Sunday, April 21, 2024

 সিস্টেম সেই একই রয়ে গেল

শৌভিক রায়

অনেকেই এস এম এস রেজিস্ট্রেশন করতে পারেননি। সঠিকভাবে ক্যারেক্টার দেওয়ার পরেও এরর, ইনকারেক্ট ইনপুট ইত্যাদি হচ্ছিল। এই ব্যাপারে এস এম এস রেজিস্ট্রেশন কাউন্টার কোনও সাহায্য করেননি। ভোটকর্মীদের কথাই শোনেননি। `কীভাবে হবে` প্রশ্ন করলেই একটাই উত্তর এসেছে, `সিস্টেম আমাদের হাতে নেই`। তারা একটাই কাজ করেছেন। প্রিসাইডিং বা ফার্স্ট পোলিং অফিসারের চিঠিতে `মোবাইল রেজিস্টার্ড` সিল দিয়েছেন।
শুধু এটুকুর জন্য একটি কাউন্টারের সামনে তিনশো থেকে চারশো ভোটকর্মী কয়েক ঘন্টা ধরে যুদ্ধ করেছেন। আমার নিজের ফোন নম্বর প্রথমে রেজিস্টার হয়নি। ভিড় ঠেলে কোনও মতে কাউন্টারের সামনে পৌঁছে এস এম এস কাউন্টারের লোকটির সাহায্য চাইলাম। তার সামনে বেশ কয়েকবার এস এম এস পাঠালাম। কিন্তু কিছুতেই হল না। অন্য কী উপায় সেটা জানতে চেয়েও সাহায্য পাইনি। লোকটি রীতিমতো আমাকে লাইন থেকে বের করে দিলেন।
ইতিমধ্যে আমার ফার্স্ট পোলিং অফিসারের মোবাইল নাম্বার রেজিস্টার্ড হয়েছে। একটু পর আমার ফোনেও মেসেজ এলো `মোবাইল রেজিস্টার্ড`। আবার লাইনে দাঁড়িয়ে ঘন্টা দেড়েকের প্রচেষ্টায় কাউন্টারের সামনে গিয়ে দেখানোর পর, লোকটি বললেন, `এখানে কোচবিহার ১ দেখাচ্ছে। আপনার কোচবিহার ৩ হবে। ` বললাম, `ফার্স্ট পোলিংয়ের মোবাইল রেজিস্টার্ড হয়েছে। আপনি কাইন্ডলি সিলটি দিয়ে দিন।` উনি দিলেন না। কেননা ওই ফোনটি আমার কাছে নেই। ফার্স্ট পোলিং তখন প্রাপ্য টাকার জন্য (তার টাকা একাউন্টে ঢোকেনি) যুদ্ধ করছে আর একটি জায়গায়।
এস এম এস কাউন্টারের লোকটিকে সেটি বললাম। কিন্তু তিনি সিল দেবেন না। বললাম, `মিথ্যে বলছি না। মিথ্যে বলে কেন নেব। তাতে তো আমারই অসুবিধে। আপনি দিন।` উনি দেবেন না। ততক্ষণে প্রবল ভিড় আর গুঁতোগুঁতিতে দরদর করে ঘামছি। এই চুয়ান্ন-পঞ্চান্ন বছর বয়সে কত আর পারা যায়! কিন্তু উনি গোঁ ধরে রইলেন। শেষটায় ফার্স্ট পোলিং অফিসারকে ফোন করে ডেকে এনে এস এম এস দেখাতে উনি কৃপা করলেন। ওঁকে দোষ দিচ্ছি না। উনি নিজের কর্তব্য করেছেন। কিন্তু একটি মাত্র এস এম এস কাউন্টারে এই গরমে প্রবল ভিড় এড়ানো যেতে পারত যদি কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকত।
পুলিশ ট্যাগিং নিয়ে আমরা ট্রেনিং ক্লাসে আগেই বলেছিলাম। যদি সেটি আমাদের করতে না হয় তবে ভাল হয়। জানতাম তাতে কর্ণপাত করা হবে না। সেটিই হয়েছে। তরুণ বিডিও সাহেবের ইচ্ছে থাকলেও হয়ত করে উঠতে পারেননি। যাহোক পুলিশ ট্যাগ করতে গেলাম। উপস্থিত মহিলা এস আই ফোন নাম্বার দিয়ে বললেন, `পুলিশকে ফোন করুন।` তাজ্জব কাণ্ড ! বিস্মিত হলাম। কিন্তু দরকার নিজের। প্রথম নাম্বার ইনভ্যালিড। দ্বিতীয়তে রিং হল। কথা হল না। এস আই বললেন, `ওরা এখনও আসেনি। আপনি একটু পরে আসুন।` অনুরোধ করলাম, `আমাকে পরের বার আর লাইনে অপেক্ষা করাবেন না।` উনি কথা রেখেছিলেন। পরের বার আর অপেক্ষা করতে হয়নি। `বয়স্ক মানুষকে আমি আগে ছাড়ব` বলে সত্যিই আমাকে ছেড়ে দিলেন তাড়াতাড়ি।
ভোটকেন্দ্র, ভোটগ্রহণ, কেন্দ্রিয় বাহিনী, পোলিং এজেন্ট, সেলফ হেল্প গ্ৰুপ, বি এল ও, সেক্টর, ওই এলাকার মানুষজন প্রত্যেকেই অত্যন্ত ভাল, অমায়িক। বহুদিন পর খুব ভালভাবে সব শেষ করতে পারলাম। কাজকর্ম মিটে গেল। ঠিকঠাক পৌঁছে গেলাম। মোটামুটি তাড়াতাড়ি। এবার জমা দেওয়া।
এক একটি কাউন্টারে ২০টি বুথের মালপত্র জমা নেওয়া হচ্ছে। কাউন্টারের সামনে যেটুকু জায়গা, তাতে যদি কুড়িটি পার্টির সকলে চলে আসে তাহলে দাঁড়ানো যাবে না। কেননা সামনে যেটুকু জায়গা রাখা আছে তাতে বড়জোর জানা দশ-পনের লোক ভদ্রমতো দাঁড়াতে পারে। কাউন্টারে যারা আছেন তারা যথেষ্ট ধীর গতিতে কাজ করছেন। এটা সেটা চাইছেন। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে তারা নিজেরাও পরিষ্কার নন কী কী নিতে হবে এবং কীভাবে নিতে হবে। সব পোলিং পার্টি সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে আসবে এটা ভাবা ঠিক নয়। অনেকেই নতুন রয়েছে। তাদের কাজে ভুলচুক হতেই পারে। সেটা তাদেরকে ভালভাবে বলা যায়। একটু সাহায্য করে মালপত্র তাড়াতাড়ি জমা নিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু সেটা আর হচ্ছে না। ফল, যা হওয়ার তাই হল। চেঁচামেচি শুরু।
শেষটায় সেই তরুণ বিডিও সাহেব এসে পরিস্থিতি সামলালেন। ঝটপট সব দেখে মালপত্র জমা নিতে শুরু করলেন। আমার মালপত্র নিতে সময় নিলেন পাঁচ মিনিট।
রিলিজ অর্ডার সই করতে করতে কাউন্টারের মহিলাটি বললেন, `চেঁচামেচি না করলেই পারতেন।` ভাবলাম উত্তর দেব না। কিন্তু মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো, `এই চেঁচামেচির জন্যই বিডিও সাহেব নিজে জমা নিলেন এবং স্পেসিফিক জিনিষগুলিই নিলেন। অযথা হয়রানি করলেন না, যেটা এতক্ষণ চলছিল।`
দুদিনের অমানুষিক পরিশ্রম ও দুশ্চিন্তা মুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম, কবে আমাদের কর্তৃপক্ষ একটু বুঝবেন। ১৯৯৬ থেকে একই চিত্র দেখে আসছি প্রতিটি ভোটে। চাকরি জীবনের শেষে এসেও অবস্থা সেই একই রয়ে গেল। ভোটিং মেশিন এলো, ভিভিপ্যাট এলো, এস এম এস এলো, ভোটকর্মীদের হোয়াটসআপ গ্ৰুপ এলো, ইউ টিউবে ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ার নানা ভিডিও এলো, কিন্তু সিস্টেম সেই একই রয়ে গেল!

No comments: