জলের দাগ আর এই সব রং
শৌভিক রায়
এই সব দিন এলেই চা বাগানের কথা মনে পড়ে।
রং খেলবার পর চলে যেতাম সেখানে। বাগানের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ। সোজা বুড়ি তোর্ষার তীর।
বুড়ি তোর্ষা কেন? তখন জানতাম না। এখনও জানি না। তবে অনুমান করি।
সম্ভবত কোনও সময় `তুই রোষা` মানে `তোর্ষা`র মূল প্রবাহ ওটাই ছিল।
কিন্তু নদীর মতিগতি কে আর কবে বুঝেছে। কেন যে ভিন্ন পথ নিয়েছিল সে জানে না কেউ। তবে ফেলে যাওয়া প্রবাহও অবশ্যই আছে। জলবন্দি সেও।
কাজ ছিল রং তোলা।
সবুজ, নীল, হলুদ, লাল, গেরুয়া যা যা লেগে থাকত মুখে বা গায়ে।
সেটা না হলে অদূরের জলদাপাড়ার বন্যেরাও মানুষ বলে চিনতে পারত না। নিশ্চিত করে বলতে পারি।
রং তো উঠে যেত। কিন্তু উঠত না যা তা হল জলের দাগ।
সত্যি বলতে আজও ওঠেনি।
আর এই ওঠেনি বলেই মুশকিল।
জলের দাগে হলুদ দেখলেই 'তন্তুবর্ধন`-এর কথা মনে পড়ে। উনি আর কেউ নন। স্বয়ং বিষ্ণু। ঋগবেদ বলছে, তিনি সূর্যের হলুদ রশ্মি দিয়েই নিজের পোশাক তৈরী করেন। প্রেম, সৌন্দর্য ও রক্ষার প্রতীক লাল রঙের সঙ্গে রং খেলায় ব্যবহৃত হয় হলুদ। আবার মাঙ্গলিক কাজেও সবচেয়ে বেশি ব্যবহারকারী হলুদ রংটি।
জলের দাগে আরও দেখতে পাচ্ছি সবুজকে। সবুজ নতুনের সঙ্গে সঙ্গে উর্বরতা ও শস্যকে প্রকাশ করে। আবার মুসলিম ধর্মের প্রতীক হিসেবেও তার ব্যবহার।
জলের দাগে এবার নীল। স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের রং। বলা হয়, অনন্ত শয়ানে থাকা বিষ্ণু তখনই জেগে ওঠেন যখন অশুভ শক্তি মাথা চাড়া দেয়। সংহারকর্তা বিষ্ণুর এই রং বলে দেয়, অশুভ শক্তি যত বলিষ্ঠই হোক না কেন তার স্থায়িত্ব বেশি নয়। আর্যাবর্তের ইতিহাসে নীল অত্যন্ত প্রাচীন রং বলে পরিচিত। তাই প্রাচীনত্ব, স্থায়িত্ব বোঝাতেও এই রং ব্যবহার করা হয়। 'ইন্ডিগো` কথাটির ব্যবহার বলে, ভারতে নীল রং কতটা আদৃত!
জলের দাগে এসে যায় গেরুয়া। ত্যাগ ও শক্তির রং।
তাহলে বিষয়টা ঠিক কী দাঁড়াচ্ছে? শুধুই রং খেলব আর জল দিয়ে ধুয়ে দেব?
জলের দাগ যে মোছা যায় না সেটা তো বুঝতে হবে।
বুঝিয়ে ছিল ওই চা বাগান আর অদূরে জলদাপাড়ার ওই নদী। বুড়ি তোর্ষা।
আজকাল খুব নাচছি। গান গাইছি। রং খেলছি। কিন্তু জলের দাগ লাগতে দিচ্ছি না।
দিচ্ছি না বলেই সমস্যা। প্রবাহ যাচ্ছে গড্ডালিকায়।
রোষ বাড়ছে। তোর। আমার।
জল বলছে শুধু `আয় দাগ লাগিয়ে দিই`।
ছবি- ঋতভাষ
No comments:
Post a Comment