কামিনী ফুলের গন্ধ
শৌভিক রায়
ফালাকাটা নতুন চৌপথীতে গদা কাকুর পেট্রোল পাম্প। তেলের গন্ধ খুব ভালো লাগত। মানি (দিনহাটা গার্লস হাই স্কুলের আসিস্ট্যান্ট হেডমিস্ট্রেস শ্রীমতী সন্ধ্যা সাহা) অবশ্য বলতেন লিভার যাদের খারাপ, তাদের নাকি ওই গন্ধ ভালো লাগে। গদা কাকু রইস আদমি। অন্তত আমার চোখে। তাঁর ভাই ছিলেন প্রখ্যাত শিল্পপতি প্রয়াত নীলমণি রায়। মালবাজারে চলে যান তিনি। ওখানেই থাকতেন। তাঁর নিজস্ব পেট্রল পাম্পে এখনও সাজানো আছে ভিনটেজ গাড়িগুলি। লাগোয়া টি-স্টলে বিখ্যাত চা বাগান মিশন হিলস-এর চায়ের স্বাদ নেওয়াও চলে। সে অবশ্য অন্য কথা।
গদা কাকুর পেট্রোল পাম্প পেরিয়ে একটু এগোলেই মনোজদাদের (প্রয়াত মনোজ রক্ষিত) বাড়ি। তার সামনে বিকেলের বাজার বসত। বাঁ হাতে একটা রাস্তা চলে যেত (কিংবা এখনও যায়) দশমীর ঘাটের দিকে। ওই রাস্তায় ডানদিকে দোতলা কাঠের বাড়ি। পিনুরা থাকত। পিনুর বাবা ছিলেন বি এল আর ও। মস্ত পোস্ট। কিন্তু মানুষটি ছিলেন মাটির। ওদের বাড়িতে আমাদের অত্যাচার চলত দিনরাত। পিনুদের বাড়ির দুটো-তিনটে বাড়ির পরই পিকুদের বাড়ি। মাধবীলতার গন্ধে মো মো করত ওদের বাড়ির সামনের রাস্তা। আর ঠিক তার উল্টোদিকের বাড়ি থাকে ভেসে আসত কামিনী ফুলের গন্ধ।
আমার কাছে কামিনী ফুল আর খুকু দিদিমণি ছিলেন সমার্থক। আর কোনও দিদিমণির গায়ে আমি ফুলের গন্ধ পাইনি। ফুল, খুকু, দিদি, মণি.....এর চাইতে আর কিছু পরিচয় দেওয়ার আছে ওঁর? না বোধহয়। ফালাকাটা বেসিক স্কুলে আমরা যখন গত শতকের সত্তরের দশকের শেষে পড়ুয়া, তখন স্কুল বলতে বুঝতাম বড়দা, মেজদা, সেজদা, রাঙাদা, খুকু দিদিমণি আর বিজন দিদিমণিকে। বড়দা মেজদা প্রমুখ সকলেরই ভাল নাম ছিল। কিন্তু তাঁরা আমাদের কাছে ওই দাদাই ছিলেন। দাদা? নাকি পিতা? নাকি দুটোই? তবে দিদিমণিরা ছিলেন মা। অবশ্যই। আমাদের সব অত্যাচার হাসি মুখে সহ্য করতেন। মনে রাখতে হবে, একদল স্কুল ছাত্র কিন্তু চঞ্চলতা আর দুষ্টুমিতে বাঘা বাঘা মানুষদেরও ঘোল খাইয়ে দিতে পারে। তাদেরকে ট্যাকেল করা মারাত্মক কঠিন। খুকু দিদিমণি কী অনায়াসে সামলে নিতেন সব। তাঁর কাছে গেলেই সেই ফুলের গন্ধে আমরা কেমন শান্ত হয়ে যেতাম যেন!
দুটো ঘটনা মনে পড়ছে। সেবার আমরা ক্রিকেট ম্যাচ খেলব। খাসমহল ময়দানে। তখনও পার্ক হয়নি। ফলে মাঠ বেশ বড়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ওয়ান ডে ম্যাচ চালু না হলেও, আমরা ওই নির্দিষ্ট ওভারের খেলা শুরু করে দিয়েছিলাম। পিকু আম্পায়ার। পিকুর মা, আমাদের কাকিমা, সেদিন কুক। লাঞ্চ টাইমে দুই দলের জন্য রুটি তরকারি করে দিলেন উনি। দুই দলে আমরা এতগুলো প্লেয়ার, এক্সট্রা প্লেয়ার, আম্পায়ার, খান কতক সাপোর্টার। অম্লান বদনে কাকিমা রুটি বেলছেন আর খুকু দিদিমণি সেগুলি সেঁকে আমাদের খেতে দিচ্ছেন। আজ এত বছর পরে সেই ম্যাচে কে হেরেছিল, কে জিতেছিল কিচ্ছু মনে নেই। কিন্তু মনে আছে কাকিমা ও দিদিমণির আমাদেরকে খাওয়ানোর কথা। মাধবীলতা আর কামিনী ফুলের যুগলবন্দী। কারও আছে এরকম অভিজ্ঞতা?
আর একবার। গৌরী টকিজে ইভিনিং শো। বাইরের আলো থেকে হলে ঢুকে সব অন্ধকার। হাতড়ে হাতড়ে লাইটম্যানের দেখানো সিটে বসলাম। আমার পেছনে প্রণব বসল। তারপর পুটন। বাপি বসতেই বিপত্তি। মহিলা কণ্ঠে চিৎকার, `আরে কোলে বসে পড়ছে তো। কোলে বসছে....` কী বিপত্তি। বাপি ভ্যাবাচ্যাকা। পুটন আর প্রণব থ। আমি কিন্তু কামিনী ফুলের গন্ধ পেয়েছি। বুঝেছি মহিলাটি আর কেউ নন। খুকু দিদিমণি। নিজেদের পরিচয় দিতেই ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। ইন্টারভ্যালে বাদাম দিলেন সবাইকে।
দিদিমণি চলে গেলেন। আজ। সকালে। ফালাকাটার একটা প্রজন্ম শেষ হয়ে আসছে ক্রমশ। ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে আমাদেরও নাড়ির টান। যেতে তো হবেই। জানি। নাভিকুণ্ডল ভেসে যাবে নদীর জলে। ভেসে যাবে স্মৃতিও। শোকও আজকাল আয়ু পায় না বেশি। আমিও ভুলে যাব তাঁকে।
তবু কখনও কামিনী ফুলের গন্ধে দেখব দিদিমণি দাঁড়িয়ে আছেন। মৃদু হেসে ক্ষমা করে দিচ্ছেন আমার আপোষ, আমার স্বার্থপরতাকে।
প্রণাম দিদিমণি। প্রণাম.....

No comments:
Post a Comment