Monday, October 14, 2024


 

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভয়ে নষ্ট হচ্ছে গবেষণার পরিবেশে  
শৌভিক রায় 

কথা বলছিলাম দেশের প্রথম সারির শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক গবেষকের সঙ্গে ,তিনি বললেন, `প্রথম দু`তিনদিন খুব ভাল লেগেছিল। ভেবেছিলাম গাইড স্যার আমাকে খুব ভালবাসেন। তাই তাঁর ব্যক্তিগত কাজ করে দিয়েছিলাম। খুশি হয়েই। কিন্তু ব্যাপারটা নিয়মে পরিণত হয়ে গেল। প্রতিবাদ করলাম। এখন তার ফল ভুগছি। প্রায় সাত বছর হয়ে গেল। এখনও গবেষণা শেষ হল না।` উচ্চ শিক্ষায় গাইডদের বিরুদ্ধে এই জাতীয় অভিযোগ নতুন নয়। সম্প্রতি উঠে আসছে আর একটি তত্ত্ব। গবেষণার পেপার পাস করানোর জন্য টাকা চাওয়া নাকি অনেক সময় গাইডকে টাকা দিতে হয়। আর জি কর হাসপাতালের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও এরকম কথা শোনা যাচ্ছে। অভিযোগ, গবেষণা পত্র পাস করাবার জন্য নির্যাতিতার কাছে বিরাট পরিমাণ টাকা দাবি করা হয়েছিল। সেটি সত্য কিনা সময় বলবে। তবে সব দেখেশুনে মনে হয়, শিক্ষার ক্ষেত্রে এই সব অপকীর্তি অতি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আর তাতে  প্রত্যক্ষ মদত যোগান উচ্চ পদে আসীন কর্তাব্যক্তিরা। নিজের সুবিধার জন্য তারা তৈরি করছেন এমন কিছু ছাত্র যারা ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম। 


আসলে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে বেশ কিছু সুবিধে আছে।  ছড়িটি তাতে খুব ভালভাবে ঘোরানো যায়। এই প্রসঙ্গে নিজের ছাত্রজীবনের কথা বলতে পারি। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিকে প্রায়ই রাতের বেলা আমাদের নিয়ে হোস্টেলের সিনিয়ররা মিছিল করত। `লুঙ্গি মিছিল` নামে কুখ্যাত সেই মিছিল বয়েজ হোস্টেল থেকে যেত গার্লস হোস্টেল অবধি। সেখানে ছাদের ওপর থেকে মেয়েরা স্লোগান দিত। আমাদের সেই স্লোগানে গলা মেলাতে হতো। এই মধ্য পঞ্চাশে এসেও আজ অবধি বুঝতে পারিনি, বয়েজ হোস্টেল থেকে মেরেকেটে পাঁচ-ছয়শ মিটার দূরত্বের গার্লস হোস্টেলের সামনে দাঁড়িয়ে, স্লোগানে গলা মিলিয়ে, আমরা কোন বিপ্লব করতাম!  যারা মিছিলে যোগ দিত না, তাদের কপালে জুটত চড়-থাপ্পড়। প্রয়োজনে হোস্টেল থেকে বের করে দেওয়াও হতো।  রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকা এই সিনিয়ারদের পছন্দ মতো না চললে বাইরে থেকে লোক এনে ভয় দেখানো, মারধোর কিছুই বাদ যেত না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এসব জানতেন না, সেটা হতে পারে না। কিন্তু জেনেও চুপ থাকার অদ্ভুত ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন তাঁরা। আসলে `মাস্টারমশাই আপনি কিছু দেখেননি` সেদিনও ছিল। আজও আছে। তখন অনেক কিছুই প্রকাশ্যে আসতো না। আজ আসছে। তবে সেদিন ছিল বলে আজও হবে, সেটা কখনই মানা যায় না।       
 
সম্প্রতি এই রাজ্য তথা দেশের এক অত্যন্ত নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, মাঝপথে গবেষণা ছেড়ে দেওয়া ছাত্র সংখ্যা দেখে বিস্মিত হয়েছি। `নিজের পছন্দের গাইড পাইনি। সেটা তবু মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু টপিকটাও ঠিক করে দিচ্ছেন ওরা। নিজেদের ইনডেক্স বাড়ানো ছাড়া এদের আর কোনও ইচ্ছে নেই। গবেষকের ইচ্ছেকে কোনও দাম দেওয়া হচ্ছে না। কিছু বললেই ভয় দেখানো হয় নানাভাবে`, জানালেন অন্য এক পড়ুয়া। কয়েকজন অতি সক্রিয় অধ্যাপকের কথাও জানা গেল। তাঁদের যোগাযোগ এতদূর বিস্তৃত যে, নিজের কর্মক্ষেত্র ছাড়াও তারা হাত বাড়ান অন্যত্র। প্রভাব খাটিয়ে ঠিক করে দেন কোন অধ্যাপকের কাছে কোন ছাত্র গবেষণা করবে। তাদের অঙ্গুলিহেলনে চলে সব কিছু। ছাত্রের কোনও ওজর-আপত্তি পাত্তা পায় না। বরং অত্যন্ত কৌশলে ছাত্রদের বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে, তাদের কথা না শুনলে আগামীতে সমূহ বিপদ। থিসিস পেপার প্রকাশ নাও হতে পারে। গবেষণা করতে এসে কে আর এভাবে ডুবতে চায়! কেননা পাঁচ বছর পর নিয়ম অনুসারে ছাত্রের স্টাইপেন্ড বন্ধ হয়ে যাবে। তাকে অন্ধ গলিতে পথ খুঁজতে হবে। গবেষণা ঠেকতে পারে সাত আট বছরেও। 

আবার দুই শিক্ষকের ইগোর লড়াইয়ে ছাত্রের স্বপ্ন অপূর্ণ থাকবার কাহিনীও কম নেই। জিআরই, টোয়েফলের মতো পরীক্ষায় যথেষ্ট ভাল রেজাল্ট করা এক ছাত্রকে জানি। সে নিজের ডিপার্টমেন্টের এক শিক্ষকের কাছে পেপার তৈরি করছিল। আশা ছিল দ্রুত কোনও জার্নালে সেই শিক্ষক সেটি প্রকাশ করবেন। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি অন্য এক শিক্ষকের ডাকে একটি প্রোজেক্ট ওয়ার্ক করতে গিয়ে সে বিপদে পড়তে হবে। তার পেপার আর প্রকাশিত হয়নি। আর শুধুমাত্র প্রকাশিত পেপারের অভাবে বিদেশের কোনও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণা করার ডাকও আসেনি। 

বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে গবেষণা করবার জন্য ছাত্রের দরকার পড়ে নিজের প্রতিষ্ঠানের অন্তত দু`জন শিক্ষকের  `রেকোমেন্ডাশন`। এক পালা গল্প সেখানেও। অনেকে সেটি দিতে চান না। কেউ কেউ ঘুরিয়ে অর্থ দাবি করেন। নিজেদের মর্জি মতো  রেকোমেন্ডাশন  লেটারে যে ভাষা প্রয়োগ অনেক সময় সেটি ছাত্রের বিপক্ষে যায়। `রেকোমেন্ড` করবার জন্যও যেভাবে শিক্ষকদের পদলেহন করতে হয়, তাতে তাদের আর শিক্ষক মনে হয় না। মধ্যযুগীয় মানসিকতার এই শিক্ষকরা শুধু ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পাশাপাশি নিজেদের দায়িত্বে আরও কিছু দানব তৈরি করছেন। সব কিছু মিলিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি আজ আর ছাত্রদের খুব একটা আকৃষ্ট করছে না। এমনিতেও একাডেমিক লাইনে এখন স্থায়ী চাকরি দুরস্ত। কন্ট্রাকচুয়াল শিক্ষকদের ভিড় সেখানে। কন্ট্রাক্ট রিনিউ না হলে বিপদে পড়বার আশঙ্কা রয়েই যায়। আর সেই রিনিউ করতে হবে বলে অনেককে শিরদাঁড়া বিক্রি করতে হয়। কেননা থ্রেট কালচার সেখানেও।  

ক্রনিকল অফ হায়ার এডুকেশনের রিপোর্ট অনুসারে এই মুহূর্তে দেশে মাঝপথে গবেষণা ছেড়ে দেওয়া ছাত্র সংখ্যা নাম নথিভুক্তকরণের প্রায়  ৫০ শতাংশ। পাঁচ থেকে আট বছর পর মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ ছাত্র শেষ পর্যন্ত গবেষণা শেষ করতে পারছে। কিছু প্রতিষ্ঠানে পিএইচডিতে ফেল করা গবেষকের সংখ্যা ৭১ শতাংশে পৌঁছে গেছে। এক সমীক্ষা বলছে এর পেছনে গাইডদের দুর্ব্যবহার, পছন্দের বিষয় না পাওয়া এবং অন্য ছাত্রদের দাদাগিরি একটি বড় কারণ। অনেক সময় শারীরিক শোষণের অভিযোগও ওঠে। এরকম নিগ্রহকারীদের কেউ কেউ  গ্রেপ্তার পর্যন্ত হয়েছে। সব মিলে চিত্রটি যথেষ্ট হতাশার।       

অবশ্যই এর সম্পূর্ণ বিপরীতে এমন শিক্ষকরাও আছেন, যাঁরা ছাত্রদের কাছে ঈশ্বরতুল্য। সবরকম বিষয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন তাঁরা। প্রয়োজনে অর্থের যোগান দিয়েও দুঃস্থ ছাত্রের পাশে থাকেন। আক্ষরিক অর্থেই একজন ছাত্রের `ফ্রেন্ড, ফিলোসফার ও গাইড` হয়ে ওঠেন তিনি। এঁদের সংখ্যা দিন দিন কমলেও উচ্চ শিক্ষা আজ এঁদের জন্যই টিকে রয়েছে। ভয় তাদের নিয়ে যাদের কাছে `আদায়` হল একমাত্র অস্ত্র। সেটা সম্মান হোক অথবা অর্থ। আর সেই আদায়ের ক্ষেত্রে এরা কতদূর যেতে পারে তার পরিমাপ করা যায় না। এমনিতেই উচ্চ শিক্ষা অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়েছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সংখ্যা দিনদিন কমছে। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের সিট ফাঁকা থাকছে। রাজ্যের প্রিমিয়াম ইউনিভার্সিটিগুলিও এর বাইরে নয়। সাধারণ বিষয়গুলি পড়ে চাকরি পাওয়ার সুযোগও নেই বললেই চলে। কর্পোরেট সংস্কৃতি শিক্ষাক্ষেত্রেও জুড়ে বসছে। তার ওপর যদি এরকম অবস্থা চলে, শিক্ষার নামে পড়ুয়াদের ওপর অত্যাচার হয় তবে বাকি আর কী রইবে! গয়ং গচ্ছ মনোভাব নিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলে, তাদের মানসিক অবস্থা বুঝে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ আশু প্রয়োজন। 

তার সঙ্গে দরকার সত্যিকারের মুক্ত চিন্তার নির্মল পরিবেশ। উচ্চ শিক্ষা ছাত্রের বোধ ও মননকে বিকাশ ও উদারতার অন্য স্তরে নিয়ে যায়। তাকে সবদিক থেকে শেষ করে দেয় না।   

(প্রকাশিত: প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা / সম্পাদক: কৃষ্ণ দেব)

No comments: