Saturday, October 5, 2024

 

ধ্রুপদী ভাষা রক্ষায় এবার সচেষ্ট হবো তো?
শৌভিক রায় 

ধ্রুপদী ভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আনন্দদায়ক ও গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। বিশ্ব সভ্যতায় সুপ্রাচীন এই ভাষার অবদান নিয়ে কোনও প্রশ্ন উঠবে না। কবির কথায় "বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে অন্ধ বাউলের একতারা বাজে উদার গৈরিক মাঠে, খোলা পথে, উত্তাল নদীর বাঁকে বাঁকে নদীও নর্তকী হয় যখন সকালে নতুন শিক্ষার্থী লেখে তার বাল্য শিক্ষার অক্ষর..." (শামসুর রহমান)

ঠিক এখানেই একটা 'কিন্তু' এসে যাচ্ছে। এই স্বীকৃতি নিয়ে আমরা যতটা উচ্ছ্বসিত, নিজের ভাষাকে রক্ষা করবার ব্যাপারে ততটা সচেতন তো? বোধহয় নয়। আজ শহর তো বটেই, গ্রামাঞ্চলেও 'বাল্য শিক্ষার অক্ষর' আর বাংলা নেই। তার জায়গায় স্থান নিয়েছে ইংরেজি। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। যেভাবে বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য দূরে সরিয়ে রেখে ক্রমশ স্থান নিচ্ছে পশ্চিমা সংস্কৃতি তাতে ভাষার জন্য ভালবাসা কোথায়? মনে রাখা দরকার, ভাষার জন্য আবেগ না থাকলে নিজের ঐতিহ্যের প্রতিও অবজ্ঞা আসে। সেই অবক্ষয় আজ কিন্তু বাংলার সর্বত্র।

ভেবে দেখুন তো, ঠিক কত সংখ্যক অভিভাবক এখন নিজের সন্তানকে বাংলা মাধ্যমে পড়ান? এমনকি বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনেকেই নিজের সন্তানের শিক্ষার জন্য বেছে নিচ্ছেন ইংরেজি মাধ্যমকে। এই অবধিও হয়ত তবু মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু দ্বিতীয় ভাষা হিসেবেও যখন বাংলাকে পছন্দের তালিকায় রাখা হয় না, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসে যায়। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা দেখাচ্ছে যে, দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে এখন পড়ুয়াদের পছন্দ হিন্দি। বাংলা চলে গেছে তৃতীয় স্থানে। অনেকেই বলবেন সময়ের দাবি এটাই। ফলে বাংলা ধ্রুপদী ভাষার স্বীকৃতি পাওয়ার পরেও কি এই অবস্থা কাটবে কিনা সে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

বাংলা ভাষার বর্তমান দৈন্য দশা আমরা জানি না তা কিন্তু নয়। তবে দেখে বুঝেও কিছু বলতে চাই না। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। রাজ্যের বিভিন্ন বিমানবন্দর থেকে শুরু করে অফিস আদালত সর্বত্র বাংলা ক্রমে পিছু হটছে। উদাহরণ হিসেবে ব্যাংকের কথা বলতে পারি। সেখানে আজ যত সংখ্যক হিন্দিভাষী, ঠিক ততটাই কম বাংলা জানা কর্মীর সংখ্যা। অন্য ভাষা বা প্রদেশের মানুষদের নিয়ে আপত্তি করছি না। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী তাদের স্থানীয় ভাষা শেখা ও বলবার কথা। কিন্তু কোথায় সেই প্রচেষ্টা? বরং তারা ভাঙা বাংলা বললে আমরা যেন কৃতার্থ হই। আসলে অন্য ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রহণের ক্ষেত্রে আমরা যতটা উদারতা দেখাতে পেরেছি, নিজেদের কৃষ্টি ও ভাষার ক্ষেত্রে বোধহয় ততটা পারিনি। 

আশা করা যায়, ধ্রুপদী ভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি আমাদেরকে নতুন করে ভাবতে শেখাবে। এই ভাষায় কথা বললে বা পড়াশোনা করলে যে পিছিয়ে পড়তে হবে না সেটাও আমরা বুঝব। উদাহরণ কিন্তু বলছে আদ্যন্ত বাংলা ভাষায় পড়াশোনা করা কৃত বিদ্য মানুষের সংখ্যা কিন্তু এখনও অবধি ঈর্ষণীয়। কোনও ভাবেই এই ভাষা ফেলনা নয়। বরং এই স্বীকৃতিকে মাথায় নিয়ে আমাদের সকলের উচিত, বাংলা ভাষা যাতে আরও ছড়িয়ে পড়ে তার সবরকম গৌরব নিয়ে, সেই চেষ্টাই করা। তবেই হবে ভাষার জন্য শ্রেষ্ঠ তর্পণ।

No comments: