Wednesday, December 27, 2023

উত্তরবঙ্গের পরিবেশ: নিজস্ব ভাবনা 

শৌভিক রায় 

পুনের জুন্নার ফরেস্ট ডিভিশনের মঞ্চার ও শিরুর জঙ্গলে চারটি লেপার্ডের অনাহারে মৃত্যুর খবর কিছুদিন আগে আমাদের সবাইকে চমকে দিয়েছিল। নয় হাজার হেক্টর অরণ্যভূমি অধ্যুষিত ৯২টি  গ্রামের মঞ্চারে প্রায়ই মানুষ ও পশুর লড়াইয়ের খবর পাওয়া যায়। সত্যি বলতে এখানকার পরিবেশ অত্যন্ত দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এতটাই যে, পশুরা জঙ্গল ছেড়ে খাদ্য অন্বেষণে বেরিয়ে পড়ছে গ্রামগুলিতে। 

উত্তরবঙ্গের পরিবেশ ও অরণ্য ভাবনা নিয়ে লিখতে বসে মহারাষ্ট্রের একটি ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে আনা আপাতভাবে হয়ত যুক্তিযুক্ত নয়। কিন্তু আমাদের রাজ্যের উত্তরের পরিবেশও দিন দিন বদলে যাচ্ছে। পাল্টে যাচ্ছে এখানকার অরণ্যভূমির চরিত্র। আজ থেকে তিন-চার দশক আগেও উত্তরের অরণ্য ছিল আরও গভীর। তার বিস্তার ছিল অনেকটা। নিজেদের স্বাভাবিক বাসস্থান ছেড়ে লোকালয়ে পশুদের বেরিয়ে আসবার চিত্রও তেমন ছিল না। কিন্তু এখন অবস্থা বদলে গেছে। ক্রমাগত নগরায়ণের ফলে জঙ্গল সংকুচিত হয়েছে। কমেছে খাদ্য। ফলে হাতি, বাইসন, চিতা ইত্যাদির মতো প্রাণীদের আনাগোনা বেড়েছে লোকালয়ে। তাদের উদ্দেশ্য একটাই। খাবার খোঁজা। তাদের সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে বিভিন্ন অরণ্য ঘেঁষে গজিয়ে ওঠা একের পর এক রিসোর্ট ও হোটেল। কিছুদিন আগেও পিকনিকের নামে, উত্তরের বিভিন্ন অরণ্যে যেভাবে মাইক বাজিয়ে বনচারীদের নাভিশ্বাস তুলে দেওয়া হত, তার থেকে প্রমাণিত যে, আমাদের অরণ্য প্রেম ও পরিবেশ ভাবনা বলে কিছুই নেই। 

কিন্তু কেন এই অসচেতনতা? লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আমাদের কাছে পরিবেশের সেভাবে কোনও গুরুত্ব নেই। যেভাবে আমরা রাস্তাঘাটে নোংরা আবর্জনা, থুতু, পানের পিক ফেলি, তার থেকে প্রমাণিত পরিবেশকে সুষ্ঠ সুন্দর রাখতে আমরা একেবারেই অজ্ঞ। ধর্মীয় সামাজিক যে কোনও অনুষ্ঠান মানেই আমাদের কাছে ডিজে বাজিয়ে হৈচৈ, নাচাকুঁদো। এই অসাবধানতা ধীরে ধীরে প্রতিফলিত হয় বৃহত্তর জীবনে। নিজের ছোট্ট গণ্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছে যাই আরও বড় ক্ষেত্রে। তারই ধাক্কা এসে পড়ে পরিবেশে। আমাদের বাড়িতে, সমাজে বা পাঠ্যক্রমেও কখনও জোর দিয়ে আমাদের বলা হয় না, `মাতা ভূমি পুত্রহম পৃথিব্য` (এই ধরণী আমাদের মা আর আমরা তার সন্তান)। যেটুকু করা বা বলা হয়, সবটাই ভাসা ভাসা। যেন করতে বা বলতে হয় তাই করা বা বলা। নির্দিষ্ট কয়েকটি দিন বেছে নিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে বৃক্ষ রোপন, শোভাযাত্রা, গাছের চারা তুলে দেওয়ার মধ্যেই আমাদের পরিবেশ প্রেম শেষ। মন থেকে সেই ব্যাপারটিকে আমরা বুঝলাম ও গ্রহণ করলাম কিনা সেই বিষয়ে কোনও পরিকল্পনা নেই। সচেতন করে তোলার কোনও প্রচেষ্টাও নেই। 

এসবের প্রতিফলন পড়েছে উত্তরের পরিবেশ ও অরণ্য ভাবনায়। সমীক্ষা দেখাচ্ছে, গত দুই দশকে উত্তরের অরণ্যভূমির ৩০ শতাংশ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বেড়েছে শহর। গত শতকের নব্বইয়ের দশকেও শিলিগুড়ির উপকন্ঠে রেন ও শেড ট্রি সম্বলিত যে চাঁদমনি চা-বাগান আমাদের সবুজ উত্তরের আভাস দিত, তা আজ বহুদিন থেকেই অদৃশ্য। সেখানে থাবা গেড়েছে আধুনিক শপিং মল ও বাসভূমি। ফালাকাটা-বীরপাড়া পথে দেড়শ-দুশো বছরের পুরোনো যে বিরাট বিরাট গাছগুলি রাস্তায় ঝুঁকে থেকে পথিককে আশীর্বাদ দিত, তারা কবে যেন লাশ হয়ে কোথায় চলে গেল! কোচবিহার বা আলিপুরদুয়ার থেকে অসমগামী সড়কের দুধারে যে সুন্দর সবুজ বৃক্ষ সুশীতল ছায়া দিত তারাও কোথায় হারিয়ে গেল! গোটা উত্তর জুড়ে সর্বত্র এই একই চিত্র। 

উন্নয়নের স্বার্থে, যদি বা তর্কের খাতিরে, এই বৃক্ষ নিধন যথাযথ ধরে নিইও (যদিও পৃথিবীর সব সভ্য দেশে পরিবেশকে হত্যা করে তথাকথিত কোনও উন্নয়ন করা হয় না। বিকল্প কিছুকে রূপায়ণ করা হয়), কী বলব ক্রমশ ফাঁকা হতে থাকা চিলাপাতা-সহ উত্তরের বিভিন্ন অরণ্যকে দেখে! নল রাজার স্মৃতি-বিজড়িত চিলাপাতার জঙ্গলে, বছর তিরিশ-পঁয়তিরিশ আগে, দিনের বেলাতে ঢুকতেও গা ছমছম করত। বক্সার অরণ্যে সূর্যের আলো মাটি স্পর্শ করতে পারত না ঠেসাঠেসি করে দাঁড়িয়ে থাকা গাছেদের ভিড়ে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বক্সার জঙ্গল পরিদর্শনে আসা উইলিয়াম গ্রিফিথের বর্ণনার সঙ্গে অনেকটাই মিলে যেত বছর চল্লিশ আগের বক্সা। নিজের চোখে জলদাপাড়া, খয়েরবাড়ির জঙ্গলের ঘনত্ব দেখেছি। লাটাগুড়ি, চাপড়ামারি, বৈকুণ্ঠপুর, মহানন্দার অরণ্যও ছিল একই রকম। কিন্তু সেসব দিন আজ যেন স্বপ্ন। কোথায় সেই গভীর অরণ্য!  জঙ্গল রক্ষা করতে হচ্ছে। চোরা-শিকারিদের হাত থেকে বনচরদের রক্ষার জন্য কড়া নিয়ম জারি করতে হচ্ছে। পরিবেশ নিয়ে আমরা যদি সঠিক বার্তা পেতাম, তাহলে এই চিত্র দেখতে হত না।  

ইংরেজ আমলের শুরুর দিকে কিন্তু উত্তরকে নিয়ে সেই সময়ের শাসকদের খুব কিছু মাথা ব্যথা ছিল না। ভারতের প্রায় সব জায়গায় নিজেদের ছড়ি ঘোরালেও দার্জিলিং বাদে উত্তরের অন্যান্য অংশ নিয়ে তাদের খুব কিছু মাথা ব্যথা ছিল না। বরং কোচবিহারের সঙ্গে তাদের সখ্য ছিল ভুটানকে বাগে রাখবার জন্য। কেননা ভুটানের মধ্যে দিয়ে তিব্বতের সঙ্গে বাণিজ্য স্থাপনে আগ্রহী ছিল ব্রিটিশরা। আর সেটা করতে গিয়ে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় ভুটানের সঙ্গে বেশ কয়েকবার যুদ্ধেও জড়িয়ে পড়ে তারা। সম্ভবত এই সময়েই ব্রিটিশরা বোঝে উত্তরের সুবিস্তৃত অরণ্য তাদের বিপুল সম্পদ দিতে পারে। শাল, সেগুন, চিকরাশি, মান্দার, গামার, কাঁঠাল ইত্যাদি গাছ হয়ে উঠতে পারে অর্থ উপার্জনের বিরাট হাতিয়ার। উত্তরের পরিবেশে প্রথম কোপটা তাই পড়েছিল ব্রিটিশদের হাত ধরেই। এখানকার কাঠ পাড়ি দিয়েছিল দেশের সর্বত্র। এমনকি বিদেশেও। ব্যবসার সুবিধার জন্য স্থাপিত হয়েছিল রেলপথ। সেটি করতে গিয়েও অরণ্যভূমি ধ্বংস করা হয়েছিল। আঘাত এসেছিল উত্তরের জীব-বৈচিত্রের ওপরেও। 

পরিবেশের ওপর সেই আঘাত কিন্তু আর কোনও দিন থামেনি। ব্যাপারটা যে একটি পরম্পরায় পরিণত হয়েছিল। চা-বাগান তৈরির কাজে উত্তরের বিপুল অরণ্যভূমি বিলুপ্ত হল। সবুজ চা-বাগানে ডুয়ার্স সহ উত্তরের বহুলাংশ অত্যন্ত মোহময়ী হয়ে উঠলেও সেদিন কিন্তু জিতে গিয়েছিল চা-শিল্পকে ঘিরে মুনাফা অর্জনের ভাবনা। হেরে গিয়েছিল পরিবেশ। দিন যত এগিয়েছে, তত বেড়েছে দূষণ। বৃদ্ধি পেয়েছে জনসংখ্যা। দেশভাগের সময়েও প্রচুর শরণার্থী ওপর বাংলা থেকে এসেছেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ গঠনের সময়েও তাদের আগমন হয়েছে। ফলে উত্তরের প্রতিটি জনপদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। আর সেই সঙ্গে বন কেটে বসত বেড়েছে। যত অরণ্য ধ্বংস হয়েছে, বদলেছে পরিবেশ। আজ থেকে কয়েক দশক আগেও উত্তরে যে পরিমাণ বৃষ্টি হত এখন আর তা হয় না। আজকের মাঝবয়েসি যাঁরা, তাঁরা নিশ্চয়ই মনে করতে পারবেন, এই অঞ্চলে এমন কি গরমের সময়েও ভোরের দিকে কিছু গায়ে দিতে হত। উত্তর আকাশে ঝকঝক করতো নীল পাহাড়। এখন এই সব কিছুই যেন স্বপ্ন বলে মনে হয়। আজকে পরিবেশের এমন অবস্থা যে দার্জিলিং কালিম্পঙের মতো সুউচ্চ পাহাড়ে কখনও ফ্যান চালাতে হচ্ছে। এসি  মেশিন বসাতে হচ্ছে সব জনপদে। এমনিতেই উষ্ণায়ন। তার ওপর এসি মেশিনের মতো পরিবেশের জন্য অস্বাস্থ্যকর আধুনিক গেজেট আরও দূষণ ছড়াচ্ছে। বিপুল পরিমাণে বেড়ে গেছে মোটর-গাড়ির সংখ্যা। দূষণের ক্ষেত্রে তাদের অবদানও কম নয়। এর সঙ্গে তো আমাদের নিজস্ব অসচেতনতা রয়েইছে! সব কিছু মিলে অবস্থা সত্যি করুণার!   

অবশ্য উত্তরের পরিবেশের এই পরিবর্তনের পেছনে বিশ্ব উষ্ণায়নের ভূমিকাও কম নয়। বিগত একশো বছরে পৃথিবীর তাপমাত্রা চার ডিগ্রি বেড়ে গেছে। এতদিন পর্যন্ত এই বৃদ্ধির হার ছিল দুই ডিগ্রি। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গ্রিনহাউস এফেক্ট। সারা বিশ্বের মতো এর কুফল ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের সবুজ উত্তরেও। সঙ্গে তো অবশ্যই রয়েছে আমাদের জাগতিক লোভ ও ক্ষমতার প্রকাশ। কোচবিহার শহরের কথাই ধরা যাক। ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা বলে এই অঞ্চলে বহুতল বাড়ি তৈরি নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু অতীতের সেই নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একের পর এক বহুতল নির্মাণ চলছে।  এর ফল কী হবে সেটা এই মুহূর্তে বোঝা না গেলেও, আগামী প্রজন্ম যে ভুগবে সেই বিষয়ে সন্দেহ নেই। আবার সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্টের উদাহরণ হিসেবে একদা কোচবিহার রাজ্যের যেসব অঞ্চলে বনাঞ্চল তৈরি করা হয়েছিল, সেগুলিতেও আমাদের কুদৃষ্টি পড়েছে। ধ্বংস হয়েছে সেসব। আর তার ফলে  জায়গার মতো `ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়` কোচবিহার জেলাও ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহের শিকার। কে কবে ভেবেছিল এখানকার তাপমাত্রা চল্লিশ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের ঘরে পৌঁছে যাবে! মোবাইল ফোনের টাওয়ারের সংখ্যা যত কোচবিহার সহ বিভিন্ন জেলায় বেড়েছে, তত বিলুপ্ত হচ্ছে নানা প্রজাতির পাখি। আমাদেরই জন্য পরিযায়ী পাখিরা আজ উত্তরের বহু জলাশয়কে পরিত্যাগ  করেছে। অবশ্য ইতিমধ্যেই আমাদের কালো হাত থাবা দিয়েছে জলাশয়েও। বুজে গেছে বহু বিখ্যাত -অখ্যাত জলাশয়। সেখানে শুরু হয়েছে চাষবাস বা নির্মিত হয়েছে দালানবাড়ি। 

উত্তরের নদীগুলিও আজ সংকটের মুখে। জানা-অজানা ছোট-বড় নানা নদীর এই অঞ্চলে দিনদিন কমছে নদীগুলির নাব্যতা। ফল সহজেই অনুমেয়। ভাবতে খারাপ লাগে যে, জয়ন্তীর মতো নদীতে প্রতি বছর বন্যার আশংকা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নদী গর্ভ থেকে পাথর তোলা নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়াতে দিন দিন উঁচু হয়ে যাচ্ছে নদীর খাত। তাই একটু বৃষ্টিতেই সারা বছর তিরতির করে বয়ে চলা জয়ন্তী দু-কুল ছাপাচ্ছে। ভুগছে সাধারণ মানুষ। ১৯৯৩ সালের বন্যা এই অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রে যে প্রবল অভিঘাত হেনেছিল তার ফলে অনেককিছু পালটে গেলেও উপযুক্ত পরিকল্পনার অভাবে আচমকা বন্যা ক্ষতি করছে সবকিছুর। এই বছর কিছুদিন আগে একদিনে ৪০০মিমি বৃষ্টির ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে যে, প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনার কাছে আমরা কতটা অসহায়। মজাটা হল যে, এই পরিস্থিতি হয়ত কখনোই হত না যদি আমরা পরিবেশকে রক্ষায় যথেষ্ট সচেতন হতাম। উত্তরের নদীগুলি আজ সত্যিই রোগাক্রান্ত। চোখের সামনে থেকে প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছে বালুরঘাটের আত্রেয়ী, শিলিগুড়ির মহানন্দা বা করতোয়া, জলপাইগুড়ির করলা-সহ একাধিক নদী। সারা বছর জল না থাকা এই নদীগুলি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে সামান্য বৃষ্টিতে। বিপদে ফেলতে পারে জনজীবনকে। 

    
অন্যদিকে হয়ত ভেবে দেখবার সময় এসেছে যে, উত্তরের প্রাণপ্রবাহ সদানীর তিস্তাকে আমরা হারিয়ে ফেলছি না তো! সেবক থেকে তিস্তাবাজার অবধি যেতে নদীর অবস্থা দেখে এরকমটা মনে হাওয়া অস্বাভাবিক নয়। এন এইচ পি সি নির্মিত বাঁধে বাঁধা পড়েছে তিস্তা। নদীর স্বাভাবিক গতি আজ রুদ্ধ। থমকে রয়েছে সে। বাঁধ-নির্মাণ ও সহায়ক রাস্তা তৈরিতে যে বিপুল পরিমান পাহাড় ভাঙা হচ্ছে তাতে এই অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র এক বিরাট প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশের ওপর এতটাই  বিরূপ প্রভাব পড়ছে যে তার রেশ পৌঁছে যাচ্ছে লামাহাটা বা মংপুর মতো তুলনায় উঁচু জায়গাগুলিতে। এমনিতেই  সেবক থেকে তিস্তাবাজার অঞ্চলটি ধ্বস-প্রবণ। বাঁধ বেঁধে জলস্তরকে আবদ্ধ করে ফেলায় বিপদ আরও বেড়েছে কেননা জলস্তরের অবিরাম অভিঘাত পাহাড়কে সামলাতে হচ্ছে। এর সঙ্গে রংপো অবধি রেলপথ বিস্তারের কাজ শুরু হলে পাহাড়ের কি দশা হতে পারে তা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। আর এই স্বাভাবিকতাকে নষ্ট করার জন্য সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে তিস্তাকে। পাহাড়ের চরিত্র বদলালে তা সরাসরি আঘাত হানবে নদীকে। নদী তার নিজের চরিত্র হারাবে।

ইতিমধ্যেই গজলডোবায় তিস্তা প্রকল্পের বাঁধে তিস্তার স্বাভাবিক গতিপথ রুদ্ধ হয়ে হয়েছে। তার ওপর আরও উঁচুতে দুটি বাঁধের  ফল ভুগতে হচ্ছে তিস্তার ওপর নির্ভর করে থাকা একটি বৃহৎ অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে। মেখলিগঞ্জ-হলদিবাড়ি অঞ্চলের তিস্তা নির্ভর সাধারণ মানুষকে দেখে অনুমান করা কঠিন না যে, অবস্থা কতটা সঙ্গীন। তিস্তার জলজীবনের ওপরও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। হারিয়ে যেতে বসেছে তিস্তার রুপোলি জীবন। যে তিস্তাকে ঘিরে এত আখ্যান ও কাহিনী সেই চেনা তিস্তা আজ হারাচ্ছে তার নাব্যতা ও গতি। এর ফল আর যাই হোক, কখনই ভাল হতে পারে না। তিস্তার জলজীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি জড়িয়ে যে মনুষ্যজীবন তাও আজ টালমাটাল। এক অঞ্চলের উন্নয়ন করতে গিয়ে আর একটি অঞ্চলের মানুষের বিপদ ডেকে আনা কখনোই কাম্য নয়। কিন্তু ঠিক তেমনটি ঘটে চলেছে তিস্তা পারের মানুষগুলির সঙ্গে। নর্মদা নদীতে যখন বাঁধ দেওয়া হয় তখন সমস্যাটা ছিল বেশ কিছু পরিবারের উৎখাত হওয়া। উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে সে সমস্যা মেটানো যেত বা যায়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সমস্যাটির শেকড় অনেক গভীরে। কেননা এখানে কোনো মনুষ্য-পরিবারের উৎখাত হওয়ার বিষয় নেই। বরং চরম ক্ষতির সম্মুখীন পরিবেশ। এই ক্ষতিপূরণ টাকার অংকে পূরণ করা সম্ভব নয়। আজ যেভাবে তিস্তাকে বাঁধা হচ্ছে সেভাবে চললে আগামীতে গাজোলডোবার পরবর্তী  তিস্তার অববাহিকা একটি মরা খাতে পরিণত হবে। বিপন্ন হবে মনুষ্যজীবন। পাশাপাশি অন্য রাষ্ট্রের কথাটিও মাথায় রাখতে হবে। কেননা তিস্তা সেই দেশে ওপর দিয়েও প্রবাহিত। এমনিতেই তিস্তার জলবন্টন নিয়ে দড়ি টানাটানি চলছে। নদী যদি শেষ পর্যন্ত শুকনো স্রোতায় পরিণত হয়, তবে সেই টানাটানি বন্ধ হলেও আখেরে ক্ষতি কিন্তু মানবজীবনের।    

সব মিলে উত্তরের পরিবেশ ব্যাপক পরিবর্তনের পথে। এই বদলে যাওয়া পরিবেশ আগামীদিনে উত্তরের সামগ্রিক জীবনে কী প্রভাব ফেলবে সেকথা ভবিষ্যত বলবে। কিন্তু এই কথা নিশ্চিন্ত করে বলা যায় যে, যদি অতি দ্রুত আমরা এই বদলকে রুখতে না পারি তবে অবস্থা সত্যিই আশঙ্কাজনক। এ যেনা মূর্খ কালিদাসের মতো গাছের ডালে বসে সেই ডাল কে কেটে ফেলার মতো। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, কালিদাসের উত্তরণ হয়েছিল। আমাদেরও দরকার সেটা। শুভ চিন্তা আর উদ্যোগ রুখে দিতে পারে এই ধ্বংসলীলা। সেটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি। 

(প্রকাশিত: অপরাজিতা অর্পণ /সম্পাদক: কুনাল নন্দী) 

No comments: