Friday, July 14, 2023

একটি পুরষ্কার ও কিছু না বলা কথা

শৌভিক রায় 

সেই ছোট্ট ছেলেটার কথা ভীষণ মনে পড়ছে! সেই ছোট্ট ছেলেটা যে দিনহাটা গার্লস স্কুলের লোহার গেটটা ঝাঁকিয়ে চলেছে আর চিৎকার করে বলছে গেটটা খুলে দিতে। 

আজ রেজাল্টের দিন। তার নিজেরও রেজাল্ট বেরিয়েছে। গোপালনগর শরণার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সে দৌড়ে চলে এসেছে মায়ের কাছে। কিন্তু মায়ের স্কুলের গেট বন্ধ। গেটের বাইরে চিৎকার চেঁচামেচি। সেই ছোট্ট ছেলের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে যাচ্ছে  তীব্র কোলাহলে। কিছুতেই সে বুঝতে পারছে না যে, কী করবে! তার মতো ছোট্ট ছেলের কাছে এই দিনহাটা শহর এক বিরাট জায়গা। বাবা থাকেন ভিন শহরে। বাড়িতে অন্যান্যরা থাকলেও, মা ও মায়ের সহকর্মীদের ঘিরেই তার জগৎ। অন্য দিন সে সোজা ঢুকে পড়ে স্কুলের ভেতর। কিন্তু আজ কিছুতেই গেট খুলছে না। দিশেহারা সে। কী করবে, কোথায় যাবে কিছুতেই বুঝতে পারছে না! তার তখন কান্নার উপক্রম। এর মধ্যেই কেউ একজন বলে উঠল, 'এই ছেলেটা বোধহয় ফেল করেছে।  কীরকম কান্না কান্না মুখ!` নিজের ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া ছেলেটির সে কথার উত্তর দেওয়ার স্পৃহাও আর নেই। সে একান্ত চাইছে মায়ের স্কুলে ঢুকতে, মাকে জানাতে তার রেজাল্ট। কিন্তু কোথায় গার্লস স্কুলের শিক্ষাকর্মী রামেশ্বরদা বা রতনদা কিংবা লাবণ্যমাসি। কে খুলে দেবে গেট!! 

হঠাৎ ছেলেটির পিঠে কেউ হাত রাখল। মুখ ঘুরিয়ে ছেলেটি দেখল তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে প্রিয় রাজাদা। অন্যদিন অনেকসময় সে আর রাজাদা একসঙ্গে মায়ের স্কুলে আসে। আজ রাজাদা পরে এসেছে। রাজাদাকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে। প্রাণ ফিরে পেল। রাজাদা ততক্ষনে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। রাজাদার ছোট্ট হাত দুটো হয়ে উঠেছে আশ্রয়ের হাত! তিরতির করে কাঁপতে থাকা ছোট্ট ছেলেটি ধীরে ধীরে শান্ত হয় এরপর....

পরের ঘটনা সহজবোধ্য। স্কুলের গেট খুলেছিল। সে এবং রাজাদা স্কুলে ঢুকেছিল। তাদের রেজাল্ট দেখে মায়েরা আনন্দ পেয়েছিলেন। ঝর্ণামাসি, প্রতিমামাসি, সন্ধ্যামাসি বা মানি, গৌরীপিসি, ইলামসি, জয়তীপিসি আর অতি অবশ্যই বেলামসি তাদের আদর করেছিলেন। বেলামসি তো চুলের বেণী ঝুলিয়ে দিয়ে ছেলেটিকে বলেছিলেন অন্যান্য দিনের মতো চুল ধরে ঝুলতে। রাশভারী সন্ধ্যামাসি গাল টিপে দিয়েছিলেন। প্রধানশিক্ষিকা মুকুলমাসি আর একটা পান মুখে দিয়ে আশীর্বাদ দিয়েছিলেন। ঝর্ণামাসি বলেছিলেন, তাদের বাড়িতে গেলে ঘুঘনি করে খাওয়াবেন। খানিক আগের সেই বিচলিত অবস্থা থেকে উদ্ধার পেয়ে ছেলে তখন নিশ্চিন্ত। ইতিমধ্যে চলে এসেছে রিঙ্কু, রূপা, বাবুদা, ইমন, তানিয়া। জমে উঠেছে তাদের খেলা। 

সেদিনের সেই ছেলেটি আজকের আমি। সেদিনের সেই সাহচর্যের হাত পিঠে রাখা রাজাদা আসলে অনির্বাণ নাগ। ঝর্ণামাসি হলেন রাজাদার মা। বাকি যে  নামগুলি বললাম তাঁরা ছিলেন দিনহাটা গার্লস স্কুলের দিদিমনি। চুল খুলে দিতেন যিনি তিনি জননেতা কমল গুহর স্ত্রী প্রয়াত বেলা গুহ, যাঁর বড় মেয়ে ইন্দ্রানীদি আজও আমার খোঁজ নেন। মানি বা সন্ধ্যা সাহা সহ বাকি দিদিমণিদের‌ও চেনেন কম বেশি সবাই।

আসলে দিনহাটা মানে আমার কাছে এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া। প্রাইমারি স্কুল ওখানে শুরু করলেও ক্লাস থ্রি-তে উঠে আমি চলে গিয়েছিলাম ফালাকাটায় বাবার কাছে। বাবা নিজের কর্মজীবনের শুরুতে ছিলেন দিনহাটা হাই স্কুলে। কিন্তু আমার জন্মের আগে  ফালাকাটায় চলে যান হেডমাস্টার হয়ে। সেই অর্থে আমার খুব ছোটবেলা ছিল বাবাকে ছাড়া। আবার ফালাকাটায় চলে গেলে মা ছাড়াই থাকতে হয়েছে অনেকগুলি বছর। পরে অবশ্য মা-ও ফালাকাটায় চলে যান। কিন্তু মূল বাড়ি এবং কলেজ জীবন দিনহাটায় হওয়ার সুবাদে এখানকার রাস্তাঘাট, মানুষজন সবই আমার একান্ত আপন। তাই আজও মহামায়া পাট হয়ে হাটখোলার দিকে গেলেই তেল-ডাল-চাল-নুন-তামাক সব মিলেমিশে থাকা সেই অদ্ভুত গন্ধ যেমন পাই, তেমনি থানার পুকুরের বিরাট বট গাছটার  ফাঁকে দিয়ে ছোটবেলার আশ্বিন রাতের নীল আকাশে পূর্ণ চাঁদ দেখি। কোনও এক মহালয়ার সকালে মা সন্তোষী বাসটির ধাক্কায় নিহত হরতোষ চক্রবর্তী যেমন আজও স্বপ্নে আসেন, তেমনি মনের চোখে দেখি আমাদের বাড়ির সামনের মসজিদের পাশে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকা কাবুলিওয়ালা মির্জা খান সাইকেলে চাপিয়ে আমাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর ছোট মেয়ে দেখলেই বলছেন, 'শুববু...এই লেড়কি কো বিয়া করবে?' দিনহাটা মানে আজও নবপল্লব পত্রিকার ক্ষুদে সম্পাদক পাজামা পাঞ্জাবি পরা অমিত কুমার দে-এর সঙ্গে কোচবিহার থেকে মিনিবাসে দিনহাটায় ফেরা আর তোর্সা ব্রিজে আটকে থাকা। দিনহাটা মানে এখনও রিকশা চেপে সেই কত্ত দূরের ঝর্ণা মাসির বাড়িতে সঞ্জয়, রাজাদা আর রিংকুর সঙ্গে খেলতে যাওয়া!

বদলে যাওয়া দিনহাটায় এখনও যেন খুঁজে পাই নিজের অস্তিত্ব, কেননা আজও কোনও শহর আমাকে নিজের মনে করেনি। দিনহাটা ভেবেছে আমি ফালাকাটার, ফালাকাটা ভেবেছে আমি দিনহাটার, আর কোচবিহার ভেবেছে বাইরে থেকে আসা কেউ একজন! অস্তিত্বের দোলাচলে এখনও যখন ভুগি, কখনও ছুটে যাই দিনহাটায় কখনও বা মূজনাই তীরের ফালাকাটায়। বেঁচে যায় আমার অহং, আমার নিজস্বতা। 

গত বছর এক শরৎ সন্ধ্যায় দিনহাটায় এমন একজন মানুষের নামে সম্মাননা পেলাম, যাঁকে প্রথম জীবনে মেসো বলে ডেকে এসেছি আর পরবর্তীতে দিনহাটা কলেজে পড়বার সুবাদে 'স্যার'। অন্য একটি অদ্ভুত সমাপতনও আছে। যাঁর নামে এই সম্মান প্রদত্ত হল সেই তিনি, শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক হিতেন নাগ, ছিলেন সেই স্কুলের ছাত্র, যে স্কুলে আমি আজ কর্মরত। 

তাঁর সম্পর্কে নতুন করে আর কী বলার আছে! দিনহাটার মতো প্রান্তিক শহরে বসে তিনি যে কাজ করে গেছেন তাঁর মূল্যায়ন ভবিষ্যৎ করবে। এমন একজন মানুষের নামে প্রদত্ত স্মৃতি সম্মাননা আমার মতো একজন অকিঞ্চিৎকর মানুষকে প্রদানের মাধ্যমে বকলম তাদের মহত্ব প্রকাশ করলেও, সম্মাননার সঠিক বিচার করলেন কিনা সে বিষয়ে আমি নিজে অন্তত সন্দিহান। তাই নিজের কৃতজ্ঞতা ও ঋণ স্বীকার করছি দ্ব্যর্থভাবে। নিজের সামান্য লেখালিখিতে কোনোদিনই ভাবিনি যে, কোনও সম্মাননার যোগ্য আমি! আনন্দ হচ্ছিল ঠিকই কিন্তু, অস্বীকার করব না, ভয়ও একটু ছিল। কেননা সম্মাননার মর্যাদা রাখার গুরু দায়িত্ব কিন্তু মাথায় চাপিয়ে দিলেন বকলম। তার ওপর এই সম্মাননা দিলেন এমন এক পরিবার ও সাহিত্য গোষ্ঠী, যাঁদের যাপনে অধ্যাপক হিতেন নাগ সবসময় উপস্থিত। পাশাপশি আমার বা আমাদের পরিবারের সঙ্গে তাঁদের যে হৃদ্যতা তা কেবল অনুভূত ও অনুমেয়। তাই এই সম্মাননা গ্রহণ আমার দিনগুলিকে নিঃসন্দেহে কঠিন করেছে, বলা বাহুল্য সেটা।

 
ওই বিশেষ দিনে বারবার মনে পড়ছিল নিজের বাবা- মায়ের কথা। ওঁরা থাকলে সবচেয়ে খুশি হতেন। দুর্ভাগ্য মাত্র এগারো মাসের ব্যবধানে দুজনকেই হারিয়েছি কিছুদিন আগে। আজ আমি যেভাবে যেটুকু সবই তো তাঁদের জন্য। আর এই দিনহাটা শহরে আজও মায়ের কত ছাত্রী রয়েছেন! রয়েছেন বাবার ছাত্ররাও। মনে পড়েছে আমার শ্বশুর মশাই দেওয়ানহাট উচ্চ  বিদ্যালয়ের সহ-প্রধান শিক্ষক প্রয়াত বলিপ্রসাদ সাহাকে। ভীষণ উৎসাহিত করতেন তিনি। আমার সেজকাকু নাট্যব্যক্তিত্ব প্রয়াত মদন রায়ও আজ বড্ড খুশি হতেন। তবে সব আক্ষেপ নিমেষে মুছে দিলেন, শ্রীমতী ঝর্ণা নাগ। তাঁর প্রবল বাৎসল্য যে আজও কতটা টনিকের কাজ করে সেটা নিয়ে গবেষণা করা যেতেই পারে। 

সবসময় মনে করি যে, সাফল্য শুধু পাহাড়ের চূড়োয় ওঠা নয়, চূড়ো থেকে সাবধানে নেমে আসাকেও বোঝায়। ম্যালোরি তাই এভারেস্ট জয় করেও বিজয়ী হন না। তিনি আরোহন করেছিলেন, অবরোহন করতে পারেন নি। একই ভাবে সম্মাননা পেলেই হয় না, তার মর্যাদা রাখতে হয়। আর এই সম্মাননা তো এমন একজন মানুষের নামে যিনি আমার কাছে প্রকৃত শিক্ষক, দার্শনিক ও পথ প্রদর্শক। প্রার্থনা তাই, এই উত্তরণ শেষে অবরোহন যেন মসৃণ হয়। রাখতে পারি যথাযোগ্য মর্যাদা!

(প্রকাশিত: বকলম, পুজো সংখ্যা, ২০২২)

No comments: