তমলুক-মহিষাদল: অতীত যেন থমকে আছে
শৌভিক রায়
রূপনারায়ণকে দেখা মাত্র সেই অমোঘ কথাগুলি মনে পড়ে গেল- রূপ-নারানের কুলে/ জেগে উঠিলাম,/ জানিলাম এ জগৎ/ স্বপ্ন নয়/ রক্তের অক্ষরে দেখিলাম/ আপনার রূপ,/ চিনিলাম আপনারে/ আঘাতে আঘাতে/ বেদনায় বেদনায়....`
কিছু কাজ নিয়ে কলকাতায় এসে বড্ড বিরক্ত লাগছিল। আসলে এই গৃহবন্দী দশায় শরীর ঠিক থাকলেও, মনের অসুখ যেন আর সারছে না! তাই বিধিনিষেধ সামান্য শিথিল হতেই একদিনের জন্য বেরিয়ে পড়া গেল রাজ্যের অন্যতম প্রাচীন স্থান তমলুক ও মহিষাদল দেখবার জন্য। কলকাতা থেকে ৮৫ কিমির তমলুক আর তার পরের আরও ৩৫ কিমি দূরের মহিষাদল পৌঁছতে বেশি সময় লাগল না ঝকঝকে ফোর লেন পথে।
অতীতের বিখ্যাত তাম্রলিপ্ত আজ সংকীর্ণ রাস্তার জনবহুল তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুরের জেলা সদর। খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক থেকেই অতীতের তাম্রলিপ্ত বা তমালিকা বা তামলিট্টি দেশি বিদেশী মানুষদের আকর্ষণ করেছে। উৎকল ও বঙ্গের মধ্য দেশ হিসেবে তমলুককে একসময় বিভাস বলেও ডাকা হত। আজকের তমলুকের অন্যতম আকর্ষণ প্রাচীন রাজবাড়িটি। ইন্দো-ইসলামীয় এবং নব্য-ধ্রুপদী স্থাপত্য শিল্পের এক অপূর্ব মিশ্রণ এই রাজবাড়িটির প্রথম রাজা ময়ূরধবজ বা ময়ূরবর্ধন। অধ্যাপক দীপক সেনগুপ্ত জানাচ্ছেন, 'তমলুকের রাজবাড়ি খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে ময়ূরবংশীয় রাজাদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল এবং সেই রাজা না কি দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় উপস্থিত ছিলেন। দীপেন্দ্রনারায়ণ রায় তার একটি রচনায় লিখেছেন –“তাম্রলিপ্ত বা তমলুককে নিক্তিতে মাপা হলে তা শুরু করতে হয় রাজা ময়ূরবর্ধনকে দিয়ে। বাংলাদেশের ঢাকা থেকে প্রাপ্ত বা তমলুক রাজবাড়ীতে রক্ষিত মরংকত বংশ তালিকা থেকে দেখা যায় বর্তমান প্রজন্মটি ৬৪ তম এবং মেয়েদের ধরলে তা ৬৫ ও ৬৬ তম চলছে। দৌহিত্ব ধরে এগোলে এই রকম একটি সুপ্রাচীন বংশ ভারতবর্ষে আর কোথাও আছে কিনা আমার জানা নেই।” বহু ইতিহাসের সাক্ষী এই রাজবাড়িতে এসেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস, কাজী নজরুল ইসলামের মতো মানুষেরা। এই বাড়ির অন্যতম সদস্য সুরেন্দ্রনাথ রায় স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছিলেন। ২০০৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তমলুক রাজবাড়ি জাতীয় সৌধ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া এই রাজবাড়ীর যে একসময় অপূর্ব সুন্দর ছিল সেটা বুঝতে অসুবিধে হয় না। বটের ঝুড়ি নেমে যাওয়া ভেঙে পড়া রাজবাড়ীর প্রাচীন দেওয়ালে আজও কত ইতিহাস লেখা রয়েছে কে জানে! রাজবাড়ীর ডানদিকে রাধামাধব ও রাধারমণ মন্দিরটিও অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। আবার তমলুকের বর্গভীমা মন্দিরটি একটি বিস্তীর্ন অঞ্চল জুড়ে সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত পবিত্র স্থল। একান্ন পীঠের অন্যতম বলে মনে করা হয় এই মন্দিরটিকে। মন্দিরের গঠনশৈলী ও স্থাপত্য গবেষণার বিষয়। অধ্যাপক দীপক সেনগুপ্তের মতে, ' প্রচলিত রয়েছে যে, মারাঠারা যখন দক্ষিণবঙ্গে লুঠতরাজ ও ধ্বংসকার্য চালায়, তখন কিন্তু তারা তমলুকে এসে দেবী বর্গভীমাকে মূল্যবান দ্রব্যাদি শ্রদ্ধার্ঘ হিসাবে প্রদান করে। ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি কালাপাহাড়ের আক্রমণ থেকেও মন্দিরটি রক্ষা পেয়েছিল। এমন কি রূপনারায়ণ নদীর বন্যাও মন্দির অবধি এসে থেমে যায় বলে জনশ্রুতি।` বর্গভীমা মন্দির ছাড়াও ২৫০ বছর পুরোনো রামজীউ মন্দির, রাজা আনন্দনারায়ণ রায় নির্মিত জগন্নাথ মন্দির, জিষ্ণুহরি মন্দির, গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর মন্দির ইত্যাদি তমলুকের অন্যতম দ্রষ্টব্য। অন্যদিকে অনেকের মতে, আর্কিওলজিকাল মিউজিয়ামটি আজকের তমলুকের অন্যতম সেরা আকর্ষণ। বহু প্রাচীন নিদর্শন, পাণ্ডুলিপি পটচিত্র, টেরাকোটা মূর্তি সমৃদ্ধ এই মিউজিয়াম দেখলে বোঝা যায় যে, একসময় এই অঞ্চলটি কতটা সমৃদ্ধ ছিল! আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমরা স্থানিক ইতিহাস ভুলে গেছি। তাই আজকের তমলুক কিছুটা হলেও যেন উপেক্ষিত। অথচ এই মাটিতে জন্ম নিয়েছিলেন মাতঙ্গিনী হাজরার মতো মহিয়সী নারী। তাঁর মূর্তি দর্শনে সেদিনের কথা ভেবে গর্ব হলেও, মন খারাপ হয় শহরের সংকীর্ণ, ঘিঞ্জি রাস্তা দেখে। তবে রূপনারায়ণের কূল ভুলিয়ে দেয় সবকিছু। এখানে প্রকৃতি এত উদার যে, তমলুক মুহূর্তে হয়ে ওঠে না ফিরতে চাওয়ার ভালবাসার শহর!
তমলুক শেষ করে দ্রুত পৌঁছে যাই মহিষাদল। তাম্রলিপ্তের সুবর্ন যুগের কিছু পরে মহিষাদলের পত্তন। মনে করা হয় যে, এক সময় এই এলাকাটি বঙ্গোপসাগরের গর্ভে ছিল। পরে পলি জমে চর ও জঙ্গল তৈরি হয়। জঙ্গল কেটে বসতি গড়ে ওঠে। মহিষাদলের সেরা আকর্ষণ সেখানকার রাজবাড়ী। এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা জনার্দন উপাধ্যায়। তিনি মোগল সম্রাট আকবরের অধীন সেনাবাহিনীর উচ্চপদে কাজ করতেন। প্রাবন্ধিক সামসুদ্দিন বিশ্বাস জানাচ্ছেন, 'ষষ্ঠদশ শতকে উত্তরপ্রদেশ থেকে জনার্দন উপাধ্যায় ব্যবসার জন্য নদীপথে মহিষাদলের উপকণ্ঠে গেঁওখালিতে আসেন। সে সময় এলাকার রাজা ছিলেন কল্যাণ রায়চৌধুরী। রাজধানী ছিল গড়গুমাই। কল্যাণ রায়চৌধুরির থেকে মহিষাদলের স্বত্ব কিনে তিনি নতুন রাজা হন। রাজা আনন্দলাল উপাধ্যায়ের পুত্র সন্তান ছিল না। তাঁর মৃত্যুর পর রানী জানকী রাজত্বের দায়িত্ব নেন। এরপর তার জামাতা ছক্কনপ্রসাদ গর্গের ছেলে গুরুপ্রসাদ গর্গ রাজা হন। সেই থেকে মহিষাদলে গর্গদের রাজত্ব।' মহিষাদলে রাজাদের দু’টি রাজবাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে রঙ্গিবসান রাজবাড়ি আনুমানিক ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে তৈরি হয়। আর ফুলবাগ রাজবাড়ি আনুমানিক ১৯৩৪ সালে তৈরি হয়। রাজবাড়ি চত্বরে রয়েছে গোপাল জিউর মন্দির ও রামবাগে রামজীউর মন্দির। রঙ্গিবসান রাজবাড়িতে এখন সংস্কারের কাজ চলছে। নতুন রাজবাড়িটির দোতলায় এখনও রাজ পরিবারের সদস্যেরা করলেও নীচের তলায় রয়েছে সংগ্রহশালা। দশ টাকা টিকিটে এই সংগ্রহশালায় দেখা যায় রাজবাড়ীর বিপুল ঐশ্বর্যের অনেককিছুই। বিলিয়ার্ডস থেকে শুরু করে রয়েছে অজস্র তৈলচিত্র, পালকি, বাসনকোসন, সোফাসেট, অস্ত্রশস্ত্র, শিকার করা স্টাফ করা বিভিন্ন জীবজন্তু, ফৈয়জ খাঁ থেকে শুরু করে বড়ে গোলাম আলি, কুমার মুখার্জি, কণ্ঠে মহারাজের মতো বিখ্যাত মানুষজনের ব্যবহৃত তানপুরা, তবলা, হারমোনিয়াম ইত্যাদি। ছোট্ট শান্ত শহর মহিষাদলের পরিত্যক্ত রাজ হাই স্কুল ভবনটিও অত্যন্ত সুন্দর। ১৮৫১ সালে রাজা লছমন প্রসাদের দেওয়ান রামনারায়ণ গিরির উদ্যোগে নির্মিত বড় পুল থেকে পুরোনো স্কুলটি দেখতে দেখতে মন খারাপ হয়ে ওঠে। আজ সেই রাজাও নেই, সেই রাজত্বও নেই ঠিকই, কিন্তু মহিষাদলের প্রায় প্রতিটি জায়গায় সে আমলের চিহ্ন লেগে রয়েছে। অতীত যেন সর্বদাই নীরবে নিজের কথা বলে চলেছে।
একদিনের ঝটিকা সফর সেরে যখন ফিরছি তখন বিকেলের সূর্য স্তিমিত। দুপুরের সেই তরতাজা সূর্য আর নেই! মানব সভ্যতাও ঠিক এরকম। অতীতের প্রসিদ্ধ ব্যস্ত তাম্রলিপ্ত-মহিষাদল আজ কৌলিন্য হারিয়ে সাধারণ দুটি জায়গায় পরিণত। কিন্তু একথা ঠিক যে, সেই অতীতের ওপর নির্ভর করে বর্তমান দাঁড়িয়ে থাকে আর অতীত না থাকলে বর্তমানের মূল্য কোথায়?
(প্রকাশিত- প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা)
রাজবাড়ি, তমলুক
রাজবাড়ি, তমলুক
রাজবাড়ি, তমলুক
মাতঙ্গিনী হাজরার মূর্তি, তমলুক
মাতঙ্গিনী হাজরার মূর্তি, তমলুক
গোপাল জিউর মন্দির, মহিষাদল
গোপাল জিউর মন্দির, মহিষাদল
রঙ্গিবসান রাজবাড়ি, মহিষাদল
ফুলবাগ রাজবাড়ি, মহিষাদল
মহিষাদলের পরিত্যক্ত রাজ হাই স্কুল
রাজবাড়ি, তমলুক







