Friday, June 30, 2023


 

ভয়ানক গরম এবং ক্রমাগত ছুটি পিছিয়ে দিচ্ছে আমাদের পড়ুয়াদের 
শৌভিক রায় 

দরদর করে ঘামতে থাকা সপ্তম শ্রেণির ছাত্রটির দিকে তাকিয়ে নিজেকেই অপরাধী মনে হচ্ছিল। সেই পাঁচ-সাত কিমি দূর থেকে এই রোদে সাইকেল চালিয়ে স্কুল করতে এসেছে। কিন্তু গনতন্ত্র রক্ষা করবার গুরু দায়িত্ব নিয়ে স্কুল আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ।  শিক্ষকদের আসতে হলেও পঠনপাঠন শিকেয় উঠেছে। আমাদের বিদ্যালয় পঞ্চায়েত ভোটের ডি সি আর সি অর্থাৎ ডিস্ট্রিবিউশন ও রিটার্নিং সেন্টার। সঙ্গে গণনা কেন্দ্র। তাই ছুটি!

বললাম, `তোদের হোয়াটসআপ গ্ৰুপে তো স্কুল ছুটির কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দেখিসনি?' ম্লান হেসে উত্তর দিল ছেলেটি, `বড় ফোন নেই স্যার। গ্ৰুপ দেখতে পারি না।` ওর `ছোট ফোন'-এর নম্বর নিয়ে বললাম, এরপর যেন ফোন পেলে যেন স্কুলে আসে।       

ছাত্রটির ফিরে যাওয়ার চেহারা দেখতে দেখতে আমেরিকার ন্যাশনাল ব্যুরো অফ ইকোনোমিক রিসার্চের একটি সমীক্ষার কথা মনে হল। ২০১৯ সালের  সেই সমীক্ষা দেখিয়েছিল, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অঙ্ক পরীক্ষায় আমাদের মতো গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলির ছাত্ররা খারাপ ফল করেছে। এর মূল কারণ, অত্যাধিক গরমের জন্য এই দেশগুলিতে  বিদ্যালয়ে ছুটি বেশি দেওয়া হয়। শুধু এটুকুই নয়। একই দেশের যে অঞ্চলে ছাত্ররা গ্রীষ্মের জন্য ছুটি বেশি পায়, তারা অন্য অঞ্চলের চাইতে পিছিয়ে। আমাদের দেশে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে যে কোনও নির্বাচনে বিদ্যালয় ভবনকে বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য ছুটি দিয়ে দেওয়া। এই বছর যেমন পঞ্চায়েত ভোটের জন্য প্রায় সব স্কুল কয়েকদিনের জন্য বন্ধ থাকছে, তেমনি ২০২৪ সালেও সাধারণ নির্বাচনের জন্য থাকবে। মাঝে এক বছর পার হতে না হতেই চলে আসবে বিধানসভা নির্বাচন। ফলে বরাদ্দ ছুটির সঙ্গে যোগ হবে আরও কয়েকটি ছুটি। অর্থাৎ শিক্ষা দিবস অবধারিতভাবে কমবে।


প্রশ্ন হল অত্যাধিক গরম ও নির্বাচনের জন্য অতিরিক্ত ছুটি হলে, শীতপ্রধান দেশের ক্ষেত্রেও এমনটি হওয়ার কথা। অত্যাধিক ঠাণ্ডার জন্য স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিত। সেসব দেশেও নির্বাচন হয়। কিন্তু তাদের ছাত্ররা কেন পিছিয়ে পড়ে না? কারণ বেশ কয়েকটি।

প্রথমত, শীতপ্রধান দেশগুলি অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর হাওয়ায়  স্কুল খোলা রাখবার বা ক্লাস করাবার বিকল্প পদ্ধতির ব্যবস্থা করে ফেলেছে। তাদের সেই পরিকল্পনায় কোনও ফাঁক নেই বলে, ফিনল্যান্ডের মতো ভয়ানক শীতের দেশ শিক্ষার ক্ষেত্রে আজ প্রথম সারিতে। বিদ্যালয়গুলিতে হিটার থেকে শুরু করে শীতকে দূরে রাখবার সব ব্যবস্থা মজুদ। 

দ্বিতীয়ত, অনলাইন ক্লাস, প্রোজেক্ট ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে তারা পরবর্তী পর্যায়ে নিয়ে গেছে।  প্রচণ্ড গরমের বিভিন্ন দেশেও এরকম নানা পরিকল্পনা নিয়ে স্কুল চালু রাখবার প্রচেষ্টা করা হয়। আবহাওয়ার সঙ্গে পড়ুয়ারা যাতে মানিয়ে নিতে পারে তার জন্য চলে আলাদা প্রশিক্ষণ। কেননা যত বন্ধ  তত ক্ষতি। 

তৃতীয়ত, ওসব দেশে নির্বাচনের জন্য স্কুল কেন, কোনও কাজই বন্ধ হয় না। অনেক দেশেই রাস্তার মোড়ে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে। পথ চলতি জনতা নিজের মতো ভোট দিয়ে যান। আবার অনেক দেশে অনলাইন ভোটের ব্যবস্থাও রয়েছে। নির্বাচনকে ঘিরে গণ্ডগোল, প্রাণহানি ইত্যাদি বিষয়কে তারা অনেক দূরে সরিয়ে রাখতে পেরেছে। তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার তারা যথেষ্ট ভালভাবেই প্রয়োগ করে এবং সেসব দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র কায়েম রয়েছে। 

ইতিমধ্যেই, করোনা মহামারির ফলে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ ছিল। নিয়মিত স্কুলের অভাবে পড়ুয়ারা যথেষ্ট পিছিয়ে পড়েছে। বেড়েছে ড্রপ আউটের সংখ্যা। তার ওপর প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্য  সমস্যা আরও বাড়ছে। ভয়ানক গরমের জন্য গত বছর, ২০২২ সালে, দুই মাস গ্রীষ্মের জন্য ছুটি দেওয়া হয়েছিল। ২০১৯ সালেও এই ছুটি ছিল দুই মাস। ২০২৩ সালে সেই ছুটি এবার ছিল দেড় মাস। এবার যোগ হচ্ছে নির্বাচনের জন্য ছুটি। প্রতিটি বিদ্যালয় ডি সি আর সি না হলেও ভোট কেন্দ্র, গণনা কেন্দ্র, নিরাপত্তা রক্ষীদের থাকবার জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হবে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও যাবেন ভোট নিতে। ফলে পঠনপাঠন আবার বন্ধ কিছুদিনের জন্য।

আমাদের মতো গরীব রাষ্ট্রে গরম মোকাবিলায় বা নির্বাচনের কাজে ব্যবহৃত স্কুলগুলির পরিকাঠামো রাতারাতি বদলে যাবে এরকম আশা করা যায় না। কিন্তু সমস্যা হল, সামান্য চেষ্টাটুকুও করা হয় না। শিক্ষার নীতি-নির্ধারকরা ছুটি ছাড়া আর কিছু যেন বুঝতে চান না। `ডিজিটাল ডিভাইড` কমিয়ে, অনলাইন ক্লাসের জন্য ছাত্রদের প্রস্তুত করে,  স্কুলের সময় এগিয়ে, প্রয়োজনে খানিকটা কাটছাঁট করে, যেখানে তুলনায় গরম কম সেখানে খোলা রেখে স্কুল চালানো যেতে পারে। নির্বাচনের কাজে স্কুলগুলিকে ব্যবহারের পদ্ধতিরও আমূল পরিবর্তন দরকার। স্কুলে কেন ভোট নেওয়া সহ গণনা কেন্দ্রের কাজ হবে? বিকল্প কি কিছুই ভাবা যায় না? এত কিছু রূপায়ণ হয়, এটা কি হতে পারে না? এভাবে ভোটের জন্য স্কুল বন্ধ করে দেয় শিক্ষার্থীর অধিকারে হস্তক্ষেপ নয় কি?

ছুটির অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে। দরকারে সেটি দিতে হবে। কিন্তু তার পাশাপাশি পড়ুয়ারা যাতে পিছিয়ে না পড়ে, তার ব্যবস্থা করাও একান্ত দরকার। মনে রাখতে হবে, যে দেশের শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ে সে দেশ সর্বার্থেই পিছিয়েই পড়ে। 

No comments: