সব খানা হ্যায়
শৌভিক রায়
মেন ফার্মেসিতে বিরাট লাইন। ক্যাশ কাউন্টারের সামনে অন্তত জনা তিরিশ-পঁয়ত্রিশ। আগে টাকা দিতে হবে। রিসিপ্ট নিয়ে সেটা জমা করতে হবে। ওষুধ রেডি করে ওরা ডাকবে।
সিস্টেম এটাই। তবে ডাকটা ঠিক মতো শুনতে হয়। পিতৃপ্রদত্ত নামেই ডাকবে তার গ্যারান্টি নেই। আমাদের বৌদি তৃপ্তি দত্তকে ডেকেছিল তিরুপতিদত্তা বলে। বৌদি তো বোঝেনইনি, নারায়ণদাও বোঝেননি। ফলে টার্ন এলেও ডাক্তারের চেম্বারে ঢোকেননি। শেষটায় কপালে সাদা বিভূতি লাগানো এক ভদ্রলোক `পো, পো` বলায় ওরা বুঝেছিলেন, কিছু একটা হয়েছে। নারায়ণদা অবশ্য `পো` বলতে ভাইপো বা বোনপোকে ভেবেছিলেন। খানিকটা বিস্মিতও হয়েছিলেন, ওই ভদ্রলোক কীভাবে তাদের চিনলেন!
আমার অবশ্য সে রকম বিশেষ সমস্যা নেই। আমার রুগীর নাম যুক্ত অক্ষর নেই। ফলে ঝামেলা কম। বরং আমার নামেই ঝামেলা। শৌভিক প্রায়ই শাউভিক, শুভিক, শোভাইক ইত্যাদি বহু কিছু হয়ে শেষটায় `রয়`-এ ল্যান্ড করে।
আমি ভাবছি অন্য কথা। অপারেশনের পর এত কম টাকার ওষুধ কেন!
রিলিজ নেওয়ার আগে ওয়ার্ডের সিস্টারকে প্রশ্ন করেছিলাম,
- দাওয়াই কে বারেমে...
তৎক্ষণাৎ উত্তর এসেছিল,
- হাঁ হাঁ দাওয়াই হ্যায় না! লে কে আইয়ে...যাইয়ে যাইয়ে...
সেই ওষুধ নিতেই এসেছি। কিন্তু ওষুধের দাম বাবদ যে পয়সা নিল তা তো অতি সামান্য। ঠিক বুঝতে পারছিলাম না কী ওষুধ দিল। গলস্টোন অপারেশনের পর আমাদের ওদিকের ডাক্তাররা তো বহু ওষুধ দেন। বেশ কিছুদিন বিশ্রামে থাকতে হয় রুগীকে। এখানে কী হল ঘটনাটা? তাহলে কি কোনও জটিল ব্যাপার? আর কোনও ওষুধ কাজ করবে না? রুগীর কি এতো বাজে হাল হয়ে গেল? এ কেমন হল! এত নামকরা হাসপাতাল। এ কোন যন্ত্রনায় পড়লাম! এত নামকরা ডাক্তার।
অবশ্য ডাক্তারের ব্যাপারে একটু বোকা হয়েছি। ভদ্রলোকের নাম দেখেছিলাম এস আর ব্যানার্জি জেসুদাসন। ভেবেছিলাম বাঙালি খ্রিস্টান। ভেবেছিলাম ভালোই হল। বাঙালি বাঙালিকে চিনবে, বুঝবে। হয় হরি! আবিষ্কার করলাম এস হল সুব্রহ্মনিয়াম এবং আর হল রত্নেশ্বরম জাতীয় কিছু একটা। নির্ভেজাল তামিল বা মালয়ালম। বাঙালিদের `ব্যানার্জি` শুনতে ভাল লাগত বলে নাকি ওঁর বাবা-মা ওটাও যোগ করে দিয়েছেন। ওঁদের নাকি এরকম হয়। ওঁরই এক বন্ধুর নাম চ্যাটার্জি আঙ্কেলেশ্বর মহাদেবন কুমারম, আর একজন রত্নাবলী মামলেশ্বরম সান্যাল চক্রবর্তী সাধুখাঁ।
এহেন জেসুদাসন অত্যন্ত নামি সার্জেন। ওঁর আন্ডারে তাবড় সার্জেনরা এইসব `ছোটামোটা` গলস্টোন জাতীয় অপারেশন করেন। উনি বসে বসে নাকি শুধু দেখেন। নিজে হাত লাগান করুণানিধি, জয়ললিতা জাতীয় হাই প্রোফাইল কেসে।
হঠাৎ আমার রুগীর নাম কানে এলো। তড়বর করে এগিয়ে গেলাম। টাকা জমা দেওয়ার লাইনে পঁচিশ মিনিট দাঁড়িয়েছি। ওষুধ পেলাম আরও চল্লিশ মিনিট পর। যাহোক হল অবশেষে। কিন্তু কী ওষুধ দিল! এত কম দাম। কৌতূহল না চাপতে পেরে প্যাকেট খুললাম। ওষুধ দেখে ক্যাপ্টেন হ্যাডকের মতো `বেবুন, হিপোপটেমাস, জলহস্তী` ইত্যাদি গালিগালাজ মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো।
এক পাতা ক্যালপল! এই এক ঘন্টা পাঁচ মিনিট পর লাইনে দাঁড়িয়ে ঠ্যাং ব্যথা করে যদি কপালে ক্যালপল জোটে, তাহলে গাল দেব না তো কী করব! কোনও মানে হয়!
সিস্টার একগাল হেসে বলল,
- আগর জরুরত হো তো পিলানা, নেহি তো নেহি পিলানা
মুখে একগাল হাসি রেখে বিশুদ্ধ বাংলায় বললাম,
- মা আমার বোন আমার তোমার এই মহানুভবতা চিরদিন মনে রাখব। ওহ কী ওষুধ দিলে মা! একবার এসো আমাদের বাড়িতে। ওষুধের লাইন দেখে যেও মনা। আলোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদ, আকুপাংচার, পতঞ্জলি.....তুমি আমাকে ক্যালপল দেখাচ্ছ! ইল্লি আর কী।
কী বুঝল কে জানে। মাথা দুদিকে নেড়ে বলল,
- ছেরি ছেরি... থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ....
রুগীকে সেই রাতে কাবাব খাওয়ালাম। মিন মিন করে বলল,
- অপারেশন হয়েছে কাল। আজ কাবাব খাবো!
বললাম,
- দেখতে হবে না, ঠিকঠাক করল কিনা! এমনিতে ক্যালপল দিল শুধু। খাও। চেকাপ তো পাঁচদিন পর। এর মধ্যে কিছু একটা হোক। তাহলে ওষুধ দেবে। এটা একটা কথা! ক্যালপল দেয় শুধু। তারপর আবার বলে, না লাগলে না খেতে।
- আমার তো লাগছে না।
- সেটাই তো। লাগছে না কেন। অপারেশন তো বোঝাই যাচ্ছে না। কোনও মানে হয়!
পাঁচদিনে মুরগি, পেঁয়াজি, চপ, মোমো, ইডলি, ধোসা, ছোলা, বাদাম ইত্যাদি ইত্যাদি দেদার উড়ে গেল! কিন্তু আক্ষেপ কিছুই হল না। কী দুর্ভাগ্য! এত বড় অপারেশন। মাত্র একপাতা ক্যালপল। এত খাচ্ছে। তও কিছু হচ্ছে না! এটা কীরকম ভৌতিক কান্ডকারখানা!
চেকাপে গিয়ে দেখি জেসুদাসন স্বয়ং বসে আছেন। ল্যাপারোস্কপিতে ছোট ছোট তিনটে ফুটো করা হয়। সেগুলিতে সেলাই করা হয়। আমার রুগীর মহা সৌভাগ্য। স্বয়ং জেসুদাসন সেলাই কাটলেন। তারপর....
- ডাক্তার স্যার, ফিরে কব আনা পড়েগা?
- কিস লিয়ে?
- ইস অপারেশন কে লিয়ে।
- ইস লিয়ে? কিঁউ? আম্মা, মত আও। বিলকুল ঠিক হো জি।
- ঠিক হুঁ ?
- হাঁ জরুর ঠিক হো? কোই তকলিফ যায় কেয়া?
- নেহি। ও তো নেহি হ্যায়।
- তব কিঁউ আনা! ঘুমনে কে লিয়ে? ইধার কেয়া দেখোগে? কুছ তো হ্যায়ই নেহি।
- কেয়া কেয়া নেহি খানা হ্যায় ?
- দারু ছোড়কে সব খানা হ্যায়।
এরও পর?
রক্ষে করুন মা। আর কিছু বলা যায়???
(বোকামির এককাল )
No comments:
Post a Comment