হায়দ্রাবাদের সালার জং সংগ্রশালা: এক অনন্য বিস্ময়
শৌভিক রায়
হায়দ্রাবাদে পৌঁছনোর পর থেকেই চেষ্টা করছিলাম মুসি নদীর তীরের বিশ্ববিখ্যাত সালার জং সংগ্রহশালায় পৌঁছতে। কিন্তু কিছুতেই আর সময় করে উঠতে পারছিলাম না।
সামান্য যেটুকু পড়াশোনা করেছি, তাতে বুঝেছি এই সংগ্রহশালা যদি খুঁটিয়ে দেখতে হয়, তবে হাতে রাখতে হবে অফুরন্ত সময়। কিন্তু সেটা আর হচ্ছে কোথায়! তবু চেষ্টা করছিলাম অন্যান্য দ্রষ্টব্যগুলির তুলনায় সালার জং সংগ্রহশালার জন্য খানিকটা বেশি সময় রাখতে। তাই বানজারা হিলসের পাদদেশে হুসেন সাগর লেকের বিস্তীর্ণ জলরাশি বা গোলকুন্ডা ফোর্টের বিশালত্ব দেখে নিয়েছি আগেই। চারমিনার, মক্কা মসজিদ আর করাচি বেকারি ছুঁয়ে এসেছি। রামোজি ফিল্ম সিটিতেও কাটিয়েছি গোটা একটা দিন। শিল্পরমমে আপ্লুত হতে হতেও, আবেগ চেপে রেখেছি সালার জং সংগ্রহশালার জন্য।
অবশেষে মিউজিয়াম ঢুকে খুব রাগ হয়ে গেল! এই রাগ আসলে অক্ষমতা থেকে। এত জলদি দেখা যায় নাকি এসব! কে দিব্যি দিয়েছিল এত কিছু সংগ্রহ করতে? সবকিছুর তো একটা সীমা আছে! কিন্তু এ তো সীমাহীন ব্যাপার। এত পারা যায় নাকি? এ কি কয়েক ঘন্টা বা গোটা একদিনের বিষয়? সব ঠিকঠাক দেখতে গেলে ঘাঁটি গেড়ে রয়ে যেতে হবে সংগ্রহশালায়!
আসলে এই অসামান্য সংগ্রহশালা নিয়ে লিখতে গেলে আস্ত একটা বই লিখে ফেলা যায়। ব্যক্তিগত সংগ্রহে এভাবে একটি বিরাট সংগ্রশালা গড়ে ওঠার নজির এই দেশে আর একটিও নেই। সারা পৃথিবীতেও এরকম দৃষ্টান্ত খুব কম। কিন্তু তার আগে বোধহয় একটু বলা বলা দরকার, সালার জং কে বা কারা।
কুতুব শাহি শাসনের পর হায়দ্রাবাদে চলে গিয়েছিল নিজামদের হাতে। ১৭২০ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত নিজামরা ছিলেন হায়দ্রাবাদের সর্বেসর্বা। কিন্তু ২০০ বছরের ওপর এই দীর্ঘ শাসন সম্ভব হত না যদি না পাইঘা ও উমরা-এ-উজ্জাম পরিবার থাকত। পদমর্যাদার দিক থেকে পাইঘারা ছিলেন নিজামদের ঠিক পরেই। আর উমরা-এ-উজ্জামদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সালার জং পরিবার। পাইঘাদের পরই গুরুত্ব পেতেন তারা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে তাঁদের গুরুত্ব আরও বাড়ে। Grand Viziers হিসেবে হায়দ্রাবাদের নিজামদের সাহায্যকারী প্রধান পাঁচটি পরিবারের একটি হয়ে ওঠেন তাঁরা। ইসলামিক দুনিয়ায় Grand Viziers বলতে বোঝায় সার্বভৌম কোনও রাষ্ট্রের শাসনকর্তাদের প্রধানকে। এর থেকেই বোঝা যায় যে, সালার জংরা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন নিজামদের হায়দ্রাবাদে। ঐতিহাসিক মতানুসারে, দেওয়ান দেবদি (দেওয়ান= প্রধানমন্ত্রী, দেবদি= হায়দ্রাবাদের বিখ্যাত পরিবারের প্রাসাদ) অট্টালিকার সালার জংরা হজরত মহম্মদের সমসাময়িক ওয়াসিস আল কারানির বংশধর। ওয়াসিস আল কারানির দশম বংশধর, দ্বিতীয় শেখ ওয়াসিস, বিজাপুরের সম্রাট আলি আদিল শাহের সময় ভারতে এসেছিলেন। খুব বেশি সময় নেনি তিনি নিজের প্রতিপত্তি বিস্তার করতে। একটি তথ্য দিলেই বোঝা যাবে তাঁরা কতটা প্রবাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন সেই সময়। সালার জং পরিবারের অধীনে যে ছয়টি জায়গীর বা তালুক ছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল পৃথিবীবিখ্যাত অজন্তা।
সালার জংদের বংশ নিয়ে আরও অনেকটা বলা যায়, কিন্তু সেটি দীর্ঘায়িত না ক`রে এটুকু জানাই যে, এই বংশের মুনির-উল-মুলকের পৌত্র তুরাব আলি ১৮৪১ সালে সালার জং বাহাদুর উপাধি পান। ছোটবেলায় পিতা সুজা-উদ-দৌল্লাকে হারানো প্রথম সালার জং ১৮৪৭ সালে খাম্মাম জেলার তালুকদার হন। পিতার অনুপস্থিতিতে প্রথম সালার জঙের পালনকর্তা কাকা সিরাজ-উল-মুলক ছিলেন সেই জেলার দিওয়ান। ১৮৫৩ সালে কাকার মৃত্যুর পর সমস্ত দায়ভার এসে পড়ে তাঁর ওপর। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেসব সামলান তিনি। শিল্প-সংস্কৃতির অন্যতম পৃষ্ঠপোষক হিসেবেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
তাঁরই পরম্পরা বর্তায় তৃতীয় সালার জং ইউসুফ আলি খানের ওপর। মাঝে দ্বিতীয় সালার জং মীর লায়েক আলি খান যেন নিজের পিতা ও পুত্রের প্রবল ব্যক্তিত্বের মাঝে খানিকটা নিষ্প্রভ হয়ে গেছেন। কিন্তু দুজনের মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী হিসেবে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাঁর সন্তান তৃতীয় সালার জঙের সময় প্রাসাদটি হয়ে উঠেছিল তদানীন্তন হায়দ্রাবাদের শিল্প-সংস্কৃতির মূল কেন্দ্র। তাঁর বিপুল সংগ্রহের নিট ফল আজকের সালার জং মিউজিয়াম, যার পরিচয় দুনিয়া ব্যাপী। এখানে রাখা শিল্প সামগ্রীর সংখ্যা হল ৪৬০০০। রয়েছে ৮০০০ পাণ্ডুলিপি, ৬০০০০ মুদ্রিত বই। এই বিপুল সংগ্রহের কিছু প্রথম সালার জং হলেও, অধিকাংশই করেছেন তৃতীয় সালার জং। একক প্রচেষ্টায় এত বিপুল মিউজিয়াম ভারত তো বটেই, সারা দুনিয়াতেও বোধহয় দ্বিতীয়টি নেই।
তৃতীয় সালার জঙের ইচ্ছে ছিল মীর আলম ট্যাঙ্কের কাছে খওয়াজা পাহাদি অথবা মৌলা আলিতে একটি মিউজিয়াম তৈরি করবার। পুনা ও উটিও ছিল তাঁর পছন্দের তালিকায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তাঁর প্রচেষ্টা সফল হওয়ার আগেই ১৯৪৯ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। শেষ যে শিল্পসামগ্রীটি তিনি কিনেছিলেন সেটি হল, টিপু সুলতানের হাতির দাঁতের চেয়ার। ষোড়শ লুই সেটি টিপুকে উপহার দিয়েছিলেন। এই বস্তুটি তৃতীয় সালার জঙের মৃত্যুর পর হায়দ্রাবাদে পৌঁছায়।
চিরকুমার তৃতীয় সালার জঙের মৃত্যুর পর, ভারত সরকার বিশেষ অর্ডিন্যান্স জারি করে একটি কমিটি গঠন করেন সালার জং এস্টেটের দেখভালের জন্য। তদানীন্তন হায়দ্রাবাদের চিফ সিভিল এডমিনিস্ট্রেটর এম কে ভেলোডি প্রখ্যাত শিল্প-সমালোচক ডক্টর জেমস কাজিনকে অনুরোধ করেন সালার জঙের সংগ্রহ নিয়ে একটি মিউজিয়াম গড়ে তুলতে। ডক্টর কাজিন অন্য কাজে ব্যস্ত থাকায়, তাঁরই পরামর্শে জি ভেঙ্কটচলম দায়িত্ব নেন। এর পরই শুরু হয় প্রস্তাবিত মিউজিয়াম তৈরির কাজ। ঠিক হয়, সালার জংদের পৈতৃক বাড়ি দেওয়ান দেবদিতে এই মিউজিয়াম গড়ে তোলা হবে। সেভাবেই কাজ শুরু হয়।
অবশেষে ১৯৫১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু মিউজিয়ামের উদ্বোধন করেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে দেওয়ান দেবদি আধুনিক মিউজিয়ামের জন্য উপযুক্ত ছিল না। ফলে সালার জং এস্টেট কমিটি মুসি নদীর দক্ষিণ প্রান্তে ৫.৮ একর জমি দান করেন। কেনা হয় আরও ৪.৭৫ একর জমি। রাজ্য সরকার মিউজিয়ামের জন্য ৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেন। কিন্তু নতুন মিউজিয়াম তৈরি করতে যে বিপুল টাকা লাগছিল তার সংস্থান কোনোভাবেই হচ্ছিল না। তাই সিদ্ধান্ত হয়, ধাপে ধাপে মিউজিয়ামটি তৈরি করা হবে।
১৯৬৩ সালের ২৩ জুলাই পন্ডিত নেহেরু নতুন ভবনের ভিত স্থাপন করেন। ১৯৬৮ সালে তৈরি হয় সেন্ট্রাল ব্লক। ততদিনে খরচ হয়ে গেছে ৩৮.৪৬ লক্ষ টাকা। ওই বছরের ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি জাকির হোসেন জনসাধারণের জন্য নতুন মিউজিয়াম উদ্বোধন করেন। বিপুল সংগ্রহের জন্য পরবর্তীতে আরও দুটি ব্লক তৈরি করা হয় ১৯৯৯ সালে। এই মুহূর্তে মিউজিয়ামে তিনটি ব্লকে গ্যালারির সংখ্যা ৩৯টি। ইন্ডিয়ান ব্লকে রয়েছে ৩০টি, ওয়েস্টার্ন ব্লকে ৭টি ও ইস্টার্ন ব্লকে আছে ২টি গ্যালারি। মিউজিয়ামের প্রদর্শিত সংগ্রাহকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে- ভারতীয়, পার্সিয়ান, নেপালি ও তিব্বতি, সিনো-জাপানিজ ও পাশ্চাত্য শিল্প। ধীরে ধীরে বলা যাবে তাদের কথা। শোনা যায়, জায়গার অভাবে আরও অনেক সংগ্রহ প্রদর্শিত করা যায় নি। টিপু সুলতানের হাতির দাঁতের চেয়ার ছাড়াও নূরজাহানের ড্যাগার, ঔরঙ্গজেবের তরোয়াল, জাহাঙ্গীরের মদ্যপানের কাপ, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর- রবি ভার্মার ছবি....কোনটা ছেড়ে বলব কোনটা!
সালার জং মিউজিয়ামের শিল্প সংগ্রহ চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। একক সংগ্রহে এত কিছু রয়েছে যে সব দেখে শেষ করে যায় না। সমগ্র দাক্ষিণাত্য তো বটেই, কলকাতা বাদে সারা ভারতের খুব কম মিউজিয়ামেই এত সংগ্রহ রয়েছে! ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের শিল্পকীর্তির পাশাপাশি রয়েছে রাজস্থানি, বাশোলি, কাংড়া ইত্যাদি রীতির শিল্পকর্ম। চিত্রকলায় রয়েছেন নন্দলাল বোস, বিনোদবিহারী মুখার্জি, মকবুল ফিদা হুসেন সহ আরও অনেক প্রখ্যাত শিল্পীরা। অষ্টম শতকের জৈন ধর্মের ও ৯০০ খ্রিস্টাব্দের ভগবান বিষ্ণুর মূর্তি সহ ব্রোঞ্জের মূর্তির সংখ্যা প্রায় ২০০।
কাশ্মীরি শালের পাশাপাশি বাঁধনি, জামদানি, বালুচরি, গোলকোন্ডা কটন, কচ্ছ ও কাথিওয়ারের এম্ব্রয়ডায়ারি, চাম্বার রুমাল, গুজরাটি পাটোলা ইত্যাদি ভারতীয় শিল্প সংগ্রহের অন্যতম। হাতির দাঁতের বিভিন্ন সামগ্রী দেখে তাক লেগে যায়। মনুষ্য মূর্তি থেকে হাতির দাঁত সুতো হিসেবে ব্যবহার করে বানানো ম্যাট দেখে নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। নানাবিধ রত্নরাজি খচিত মুঘল ও তার পরবর্তী আমলের কাপ, হুক্কা, প্লেট, বেল্ট, বই রাখবার স্ট্যান্ড, আংটি, চুলের কাঁটা ইত্যাদি দেখে ভাবছিলাম যে, একসময়ে কী সমৃদ্ধ-ই না ছিল আমাদের দেশ! মিউজিয়ামে সংগৃহিত অস্ত্রের সংখ্যা ১২০০, আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে ১৯৬টি। বিভিন্ন সাইজের, বিভিন্ন ধরণের, বিভিন্ন ধাতুর এই অস্ত্র শুধু ভারত থেকেই নয়,আনা হয়েছে বিশ্বের নানা দেশ থেকে। কুতুব শাহি আমলের দুটি তরোয়াল, জাহাঙ্গীর, শাজাহান ও আওরঙ্গজেবের ব্যবহৃত অস্ত্রও বিশেষ আকর্ষণ। ভারতীয় সংগ্রহের মধ্যে পালকি, চন্দন কাঠের চেয়ার, কাঠের নানা সামগ্রী ইত্যাদি মিলে এক এলাহি কান্ড!
পার্সিয়ান সংগ্রহের মধ্যে পোর্সেলিন, কাঁচ, এনামেল, টেক্সটাইল, পেন্টিং ইত্যাদির পাশাপাশি কার্পেটগুলিও অসামান্য। নেপালি, তিব্বতি, বার্মিজ সংগ্রহে আকর্ষণ করে তামা ও ব্রোঞ্জের নানা ধরণের স্থাপত্য, খুকরি, মসলার বাক্স ইত্যাদি। চাইনিজ ও জাপানিজ বস্তু সংগ্রহে সালার জং মিউজিয়াম ভারতের অন্যতম সেরা। রয়েছে ৫০০০-এর বেশি প্রদর্শিত সামগ্রী। মিং সাম্রাজ্যের থেকে শুরু করে আধুনিক কালের নানা জিনিষ সত্যিই দেখবার। তবে চাইনিজ ও জাপানিজ শিল্প সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকলে এদের রস আস্বাদন করা কঠিন। তবু ভাল লাগে মিনিয়েচার পেন্টিং, সামুরাই তরোয়াল, সিল্ক এমব্রয়ডারি ও অন্যান্য জিনিষগুলি। পাশ্চাত্য গ্যালারিও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ইংরেজ, ইতালিয়ান, ফরাসি শিল্পীদের আঁকা ছবি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে হয়। ইতালিয়ান শিল্পী ক্যানালেত্তর Piazza San Marco চিত্রকলাগুলির মধ্যে সবচেয়ে নামী। আর স্থাপত্যে বেনজোনির Veiled Rebecca তো জগৎবিখ্যাত। একই কাঠের গুঁড়িতে সৃষ্ট অনামী শিল্পীর মেফিস্টোফিলিস-মার্গারেট মূর্তিটি বিস্মিত করে তোলে। রয়েছে ভেনিস, ফ্রান্স, বোহেমিয়া, আমেরিকা, বেলজিয়াম, ইস্তাম্বুল, চেকোস্লোভাকিয়া থেকে আনা কাঁচের নানা সম্ভার। ঘড়ি রয়েছে জার্মানি, হল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ইত্যাদি দেশের।
সালার জঙ মিউজিয়ামের ঘড়ি প্রসঙ্গে বলি সেই বিখ্যাত ঘড়িটির কথা। ইংলিশ ব্র্যাকেট ক্লিক নামে বিখ্যাত এই ঘড়িটি ইংল্যান্ডে তৈরি হয় আর ঘড়ির বিভিন্ন অংশ জোড়া লাগানো হয় ঊনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতা শহরে। কুক এন্ড কেলভি কোম্পানির থেকে তৃতীয় সালার জং ঘড়িটি কিনেছিলেন। মোট ৩৫০টি পার্টস থাকা এই ঘড়িটি প্রত্যেক ঘন্টার তিন মিনিট আগে দাড়িওয়ালা একটি মূর্তি বেরিয়ে এসে ঘন্টা বাজিয়ে আবার ঘড়ির ভেতরে চলে যায়। আর একটি মূর্তি হাতুড়ি নিয়ে, না থেমে, সেকেন্ড ঘোষণা করে। পনের মিনিট পর পর সময় জানানোর পাশাপাশি ঘড়িটিতে দিন, তারিখ ও মাস প্রদর্শনের তিনটি ডায়াল রয়েছে। সালার জং মিউজিয়ামের এই ঘড়িটি দেখতে নানা জায়গা থেকে ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা। আসবাবপত্রের বর্ণনায় আর গেলাম না। সোফা সেটের সমাহার দেখে নিজের জন্য করুণা হচ্ছিল। আর এখানে কী নেই! তবে মিউজিয়ামের লাইব্রেরি সম্পর্কে না বললেই নয়। মুদ্রিত বইয়ের সংগ্রহ মাত্র(!) ৬২,৭২২ টি। এর মধ্যে ইংরেজি বই ৪১,২০৮, উর্দু ১৩,০২৭, হিন্দি ১১০৮, তেলেগু ১১০৫, পার্সিয়ান ৩৫৭৬, আরবি ২৫৮৮, তুর্কিশ ১৬০ টি। আরবি, পার্সিয়ান, উর্দু ও অন্যান্য ভাষার পাণ্ডুলিপি রয়েছে মাত্রই (!) ৮০৫৫৬টি।
সব দেখে শুনে চক্ষু চড়কগাছ করে যখন সালার জং মিউজিয়াম থেকে বাইরে এসেছি তখন বিকেল। পাঁচটা বেজে গেলেও আকাশে যথেষ্ট আলো। অদূরে দেখা যাচ্ছে হাইকোর্ট আর তার উল্টোদিকে ওসমানিয়া হাসপাতাল। তাদের সুন্দর স্থাপত্য আর বিশালত্ব দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও মন তখন আচ্ছন্ন হয়ে আছে সালার জং মিউজিয়ামে। মুসি নদীর তীরে হাঁটতে হাঁটতে আর একবার ফিরে তাকালাম মিউজিয়ামের দিকে। জীবন সার্থক হল ঠিকই, কিন্তু ইচ্ছে যেন আরও বেড়ে গেল। আসলে বিত্ত ও বৈভবের সঙ্গে যদি রুচির ঠিকঠাক মিশেল হয়, তবে এরকম সংগ্রহশালা গড়ে ওঠে। কিন্তু সেটি তো সবার ভাগ্যে হয় না। কেউ কেউ শুধু বিত্তের পেছনেই ছোটেন। কেউ কেউ ইচ্ছে থাকলেও পেরে ওঠেন না। সঠিক সময়ে সঠিক মূল্যে সঠিক বস্তুটি সংগ্রহে খানিকটা ভাগ্যেরও প্রয়োজন হয়। তৃতীয় সালার জং সেদিক থেকে সত্যিই ভাগ্যবান ছিলেন। কিন্তু তার চাইতেও বড়, নিজের সংগ্রহকে সবার মধ্যে তুলে ধরতে তিনি পিছপা হননি। এই ব্যাপারটিও লক্ষ্যণীয়। হায়দ্রাবাদে যারাই যাবেন ভবিষ্যতে, অন্তত একটিবার নিজের চোখেই দেখে আসবেন একক প্রচেষ্টার একটি সংগ্রহশালা কী হতে পারে! এরকম অভিজ্ঞতা এক জীবনে খুব বেশি হয় না!
প্রকাশিত: গোডো আসবেই (পঞ্চম সংখ্যা)/ সম্পাদক- অভিজিৎ দাশ
(লিখেছেন- ডঃ সুশান্ত কুমার চক্রবর্তী, দিবাকর মুখার্জী, তীর্থ চক্রবর্তী, ডঃ রণজিৎ কুমার মিত্র, গৌতম গুহ রায়, সঞ্জয় সাহা, ডঃ জয়দীপ সরকার, অভিজিৎ দাশ, ডঃ বিপ্লব কুমার সাহা, আরণ্যক চক্রবর্তী, ডঃ সব্যসাচী দত্ত, ডঃ রাজর্ষি বিশ্বাস, দীপালোক ভট্টাচার্য )

































