কোভিল
শৌভিক রায়
পেছন ফিরে দেখি বাবা মা নেই।
একটু চিন্তা হল। কোথায় গেল এরা? না। হারানোর ভয় নেই। আশ্রমের গার্ডেন হাউস সবাই চেনে। মাতৃ মন্দির থেকে খুব একটা দূরে নয়। আছিও বেশ কয়েকদিন থেকে। সবাই রাস্তাঘাট চিনে গেছি মোটামুটি। আমি খানিক বেশি। সকালে ঘণ্টা প্রতি পঞ্চাশ পয়সায় সাইকেল ভাড়া করি আর টো টো করে ঘুরে বেড়াই মেরিন ড্রাইভ থেকে যেদিকে চোখ যায়। দাদা একশ টাকা হাতখরচ দিয়েছে। কাজেই চিন্তা নেই।
কিন্তু এরা গেল কোথায়?
প্রতিদিন সকালে মাতৃ মন্দিরে এসে সমাধিতে ধুপ কাঠি জ্বালাই আর ফুল দিই। এদিক ওদিক কয়েকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকেন। সমুদ্রের গর্জন শোনা যায় শান্ত নিস্তব্ধতায়।
আজও ফিরছিলাম মাতৃ মন্দির থেকে। রাস্তায় বাবা মায়ের সঙ্গে দেখা। একসঙ্গে কিছুটা হাঁটার পর পেছন ফিরে দেখি দুজনের একজনও নেই। গেল কোথায়!
এদিক ওদিক তাকাতে হঠাৎ কানে এলো- ভা ভা...
দেখি ষন্ডগন্ডা চেহারার মিশকালো রঙের এক মানুষ চেঁচিয়ে যাচ্ছে। বেশ মারমুখী একটা ভাব।
কাকে বলছে কী বলছে বুঝতে না পেরে এগোনোর জন্য যে-ই পা বাড়িয়েছি, দুম করে আমার হাত টেনে ধরল লোকটা। আমার ততক্ষণে ভয়াবহ অবস্থা। ভর দিনের বেলা! এখন ছিনতাই করবে!! পন্ডিচেরির তো এরকম দুর্নাম শুনিনি।
কাঁদব কী কাঁদব না বুঝতে না বুঝতেই আবার 'ভা ভা' বলে লোকটা হাসল। ঝকঝকে সাদা দাঁত। বেশ খোলতাই হয়েছে ওই মুখে। হাত দিয়ে একটা মন্দির দেখালো। বুঝলাম মন্দিরে যেতে বলছে।
যাক। তাও ভাল।
গুটিগুটি পায়ে এগোলাম। প্যা পো করে দক্ষিণী সঙ্গীতের আওয়াজ আসছে। গেট দিয়ে ঢুকে বেশ বড় উঠোন মতো। সার সার চেয়ার পাতা। দেখি বাবা মা বসে আছে। কপালে টিপ তিলক লাগানো। কেমন ভেবলে যাওয়া মুখ।
- আম্মা! উঙ্গাই মাকেন। উতকারে...
আবার একগাল হাসি। আমাকে চেয়ারে প্রায় জোর করে বসিয়েই দিল। কপালে ফোঁটাও লাগিয়ে দিল।
আমার তখন খুউব রাগ হচ্ছে। এটা কী! এভাবে জোর করে কেউ মন্দিরে টেনে আনে? মায়ের দিকে তাকাতেই মা বলল,
- তোর বাবা! বুঝিস না? সাউথ ইন্ডিয়ায় এসে একেবারে ধর্মাবতার হয়েছে। মন্দির দেখলেই হল। ঢুকতেই হবে। এই মন্দিরে ঢুকবার কী ছিল? গোপুরম পর্যন্ত নেই। বিগ্রহই বা কোথায় বুঝতে পারছি না। ঢোকার পর থেকে শুধু উতকারে উতকারে করে যাচ্ছে! তোকেও ধরে আনলো! কী উটকো ঝামেলা।
- আহা ঝামেলার কী পেলে! অন্য মন্দিরের সঙ্গে মিল নেই বলেই তো ঢুকলাম। কোনও মন্দিরে এভাবে বসিয়েছে?
বাবার ডিফেন্স।
- সে তো বুঝলাম। কিন্তু বিগ্রহ কোথায়?
- আরে গর্ভগৃহে পুজো বা ধোওয়া মোছা চলছে। সেজন্যই তো বসিয়ে রেখেছে।
বাবার কনফিডেন্স।
কী আর করা। বসে রইলাম।
মিনিট দুয়েকের মধ্যে তিন প্লেটে মিষ্টি এলো। বয়স্ক মহিলা থেকে শুরু করে কিশোরীরা ঘিরে ধরল।
- সাপ্পিডে সাপ্পিডে...
সাপ ব্যাঙ তো নেই! ছাইভস্মও নেই। বোধহয় খেতে বলছে। এ তো ব্যাপক মন্দির। বেশ দামি দামি মিষ্টি।
- উঙ্গালেক্কে পুরিইয়া ভিল্লাই এন বাদেই নাঙ্গাল পুরিন্দা কুম গেরুম।
কী বলে কে জানে। বলুক গিয়ে। চুপচাপ খেয়ে নিতেই সামনে দেখি নতুন বর বউ দাঁড়িয়ে।
বাবা আর মা-কে ঢিপ ঢিপ প্রণাম। আমার দিকে তাকিয়ে একগাল হাসি।
- উঙ্গালেই পেটরা দিল নাঙ্গাল মিকাভুম মাদাইচি আদায় কেরুম।
- আশীর্বাদিপ্পার।
- দেব পাভ ভিরুন্তানুর....
এতক্ষণে কেসটা বুঝলাম। ওটা মন্দির নয়। বাড়ি। বিয়ে বাড়ি। বাবা ভুল করে মন্দির ভেবে ঢুকে পড়েছে। ওরা বুঝতে পেরেছে সেটা। কিন্তু অতিথি নারায়ণ। তাই রাস্তা থেকে আমাকে ধরে এনে বসিয়েছে। আপ্যায়ন করে মিষ্টি খাইয়ে এখন বাবা মায়ের আশীর্বাদ নিচ্ছে।
আমরা তিনজনই হতভম্ব। বাবার কনফিডেন্স শেষ হয়ে মুখে এক চিলতে হাসি। মা রাগতে গিয়েও সামনে মিষ্টি মুখের নববধূ আর তার সুপুরুষ সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে গলে জল। আমার পেট থেকে সোডার বোতল খোলার মতো হাসি ভুস ভুস করে বেরিয়ে এলেও কন্ট্রোল করছি নিজেকে....
আর কী! বেরিয়ে এলাম অবশেষে। ওরা সমস্বরে বলল,
- মিন্তুম ভারুকা.....
(বোকামির এককাল)
(১৯৮৯ সালে প্রথম দক্ষিণ ভারত বেড়াতে গিয়ে এই অভিজ্ঞতা হয়েছিল। আজ বাবা মা নেই। কিন্তু আমাদের তিনজনের সেই বোকা বনে যাওয়ার ঘটনাটা স্পষ্ট মনে আছে।)
* কোভিল- মন্দির
বাকি তামিল ভাষা বুঝতে গেলে পাঠককে খাটতে হবে। ওটা আমার পারিশ্রমিক।
No comments:
Post a Comment