হরিদ্রাভ সন্ধ্যায় বানভাসি হয় চাঁদ
শৌভিক রায়
পরান মণ্ডলের জালে আজকাল আঁশবোরোলি আর ধরা দেয় না। অনীহা নামের গুপ্তরোগ গ্রাস করেছে তাদের।
গর্ভিণী হরিণীদেরও দেখা যাচ্ছে না । আকাশে মেঘ করলেই ওরা ভিড় জমাতো মস্ত পাকুড়তলায়। আসলে নেই সেই পাকুড় গাছ। বদলে পড়ে আছে তার বিরাট আস্ত গুঁড়িটা! গাছ নেই তো ঝরবে কী! স্নান করাবে কাকে? অগত্যা চলে যায় মেঘদল। অন্য কোথাও। অন্য কোনও খানে।
পেছনে পড়ে রইল তাই এক বিরাট ভূমি। সেই ভূমির মাথায় নীল পাহাড়। বুকে এঁকেবেঁকে থাকা গুচ্ছের নদী। ছোট, মাঝারি, বড় হরেক কিসিমের। পায়ের দিকে মস্ত ঢাল বলে সেই নদীরা বয়ে চলে দ্রুত।
চলে? নাকি চলত? পাহাড় থেকে বয়ে আসা পাথররা জেদ ধরেছে আর যাবে না। বালির সঙ্গে হাত মিলিয়ে তারা জাগিয়ে তুলেছে চর। এই শরতে সেই চর কাশ ফুলে ঢাকা। দূর থেকে দেখলে মনে হবে বরফ পড়ে আছে যেন!
এছাড়াও হয়েছে এক কাণ্ড! ভালবেসে জল,নদীকে আটকেছে মানুষের দল। বিরাট ব্যাপার সেসব। চাকা ঘুরছে। বিদ্যুৎ আসছে। চমক দিচ্ছে চারদিকে। নদীও হতভম্ব। সে জানতো না ঐশ্বর্য তার এত! থমকে গেছে সে। সহসাই।
ওদিকে চিলাপাতার অরণ্যে সাজো সাজো ব্যাপার। কালো মৃত্তিকা বড্ড খুশি আজ। রোদের সঙ্গে দেখা হবে যে! ঠাসাঠাসি ঘেসাঘেসি করে থাকা মহীরুহদের ষড়যন্ত্র ছিল এতদিন। সূর্যের আলো পেত না মৃত্তিকার সুখস্পর্শ। আদিম অন্ধকারে ছেয়ে থাকত চারদিক। হিংস্র শ্বাপদেরা ছমছমে ঘুরে বেড়াত যত্রতত্র। তাদের জ্বলজ্বলে চোখ ত্রাস আনতো আবহে।
মহীরুহ মরে গেছে। লাশ হয়ে ভিনদেশে পাড়ি দিয়েছে সে।
নিজের জেলে ডিঙিতে পরান মণ্ডল তাই আকাশ ধরে। গাঢ় নীল আকাশ। কখনও কৃষ্ণ কালো। কখনও ঝুপি ঝুপি অন্ধকার। কখনও তারা ভরা আকাশ। তার জালে ধরা পড়ে অনায়াস। ফাউ মেলে নীল সারি পাহাড়ের চিত্রপট। সবুজের ঝলক। সঙ্গে লাল নীল নানা রং। তোর্ষার চরের বিষণ্ণ শালিখ। একা ওদাল। কৃষ্ণচূড়া। কিংবা মাদার। কল্পিত রেখা পেরিয়ে বালিহাঁসেদের সঙ্গে উড়ে যেতে যেতে পরান দেখে নক্ষত্ররা ডাকে তাকে- সপ্তর্ষি, অরুন্ধতী, রোহিনী। প্রেমাসক্ত চোখে সে জেগে ওঠে করতোয়া, কুমলাইয়ে আর মুজনাইয়ের ধারে, নিজস্ব অবগাহন শেষে।
তবু টপ স্টেশনের নীলাকুরুনজির মতো সুখ তার কপালে ওই বারো বছরে একবার। প্রতি বছর কোনও হরিদ্রাভ সন্ধ্যায় বানভাসি হয় তার চাঁদ। জল থৈ থৈ চারধারে ভেলা বায় সে। জল সেঁচবার চেষ্টাও করে না সে। মা দুর্গা স্বয়ং যেখানে পারেননি, সেখানে কোন ছাড় সে!
থিকথিকে পলি জমে জমে হাতের মুঠোয় সর্বনাশ হলে, অদূরে ঢাকের আওয়াজ। পরান টের পায় প্রান্তসীমার টলটলে স্মৃতি জাগিয়ে মা আসছেন। কিছু হাঁড়িকুড়ি আর নিঃসীম মান-অভিমান নিয়ে, সে থিতু হয় আবার উদ্বাস্তু হবে বলে! পাওনা তার মায়ের মৃদু হাসি। অশ্বিনের নতুন ধানে রাইকিশোরীর চুলের গন্ধ।
কল্পনায় শরীরের আলপথ আর অজানা বাঁকে হেঁটে যেতে যেতে সে শোনে মধ্যবর্তী এক বেসুরো গান। তারপর বনজ্যোৎস্নায় স্নান। সবকিছু হারিয়েও অম্লান।
আসলে ছায়া সরে যায়। আর ছায়া সরতেই দাঁড়িয়ে থাকে ধুলো মাখা সময়। সেই সময়ের পরতে পরতে রয়ে যায় গোলাবাড়ির ধান, মাটির দাওয়ার আল্পনা, ফলবতী বৃক্ষ, দিঘিজল, দেশভাগ আর এক অদৃশ্য বৃত্তপথে। নিঃশব্দে কেটে যায় প্রবলপরাক্রমী রাত। যন্ত্রণার ছায়াঘরে কর্কট সেজে সুখ যখন কামড়ে ধরে, তখনই তো উলম্ব বিছানা পেতে শুয়ে পড়ে কেউ। হালকা ঝোলে। বুড়ো আঙুল দেখায় জীবনকে। পরাজয় নিশ্চিত জেনেও এই যে খেলতে নামা, যাবতীয় প্রত্যর্পণ শেষে, কীভাবে তাকে পরাজিত বলি!
দিগন্তে মন্দাক্রান্তা ছন্দে আরশিনগর দেখি তাই। হয়ে যাই পরান মণ্ডল। আঁকি অভিমানী ছবি নিজস্ব ক্যানভাসে।
`আকাশপ্রদীপ সবার সাথে/ তুলসীতলায় মায়ের আঁচল/ ইচ্ছেডানার স্বপ্ন উড়ান/ হঠাৎ সে যে দিনবদল!`
জানি দিনবদল হয় না। হতে পারে না।
তারাদের লিখে চলা ইতিহাসে অনির্দিষ্ট নির্দিষ্টতায় একক কেউ মিশে যায় আমাদের সবার সঙ্গে। এভাবেই।
(আজকের (২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৩) উত্তরবঙ্গ সংবাদের রংদার রোববারের `এলোমেলো গদ্য, উত্তরের ভাবনা`য় প্রকাশিত একটি লেখা। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা উত্তরবঙ্গ সংবাদ ও কার্যকরী সম্পাদককে।)

No comments:
Post a Comment