Saturday, December 30, 2023


 


আলিপুর জেল মিউজিয়াম যেন এক পুণ্যতীর্থ 
শৌভিক রায় 

এই সেই অটোপ্সি রুম। ফাঁসির পর এখানেই বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের মৃতদেহ পরীক্ষা করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপর রাতের অন্ধকারে চিতাভস্ম ফেলে দেওয়া হয়েছিল টালির নালায়। 

এসেছি কলকাতার জর্জ কোর্ট রোডের আলিপুর জেল মিউজিয়ামে। স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসবের অন্তিম পর্বে এসে ঠিক করেছিলাম মিউজিয়ামটি দেখতে হবে। কিছুদিন আগে আন্দামানের সেলুলার জেল দেখে এসেছি। জেনেছি কীভাবে এক কুখ্যাত কারাগার মুক্তিতীর্থ হয়ে উঠেছিল। আলিপুর সেন্ট্রাল জেল আন্দামানের সেলুলার জেলের মতো কুখ্যাত না হলেও ব্রিটিশ আমলে তার বদনাম কিন্তু কম ছিল না! ১৯০৬ সালে লাল ইঁট দিয়ে তৈরি হয় এই কারাগার। স্বাধীনতার বহু পরেও  ২০১৯ সাল অবধি সক্রিয় ছিল এই কারাগার। সরকারি উদ্যোগে আজ সেটি  মিউজিয়ামে পরিণত। 

প্রবেশ পথের একদিকে টিকিট কাউন্টার অন্যদিকে স্যুভেনির শপ। ঢুকে বাঁ হাতে সবুজ গালিচার মতো ঘাসের ওপর ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর আবক্ষ মূর্তি ও তার পেছনে কাজি নজরুলের `করা ওই লৌহ কপাট...` লেখা গ্রাফিটি রেখে এগিয়ে গেলে কিউরেটর সাহেবের অফিস ও আর একটি গ্রাফিটি। সেখানে বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আবক্ষ মূর্তি স্থান পেয়েছে। লাল ইঁট আর লাল টালির অফিসটি অত্যন্ত সুন্দর। ভাবতে অবাক লাগে, একদিন এই সুন্দর ঘরে থেকেই হয়ত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র চলত। ফন্দি করা হত কীভাবে নির্মম অত্যাচার করা যায় তাঁদের ওপর! অফিসের আর দিকে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। তার সামনে দাঁড়িয়ে খানিক নীরবতা পালন করে শুরু করেছিলাম এক অনন্য পরিভ্রমণ। আর তার শুরুতেই অফিসের থেকে একটু দূরেই অটোপ্সি রুমের সামনে দাঁড়িয়ে এখন। 

এই ঘরটির পাশেই মঞ্চ। পাথরে ঘেরা একটি কূপের ওপর। মঞ্চের ওপর ফাঁসিকাঠ দাঁড় করানো। মুখোমুখি যে দালানটি, সেখানে আটক বন্দিদের বাধ্য করা হত সহ বন্দিদের ফাঁসিকাঠে ঝোলা দেখতে। ফরাসি শব্দ `পোটেন্স` থেকে ফাঁসিকাঠ শব্দটি এসেছে। ল্যাটিন পোটেনশিয়া থেকে জন্ম নেওয়া পোটেন্স কথাটির অর্থ  ক্ষমতা। ঔপনিবেশিক অঞ্চলের মানুষদের দমন করার জন্য ফাঁসি অর্থাৎ প্রাণদণ্ড ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকরী উপায়। তাই কানাইলাল দত্ত, সত্যেন্দ্রনাথ বসু,  বীরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, গোপীনাথ সাহা, প্রমোদ রঞ্জন চৌধুরী, অনন্ত হরি মিত্র, রামকৃষ্ণ বিশ্বাস, দীনেশ মজুমদার প্রমুখ প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ফাঁসি এভাবেই দেখেছিলেন কলকাতার আলিপুর জেলের সেদিনের বন্দিরা। 

উল্লেখ্য, সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মৃতদেহ তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের হাতে তুলে দিলেও, দীনেশ গুপ্তের শব কিন্তু দেওয়া হয়নি। সরকারি রিপোর্ট বলছে, তাঁকে ফাঁসির আগের রাতে বেশি করে আফিমের মতো মাদক সেবন করানো হলেও তিনি সম্পূর্ণ সজাগ ছিলেন। ১৯০৮ সালে সত্যেন্দ্রনাথ বোসের ফাঁসি সম্পর্কে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর রিপোর্টে লেখা হয়, `সাজাপ্রাপ্ত লোকটিকে ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগোতে দেখা যাচ্ছিল। তার দুপাশে দুই ইউরোপীয় কারাধ্যক্ষ, পিছেনে পিছনে পুলিশ ও জেলের পদাধিকারীরা। কয়েক মুহূর্ত আগেই দণ্ডিতকে তার নির্জন কক্ষের মধ্যে পড়ে শোনানো হয়েছিল ফাঁসির আদেশ ও দোয়া প্রার্থনার আবেদন খারিজ করে লেখা জবাব।`        

অটোপ্সি রুমের উল্টোদিকে যে দ্বিতল ভবন সেখানে রাখা হয়েছিল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, ডঃ বিধানচন্দ্র রায় প্রমুখ বরেণ্য মানুষদের। কক্ষগুলি তাঁদের মূর্তি দিয়ে সাজানো। নেতাজিকে ১৯৩০ সালের ২৩ জানুয়ারি থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর অবধি রাখা হয়েছিল এই ভবনের কক্ষে। এই বছরই নেতাজি মাথায় আঘাত পেয়ে প্রায় এক ঘন্টা অচৈতন্য ছিলেন। উল্লেখ্য, বন্দিদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদ করায় নেতাজি সহ অন্যান্য কংগ্রেস নেতাকে লাঠিপেটা করা হয়েছিল সেদিন। কলকাতা কর্পোরেশনের প্রথম মেয়র দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসও এই ভবনের ৮ নম্বর ঘরে বন্দি ছিলেন। ১৯৩০ সালের এপ্রিল ১৯৩২ সালের ২২ অক্টোবর থেকে ১৯৩৩ সালের ৫ জুন পর্যন্ত দুই দফায় বন্দি করা হয় দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্তকে।              

ইতিমধ্যে পরিচয় হয়েছে মিউজিয়াম কিউরেটর অনিমেষ ভট্টাচার্যর সঙ্গে। জানলাম, ওয়ারেন হেস্টিংসের সময় এখানে শিকারিদের থাকবার ব্যবস্থা করা হত। সেই সময় `হরিণ বাড়ি` নামে পরিচিত ছিল ভবিষ্যতের এই কারাগার। বেঙ্গল গেজেট প্রকাশনার জন্য বিখ্যাত জেমস হিককে এখানে বন্দি করা হয় ১৭৭৮ সালে। তবে ১৮৫৭ সালে এখানকার কয়েদি ও কাজ জানা সাধারণ কর্মীদের নিয়ে ছাপাখানা শুরু করেন ইন্সপেক্টর জেনারেল ড. এফ. যে. মোয়াৎ। সেই ছাপাখানা আজও আছে। আছে বিখ্যাত লাইব্রেরি ও সেমিনার হল। ইতিহাসের মূল্যবান বই সমৃদ্ধ সেই লাইব্রেরি যে কোনও গবেষককে প্রলুব্ধ করবে মুহূর্তেই। 

আলিপুর জেল নির্মাণে  ব্রিটিশ দার্শনিক জেরেমি বেন্থামের আবিষ্কৃত প্যানোপটিকন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল, `একটি বৃত্তাকার ভবন...পরিধি বরাবর বিস্তৃত কক্ষে বন্দিরা...কেন্দ্রে থাকবেন প্রশাসক। জানালার খড়খড়ি এবং অন্যান্য কৌশলের মাধ্যমে বন্দিদের দৃষ্টির আড়ালে থাকবেন কারা-পরিদর্শক। একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে সবকটি কক্ষ দেখতে পাওয়া যাবে।` অনেকটা আন্দামানের সেলুলার জেলের ধাঁচের সেন্ট্রাল টাওয়ারে বসে বিপ্লবী বন্দিদের ওপর নজর রাখত সেদিনের অত্যাচারী শাসকেরা। সেন্ট্রাল টাওয়ারে রাখা হয়েছে আন্দামানের সেলুলার জেলে বন্দি থাকা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নামের তালিকা। উল্লেখ্য, সেলুলার জেলে শেষ পর্যায়ে যখন আমরণ অনশন শুরু করেন বন্দিরা, তখন সারা দেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। ইংরেজ শাসকেরা সেই সময় বাধ্য হয় সেলুলার জেল থেকে বন্দিদের মূল ভূখণ্ডের বিভিন্ন জেলে প্রত্যর্পণ করতে। সেই বন্দিদের একটি বৃহৎ সংখ্যা স্থান পেয়েছিল আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে।  

জেলের সেন্ট্রাল টাওয়ারকে ঘিরে বৃত্তাকারে তৈরি করা বিভিন্ন সেল বর্তমানে উন্মুক্ত আমাদের মতো সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য। ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের জন্য পৃথকীকরণ কক্ষ, বন্দিদের জীবনচর্চা কক্ষ না দেখলে ঠিক বোঝা যায় না কতটা নির্মম অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু যে কক্ষে কারারুদ্ধ ছিলেন সেটিও অন্যান্য কক্ষগুলির মতো। ১৯৩৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ মে বন্দি ছিলেন তিনি। তাঁর কন্যা ইন্দিরা গান্ধি দু`সপ্তাহ পর পর কুড়ি মিনিটের জন্য তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। ভবনের সামনের অঙ্গন হাছের তলায় বাবা ও মেয়ের দেখা হত। অস্বাস্থ্যকর কক্ষটিতে ছিল একটি মাত্র জানালা এবং লণ্ঠন, কাগজ-কলম ও বিছানার চাদর। অন্যদিকে সাধারণ কক্ষগুলি ছিল খুবই সংকীর্ণ এবং পর্যাপ্ত পরিমানে এল-বাতাস চলাচলের অনুপোযুক্ত। কক্ষগুলিকে দেওয়াল দিয়ে বিভক্ত করা হত। মহিলা ও দেওয়ানি বন্দিদের জন্য ছিল পৃথক ব্যবস্থা। নজরুল কক্ষটি বিশেষভাবে সজ্জিত তাঁর লেখা বই ও অন্যান্য ছবি দিয়ে। সাধারণ বন্দিদের অবস্থা অবশ্য ছিল আরও করুণ। লম্বা ঘরে তাদের প্রায় গায়ে গা লাগিয়ে থাকতে হত। একই ঘরের মধ্যে পঞ্চাশজনের জন্য একটি শৌচাগার বলে দেয় তাঁদের নারকীয় দশা। বন্দিদের সেই দিনযাপনও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তবে শুধু গাদাগাদি ঠাসাঠাসি করে থাকা নয়। উদয়াস্ত পরিশ্রম করতে হত সবাইকে। তাঁতকলে কাজ করে নির্দিষ্ট পরিমাণ সুতো বের করতে না পারলেই জুটত অকথ্য অত্যাচার। অতীতের সেই দৃশ্যও আজ সজ্জিত।  `ইচ্ছে আছে আরও অনেককিছু করবার। কাজ চলছে`, জানালেন অনিমেষবাবু। 
 
স্থায়ী প্রদর্শনী কক্ষে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম অসামান্যভাবে বিবৃত হয়েছে। আবার সাধারণ প্রদর্শনী কক্ষেও  বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা হচ্ছে অতীত ইতিহাস। অবশ্য সন্ধ্যার লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো দেখবার গুরুত্ব ও অনুভূতি আলাদা। শো-তে সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের খুঁটিনাটি। মিউজিয়ামের এক আকর্ষণীয় অংশ অবশ্যই পুলিশ মিউজিয়াম। এপিসি রোডের পুলিশ মিউজিয়াম থেকে এখানে হস্তান্তরিত হয়েছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সামগ্রী। এখানে দেখে নেওয়া যায় কিংসফোর্ডকে পাঠানো বই বোমা, বিপ্লবী ভূপেন্দ্রকিশোর আচার্যের কাছে পাওয়া পাঁচ চেম্বার রিভলবার, নরেন গোসাইনকে হত্যা করতে ব্যবহৃত কানাইলাল দত্তের রিভলবার, ১৯১০ সালে খুলনা-যশোর গ্যাং সদস্যদের ব্যবহৃত পিস্তল,  ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলার বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র,  ১৯১৭ সালে উদ্ধার হওয়া কোল্ট পিস্তল, শিবপুরে নরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির বাড়ি থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন অস্ত্র, দীনেশ চন্দ্র মজুমদারের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া এলুমিনিয়াম বোমা সহ বিভিন্ন জিনিস। উপরি পাওনা বিভিন্ন আন্দোলনের লিখিত ইতিহাস ও বিপ্লবীদের সচিত্র পরিচয়। 

সারাদিন ধরে সব খুঁটিয়ে দেখে, মিউজিয়ামের সুদৃশ্য শপে কফি খেয়ে, বেরিয়ে আসবার সময় চোখ আটকে গেল ১৯০৯ সালে নির্মিত বিরাট ঘণ্টাটিতে। কারাগারে ঘন্টা বাজানোর প্রথা চালু হয় সপ্তদশ শতাব্দীতে। সকালে বিভিন্ন কাজ শুরু হওয়ার আগে, কাজ শেষ হলে ঘন্টা বাজানো হত। বন্দি মুক্তি পেলেও ছিল ঘন্টা বাজানোর রেওয়াজ। আলিপুর কারাগারে অবশ্য ১৯০৬ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত কোনও বন্দিকেই মুক্তি দেওয়া হয়নি। এই ঘন্টাটি বাজত ভোর ছয়টায় বন্দিদের ঘুম থেকে টুলবার জন্য। সাড়ে ছয়টায় যখন সেটি আবার বেজে উঠত তখন তাদের বিভিন্ন কাজের জন্য সেল থেকে বের আনা হত। সন্ধে সাতটায় রাতের খাবারের জন্য ঘন্টা বাজানো হত। খাবার শেষ করে সাড়ে সাতটায় বন্দিদের ঢুকে যেতে হত নিজস্ব কক্ষে।  

ঘন্টাটি আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের সমস্ত কিছুর নির্বাক সাক্ষী । অতীতে বিভিন্ন সময় ঘন্টাধ্বনি করা হলেও আজ নির্বাক সে। হয়ত শহীদদের অব্যক্ত বেদনা বুকে নিয়ে সে এখনও লিখে চলেছে তার নিজস্ব ইতিহাস....  































(স্বাধীনতার ৭৫ বছরে, অমৃত মহোৎসব বর্ষে, শ্রেষ্ঠ পাওনা স্বাধীনতা আন্দোলনের দুই কুখ্যাত কারাগার দর্শন। অনুভব করেছি মহানুভব সেই দেশপ্রেমীদের যাঁরা সেই কারাগার দুটিকে মুক্তিতীর্থে পরিণত করেছিলেন। বর্ষশেষে স্মরণ করছি আবারও তাঁদের। সঙ্গে দুই কিস্তিতে দুটি লেখা। আজকের লেখাটি ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে শ্রীমতী অঞ্জনা দে ভৌমিক সম্পাদিত `অঙ্কুরোদ্গম` পুজো সংখ্যায়।)    

No comments: