স্বাধীনতা আন্দোলনে ডুয়ার্স
শৌভিক রায়
স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব বর্ষে যখন সমগ্র ভারত স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস স্মরণ করছে, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে সেই সময় এই রাজ্যের উত্তরের ডুয়ার্স অঞ্চল কীভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল? সেই আলোচনায় ঢুকবার আগে অবশ্য ডুয়ার্স শব্দটির অর্থ কী এবং কোন অঞ্চলকে ডুয়ার্স বলে সেটা জানা দরকার। আমরা আবেগের বশে `ডুয়ার্স` বলে থাকি ঠিকই, কিন্তু ডুয়ার্স সম্পর্কে আমাদের অনেকের সুস্পষ্ট ধারণা নেই।
ডুয়ার্স শব্দটি এসেছে ইংরেজি ডোর থেকে। ভারতীয় শব্দ দ্বার থেকেও তার আসবার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু তিস্তা থেকে সংকোশ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এই ভূভাগকে, ডোর শব্দের বহুবচনে ডোরস এবং ডোরস থেকে অপভ্রংশে ডুয়ার্স বলবার পেছনের কারণটি ঠিক কী? আসলে এই অঞ্চলে ছিল দুর্গম ভুটানে যাওয়ার জন্য বা ভুটান থেকে সমতলে আসবার জন্য ছিল বেশ কয়েকটি গিরিপথ। একটা সময় ভুটান ছিল বহিরাগতদের জন্য নিষিদ্ধ দেশ। ভুটানিরা স্বয়ং এই পথগুলি দিয়ে সমতলে এসে ব্যবসা করতো , অনেকসময় লুটপাটও চালাতো। বহির্মহলে ভুটানের পরিচিতি ছিল লস্ট হরাইজন বা সাংগ্রিলা নামে। ঘন অরণ্য, হিংস্র শ্বাপদের এই ভূমিকে নিজেদের সাম্রাজ্যভুক্ত করবার খুব একটা ইচ্ছে ইংরেজদের কোনোদিন ছিল না, কেননা তারা জানতো যে, এখান থেকে সেভাবে রাজস্ব পাওয়া যাবে না। কিন্তু ১৮৩৫ সালে দার্জিলিং ইংরেজদের অধীনে এলে এই অঞ্চলের গুরুত্ব খানিকটা বৃদ্ধি পায়, কেননা ভুটানের ভেতর দিয়ে তিব্বতে বাণিজ্য করবার জন্য এই গিরিপথগুলির একান্ত প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজনের তাগিদেই ইংরেজরা মোট ১৮টি গিরিপথ আবিষ্কার করেছিল তিস্তা থেকে অসমের ধানসিঁড়ি পর্যন্ত। এগুলি হল- ১/ ডালিমকোট (বর্তমান কালিম্পঙ জেলায়), ২/ ময়নাগুড়ি বা জুমের কোর্ট (বর্তমান জলপাইগুড়ি জেলায়), ৩/ চামুর্চি (বর্তমান জলপাইগুড়ি জেলায়), ৪/ লক্ষী বা ল্যাককি (বর্তমান জলপাইগুড়ি জেলায়), ৫/ বক্সা বা পাশাখা (বর্তমান আলিপুরদুয়ার জেলায়), ৬/ ভল্কা বা ভুলকা (বর্তমান আলিপুদুয়ার জেলায়), ৭/ বরা (বর্তমান আসামের কোকরাঝাড় জেলায়), ৮/ গুমর ( বর্তমান আসামের কোকরাঝাড় জেলায়), ৯/ রিপো (বর্তমান আসামের কোকরাঝাড় জেলায়), ১০/ চেরাং ( বর্তমান আসামের কোকরাঝাড় জেলায়), ১১/ বাগ বা ছোট বিজনি (বর্তমান আসামের কামরূপ জেলায়), ১২/ বুড়িগুমা (বর্তমান আসামের দরং জেলায়), ১৩/ কালিং (বর্তমান আসামের দরং জেলায়), ১৪/ শুরকুল্লা (বর্তমান আসামের কামরূপ জেলায়), ১৫/ বংসকা (বর্তমান আসামের কামরূপ জেলায়), ১৬/ চাপাগুড়ি (বর্তমান আসামের কামরূপ জেলায়), ১৭/ চাপাঘামা (বর্তমান আসামের কামরূপ জেলায়), ১৮/ বিজনি (বর্তমান আসামের কামরূপ জেলায়)। এখানে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, প্রথম ১১টি স্থান ব্রিটিশ আমলে বেঙ্গল ডুয়ার্স ও বাকি ৭টি জায়গা আসাম ডুয়ার্স নাম পরিচিত ছিল। কিন্তু আজ আর এভাবে ভাগ করা হয় না। বরং সংকোশ নদীকে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বিভাজনকারী নদী হিসেবে ধরে নিয়ে সংকোশের পশ্চিম থেকে তিস্তা নদীর পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত ভূভাগকে ডুয়ার্স বলে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে।
ইংরেজরা যখন ডুয়ার্স সম্পূর্ন নিজেদের দখলে নেয় তখনও তারা জানে না যে, ডুয়ার্স তাদের কাছে অচিরেই স্বর্ণখনিতে পরিণত হবে। আর সেই স্বর্ণখনি হল
সবুজ সোনা বা চা। একটা সময় ছিল যখন চা ছিল চিনের নিজস্ব উৎপাদন। চীন সম্রাট শেঙ যে পানীয় খেয়ে উল্লসিত হয়েছিলেন তা ছিল চা। চতুর্দশ শতকে চা সমগ্র চিনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সপ্তদশ শতকে ইউরোপিয়ান অভিযাত্রীদের হাত ধরে চা পৌঁছে যায় ইউরোপে। উষ্ণ এই পানীয়টি ইউরোপ অত্যন্ত সমাদর পায়। ইংল্যান্ডে চা প্রায় জাতীয় পানীয়ের পরিণত হয়েছিল। ১৮৩৩ অবধি ইংল্যান্ডের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চিন থেকে ইউরোপে চা-চালানে একচেটিয়া রাজত্ব করত। কিন্তু এরপর ইউরোপের বিভিন্ন কোম্পানি এসে গেলে তাদেরকে কড়া মোকাবিলার সম্মুখীন হতে হয়। ইতিমধ্যেই কিন্তু ব্যবসায়ী ইংরেজরা ভাবতে শুরু করেছিল যে, যদি তাদের অধীনে চা-বাগান থাকত তবে তাদের মুনাফা নিয়ে ভাবনা থাকত না। সেসময় ইংরেজদের ভাগ্যলক্ষ্মীও সহায় ছিল।হয়ত সেই কারণেই, ১৮২৩ সালে মেজর রবার্ট ব্রুস আসামের জঙ্গলে চা-গাছ আবিষ্কার করেছিলেন। ভবিষ্যৎ বুঝতে পেরে, ধূর্ত ইংরেজরা ১৮২৫ সালে দ্রুত আসাম দখল করে চা-চাষে উদ্যোগী হয়। তাদের উদ্যোগ সফল হয় ১৮৩৮ সালে। সে বছর লন্ডনের আন্তর্জাতিক নিলামে আসামের চা বিক্রি হয় এবং সুগন্ধের জন্য অচিরে সেই চা ইউরোপ সাড়া ফেলে। এর ফলে আসামের চায়ের এক নতুন দিগন্ত খুলে যায় ও দলে দলে ইংরেজ আসামে আসতে শুরু করে। আসাম তার চায়ের জন্য পৃথিবী-বিখ্যাত হয়ে ওঠে।
এদিকে ১৮৪১ সালে ডঃ ক্যাম্পবেল দার্জিলিঙে নিজের বাড়িতে খানিকটা শখেই চা-গাছ পুঁতেছিলেন। সেই গাছ তরতরিয়ে বেড়ে ওঠায় ইংরেজরা বুঝেছিল যে, দার্জিলিঙের মাটি ও আবহাওয়া চা-চাষের অনুকূল। তাই দার্জিলিঙের সিভিল সার্জেন মেজর গ্রামলিনের হাত ধরে দার্জিলিঙে একের পার এক চা-বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু ডুয়ার্সের মাটিও যে চা-চাষের অনুকূল সেটা বুঝতে ইংরেজরা বুঝতে পারে নি বলে, ডুয়ার্স এইসব ব্যাপার থেকে তখনও অনেকটা দূরে ছিল। অবশেষে ১৮৭৪ সালে আজকের গাজলডোবায় হাউটন সাহেব প্রথম ডুয়ার্সের চা-বাগিচা প্রতিষ্ঠা করেন। ডুয়ার্স অঞ্চলে যখন চা-চাষে সাফল্য এলো, তখন ডুয়ার্সের গভীর জঙ্গল কেটে শুরু হল চা-বাগান প্রতিষ্ঠার কাজ। মাত্র কয়েক বছরেই ডুয়ার্সের নানা অঞ্চলে গড়ে উঠলো ১৯টি জনপদ শুধুমাত্র চা-বাগানকে কেন্দ্র করে। আর চা-বাগান তৈরির কাজে ছোটনাগপুর, নেপাল ও সিকিম থেকে নিয়ে আসা হল শ্রমিকদের। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে ডুয়ার্সের চা-শ্রমিকদের মধ্যে ৮০ শতাংশ ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে নিয়ে আসা শ্রমিকেরা। বাকি ২০ শতাংশ শ্রমিক নেপাল ও সিকিম থেকে আনা হয়। অদ্ভুতভাবে ডুয়ার্সের নিজস্ব আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষেরা কিন্তু চা-শ্রমিকের কাজে নিযুক্ত হন নি। এই চা-বাগানগুলিকে কেন্দ্র করেই ডুয়ার্সে একের পর এক জনপদ সৃষ্টি হয়। শুরু হয় ডুয়ার্সের নিজস্ব মিশ্র সংস্কৃতি ও অন্য পরিচিতি।
তাহলে এটা বলা যায় যে, ১৮৭৪ সালের পর থেকে মোটামুটিভাবে ডুয়ার্সের বিকাশ শুরু। আর এই বিকাশের শুরুতে ছিল ইউরোপিয়ান টি প্লান্টার ও ম্যানেজার, বাঙালি কেরানি শ্রেণি, পাঞ্জাবি দফাদার, আদিবাসী শ্রমিক ও চিনা চা বিশেষজ্ঞ ও কাঠমিস্ত্রি। ইউরোপিয়ানরা খুব স্বাভাবিকভাবেই অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখত। বাঙালি কেরানিরাও প্রয়োজন ছাড়া অন্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে তেমন মিশত বলে জানা যায় না। আদিবাসী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে শ্রেণি ও চরিত্রগত পার্থক্য থাকলেও, ধীরে ধীরে তারা মিশতে শুরু করেছিল। কিন্তু সেটিও অনেক পরে। পাঞ্জাবি ও চিনারা সম্পূর্ণভাবে পৃথক থাকত। আর ডুয়ার্সের ভূমিপুত্র বলে পরিচিত যে সম্প্রদায়ের মানুষরা ছিলেন, তারা তো প্রথম থেকেই চা-বাগান থেকে মুখ সরিয়ে রেখেছিলেন। তাই সব মিলে বলা যায় যে, ডুয়ার্সে সেই সময় স্বাধীনতা আন্দোলন দানা বাঁধা সত্যিই কষ্টকর ছিল। আরও একটা বিষয় হল, ভারতের, বিশেষ করে বঙ্গের, স্বাধীনতা আন্দোলনের মুখ ছিল কিন্তু পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়। এই সংগ্রামে আর্থিকভাবে উচ্চ ও নিম্ন শ্রেণির উপস্থিতি কিন্তু সেভাবে চোখে পড়ে না। ডুয়ার্সের অধিকাংশ মানুষ সেই সময়ে আর্থিকভাবে যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, তাদের কাছে আন্দোলন বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু ছিল না। ডুয়ার্স ঘেঁষা কোচবিহার রাজ্যও ছিল ইংরেজদের বিশেষ বন্ধু। আর বাকি অংশ তো তাদের নিজেদের মুঠিতে।
এরকম অবস্থায় ডুয়ার্সে স্বাধীনতা আন্দোলন সেভাবে না দেখতে পাওয়ারই কথা। কিন্তু ইতিহাসের মজা কে আর বোঝে! স্বাধীনতা আন্দোলনের ডাক এতটাই তীব্র ছিল যে, ডুয়ার্সের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়েছিল। ডুয়ার্সের, বিশেষ করে অবিভক্ত জলপাইগুড়ি জেলার প্রায় সব সম্প্রদায়ের মানুষেরা তাতে যোগ দিয়েছিলেন। স্বদেশী আন্দোলনে আমরা দেখতে পাচ্ছি জলপাইগুড়ি জেলা স্কুলের ছাত্র বীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তকে। ১৯০৫ সালে তিনি স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দেন। নিজের বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষকের বিরুদ্ধে যেতেও তিনি পিছপা হননি কেননা প্রধানশিক্ষক অন্য একটি ছাত্রকে বেত্রাঘাত করেন বিদেশী কাপড় পুড়িয়ে ফেলবার জন্য। পরবর্তীতে তিনি কলকাতা সহ বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষা লাভ করেন এবং বিদেশে চলে যান। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তুর্কি সেনাবাহিনীর হয়ে তাঁর লড়াই হয়ত স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব ফেলেনি, কিন্তু তাঁর জীবন নিঃসন্দেহে বহু জনকে প্রাণিত করেছিল। অন্যদিকে, সশস্ত্র আন্দোলনে জলপাইগুড়ির মুখ ছিলেন ধীরেন দত্তগুপ্ত। ১৯১১ সালে কলকাতা হাইকোর্টে তিনি সামসুল হককে হত্যা করেন। ফলে তার ফাঁসি হয়। এই সময় তাঁর অনুগামীরা জলপাইগুড়ি শহর ও ডুয়ার্সের বেশ কিছু জায়গা থেকে বন্দুক ছিনতাই করেন। আন্দোলনের তীব্রতা আনতে মাকড়াপাড়া চা-বাগান এলাকায় অস্ত্র শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। তবে ডুয়ার্স অঞ্চলে সেভাবে সশস্ত্র আন্দোলন কিন্তু দেখা যায়নি। উত্তরবঙ্গের হিলি-সহ আরও বেশ কিছু অঞ্চলে হিংসাত্মক আন্দোলন দেখা গেলেও, ডুয়ার্স তার থেকে অনেকটা দূরে ছিল।
সংগঠনমুখী আন্দোলনেও কিন্তু ডুয়ার্স পিছিয়ে ছিল। ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৭৫ সালে। কিন্তু ডুয়ার্সের জলপাইগুড়িতে ১৯২১ সালে জেলা কংগ্রেসের সৃষ্টি। সম্ভবত এর জন্য দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের উত্তরবঙ্গ সফর দায়ি। জালিয়ানাবাগ হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দিয়ে তিনি বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেছিলেন। ফলে "চারিদিকে স্কুল কলেজ বর্জন, সরকারী খেতাব ও পদত্যাগ, এমন কি আইনের ব্যবসা পর্যন্ত ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেল। সেই সঙ্গে বিলাতী দ্রব্য বর্জনের আন্দোলন, চরকা-কাটা ও তাঁত বোনের কর্মসূচী ব্যাপকভাবে চলতে লাগল।" ইতিমধ্যেই গান্ধিজি অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। ১৯২৫ সালে তিনি স্বয়ং উত্তরবঙ্গে এলেন। ফলে আন্দোলনের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পেলো। ডুয়ার্স অঞ্চলেও বিভিন্ন স্বাধীনতা সংগ্রামী পা রাখতে শুরু করলেন। ১৯৩৯ সালে জলপাইগুড়িতে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্মেলন হল। এই সম্মেলনের প্রধান অতিথি ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস। আর এই সভা বিশেষ মাত্রা পেল যখন তিনি পূর্ণ স্বাধীনতা ও সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক দিলেন।
ডুয়ার্সের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে কুমারগ্রামদুয়ার একটি স্মরণীয় নাম। অসহযোগ আন্দোলনের সময় কুমারগ্রাম থানায় দেশপ্রেমিক সতীন সেনকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের সময় পোয়াতু দাস, দেবেন দাস, অবিনাশ দাস, সুনীল সরকার, দেওয়ান রায় প্রমুখের নেতৃত্বে এই কুমারগ্রাম থানা দখল করে স্বাধীন ভারতের পতাকা তোলা হয়েছিল। শোনা যায় যে, পোয়াতু দাস দারোগার বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লে তিনি বন্দুক নামাতে বাধ্য হন। তারও আগে অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে কুমারগ্রামে মঘা দেওয়ানি, পশুপতি কোঙারের সরকারি হাট বয়কট করে কুলকুলির হাট স্থাপন নিঃসন্দেহে সাড়া জাগানো ঘটনা ছিল। মঘা দেওয়ানিকে গ্রেপ্তার করেও জনতার চাপে মুক্তি দিতে বাধ্য হন তৎকালীন প্রশাসন। আর সেই আন্দোলনে চন্দ্রদীপ সিং ও কুলদীপ সিং নামে দুই পাঞ্জাবি যুবকের ভূমিকা কখনই ভুলবার নয়। দেশপ্রেমিক সতীন সেনকে বন্দি করা হয়েছিল এখানকার থানায়। স্বাধীনতা পরবর্তীকালেও কুমারগ্রামের চা-বাগানগুলির শ্রমিক আন্দোলন উল্লেখযোগ্য। কুমারগ্রামদুয়ারের থানা কিন্তু অত্যন্ত প্রাচীন। মনে করা হয় যে, লস্ট হরাইজন বা স্যাংগ্রিলা অর্থাৎ ভুটান থেকে নেমে আসা দুর্বৃত্তদের দমন করবার জন্যই এখানে থানা তৈরি করা হয়েছিল। গড়ে তোলা হয়েছিল তহশিল। এই এলাকার জয়দেবপুর, অমরপুর ইত্যাদি নামের মধ্যে অতীতের সেই তহশিলদারের নাম লুকিয়ে রয়েছে।
এই সময়ের তেভাগা আন্দোলনের কথা না বললে ডুয়ার্সের স্বাধীনতার ইতিহাস কিন্তু অসম্পূর্ণ থেকে যায়। "১৯৪৬-৪৭ সালে অবিভক্ত বাংলার ২২ টি জেলায় তেভাগা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। বাংলার দিনাজপুর, রংপুর, জলপাইগুড়ি, খুলনা, ময়মনসিংহ, যশোর, ২৪ পরগনা জেলায় তীব্র হয়ে ওঠে তেভাগার সংগ্রাম। উৎপাদিত ফসলের একভাগ জমির মালিক পাবে, বাকি দুই ভাগ চাষীদের- এই দাবি থেকেই তেভাগা আন্দোলনের সূত্রপাত। অবিভক্ত জলপাইগুড়ি জেলার বোদা, পচাগড়সহ নয়টি থানা এলাকা এবং মেটেলী ব্লকের হায়হায় পাথার, বর্তমান মাথাচুলকা বিধান নগর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় এবং অদূরের মঙ্গল বাড়িতে গয়ানাথ দেউনিয়ার খোলানে এই আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। জলপাইগুড়ি জেলা শহরের মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেরাও এই আন্দোলনে ভাগ চাষীদের পাশে এসে দাঁড়ান এর সাথে যুক্ত হয় চা বাগানের শ্রমিক, রেলওয়ে শ্রমিক এবং কৃষক রমনীরা। হিন্দু-মুসলিম আদিবাসী অংশের মানুষ একসাথে এই আন্দোলনের শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেন। পুলিশ প্রশাসন ও জোতদারদের যুক্ত চক্রান্ত ব্যর্থ করে সংগ্রাম এগিয়ে চলে। কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে মেটেলি ব্লক-এর তেভাগা আন্দোলনের সময় দুটি পৃথক ঘটনায় ১৫ জন কৃষক-ও চা-শ্রমিকের পুলিশের গুলিতে আত্মবলিদান নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে ।" (দীপশুভ্র সান্যাল, চিন্তন নিউজ, ১১ মে, ২০২২)
যে কোনও আন্দোলনের মতোই ডুয়ার্সের স্বাধীনতা সংগ্রামে বেশ কিছু মানুষের অবদান অনস্বীকার্য। এঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নলিনীমোহন পাকড়াশী। ১৯২১ সালে তিনি ডুয়ার্সে এলেও আরও কয়েকবছর পর, ১৯২৯ থেকে, তিনি আলিপুরদুয়ারে বসবাস শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে ডুয়ার্স অঞ্চলের জাতীয় আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৮৬৯ সালে জলপাইগুড়ি জেলা গঠিত হওয়ার পর "আলিপুরদুয়ার মহকুমার বক্সা, ফালাকাটা, আলিপুরদুয়ার, কুমারগ্রাম, শামুকতলা, মহাকালগুড়ি, কামাখ্যাগুড়ি ও অন্যান্য অঞ্চলেও নতুন ধরনের ভুমি বন্দোবস্ত শুরু হয়। শুরু হয় কৃষিজমি, নদী, ঘাট ও হাট থেকে খাজনা আদায়ের নতুন প্রথা। পাশাপাশি ডুয়ার্স হয়ে ওঠে চা-বাগিচার বিকাশের কেন্দ্রবিন্দু। আলিপুরদুয়ার মহকুমার ভুটান ঘেঁষা অঞ্চলে দেশীয় ও ইউরোপীয় উদ্যোগীদের প্রচেষ্টায় স্থাপিত বেশ কিছু চা-বাগান। কালচিনি, হ্যামিলটনগঞ্জ, মাদারিহাট, রাজাভাতখাওয়া, কার্তিক, রায়ডাক, তুরিতুরি ও কুমারগ্রামের চা-বাগানগুলি ভরে ওঠে আদিবাসী শ্রমিক ও বাঙালি ‘বাবুদের’ ভিড়ে।" আগেই বলেছি খুব সচেতনভাবে তখনকার শিক্ষিত বাবু সম্প্রদায়ের মানুষেরা শ্রমিক শ্রেণির থেকে দূরত্ব রাখত। ফলে জলপাইগুড়ি শহরের তুলনায় অন্যত্র একেবারেই আলাদা চিত্র ছিল। আলিপুরদুয়ারে শিক্ষা প্রসারে কিছু বিদ্যালয় ছিল একমাত্র ভরসা। কোনও কলেজ ছিল না। "পাশ্ববর্তী গ্রামগুলির অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়। বিশ শতকের গোড়ায় মিশনারিদের চেষ্টায় বেশ কিছু প্রাইমারি ও মিডল ইংলিশ স্কুল গড়ে উঠলেও কুমারগ্রাম, মহাকালগুড়ি, কামাখ্যাগুড়ি, শামুকতলা, ফালাকাটা, মাদারহাটি ও বীরপাড়ার স্থানীয় মানুষেরা উচ্চশিক্ষায় সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। তাঁদের পক্ষে এলিট-রাজনীতির কেন্দ্রে প্রবেশ করা বা রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া ছিল একেবারেই অসম্ভব। বিশ শতকের গোড়ার দিকের আলিপুরদুয়ারের এরকম পরিস্থিতিতে ১৯২১ এ নলিনীমোহন আলিপুরদুয়ারে এসে দেখলেন যে এখানে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ(১৮৮৩), কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ (১৮৯৯) বা রংপুরের কারমাইকেল কলেজের মতো কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। নেই পূর্ববাংলার জমিদার শ্রেণির কৃষক শোষণ। এমনকি পূর্ববাংলার মতো রাজনীতি চেতনাও নেই। তবে এখানে আছে অন্য ধরনের শাসন ও শোষণ। শাসিতের হয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার মানুষের বড় অভাব। জলপাইগুড়ির এলিট নেতৃবর্গের ডুয়ার্সের সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে চিন্তাভাবনা করার মতো মানসিকতাই ছিলোনা। এরকম পরিস্থিতিতে নলিনীমোহন চুপ থাকতে পাড়েননি। মাসিক ১৫০ টাকা বেতনের কাজ ছেড়ে নলিনীমোহন ঝাঁপিয়ে পড়লেন জনগণকে সংগঠিত করার কাজে। নিজেকে উৎসর্গ করলেন ডুয়ার্সের সাধারণ মানুষকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। তাঁর নেতৃত্বে শামুকতলার শুক্রবারের হাটে সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলন (১৯২৯) ও ফালাকাটায় আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০) তাঁকে ডুয়ার্সের রাজনৈতিক মহলে পরিচিত করে তোলে। কুমারগ্রামদুয়ার থেকে মাদারিহাট, ভলকা থেকে ফালাকাটা---ডুয়ার্সের সবত্রই নলিনীমোহন হয়ে ওঠেন “নলিনী ঠাকুর”। কুমারগ্রামদুয়ার, আলিপুরদুয়ার, ফালাকাটা ও মাদারিহাটের অন্যান্য কৃষক সম্প্রদায়ের ব্রিটিশ-বিরোধী মনোভাবকে সংগঠিত করেন নলিনীমোহন। ভারত শাসন আইন (The Government of India Act, 1935) গৃহিত হওয়ার পরে ১৯৩৭ এর বিধানসভার নির্বাচনে ডুয়ার্সের নির্বাচনী রাজনীতিতে ভাগ বসানোর জন্য এগিয়ে আসেন জলপাইগুড়ির এলিট-রাজনীতিকগন। প্রসন্নদেব রায়কত, খগেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত (১৮৯৮-১৯৮৫) ও উপেন্দ্রনাথ বর্মন (১৮৯৮-১৯৮৮) জলপাইগুড়ি থেকে বাংলার বিধানসভায় প্রবেশ করেন। জলপাইগুড়ি-শিলিগুড়ি বিধানসভা ক্ষেত্রের তপশিলিজাতির প্রতিনিধি উপেন্দ্রনাথ ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রীসভার (১৯৪১-৪৩) মন্ত্রী হয়ে ডুয়ার্স অঞ্চলের কৃষকদের খাজনা কমানোর আর্জি জানিয়েছিলেন বিধানসভায়। কিন্তু এটা বাস্তবায়িত হয়নি। ডুয়ার্স অঞ্চলের মাটি পূর্ববাংলা বা দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলির মতো এতোটা উর্বর ছিল না। ফলে এখানকার জোত জমির কৃষকদের পক্ষে ভূমি রাজস্বের হার হয়ে উঠেছিল একটা বড় বোঝা। কৃষকদের মনে দানা বাঁধতে শুরু করেছিল খাজনা না দেওয়ার প্রবণতা। “No Rent” বা খাজনার বন্ধের আন্দোলন কুমারগ্রামদুয়ার এলাকায় প্রখর রূপ ধারন করেছিল নলিনীমোহনের নেতৃত্বে। কুমারগ্রামের জোতদার মঘা দেওয়ানী বা মদন সিং বরুয়ার মতো কংগ্রেসি কৃষকেরা খাজনা বন্ধের আন্দোলনকে গণ-আন্দোলনে রূপান্তরিত করেছিলেন। খাজনা বন্ধের প্রভাব পড়েছিল কুমারগ্রামের কুলকুলি, দলদলি ও শামুকতলার হাটেও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন (১৯৩৯-১৯৪৫) ভারতের রাজনীতির জটিল পরিস্থিতিতে ১৯৪২ এর ৮ই আগস্ট জাতীয় কংগ্রেসের “ভারত ছাড়ো” (Quite India) আন্দোলনের ডাক দেয়। “করেঙ্গে-ইয়ে-মরেঙ্গে” ধ্বনিতে ভেসে ওঠে ভারতের আকাশ বাতাস। ৯ই আগস্ট গান্ধীজী সহ জাতীয় কংগ্রেসের কেন্দ্রিয় নেতৃবর্গকে গ্রেফতার করা হয়। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাবে স্থানীয় কংগ্রেসী নেতৃবর্গ তাঁদের নিজস্ব মত ও কর্মপন্থানুযায়ী ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতায় মেতে উঠেন। ব্রিটিশ শাসনের প্রতীক (বিশেষত রেললাইন, টেলিগ্রাফ, পোস্ট অফিস ও যোগাযোগ ব্যবস্থা) সমূহের উৎপাটনে মেতে উঠে উন্মত্ত জনতা। ডুয়ার্সের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলেও তাঁর প্রভাব অনুভূত হল। নলিনীমোহনের নেতৃত্বে কুমারগ্রাম থানা আক্রমন করে টেলিগ্রাম লাইন কেটে দিয়ে কাঠের তৈরি সেতুগুলির পাটাতন উপরে দিয়ে কুমারগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করেছিলেন এখানকার স্থানীয় জনগণ। ‘তারকাটা আন্দোলন’ নামে পরিচিত এই গন-আন্দোলনের পর নলিনীমোহন ডুয়ার্সের সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত হলেন “ডুয়ার্স গান্ধী” নামে।" (ডঃ রূপকুমার বর্মন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়)
'ডুয়ার্স গান্ধী` নামে পরিচিত ছিলেন আরও একজন মানুষ। তিনি হলেন যজ্ঞেশ্বর রায়। নলিনীমোহন পাকরাশির সংস্পর্শে এসে তিনিও স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। অসহযোগ আন্দোলনের পর আইন অমান্য আন্দোলন এবং স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলনে তিনি ছিলেন নলিনীমোহনের যোগ্য সঙ্গী । খাজনা বন্ধের আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন তিনি। "তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধারা গ্রামীণ হাটগুলিকে প্রচারের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, যাতে বেশি সংখ্যক মানুষের মধ্যে আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে পারেন। ১৯৪৩ সাল তথা ১৩৫০ বঙ্গাব্দ, ব্রিটিশ আর দেশীয় অসাধু আড়তদার – মজুতদারদের যৌথ আক্রমণে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ডুয়ার্সের বুকে মন্বন্তর মোকাবিলায় অক্লান্ত প্রয়াস চালিয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী যজ্ঞেশ্বর রায়। তিনি শুধু মাত্র “ডুয়ার্স গান্ধী” নন “ডুয়ার্সের বিদ্যাসাগর” বললেও অতুক্তি হবে না। স্বাধীনতাত্তোর ভারতবর্ষে শিক্ষাবিস্তারের জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। মাদারিহাট – বীরপাড়া ব্লকের অন্তর্গত রাঙ্গালিবাজনার মতন জঙ্গল অধ্যুষিত এলাকায় নিজের অর্থে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি।শুধু রাঙ্গালিবাজনা নয় ডুয়ার্সের একাধিক স্থানে প্রাথমিক, উচ্চপ্রাথামিক ও উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। যেমন- ফালাকাটা উচ্চ বিদ্যালয়, জল্পেশ উচ্চ বিদ্যালয়,কুমারগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়, জটেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়, আমগুড়ি উচ্চ বিদ্যালয় ও রঙ্গালিবাজনা নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গান্ধীজির ভাবধারায় অনুপ্রাণিত ডুয়ার্স গান্ধী গান্ধীজির মতোই দুষ্কৃতীদের হাতে খুন হয়েছিলেন ১৯৭১ সালে।" (সুমন ভৌমিক, হামার খবর)
অন্যদিকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোসের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ধূপগুড়ির গধেয়ারকুঠি গ্রাম পঞ্চায়েতের পাড়কুমলাই গ্রামের কান্ত নারায়ণ রায় ইংরেজ বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সংগঠিত করে তোলেন। ১৯৩২ বিপ্লবী আন্দোলনের নেতৃত্বের ডাকে জলপাইগুড়ি জেলা জজ কোর্ট আক্রমণের দায়িত্ব পড়ে কান্ত নারায়ণের উপর। কিন্তু কোনভাবে এই গোপন কথা ফাঁস হয়া যায়। ধরা পড়েন কান্ত নারায়ণ। জলপাইগুড়ি সেন্ট্রাল জেলে ছয় মাস কারাবাসের পর তাঁর স্থান হয় হিজলি জেলে। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরেও তিনি দমেননি। ধূপগুড়ি অঞ্চলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই-আন্দোলনে তিনি মিটিং, মিছিল, পিকেটিং, অসহযোগ ইত্যাদি নিয়মিত ভিত্তিতে চালিয়ে যেতেন। (তথ্যসূত্র: হামার খবর, ক্ষিরোদা রায়) ডুয়ার্সের বিভিন্ন অঞ্চলে এভাবেই কান্ত নারায়ণ রায়ের মতো আরও অজস্র মানুষ রয়েছেন যাঁরা আজ বিস্মৃত। স্বাধীনতা আন্দোলন সেই সময় কমবেশি সবাইকেই নাড়িয়ে তুলেছিল। কিন্তু ডুয়ার্সে সেইভাবে কোনও সংগঠিত আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। এর কারণ সম্ভবত গুটিকয়েক মানুষ ছাড়া এই আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে যোগ্য নেতৃত্বের অভাব আর আন্দোলনের পীঠভূমি থেকে অনেকটা দূরে ডুয়ার্সের অবস্থান দায়ি। তবু বিচ্ছিন্নভাবে যেটুকু হয়েছিল তার গুরুত্ব কোনও অংশে কম ছিল না। কেননা এই আন্দোলনের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এই অঞ্চলের মানুষের দেশের প্রতি ভালবাসা ও বিদেশি অত্যাচারী শাসকের জন্য ঘৃণা। পরবর্তীতে ডুয়ার্স অঞ্চলে যে বহু আন্দোলন সংগঠিত হয় সেই সবেরই বীজ কিন্তু প্রোথিত হয়েছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে।
ডুয়ার্সের স্বাধীনতা আন্দোলনে বক্সা ফোর্টও কিন্তু জড়িয়ে রয়েছে। অবশ্য এই জড়িয়ে থাকা আসলে অন্যভাবে। আন্দামানের কুখ্যাত সেলুলার জেলের পরেই বক্সা ফোর্টের স্থান।এটি কবে তৈরী সে নিয়ে বিতর্কের মাঝে কিছু তথ্য জরুরী। মনে করা হয়, ১৬৬১ সালে প্রাণভয়ে ভীত কোচবিহার-রাজ প্রাণনারায়ণ এই ফোর্টে এক বছর কাটিয়ে ছিলেন। ফোর্টটি তখন 'জং' নামে পরিচিত। পরবর্তীতে 'জং'-এর অধিকার নিয়ে লড়াই বেঁধে থাকতো ভুটান ও কোচবিহারের। চা-ব্যবসার বৃদ্ধির ইচ্ছায় ডুয়ার্সে পা দিয়ে, কোচবিহারের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করে, ইংরেজ ক্যাপ্টেন জোনস ১৭৭৩ সালে বক্সা অধিকার করেন এবং নজর দেন ফোর্টের দিকে। ভুটানে তিব্বতের প্রতিনিধি তাসি লামার মধ্যস্থতায় ১৭৭৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ভুটানের চুক্তি হলেও ঝামেলা লেগেই থাকতো। দীর্ঘদিন বিবাদ লেগে থাকবার পর কোম্পানির প্রতিনিধি ইডেন ১৮৬৪ সালে ভুটানে অপমানিত হয়ে ফিরে আসেন এবং শুরু হয় দ্বিতীয় ভুটান যুদ্ধ। ১৮৬৫ সালে সিনচুলা চুক্তি অনুসারে ব্রিটিশদের দখলে আসে ফোর্টটি এবং পাকাপাকিভাবে 'জং` বা ফোর্টের দখল নেয় তারা। বক্সা ফোর্টের দখল নিয়ে ব্রিটিশরা কিছু সংস্কার করেছিল। ফোর্টটি পাথরের দেওয়ালে মুড়ে ফেলা হয়, টিনের ছাদ দেওয়া হয়। নির্মিত হয় অফিসারদের থাকবার ঘর, পোস্ট অফিস। জলের ব্যবস্থাও করা হয়। সর্বোপরি, বক্সাকে দেওয়া হয় মহকুমার মর্যাদা। ১৮৬৯ সালে জলপাইগুড়ি জেলা গঠিত হলে ফালাকাটাকে মহকুমা ঘোষণা করা হয়। বক্সা থেকে ফালাকাটায় স্থানান্তরিত হয় মহকুমা। ১৮৭৩ সালে সেনা মোতায়েন-সহ তিনটি পিকেট বসানো হয় বক্সায় এবং পরের বছর বক্সাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় মহকুমার মর্যাদা। ১৯০১ সালে রাজাভাতখাওয়া থেকে জয়ন্তী পর্যন্ত মিটার গেজ রেলপথ চালু হলেও ফোর্টের দুর্গমতা কিন্তু একই থেকে যায়। ১৯১৪ থেকে ১৯২৪ অবধি মিলিটারি পুলিশের ছাউনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল ফোর্টটি। অবশেষে স্বাধীনতা আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে থাকলে ১৯৩০-এ জেলখানায় বদলে যায় ফোর্ট। দুর্গম এই ফোর্টে বন্দি হয়েও সেদিনের স্বাধীনতা-সংগ্রামীরা দমে যাননি। তবে এই ফোর্টে নেতাজি সুভাষকে বন্দি রাখা হয়েছিল বলে যে কথা শোনা যায় তা ঠিক নয়। স্বাধীনতা-সংগ্রামী ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীকে অন্য বন্দীরা 'নেতাজি' সম্বোধন করতেন। সম্ভবত সেখান থেকেই নেতাজি সংক্রান্ত বিপত্তি। এই ফোর্ট থেকেই ১৯৩১ সালে বন্দিরা রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তিতে তাঁকে অভিনন্দনপত্র পাঠিয়েছিলেন। বিশ্বকবি প্রত্যুত্তরও দিয়েছিলেন। ফোর্টে প্রবেশের মুখে খোদাই করা দুটো পত্রই দেখা যায় আজও।
স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পার করে এসেও অবশ্য ডুয়ার্সের বিকাশ ও অগ্রগতিতে খুব কিছু পার্থক্য চোখে পড়ে না। আজ চা বাগানগুলি আক্ষরিক অর্থেই ধুঁকছে। নারী শ্রমিকদের অবস্থা দিনের পর দিন আরও খারাপ হচ্ছে। বাড়ছে দারিদ্র, অনাহার আর অশিক্ষা। এসবের সুযোগ নিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে পাচার। ডুয়ার্সের বনাঞ্চল প্রায় ধ্বংসের মুখে। পরিকল্পনাহীন নগরায়ন, হোম স্টে, রিসোর্ট ইত্যাদির দাপটে জঙ্গল ক্রমে কমছে। বাড়ছে মানুষ-পশু সংঘাত। ডুয়ার্সের বিভিন্ন ছোট ছোট জনপদে আজও সঠিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়নি। অভাব রয়েছে শিক্ষা পরিকাঠামোরও। বেকারত্বের কথা আর আলাদা করে কিছু বলার নেই। সেটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে বহুদিন ধরেই। ডুয়ার্স তার ব্যতিক্রম নয়। তবু দেশের অন্য সব জায়গার মতো ডুয়ার্সও মেতে রয়েছে স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। আসলে স্বাধীনতা এমন একটি বিষয়, যা শুধু অর্জন করলে হয় না। তাকে ধরে রাখতে হয়। তার সুফল ছড়িয়ে দিতে হয় প্রান্তিক পর্যায়। তাহলেই স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ বোঝা যায়। পাওয়া যায় তার প্রকৃত স্বাদ। ডুয়ার্স সেই স্বাদ থেকে খানিকটা দূরে থাকলেও, এই সুন্দর মুহূর্তে সেই খেদ মনে রাখেনি।
(প্রকাশিত)
No comments:
Post a Comment