তাতে সেরকম হলে অবাক হবে না। জনঘনত্বের দিক থেকে দেশের দ্বিতীয় এই বঙ্গে থেকে এরকম ফাঁকা এলাকা কল্পনাও করা যায় না।




ভুজের রাস্তায় 
   

তবে ভুজ কিন্তু আদৌ অভিশপ্ত নয়। বরং বিরুদ্ধ প্রকৃতির সঙ্গে মানবের প্রতিনিয়ত লড়াইয়ের প্রেরণা এই শহর। প্রকৃতি এখানে বারবার নির্দয় প্রহার করেছে। আর বারবারই এই শহর নিজের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। পুরান অনুসারে এই শহর শাসন করতেন নাগ সম্প্রদায়ের রাজারা। তাদের শেষ রাজা ভুজঙ্গের বিরুদ্ধে ভেরিয়া কুমার যুদ্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু হেরে যান। 



বর্তমান ভুজের সুপ্রসিদ্ধ মিষ্টির দোকান 

তাঁর রানি সাগাই সহমরণে সতী হন। ভুজিয়া পাহাড়ে থাকতেন তারা। পাহাড়ের পাদদেশ পরিচিত ছিল ভুজ নামে। সেই বিষম যুদ্ধের পর ভুজঙ্গ হয়ে ওঠেন ওই এলাকার পূজনীয় দেবতা। আধুনিক ভুজ গড়ে ওঠে ১৫১০ সালে রাও হামিরের হাত ধরে। ১৫৪৯ সালে প্রথম রাও খেঙগারজি ভুজকে কচ্ছের রাজধানী ঘোষণা করেন। ১৫৯০ সালে মুঘলরা আধিপত্য বিস্তার করলে মুসলিমদের মধ্যে শহর সুলেইমান নগর হিসেবে পরিচিত হয়। ১৭২৩-এ শহরের চারদিকে প্রাচীর তোলা হয়।  






নির্মিত হয় ভুজিয়া ফোর্ট। সেই ফোর্ট সহ পুরো এলাকা ব্রিটিশদের দখলে আসে ১৮১৯ সালে। ১৯৫৬ ও ২০০১ সালের প্রবল ভূমিকম্প ভুজকে সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত করেছিল। কিন্তু প্রকৃতির সেই রুদ্র রোষ কাটিয়ে ভুজ আজও অনবদ্য। নতুন যুগের সূচনা হয়েছে যেন এখানে। পুরোনো ভুজের চিহ্ন ইতস্তত ছড়িয়ে থাকলেও চারদিকে নবীনের হাতছানি। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এখানে দোতলার বেশি উঁচু বাড়ি আর তৈরি হয় না। যেগুলি আছে সেগুলি ২০০১-এর আগের। জনবসতি এলাকায় একই ধরণের বাড়ি দেখে সরকারি বা বেসরকারি কোনও কলোনি বলে ভুল হতে পারে। 


স্মৃতি স্মারক 


যে সব  সুপারমার্কেট আছে, সেগুলিতে প্রবল ভিড়। সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে গড়ে ওঠা আদানিদের হাসপাতাল দেখলাম। ভুজ পৌঁছতে রাস্তায় এই শিল্পগোষ্ঠীর সিএনজিও পাম্প দেখেছি। নতুন করে যে অঞ্চলগুলি এখনও গড়ে উঠছে সেগুলিতে বিত্তের সুস্পষ্ট ছাপ। অতীতে ভুজ ছিল ৩৫ ফুট উঁচু প্রাচীর ও টাওয়ারে ঘেরা। একান্নটি বন্দুক নিয়ে অতন্দ্র পাহারায় শহরকে রক্ষা করত রক্ষীরা। সেসব আজ স্মৃতি হলেও, তার চিহ্ন রয়েছে। এমনিতেও ভুজ ভারতীয় বিমানবাহিনীর ব্যস্ততম ও বৃহত্তম এয়ার বেস। ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে ভুজের অবদান কমবেশি সকলেই জানি। বলিউড ফিল্মও তৈরি করেছে সে ঘটনা নিয়ে। 



ভুজে আমাদের হোটেল 










স্মৃতিভান আর্থকোয়েক মিউজিয়াম ছিল ভুজে আমাদের প্রথম দ্রষ্টব্য। ভুজিয়া পাহাড়ে যেখানে কেল্লা রয়েছে, যেখানে ৩ লাখের ওপরে বৃক্ষ সৃষ্টি করেছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মিয়াওয়াকি অরণ্য, সেখানেই গড়ে উঠেছে আধুনিক ভারতের সবচেয়ে বড় স্মৃতিসৌধ ও মিউজিয়াম। ২০২২ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধন করা এই মিউজিয়ামটি এই মুহূর্তে ভুজের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। মোট সাতটি ভাগে বা তলে ভাগ করা হয়েছে সৌধটিকে- Rebirth, Rediscover, Restore, Rebuild, Rethink, Relive, Renew
পৃথিবীর বিবর্তন থেকে কচ্ছের সৃষ্টি, তার ইতিহাস ও ভৌগোলিক অবস্থান, জনজীবন, আদিবাসী, ভূমিকম্প বিধ্বস্ত কচ্ছ, ক্ষয়ক্ষতি, পুনরুদ্ধার, ভূমিকম্পের প্রাবল্য অনুভব করা এবং মৃতদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন ইত্যাদি সব কিছু মিলিয়ে এই মিউজিয়াম সত্যিই অনবদ্য। তুলনাহীন। মোট ৪৭০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা মিজিয়ামটি অতি অবশ্যই এক স্থাপত্য বিস্ময়। প্রকৃতির সঙ্গে আধুনিকতার অদ্ভুত মিশ্রণে তৈরি করা হয়েছে এটি। ১.১ মেগাওয়াটের সোলার প্ল্যান্ট আলো দিচ্ছে এখানে। রয়েছে ৫০টি চেক-ড্যাম রিজার্ভার। সেগুলি এই এলাকার জলের স্তর ও অরণ্যভূমিকে সঠিক রাখতে সাহায্য করছে অনবরত। এক কথায় `সাস্টেইনেবল ডেভলপমেন্টের` এক অসামান্য নিদর্শন এটি। ইতিমধ্যেই ইউনেস্কোর প্রশংসা কুড়িয়েছে মিউজিয়াম। এটি না দেখলে ভুজ সহ কচ্ছ অধরাই রয়ে যাবে। মিউজিয়ামের প্রতিটি তলে নিজস্ব গাইড রয়েছে। ছোট ছোট গ্ৰুপে পর্যটকদের প্রবেশ করাচ্ছেন তারা। ব্যাখ্যা করছেন সবকিছু। রিখটার স্কেলে ৭-এর ওপর উঠলে ভূমিকম্পের ঝটকা ও ক্ষয়ক্ষতি কীরকম হতে পারে সেটি চাক্ষুস বোঝার পর, ভূমিকম্পে নিহতদের জন্য শ্রদ্ধা জানানোর ব্যাপারটি মন থেকেই এসে যায়। শ্রদ্ধায় মাথা নত হয় সেই সাৰ মানুষদের জন্য যাঁরা চলে গেছেন আর যাঁরা প্রবল অভিঘাত আর ধংসলীলা সহ্য করেও ভুজকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন নিত্যদিন।     



















স্মৃতিভান আর্থকোয়েক মিউজিয়াম যদি হয় আধুনিক স্থাপত্য ও কারিগরির এক চূড়ান্ত উদাহরণ, তবে কচ্ছ মিউজিয়ামের গায়ে  ঐতিহ্য ও বনেদিয়ানার ছাপ। ১৮৭৭ সালে মহারাও খেঙগারজি প্রতিষ্ঠিত এই মিজিয়ামটি গুজরাটের সর্ব প্রাচীন। অতীতে ফার্গুসন মিউজিয়াম নামেও পরিচিত ছিল হামিসার লেকের ধারের সুদৃশ্য এই জাদুঘর। ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, কচ্ছ ভ্রমণের আগেই যদি এই মিউজিয়ামটি দেখে নেওয়া উচিত। আসলে কচ্ছ এক বৈচিত্রময় এলাকা। বহু ধরণের মানুষের বাস এখানে। এখানকার হস্তশিল্পও বৈচিত্রে ভরা। তাই কচ্ছের সাধারণ মানুষ ও তাদের জীবনযাত্রার কিছুটা বুঝতে হলেও মিউজিয়ামের সাহায্য নিতেই হয়। প্রথম শতকের ক্ষত্রপ লিপির সবচেয়ে বড় ভান্ডার এটি। অতীতের কচ্ছি লেখারও দেখা মেলে এখানে। আজকাল অবশ্য গুজরাটি হরফে কচ্ছি লেখাই রেওয়াজ। কচ্ছের আদিবাসীদের জীবন, তাদের শিল্পের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে মিউজিয়ামে। দেখা যায় বাঁধনি, এপ্লিক, মুশরু, এম্ব্রয়ডায়েরি সহ নানা ধরণের শিল্প নিদর্শন। কচ্ছের প্রাচীন মুদ্রা `কড়ি` ও অন্যান্য মুদ্রার সম্ভারও ব্যাপক। কচ্ছের ঘোড়ার বদলে টিপু সুলতানের দেওয়া কামানটিও দুর্দান্ত। ইতালিয়ান গথিক স্টাইলে নির্মিত দ্বিতল এই মিউজিয়ামের নির্মাণ খরচ পড়ছিল সেই আমলে ৩২ হাজার টাকা। ১৮৮৪ তে নতুন ভবনের কাজ শুরু হয়। তখন বোম্বে প্রদেশের গভর্নর ছিলেন জেমস ফার্গুসন। ফলে ইংরেজ আমলে কচ্ছ মিউজিয়াম তাঁর নামেই পরিচিতি পায়। স্বাধীনতার পর বর্তমান নাম দেওয়া হয় সমৃদ্ধ এই মিউজিয়ামের। 







হামিসার লেকের অন্য ধারে প্রাগ মহল আর আয়না মহল দেখে তাক লেগে গেল। দ্বিতীয় প্রাগমলজির নামাঙ্কিত প্রাগ মহল দেখলে মনে হয় ইউরোপে আছি। ইতালিয়ান গথিক রীতির বিরাট মহলটির নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৮৬৫ সালে। শেষ হয় ১৮৭৯তে। দ্বিতীয় প্রাগমলজির পুত্র তৃতীয় খেঙরাজির আমলে। আজকাল অবশ্য ইতালিয়ান রীতির বদলে রোমান ঘরানার কথা বলা হচ্ছে এই বিরাট মহলটির নির্মাণ শৈলীতে। তবে কর্নেল হেনরি সেন্ট উইলকিনসের নকশা ও তত্বাবধানে ইতালিয়ান শিল্পীদের মহল তৈরির কাজের ব্যাপারে কোনও দ্বিমত নেই। তাদের মজুরি হিসেবে দেওয়া হত স্বর্ণমুদ্রা। ১৮৭৫ সালে দ্বিতীয় প্রাগমলজির মৃত্যুর পর অবশ্য স্থানীয় কচ্ছি মিস্ত্রিরা উইলকিনসের নির্দেশেই কাজ করেছেন। যাহোক এই মহল তৈরির খরচ ছিল ৩১ লক্ষ টাকা। প্রাগ মহলের ৪৫ মিটার বেল-টাওয়ারটি অনবদ্য। ভুজ শহর দৃশ্যমান এখান থেকে। দরবার হল থেকে শুরু করে অন্যান্য যে ঘরগুলি প্রদর্শিত তার সব কয়টিই বিত্ত ও বৈভবের পরিচয় দেয়। আমাকে অবশ্য বেশি আকৃষ্ট করল দরবার হলের কোরিন্থিয়ান পিলারগুলি। রাজস্থানের বালিপাথর আর ইতালিয়ান মার্বেলের এরকম ব্যবহার ভারতের আর কোথাও দেখেছি বলে মনে হল না। উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে ২০০১-এর প্রবল ভূমিকম্পে প্রাসাদটির যথেষ্ট ক্ষতি হয়। ২০০৬ সালে চোরেরা নিয়ে যায় বহু মূল্যবান জিনিসপত্র। ক্ষতি করে অন্দরমহলের। ২০০৭ সালে প্রায় পরিত্যক্ত হয় প্রাগ মহল। অমিতাভ বচ্চনের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ক্লিক-টাওয়ারের পুনর্নির্মাণ এবং তৃতীয় মহারাও প্রাগমলজির অনুদান কিছুটা হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনে প্রাগ মহলের। `হাম দিল দে চুকে সনম`, `লাগান` ইত্যাদি বলিউডি ছবিও প্রাগ মহলকে ধীরে ধীরে পরিচিত করে বৃহত্তর ভারতে। সাধারণ মানুষদের জন্য খুলে দেওয়া হয় বেশ কিছু অংশ। তাদেরই একজন হয়ে প্রাসাদের ভেতরে থাকা স্টাফ করা পশু, মার্বেল পাথরের অপূর্ব মূর্তি, সুদৃশ্য ঝাড়বাতি, ছাগলে টানা শিশু প্রাগমলজির গাড়ি, অস্ত্রশস্ত্র, দৈনন্দিন ব্যবহার্য পোর্সেলিনের বাসনপত্র ইত্যাদি নানা কিছু দেখা গেল। 












প্রাগ মহল লাগোয়া আয়না মহলও অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ভূমিকম্পে। ১৭৬১ সালে রাও লাখপতজি এই ঐতিহাসিক প্রাসাদের নির্মাণ করিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ইউরোপে থাকা রাম সিং মলম নকশা করেছিলেন এটির। অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে,  স্থানীয় কচ্ছি মিস্ত্রিদের নিয়ে, মার্বেলের দেওয়াল ব্রোঞ্জ আর কাঁচে সাজিয়ে এক অসামান্য নির্মাণ উপহার দিয়েছিলেন তিনি। দুটি তল এই মহলটির। প্রথম তলায় রয়েছে   Audience Hall, the Pleasure Hall, the Hall of Mirrors and the State Apartments এবং দ্বিতীয় তল ante-chamber, Darbar (Court) Hall and Marriage Hall সমৃদ্ধ। আজকের আয়না মহল অবশ্য সুদৃশ্য মিউজিয়াম। দেখা যায় বিভিন্ন ধরণের ঘড়ি, খেলনা, শিল্পকর্ম, ছবি, পালকি ইত্যাদি। সোনার তৈরি নিচু পায়ার খাটটি বিস্ময়ের। জানা গেল, রাও লাখপতজি তাঁর ব্যবহৃত খাট এক বছর পর নিলামে তুলতেন। তৈরি হত নতুন খাট। সম্পূর্ণ মিউজিয়ামে কচ্ছি শিল্প-সংস্কৃতি ছড়িয়ে রয়েছে। কচ্ছে মুঘলদের আধিপত্য, সিল্কের শাড়ি, উইলিয়াম হোগার্টের ম্যুরাল ইত্যাদি সব কিছু মিলিয়ে এই প্রাসাদটিও অসামান্য। ভারতের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে এবং নানা মহল দেখে একটা জিনিস বুঝেছি যে, এই দেশের  রাজাবাহাদুরদের সম্পদের অভাব ছিল না। সঙ্গে যোগ হয়েছিল রুচি ও শিল্পকলার প্রতি অনুরাগ। ফলে আয়না মহলের মতো এক একটি বিস্ময় তৈরি হয়েছে দেশের বহু জায়গায়। কিছু অবশ্য কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে একেবারেই। যেগুলি অবশিষ্ট রয়েছে সেগুলি যদি সঠিকভাবে রাখা যায়, তবে লাভ আমাদেরই। পাশাপাশি নিজেদের পুরোনো গৌরব ভবিষ্যতের জন্য গুছিয়ে রাখাটাও প্রতিটি প্রজন্মের কর্তব্য। ভূমিকম্পের অভিঘাত সহ্য করেও আয়না মহল সেটি করছে বলে ভাল লাগল। 





পাহাড়ের ওপর ভুজঙ্গ মন্দির, স্বামীনারায়ণ মন্দির, মাধাপারের কাছে এয়ার ফোর্সের রেপ্লিকা ইত্যাদি আরও কিছু দর্শনীয় স্থান আছে ভুজে। এখানকার স্বামীনারায়ণ মন্দিরটি স্বামীজি জীবিত থাকাকালীন নির্মিত বলে তার একটু আলাদা মর্যাদা আছে সবসময়। তবে গান্ধিনগর, দিল্লি ইত্যাদি জায়গার স্বামীনারায়ণ মন্দির দেখেছি বলে খুব কিছু আলাদা মনে হল না। কিন্তু নতুন ভুজ সত্যিই সুন্দর। বিরুদ্ধ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ে বারবার মানুষের বিজয়গাথাই যেন বলে চলেছে সে।  



ভুজ থেকে দক্ষিণে চলেছি। পশ্চিম ঘেঁষে। কচ্ছের সমুদ্র শহর মাণ্ডবীতে। মূলত আরব সাগর। আরও একটু পূর্বে সেই জলই গাল্ফ অফ কচ্ছ। কিন্তু মাণ্ডবী থেকে ওখা সমুদ্রপথে মাত্র ৫০ কিমি দূরে। সড়কপথে দূরত্ব কিন্তু ৪৭২ কিমি। ওখা উল্লেখ করলাম এই জন্যই যে, ওখা থেকে মাত্র ৩০ কিমি দূরেই দ্বারকা। তাই কচ্ছ সহ গোটা গুজরাট বেড়াতে হলে হাতে যথেষ্ট সময় রাখতে হবে। কেননা মাণ্ডবী থেকে দ্বারকা ও ওখা যেতে কিন্তু সড়কপথই ভরসা। 


মাণ্ডবী সম্পর্কে আমার আগ্রহ ছিল অন্য একটি কারণে। ইতিহাসের শহর এটি। এই জনপদের নাম এসেছে মাণ্ডব্য ঋষির নাম থেকে। তবে আধুনিক শহর তৈরি হয়েছে ১৫৮০ নাগাদ প্রথম খেনগারজির হাতে। কিন্তু তার আগেও মাণ্ডবী ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে অন্য আর একটি ব্যাপারে। বলা হয়, ১৪৯৭ সালে ভাস্কো-ডা-গামা যখন ইউরোপ থেকে ভারতে আসেন, তখন আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের মালিন্দি থেকে কালিকট অবধি তাঁকে পথ দেখিয়ে এনেছিলেন এক ভারতীয়। ঐতিহাসিকরা কেউ তাঁকে হিন্দু ধর্মাবলম্বী বলেছেন। কারও মতে তিনি ছিলেন খ্রীষ্টান। কাঞ্জি মলাম নামে সেই ব্যক্তি কিন্তু ইতিহাসে উপেক্ষিত থেকে গেছেন। এই কাঞ্জি মলাম ছিলেন মাণ্ডবীর বাসিন্দা। কচ্ছের ধানেটি থেকে ১৫ ও ১৬ শতকে গোহিল, ভাট্টি, জাদেজা, রাঠোর, সোলাঙ্কি, জেঠওয়া প্রমুখ সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ীরা মাণ্ডবীতে বসতি স্থাপন করেছিলেন। সম্মিলিতভাবে চারশ জাহাজের নৌবহর নিয়ে তারা ব্যবসা শুরু করেন পূর্ব আফ্রিকা, মালাবার, পার্সিয়ান গালফ অঞ্চলে। 








তখন থেকেই এখানে চলছে জাহাজ নির্মাণ। আজ পরিমাণে কম হলেও জাহাজ তৈরি দেখা যায় মাণ্ডবীতে। রুক্মাবতি নদীর তীরে এই জাহাজ বানানো দেখা এক নতুন অভিজ্ঞতা হল। আধুনিক জাহাজ নয়। চিরাচরিত জাহাজ। কাঠ আসছে মালয়েশিয়া থেকে। জাহাজের খোল বানাচ্ছে মিস্ত্রিরা। এক ঠিকেদারের সঙ্গে কথা হল। তিনি জানালেন, মূল অর্ডার আসে গালফ থেকে। তবে দেশ থেকেও কম নয়। একটি জাহাজ তৈরি করতে বছর চার-পাঁচ লেগে যায়। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলাম কাঠ আর হাতুড়ির ঠোকাঠুকি। আর আমার বিস্ময় দেখে আমাকে দেখতে লাগল জাহাজ তৈরির কারিগররা। 




























মাণ্ডবীর অন্যতম আকর্ষণ এখানকার বিজয়বিলাস প্যালেস। ১৯২০ সালে শুরু হয়ে ১৯২৯-এ এই বিরাট সুদৃশ্য প্রাসাদটির নির্মাণ শেষ হয়। কৃতিত্ব মহারাও তৃতীয় খেনগারজির। মূলত তাঁর নিজের ও উত্তরাধিকারীদের `সামার প্যালেস` হিসেবে ৪৫০ একর জমি জুড়ে নির্মিত এই ভবনটি শেষ অবধি যুবরাজ বিজয়রাজজির নামে পরিচিত হয়। কচ্ছের রাজপরিবার এখন এখানেই থাকেন। একটি অংশ সাধারণদের জন্য উন্মুক্ত। ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে অমিতাভ বচ্চনের `কচ্ছ নেহি দেখা তো কুছ নেহি দেখা` এবং `হ্যাম দিল দে চুকে সনম`-এর বেশ কিছু অংশ চিত্রায়িত হয়েছে এখানেই। হবে না-ই বা কেন! লাল বেলে পাথরের এরকম নির্মাণ খুব কম চোখে পড়ে। জালি, ঝরোকা, ছত্রি, ম্যুরাল, রঙিন কাঁচের জানালা সব মিলিয়ে একদম হৈ হৈ কাণ্ড। ভবনের নির্মাণে মিস্ত্রিরা এসেছিল বাংলা, রাজস্থান, সৌরাষ্ট্র থেকে। স্থানীয় কচ্ছি মিস্ত্রিরা তো ছিলেনই। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের শিল্পের ছাপ বিজয়বিলাস প্যালেসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বিরাট বাগানের মাঝে, সমুদ্রের ধারে অবস্থিত হওয়ায় ফুরফুরে হাওয়া মন-প্রাণ শান্ত করে দেয় এখানে। প্যালেসের ভেতরের ঘরগুলিতে যথারীতি বিত্ত ও বৈভবের নানা নিদর্শন প্রদর্শিত। ছাদের ঝরোকায় বসে চারদিকের দৃশ্য দেখতে দেখতে নিজেকেই রাজা-গজা মনে হচ্ছিল। 












আগেই দেখে নিয়েছিলাম জৈনালয়া। বাহাত্তরটি জৈন মন্দিরের মূল মন্দিরটি মহাবীরের উদ্দেশ্যে। আর তাকে ঘিরেই সাদা মার্বেল পাথরের এই বিস্ময়। গুণ সাগর সুরিসওয়ারজী মাহারার স্মৃতিতে ১৯৮২ সালে নির্মিত হয় মাণ্ডবী শহরের ১০ কিমি আগে এই মন্দিরগুলি। নির্মাণ আজও চলছে। আশি একর জমির ওপর অবস্থিত এই মন্দির কমপ্লেক্সে রয়েছে থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্তও। অষ্টভুজাকার মন্দিরগুলির গায়ের শিল্পকর্ম দেখলে তাক লেগে যায়। সুদৃশ্য থাম, উঁচু চূড়ো, আদিশ্বর ভগবানের ৬ ফিট উচ্চতার মূর্তি ইত্যাদি সব কিছু মিলিয়ে পুণ্যার্থীদের ভাল লাগেই। আর একটা বিষয় হল, গুজরাটের পালিতানা, জুনাগড় কিংবা কর্ণাটকের শ্রাবনবেলগোলার মতো এখানে দীর্ঘ পথ ও সিঁড়ি ভাঙবার প্রয়োজন হয় না। তবে মন্দিরগুলি খুঁটিয়ে দেখতে সময় লাগে কিছুটা। সাদা মার্বেলের কাজ মনে করায় রাজস্থানের মাউন্ট আবুর দিলওয়ারা মন্দিরকে।     






















সম্প্রতি মাণ্ডবীর আর এক আকর্ষণ শ্যামজি কৃষ্ণ ভার্মা মেমোরিয়াল। স্বাধীনতা সংগ্রামী এই মানুষটির জীবনে নানা ওঠানামা। কচ্ছের এই মানুষটির পড়াশোনা অবশ্য মুম্বাইতে। দয়ানন্দ সরস্বতীর সংস্পৰ্শ তাঁকে বদলে দিয়েছিল। নাসিকে তীক্ষ্ন মেধাবী মানুষটির ভাষণে প্রোফেসর উইলিয়ামস চমৎকৃত হন। তাঁর পরামর্শে শেষ পর্যন্ত পাড়ি দেন বিলেতে। তাঁদের ছয় বছরের মিলিত প্রয়াসের ফসল হল ইংরেজি-সংস্কৃত অভিধান। অক্সফোর্ডে যোগ দিয়ে তিনি আইন পড়ে ব্যারিস্টার হয়েছিলেন। রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্যও হন। ভারতে ফিরে রতলাম, আজমির,  উদয়পুর, জুনাগড় ইত্যাদি করদ রাজ্যগুলি বিভিন্ন কাজে যুক্ত হন। ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে। কিন্তু দ্রুত মোহভঙ্গ হয় তাঁর। ফিরে যান বিলেতে। লন্ডনে তৈরি করেন `ইন্ডিয়া হাউস`। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর লড়াই। ফলে ব্রিটিশদের বিরাগভাজন হতে তাঁর সময় লাগেনি। শেষ জীবন কাটান জেনেভাতে। মেধাবী ছাত্রদের জন্য তাঁর অবদান আজও অনস্বীকার্য। তাঁর চিতাভস্ম রক্ষিত মেমোরিয়ালে। লন্ডনের ইন্ডিয়া হাউসের আদলে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিসৌধের একটি অংশে। আধুনিক স্থাপত্য এখানেও। মনকাড়া। সেই আমলের করদ রাজ্যগুলির মধ্যে কোচবিহারের নাম দেখে খুব ভাল লাগল। কিউরেটর সাহেবকে বললাম, আমরা কোচবিহার থেকে এসেছি। একটু বোধহয় খাতিরদারি বাড়ল তাতে। বাঙালি মানেই কলকাতা নয়, সেটাও কিছুটা বুঝলেন তাঁরা। 

বিকেল থেকে সন্ধে পর্যন্ত কাটালাম মাণ্ডবীর সমুদ্র সৈকতে। বহু দোকানপাট চারদিকে। চা থেকে শুরু করে কোনও কিছুর অভাব নেই। উট নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে অনেকে। চলছে বিকট আওয়াজের চার-পাঁচজন বসার যান। আরব সাগরের নীল জলে এখানে কিছু ওয়াটার স্পোর্টস আক্টিভিটি চলে। একদল ছাত্রের সঙ্গে দেখা হল। স্কুলের টিচারদের সঙ্গে তারা এসেছে। বিচের নরম বালিতে তাদের হুটোপুটি দারুণ লাগছিল। কিন্তু খানিক বাদেই যেভাবে জনবহুল সৈকতের মাঝে মৃতদেহ দাহ করা হল সেটা কল্পনাতেও আসেনি। সত্যি বলতে ভারতের বহু সৈকতে ঘুরেও কোনও দিন এরকম কাণ্ড দেখিনি। জানিনা মাণ্ডবী প্রশাসন কীভাবে এই জিনিস বরদাস্ত করছেন। এভাবে চললে সমুদ্র সৈকত পর্যটনের বাইরে চলে যাবে। যাহোক, পশ্চিমাকাশে সমুদ্রে সূর্যাস্ত দেখে উঠে পড়লাম বিচ থেকে। আসলে এখনও আন্দামানের স্মৃতি আমার মনে টাটকা। ফলে মাণ্ডবীর সমুদ্র খুব কিছু ভাল লাগল না।






 

সারাদিনের ধকল অবশ্য কেটে গেল নারেদিতে কয়লার উনুনে বানানো চা খেয়ে। সেই চা বানানো দেখাও বেশ মজাদার। আর এখানকার লোকেরা কাপে চুমুক দে কম। সবার হাতে ধরা থাকে প্লেট। সেই প্লেটেই চা ঢেলে দেওয়া হয়। সশব্দে চলে সেই খাওয়া। দুপুরে খেয়েছিলাম যে ধাবায় সেটিও দারুণ। আদেশ নামের ধাবাটি এক ঝলকেই ভাল লেগে গিয়েছিল। কচ্ছি শৈলীর বাড়ি আর বাড়ির গায়ে ছবি নিয়ে ধাবাটি বলে দিচ্ছিল আমরা সত্যিই বসে আছি ভারতের এক অদ্ভুত বৈচিত্রময় এলাকায়। 




আমার সামনে বসে আছেন আব্দুল গফ্ফার খতরি। প্রথমটায় বিশ্বাস হচ্ছিল না। পদ্মশ্রী পাওয়া একজন মানুষকে চোখের সামনে এভাবে দেখব, কথা বলব....তাও আবার কচ্ছে এসে....ভাবিনি কখনও। আর খতরি সাহেব তো যে সে মানুষ নন। রোগান চিত্রকলার একমাত্র ধারক ও বাহক। শিল্পী হিসেবে তিনি দেশে-বিদেশে বন্দিত। ভারত সফরে এলে তদানীন্তন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে তাঁর হস্তশিল্পই উপহার দেওয়া হয়েছিল।  ভারতের রাষ্ট্রপতি আব্দুল কালাম, প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী, শাহেনশা অমিতাভ বচ্চন থেকে শুরু করে বহু গুণীজনের সংস্পর্শে এসেছেন তিনি। পেয়েছেন বহু পুরস্কার। রোগান শিল্প নিয়ে  বিদেশেও গিয়েছেন কয়েকবার। তাঁর জন্য গর্বিত হয়েছে দেশ। এমন মানুষটি যখন শুনলেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছি আর শিক্ষকতার পাশাপাশি সামান্য লেখালেখি করি, অত্যন্ত খুশি হলেন। আমার ক্যামেরায় ফ্লেমিংগোর ছবি দেখে `আপ ভি তো কলাকার হ্যায়` বলে লজ্জাও দিলেন। 






কচ্ছের নিরোনা গ্রামে আমার জন্য এরকম `সারপ্রাইজ` অপেক্ষা করে আছে সেটা কিন্তু স্বপ্নেও ভাবিনি। যতদূর জানি, কচ্ছে মোট গ্রামের সংখ্যা ৯৩৯। কোনও কোনও গ্রাম দেখে মনে হতেই পারে সভ্যতা এখানে তার আশীর্বাদ রাখেনি। কিছু গ্রাম আবার আধা-শহর। কোনও কোনও গ্রাম পাঁচ/দশটি পরিবারেই শেষ। কিছু গ্রামে পরিবারের সংখ্যা সামান্য বেশি। কিন্তু তাদের মিল একটি বিষয়ে। প্রতিটি গ্রামই হাতের কাজে অনন্য। কিছু না কিছু তৈরি করছেন গ্রামবাসী। তাদের কাছে সেসব খুব সাধারণ হলেও, আমাদের শহুরে চোখে সেগুলি অসামান্য। নিরোনা শুধুমাত্র রোগান শিল্পের জন্য নয়, সে বিখ্যাত তামার ঘন্টা আর বার্নিশ করা কাঠের কাজের জন্যও। 





নিরোনার তামার ঘন্টা শিল্প কিন্তু হাজার বছরের পুরোনো। মূলত বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশের শিল্প এটি। ভারতে এখন কচ্ছ অঞ্চলে এই শিল্প দেখা যায়। শুধু নিরোনা নয়। গোটা কচ্ছ জুড়েই এই শিল্পের প্রচলন। নিরোনাতে মোট ১৩ ধরণের ঘন্টা নির্মিত হয়। ছাগলের মতো ছোট জানোয়ারের ক্ষেত্রে ছোট কিন্তু তীক্ষ্ন আওয়াজের ঘন্টা, আর গরু-মোষের মতো বড় প্রাণীর ক্ষেত্রে আকৃতিতে বড় আর আওয়াজে গম্ভীর ঘন্টার ব্যবহার বেশি। সাধারণত লোহার সম্প্রদায়ের হাতেই তৈরি হয় এই ঘন্টা। কচ্ছের বান্নি এলাকায় এই জাতীয় নোমাডিক জাতির মানুষদের ভিড়। গোবর্ধন পূজা, উটের দৌড়, পশুমেলা ইত্যাদি প্রমাণ করে, নোমাডিক হয়েও তাদের জীবনযাত্রা আজ `নন নোমাডিক`। তাই ঘন্টার ব্যবহার শুধুমাত্র পশুকে চিহ্নিত করবার জন্য নয়, কিছু সজ্জার জন্যও । 













      

ন্যাচারাল কালার দিয়ে কাঠের ওপর বার্ণিশের কাজের ক্ষেত্রেও নিরোনা অসামান্য। আশেপাশের বাবুল সহ বিভিন্ন গাছ থেকে সংগ্রহ করা প্রাকৃতিক রঙে, দক্ষ শিল্পীর হাতে সেজে ওঠে গৃহস্থালি নানা জিনিস। আসলে খুব ছোট ছোট যে আসবাব আমাদের নিত্যদিন প্রয়োজন, সেগুলিকেও সুন্দর করে তোলার মধ্যে একধরণের নান্দনিকতা রয়েছে। সেটা বোঝা যায় কচ্ছের গ্রামগুলি ঘুরে বেড়ালে। প্রতিটি বাড়ির বাইরের দেওয়াল নানারকম নকশায় সজ্জিত। ঘরের ভেতর উঁকি দিলে বিস্মিত হতে হয়। সব কিছুই সাজিয়ে রাখা হয়েছে অত্যন্ত যত্নে। সুরুচির ছাপ তাতে স্পষ্ট। দেওয়ালি সামনে বলে এমনিতেও ঘরদোর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। পাতা ছাওয়া গোল গোল ঘরগুলি দেখতে এমনিতেই ভাল লাগে। তার ওপর অদ্ভুত সুন্দর কাজ সেগুলিকে নয়নলোভন করেছে। 







এই দুই শিল্পের পাশাপাশি রোগান শিল্প নিরোনার সবচেয়ে বড় পরিচয়। আজকের রোগান পেইন্টিংকে পারসিয়ান শৈলীর মনে করা হলেও, মনে করা হয় এই শিল্পের জন্ম হয়েছিল অতীত পাটলিপুত্রে। সেখান থেকে বামিয়ান হয়ে আজকের গুজরাটে থিতু হয়েছে। যদিও তিন ধরণের রোগান আর্টের  (রোগান ছাপ, রোগান নির্মিকা ছাপ, রোগান ভার্নিকা  ছাপ) কিছু তামিলনাড়ু ও বিহারেও দেখা যায়। নিরোনা গ্রামের আব্দুল গফ্ফার খতরির পরিবার অবশ্য গুজরাটের তিনশো বছরের পুরোনো রোগান শিল্পের একমাত্র উত্তরাধিকারী। কীভাবে রোগান ছাপ কাপড়ের ওপর বসে সেটি ব্যাখ্যা করছিলেন সুমের খতরি। দেখাচ্ছিলেন একের পর এক শিল্পকর্ম। ক্যাস্টর ওয়েল এবং আহমেদাবাদ থেকে কিনে আনা বিশেষ ধরণের ভেজিটেবল পিগমেন্ট ব্যবহার করা হয় এই শিল্পকর্মের ক্ষেত্রে। যেহেতু হাতের কাজ, সুতরাং যে কোনও ধরণের কাজই যথেষ্ট মূল্যবান। মুগ্ধ হয়ে দেখলাম কীভাবে কাপড়ের ওপর ফুটে উঠছে নকশা। খতরি সাহেবের পরিচ্ছন্ন সুন্দর বাড়ি আর নম্র ব্যবহারে মোহিত হয়ে রইলাম অনেকক্ষণ। আজ অবশ্য আরও কয়েকটি পরিবার রোগান আর্ট প্র্যাকটিস করছে। কিন্তু পদ্মশ্রী পাওয়ার পর নিরোনা আর খতরি সাহেব যেন এক হয়ে গেছে। 




ভিরান্ডিয়ারার মাওয়া দিব্যি জমে গেল। সকালে ব্রেকফাস্ট করে বেরোলেও, আমাদের `খাতে পিতে চেহারা`র ড্রাইভার ইকবাল মাওয়া টেস্ট করাবেই। ওটা না খেলে নাকি জীবন বৃথা। খাবার ব্যাপারে আমি চিরদিন পিছিয়ে পড়া শ্রেণির। খুব কিছু আগ্রহ নেই। আমার দিদিমণির আছে। তবে ওই একটু চেখেই তার দৌড় শেষ হয়ে যায়। তবে চায়ের নেশা মারাত্মক। আমি `না চা'-এর দলে পুরোপুরি না হলেও, ব্যাকগ্রাউন্ড ড্যান্সার টাইপ। না হলেও সমস্যা নেই। তাই ছোট্ট ভিরান্ডিয়ারায় যখন ইকবাল আর দিদিমণির মাওয়া খাওয়া চলছে, আমি নিজের মতো এদিক ওদিক দেখছি। 





কী অদ্ভুত সব গ্রাম। পাতা ছাওয়া গোল গোল বাড়ি। বাড়ির দেওয়ালে দুরন্ত সব ছবি। হাতে আঁকা। কাঁটা জাতীয় গাছের ছায়ায় খাটিয়া রাখা। কিছু বাড়ি রাজোয়ারি ঘরানার। কিছুর নাম বুঙ্গা। বাড়ির পুরুষদের চেহারা দেখলেই বোঝা যায়, তারা প্রত্যেকেই যথেষ্ট বলশালী ও কর্মঠ। একটু বয়স্কদের গায়ে ধুতি আর পাঞ্জাবি। মুখে বিরাট গোঁফ আর মাথার পাগড়ি তাদের সম্মান আর প্রতিপত্তির চিহ্ন। মহিলাদের দুটি হাতই চুড়ি দিয়ে ঢাকা। নাকে বিরাট নথ। ঘোমটা দিয়ে ঢাকা মাথা। চোলি আর ঘাঘরা পরনে। বয়স্কা মহিলারা ছবি তুলতে দিলেও, তরুণী ও কিশোরীরা একদম রাজি নয়। পোড় খাওয়া মহিলারা অবশ্য অনেক সময় পয়সাও দাবি করেন ছবি তোলার বিনিময়ে।  








তবে এই সব গ্রামগুলিতেই হস্তশিল্পের কাজ চলছে। আজরক, ব্লক প্রিন্ট, বাঁধনি, আপ্লিক, মুশরু, এম্ব্রয়ডায়েরি ইত্যাদি নানা ধরণের কাজ চলে কচ্ছের গ্রামগুলিতে। রয়েছে ডোগরাও। মেঘওয়াল, ফোকরানি জাঠ, মুতওয়া, মারওয়ার, চরণ, আহির, ভাগদিয়া রাওড়ি, ভিল, কোলি ইত্যাদি নানা জাতির মানুষের বাস এইসব গ্রামগুলিতে। রয়েছে সামা, লোহারা, মহাজন, সোমরা ইত্যাদি সম্প্রদায়ের মানুষও। লুড়িয়া, গান্ধি নু গাঁ, মালদারি, খাওরা ইত্যাদি নানা গ্রাম দেখে মনে হচ্ছিল, সভ্যতা থমকে রয়েছে কচ্ছে। কেননা মাইলের পর মাইল জুড়ে ফাঁকা জমি। নিতান্তই রুক্ষ। গাছের চিহ্ন নেই সেকথা বলা যাবে না। কিন্তু জমি দেখেই বোঝা যায় সে জমি বানজারা। আর তাতেই কোথাও কোথাও বাসা বেঁধেছে পশুপালকরা। দেখেই মনে হল, কোনও মতে দিন গুজরান তাদের। তবে ইকবাল জোর গলায় জানালো, এদের প্রত্যেকের মূল ব্যবসা হল দুধ সরবরাহ করা। লক্ষ্য করে দেখলাম প্রত্যেকের হয় মোটর সাইকেল অথবা ভ্যান জাতীয় গাড়ি রয়েছে। ইকবালের কথা অনুযায়ী, এরা এক একজন প্রচুর পয়সার মালিক। 

পশুপালনের কোথায় মনে হল, এত সংখ্যক উটকে এই ভাবে খোলা মাঠে চরে বেড়াতে কোনও দিন দেখিনি। আবার ট্রাকের মধ্যে উটকে অথবা চেষ্টাও যে চলে সেটা জানলাম এখানে এসেই। প্রচন্ড গরমে কালো মোষদের জলে ডুবে থাকার দৃশ্যটিও মনে গেঁথে আছে।  






ধামারকা নামের গ্রামটি থেকে আমরা কিছু আজরক প্রিন্টের জামাকাপড় কিনেছিলাম। কেনা হয়েছিল ভুজোদি গ্রাম থেকেও। দুটি গ্রামই শহর ঘেঁষা বলে চট করে বোঝা যায় না। ভুজোদি গ্রামটি সুপরিচিত। এখানকার প্রতিটি বাড়িতে কাজ চলছে। কিছু জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম সেই কাজ। এদের উৎপাদন দেশের সর্বত্র তো বটেই, যাচ্ছে বিদেশেও। ঠিকানা আর কুরিয়ার চার্জ দিলে পছন্দের জিনিস তারা পাঠিয়েও দেয়। ক্যারি করবার দরকার পড়ে না। অনলাইন পেমেন্ট করবার সুবিধেও রয়েছে। তবে অন্যান্য জায়গায় সেই সুবিধে নেই। নগদে লেনদেন চলছে সেখানে। আর সেই সব ছোট ছোট গ্রামে বিক্রি হয় পুরোনো বাসনপত্রও। ঘরের ভেতর সাজিয়ে রাখা ব্যবহৃত বাসনের বিক্রির চল এর আগে আমার চোখে পড়েনি। তামা, পেতলের সেসব বাসন অবশ্য যথেষ্ট ভারি আর পুরোনো। এই রেওয়াজ দেখে মনে হল, কত কম জানি নিজের দেশ সম্পর্কে!












কয়েকদিনের জন্য গিয়ে কচ্ছের সব গ্রাম দেখা সম্ভব নয়। তাই যতটা পারছিলাম দেখে নিচ্ছিলাম। এই অদ্ভুত দেশ, তার মানুষজন, জীবন আর সংস্কৃতি সত্যিই  একেবারেই আলাদা। সূর্যের খরতাপ, অনুর্বর মৃত্তিকা, ভিরান এলাকা কোনও কিছুই দমিয়ে রাখতে পারেনি এখানকার মানুষদের। নিজেদের মতো তারা তৈরি করেছে এক অসাধারণ মনুষ্য সভ্যতা। আর সেটি কোনও হঠাৎ হওয়া নয়। বহু আগে থেকেই সভ্যতার পদচিহ্ন পড়েছে এই এলাকায়। কচ্ছ ভ্রমণে আমাদের শেষ যাত্রা সেখানেই। তার আগে এখন চলছি কালা ডুঙ্গার আর ধরঢো গ্রামে।   



 

ইকবাল হঠাৎ গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে দিল। একটু বিরক্ত হলাম। এই তো মিনিট দশেক আগেই চা খেয়েছি। এখন আবার কী!

যাচ্ছি কালা ডুঙ্গার। কচ্ছের সবচেয়ে উঁচু জায়গা। আন্দামানে আমাদের ড্রাইভার সুভাষের মতোই ইকবালও কালা দুঙ্গার নিয়ে অনেককিছু বলছিল। দারুণ উঁচুতে উঠতে হবে. মেঘ স্পর্শ করা যাবে ইত্যাদি আর কী। ওকে থামাইনি। বলুক। বলে আনন্দ পাক। উত্তরবঙ্গের মানুষদের পাহাড় সম্পর্কে কেউ কিছু বললে মজা লাগে। চুপচাপ শুনি। এবারও তাই করছিলাম। 




কালা দুঙ্গারের উচ্চতা মাত্র ১৫১৬ ফুট। কিন্তু অবস্থানগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পাহাড়। অতীতে আজকের পাকিস্তান থেকে কালা ডুঙ্গার পার করে ব্যবসায়ীরা কচ্ছে প্রবেশ করত। তাদের বিশ্রামের জায়গা ছিল সামান্য শীতল এই উচ্চভূমি। বর্তমান ভারতের দিক মরুতীর্থ হিংলাজ যেতেও কালা ডুঙ্গার অতিক্রম করতে হতো। এখান থেকে কচ্ছের যে সৌন্দর্য্য দেখা যায় তা এককথায় গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো।  



 

তবে কালা ডুঙ্গারের দত্তাত্রেয় মন্দিরের টানেও অনেকে এখানে আসেন। চারশো বছরের পুরোনো এই মন্দির ঘিরে সবচেয়ে জনপ্রিয় নানা উপাখ্যান প্রচলিত। বলা হয়, পৃথিবী পরিক্রমা করতে করতে দত্তাত্রেয় এখানে এসে ক্ষুধার্ত শৃগালদের দেখে থমকে ছিলেন। তাদের খাদ্য জোগাতে তিনি নিজের শরীর দান করেন। যতবার অভুক্ত শৃগালরা তাঁর শরীরের মাংস খায়, ততবার দৈবী শক্তিতে শরীরে মাংস বৃদ্ধি পায়। এই রীতি অনুসরণ করে আজও এই মন্দিরে সন্ধ্যারতির পর শেয়ালদের খাবার দেওয়া হয়। আবার লাখ গুরুর উপাখ্যানটিও বেশ প্রচলিত। দত্তাত্রেয় ভক্ত এই মানুষটি নাকি নিজের অঙ্গ কেটে শেয়ালদের খাইয়েছিলেন। 





গল্প যা-ই হোক, কালা ডুঙ্গার প্রথমেই চমক দিল। তখনও আমরা পাহাড়ের মাথায় পৌছোইনি। ইকবাল গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে দিল। বিরক্ত হয়ে ওর দিকে তাকাতেই দেখি গাড়ি আপনাআপনি চলছে। ইকবালের মুখে মিটিমিটি হাসি। হাত তুলে সামনে একটি সাইনবোর্ড দেখালো। তাতে গুজরাটি, হিন্দি আর ইংরেজিতে লেখা `ম্যাগনেটিক জোন`। অপটিক্যাল ইলুউশনের এরকম অভিজ্ঞতা আগে হয়নি বলে চমকে উঠলাম। আসলে কালা ডুঙ্গারের ঢাল যতটা সরল ও সোজা দেখায়, তার চাইতে অনেকটা বেশি। ফলে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ থাকলেও সেটি নিজে নিজেই চলতে পারে। স্পিড উঠে যেতে পারে ঘন্টায় ৮০ কিমি পর্যন্ত। গ্র্যাভিটি পাহাড়ের এরকম দৃষ্টান্ত ভারতে খুব বেশি নেই। ফলে বেশ মজা লাগল। 





তবে সব কিছু ছাপিয়ে গেল পাহাড়ের মাথা থেকে চারদিকের অপূর্ব দৃশ্য। গ্রেট রন অফ কচ্ছ লেক এখান থেকেই প্রথম দেখলাম। পাকিস্তানের বোর্ডের খুব দূরে নয় বলে, দূরবীন দিয়ে সেটি দেখারও বৃথা চেষ্টা করা গেল। চারদিকে অজস্র পাখি। দূরে নিচে লেকের টলটলে জল আর সাদা (লবন)  বালির ওপর সূর্যের আলোর মায়াময় খেলা, হাওয়ার ঝিরঝিরে শব্দ ইত্যাদি সব কিছু মিলে আর ফিরতে ইচ্ছে করছিল না। এমনিতে কচ্ছ গ্রীষ্মপ্রধান। কিন্তু এখানে শীতল বাতাস শরীর জুড়িয়ে দিল। 













তবে একটা ব্যাপার স্পষ্ট। যে রাজ্য যতই `ভাইব্র্যান্ট` হোক না কেন, দারিদ্র বোধহয় ভারতের পিছু ছাড়বে না। কালা দুঙ্গারের মতো জায়গাতেও উটদের সাজিয়ে রাখা হয়েছে মন্দির থেকে সানসেট পয়েন্ট অবধি নিয়ে যেতে। রয়েছে কচ্ছি ফেরিওয়ালা। ম্যাগনেটিক জোনের আগেই পাকিস্তান বর্ডার দেখবার জন্য ভাড়ার  দূরবীন নিয়ে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকজন। দেখেশুনে খারাপ লাগে। আমাদের মধ্যবিত্ত মন খারাপ হয়। একটা দূরবীন ভাড়া বা উটের পিঠে সামান্য চাপাতে কতটুকু আর সাহায্য হয় এইসব মানুষদের। সারা ভারতেই একই চিত্র। তবে কচ্ছে একটা জিনিস ভালো লাগল। এখানে গবাদি পশুর বড় আদর, সে পশু গরু বা মোষ বা উট যা-ই হোক না কেন। গরুদের বিরাট শিঙও দর্শনীয়। আর চকমকে পোশাক পরা ভাবলেশহীন মুখের উটদের দেখলে আমার তাদেরকে চিরকাল প্রবল দার্শনিক বলে মনে হয়।    













কালা ডুঙ্গার একটা আইডিয়া দিয়েছিল রন ব্যাপারটা ঠিক কী। ভূগোল বই পড়লেও আর ম্যাপে দেখলেও রন সম্পর্কে কোনও ধারণাই ছিল না। আমাদের এবারের বেড়ানোর শেষ দিকে এসে এবার তাই রন নিয়ে সামান্য জানা দরকার। কেননা এরপরেই আমরা ঢুকে পড়ব জগত বিখ্যাত কচ্ছের রন দেখতে। পৌঁছব ধোরঢো গ্রামে। এই গ্রামের নাম আজ সারা বিশ্বে। আর তার পরেই দেখব হরপ্পা সভ্যতার অন্যতম বৃহত্তম শহর ধোলাভিরার ধ্বংসাবশেষ। ধোলাভিরা ইতিমধ্যেই ইউনেস্কোর মর্যাদা পেয়েছে। আর সেখানে সহজে পৌঁছাতে কিছুদিন আগেই নির্মিত হয়েছে লেকের মাঝখান দিয়ে রোড টু হেভেন নামের আমার দেখা অন্যতম সেরা পথ। এই পথের উপরি পাওনা রন। 

এতদিন ধরে যা দেখেছি, নিঃসন্দেহে, সেসব অনবদ্য।  কিন্তু এবার সত্যিই মনে হচ্ছে, `কচ্ছ নেহি দেখা? তো কুছ নেহি দেখা।` প্রকৃতি যে এরকমও হতে পারে সেটি দেশের এই অঞ্চলে না এলে মোটেও বোঝা যায় না। সত্যিই বিচিত্র আমাদের দেশ। আর যা নেই ভারতে তা নেই (ভূ)ভারতে। 







অবশেষে দিগন্ত বিস্তৃত সেই সাদা। 

এতদিন ছবিতে দেখেছি। টিভির পর্দায় দেখেছি। এখন সেই দৃশ্য আমার সামনে। বিশ্বাস হচ্ছিল না, ছোটবেলার ভূগোল বইয়ের সেই কচ্ছের রনে আমার দাঁড়িয়ে আছি। কানে ভাসছে মায়ের গলা। মা বাংলার শিক্ষক হলেও, ভুগোল পড়াতেন। ক্লাসে ম্যাপ নিয়ে চেনাতেন ভারতের নানা অঞ্চল। আবেগাপ্লুত হয়ে উঠছি। স্পষ্ট বুঝতে পারছি। কিন্তু কী করব! এই দৃশ্য দেখে যে আবেগে ভাসবে না, সে সত্যিই মানুষ নয়। 

কিন্তু রন ব্যাপারটা ঠিক কী? হিন্দিতে `রন` শব্দটির অর্থ মরুভূমি। আরব সাগরের একটি অংশ শুকিয়ে সৃষ্টি হয়েছে রনের। নাসা বলছে,  The Kutch district contains one of the largest salt deserts in the world: the Rann of Kutch. (Rann means desert in Hindi.) Although the desert is largely in India’s Gujarat state, some parts extend into the Sindh province of Pakistan. Spanning 26,000 square kilometers (10,000 square miles), the Rann was a shallow arm of the Arabian Sea thousands of years ago. It evolved into an extensive saline mudflat due to centuries of silting. During the dry season, the area has one of the highest annual evaporation rates in the region. The Rann of Kutch and Gujarat state are the largest salt production areas in India. During monsoon months, the Arabian Sea floods Rann with sea water. When the water retreats around October, salt farmers dig wells and pump briny groundwater into square fields where white salt crystals are naturally evaporated out. The shallow wetland is divided into two sections: the Great Rann of Kutch and Little Rann of Kutch. The Great Rann is a vast span of salt and known for its white, snowy look, which also makes it a popular filming spot for Bollywood movies. The Little Rann, which lies to the southeast, is known for its wildlife; it is one of the few places to spot the Indian onager. The area is also a popular bird watching spot where visitors can see eagles, flamingos, cranes, and more.

হোয়াইট রন দেখবার জন্য সবাই ভিড় করে ধোরঢো গ্রামে। আজকাল ধোলাভিরাতেও ভিড় জমছে। গ্রেট রন অফ কচ্ছ লেক পার করে পৌঁছতে হয় সেখানে। অক্টোবর থেকে মার্চ এপ্রিল অবধি সেই লেকের অনেকাংশই শুকিয়ে সাদা মরুভূমি হয়ে যায়। ধোরঢো বিখ্যাত গ্রেট রন অফ কচ্ছ ফেস্টিভ্যালের জন্য। এই বছর থেকে ধোলাভিরাতেও বসেছে কচ্ছ ফেস্টিভ্যালের আসর। বর্ষায় অবশ্য সাদা মরুভূমি জলে ঢেকে যায় আরব সাগরের নোনা জলে। জল সরলেই দেখা যায় শক্ত লবণের আস্তরণ। এতটাই শক্ত সেটি, যে রনে নেমে দিব্যি হাঁটাচলা করা যায়। পূর্ণিমার রাতে সাদা আলোতে রনের অপার্থিব রূপে পাগল হয়নি এমন কেউ নেই। আমাদের সৌভাগ্য, ধোলাভিরায় গভীর রাতে বিশেষ অনুমতি নিয়ে নেমে পড়েছিলাম রনে। অবশ্যই গাইড নিয়ে। তা না হলে দিক ভুল করে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বেশিক্ষণ থাকায় উচিত নয় সাদা রনে। হাওয়ায় শরীরে লবণ লেগে শরীর খারাপ হতে পারে। অমাবস্যার রাতে রনের দৃশ্য অসামান্য। মনে হয় আকাশের তারারা হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। কোনটি আকাশ আর কোনটি রন, বোঝা যায় না। দুজনেই যেন মিলেমিশে এক হয়ে যায়। 

















 

ধোরঢোতে এন্ট্রি করে ঢুকে পড়লাম রনে। কোনও কোনও জায়গা সাদা হয়ে আছে। কোথাও জল। ঢুকবার আগেই আমাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে একদল ফ্লেমিংগো। দূরে তৈরি হচ্ছে টেন্ট সিটি। রন ফেস্টিভ্যালের জন্য। লিটিল রন অফ কচ্ছে দেখা মেলে বুনো গাধার। ভারতের একমাত্র  Ass Sanctuary এখানেই। আর গ্রেট রনে নানা ধরণের পাখি, উটের সমাহার। রয়েছে ঘাস আর জমে থাকা লবনাক্ত জলাভূমিও। আর সব কিছুর ওপরে সাদা মরুভূমি। ধোরঢো গ্রামটি সদ্য সেরা ট্যুরিজম গ্রাম হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ইউনাইটেড নেশনসের  World Tourism Organization এই স্বীকৃতি দেয়। সেদিক থেকে ধোরঢো এই মুহূর্তে ভারতের অন্যতম সেরা আকর্ষণ। সংস্কৃতি রক্ষণাবেক্ষণ ও সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট বুঝতে হলে অবশ্যই এই গ্রামটি দেখা উচিত। 

ধোরঢোতে সাদা রনে নেমে আর গ্রাম ঘুরে যখন ধোলাভিরার জন্য রোড টু হেভেন ধরলাম তখন শুধু পাগল হতেই বাকি! এরকমও হয়? লেকের মধ্যে দিয়ে সোজা রাস্তা। শুধু হাওয়ার শোঁ শোঁ শব্দ আর জলের পারে আছড়ে পড়া ছাড়া কিচ্ছু নেই। সমস্ত রাস্তায় আমরা দুজন শুধু। ইকবাল অবশ্যই আছে সারথি হয়ে। কোনও কোনও জায়গায় সাদা রন ঢেকে দিয়েছে লেককে। তিরিশ পঁয়ত্রিশ কিমির এই দীর্ঘ পথের দৃশ্য আমার পক্ষে বর্ণনা করা সম্ভব না। কী যে লাগছে তখন বোঝানো সত্যিই কষ্টকর। এই দৃশ্য শুধু উপলব্ধির। এতদিন কেন রনে আসিনি ভেবে আফসোস হচ্ছিল। বারবার মায়ের গলা কানে বাজছিল। রন আর রন লেক অফ কচ্ছ থেকে মনে হচ্ছিল মা যেন আমাদের দেখছেন....   

রনের সাদা রঙে রঙিন হয়ে এগিয়ে চললাম ধোলাভিরার দিকে। কখনও নেমে পড়লাম লেকে। কখনও জল শুকিয়ে যাওয়া, সাদা হয়ে যাওয়া রনে। রাতের বেলায় ইকবাল, গাইড গণপত আর রিসোর্টের এক ভাইয়ের সাহায্যে সাদা রনে টহল দেওয়া সম্ভব হল। এ এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। সীমাহীন আকাশে সাদা চাঁদ, নিচে দিগন্তবিস্তৃত সাদা রন। মাঝে ক্ষুদ্র আমরা। সত্যিই ক্ষুদ্র। ছোট্ট। সবদিক থেকে।






হোয়াইট রন দেখতে দেখতে গ্রেট রন অফ কচ্ছ লেকের ভেতর দিয়ে তৈরি রোড টু হেভেন ধরে যখন ধোলাভিরা পৌঁছে ছিলাম, তখন দুপুর। বাখাউ তালুকের খাদিরবেট অঞ্চলে, কর্কট ক্রান্তির ওপর অবস্থিত, ছোট্ট এই গ্রামটি এবারের কচ্ছ ভ্রমণের অন্যতম সেরা আকর্ষণ ছিল। খাদিরবেট আসলে গ্রেট রন অফ কচ্ছ আর কচ্ছ ডেজার্ট ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারির মধ্যে থাকা একটি দ্বীপ। আধুনিক গবেষণা বলছে এই গ্রামে খ্রিস্ট পূর্ব ৩৫০০ থেকে খ্রিস্ট পূর্ব ১৮০০ অবধি হরপ্পা সভ্যতার বিস্তার ঘটে ছিল। ধোলাভিরার খনন কার্যের ডিরেক্টর রণবীর সিং বিস্ত প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে এই ঐতিহাসিক স্থানটিকে কতগুলি ভাগে ভাগ করেছেন-     
Stage I2650–2550 BCEEarly Harappan – Mature Harappan Transition A
Stage II2550–2500 BCEEarly Harappan – Mature Harappan Transition B
Stage III2500–2200 BCEMature Harappan A
Stage IV2200–2000 BCEMature Harappan B
Stage V2000–1900 BCEMature Harappan C
1900–1850 BCEPeriod of desertion
Stage VI1850–1750 BCEPosturban Harappan A
1750–1650 BCEPeriod of desertion
Stage VII1650–1450 BCEPosturban Harappan B
 প্রি হরপ্পান ধোলাভিরান কালচারকে আবার ভাগ করা হচ্ছে Stage I (c. 3500-3200 BCE), and Stage II (c. 3200-2600 BCE) দুই ভাগে। ১৯৬০ সালে স্থানীয় শম্ভুদান গাধভি ধোলাভিরায় হরপ্পান সভ্যতার বিষয়টি নজরে আনলেও, ১৯৬৭-৬৮ সালে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তদানীন্তন আধিকারিক জে পি জোশির নেতৃত্বে খনন কার্য শুরু হয়। সেটি চলে ১৯৯০ অবধি। হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো, গানেরিওয়ালা, রাখিগরহি, কালিবানগান, রূপনগর ও লোথাল ছাড়া এত বড় প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ২০২১ সালে ইউনেস্কো তাই ধোলাভিরাকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা দিয়েছে। 






একটু ভালভাবে দেখলেই বোঝা যায় যে, হরপ্পা সভ্যতার বন্দর নগরী লোথালের চাইতেও প্রাচীন ধোলাভিরা তিনটে অংশে বিভক্ত- সিটাডেল, মিডল টাউন এবং লোয়ার টাউন। সিটাডেল বা শহরের ওপরের অংশ এবং মিডল টাউন তাদের নিজস্ব সুরক্ষা, বিভিন্ন দ্বার, রাস্তা, কুয়ো এবং খোলা ময়দান নিয়ে অনন্য। অন্যান্য অংশে বিরাট রিজার্ভার, শস্যাগার প্রমান করে যে কতটা উন্নত ছিল সেই সময়ে মানুষেরা। উত্তর দিক থেকে প্রবাহিত মানসার আর দক্ষিণের মানহার ধোলাভিরার জলের উৎস হলেও, বৃষ্টির জলকে বেঁধে রাখবার উপায় যে তারা আবিষ্কার করেছিল সেটি প্রমাণিত। ধোলাভিরার সমাধিক্ষেত্রে কোনও কঙ্কাল পাওয়া না গেলেও এর জ্যামিতিক আকৃতি অনন্য। এমনিতেও পুরো শহরটি ছিল আয়তাকার। বাসিন্দাদের মূল জীবিকা ছিল পুঁতি বানানো। পুঁতির মালা থেকে টেরাকোটা বিভিন্ন যে দ্রব্যাদি পাওয়া গেছে সবকিছুই অসামান্য। তবে সোনা, হাতির দাঁত, অন্যান্য কমদামি পাথরের নানা কাজেও তারা দক্ষ ছিল। প্রমান রয়েছে তারও। হরপ্পা সভ্যতার অন্যান্য জায়গার মতো ধোলাভিড়ার লোকেরাও যে ভাষায় কথা বলত সেটি অজানা। কিন্তু তাদের লেখা সাংকেতিক চিহ্ন থেকে অনুমান করা যায় সেটিই তাদের ভাষা।    












দীর্ঘ সময় আমরা রইলাম ধোলাভিরার ঐতিহাসিক এলাকায়। খুঁটিয়ে দেখলাম যতটা পারি। আমাদের গাইড গণপত সব বুঝিয়ে বলছিল। ওর বাবা খননকার্যের সময় এখানে কাজ করেছেন। আজ গণপত পড়াশোনা শেষ করে রাজ্য সরকারের অনুমোদিত গাইড হিসেবে কাজ করছে। আমাদের আগ্রহ দেখে যতটা পারছিল বুঝিয়ে বলছিল ও। আর সত্যি বলতে এত বিরাট এলাকা দেখে মোহিত হচ্ছিলাম। সময় যেন ধোলাভিরায় থমকে আছে। শুধু মানুষগুলি নেই। তাদের ব্যবহৃত এই শহর আজ পরিত্যক্ত হলেও, এখানে যে এক সময় কী বিরাট ব্যবস্থা ছিল সেটি নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। এখানকার মিউজিয়ামে বেশ কিছু জিনিস রাখা থাকলেও, ধোলাভিরা থেকে প্রাপ্ত অধিকাংশ প্রত্নতাত্বিক সামগ্রী রাখা আছে দিল্লিতে। সম্ভবত ভূকম্পপ্রবণ কচ্ছের গর্ব ধোলাভিরা প্রবল ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়। অনুমান তেমনই। হাজার হাজার বছর মাটির তলায় চাপা পরে থেকে আজ ধোলাভিরা আমার মতো সাধারণ মানুষদের কাছে উন্মুক্ত হলেও, এখনও ধোলাভিরার অনেক কিছুই অজানা। হয়ত জানা যাবে সে সব আগামীতে। সেদিন হয়ত আমরা কেউ থাকব না। কিন্তু সাধারণ মানুষই যে ইতিহাস তৈরি করে তার প্রমাণ এই প্রাচীন শহর। কোথায় সেই শহরের মুখ্যপাল আর সেনাপতি। রয়ে গেছে ইমারত আর ভাঙাচোরা ইঁট। তারা শুধু বলে যাচ্ছে মানুষের কথা। 








এরপর চলে এলাম ফসিল পার্কে। গ্রেট রন অফ কচ্ছ লেকের ধারের এই ফসিল পার্ক অনবদ্য। প্রকৃতি এখানে নিজের রংতুলি দিয়ে নানা ছবি ও স্থাপত্য তৈরি করেছে। সঙ্গে রয়েছে পাখিদের নিজস্ব মুক্ত উড়ান। পাহাড়ের ওপরের একটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকে পায়ে হেঁটে আমরা নিচে নেমেছিলাম আমরা। গোটা পথে শুধু দুজন। ফিরবার সময়েও। উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ, ঝোপ ঝোপ জঙ্গল নিয়ে সেই হাঁটাও মনে থাকবে বহুদিন। 

একদম শেষে পৌঁছলাম সান সেট পয়েন্টে। সন্ধে ঘনিয়ে আসছে। ঘড়ির কাঁটায় প্রায় সাড়ে ছয়টা। ভাবছিলাম আমাদের ওদিকে এখন অন্ধকার। আর এখানে সূর্য অস্ত যাচ্ছে কেবল। আসলে ভারতের পশ্চিম প্রান্তে এমনটাই হওয়ার কথা। দূরে লেকের জলের ওপর দেখা যাচ্ছে বাঞ্জানো হিলস। আগে ওখানে একটি মন্দির ছিল। সেটি এখন সান সেট পয়েন্টে সরিয়ে আনা হয়েছে। আসলে কচ্ছের সাদা রনে অনেকেই পথ হারিয়ে ফেলে। মন্দিরটি হতে পারে একটি চিহ্ন। সেই ভেবেই এই সিদ্ধান্ত। 








সাদা রন আর লেকের জলে ক্রমে রং ধরল। সূর্য নামছে পশ্চিমে। লাল হয়ে উঠছে সাদা লবণ। লেকের জলেও রঙিন আভা। নেমে পড়লাম রনে। একাই। বেশিদূর যেতে বারণ করল ইকবাল। কোনও কোনও জায়গায় পা ডেবে যেতে পারে। কোথাও হঠাৎ করে জল ঘিরে ধরতে পারে। তাছাড়া লবণ। অনভ্যস্ত শরীরের পক্ষে যথেষ্ট ক্ষতিকারক। 

যদিও বারণ শুনতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু উপায় নেই। হাওয়া, সূর্যের নিচে নেমে আসা, ফ্লেমিংগোদের হাঁটাচলা, বাঞ্জানো হিলস, টলটলে জল দেখতে দেখতে হারিয়ে যাচ্ছিলাম নিজের মধ্যেই। 

হারিয়ে যাচ্ছিলাম কচ্ছের রনে, কচ্ছের গ্রামে.....তার মায়াময় ইতিহাসে....      

  


        
  
 
 
 

No comments: