Saturday, August 21, 2021

 


তমলুক-মহিষাদল: অতীত যেন থমকে আছে 
শৌভিক রায় 

রূপনারায়ণকে দেখা মাত্র সেই অমোঘ কথাগুলি মনে পড়ে গেল-   রূপ-নারানের কুলে/ জেগে উঠিলাম,/ জানিলাম এ জগৎ/ স্বপ্ন নয়/ রক্তের অক্ষরে দেখিলাম/ আপনার রূপ,/ চিনিলাম আপনারে/ আঘাতে আঘাতে/ বেদনায় বেদনায়....`

কিছু কাজ নিয়ে কলকাতায় এসে বড্ড বিরক্ত লাগছিল। আসলে এই গৃহবন্দী দশায় শরীর ঠিক থাকলেও, মনের অসুখ যেন আর সারছে না! তাই বিধিনিষেধ সামান্য শিথিল হতেই একদিনের জন্য বেরিয়ে পড়া গেল রাজ্যের অন্যতম প্রাচীন স্থান তমলুক ও মহিষাদল দেখবার জন্য। কলকাতা থেকে ৮৫ কিমির তমলুক আর তার পরের আরও ৩৫ কিমি দূরের মহিষাদল পৌঁছতে বেশি সময় লাগল না ঝকঝকে ফোর লেন পথে।  

অতীতের বিখ্যাত তাম্রলিপ্ত আজ সংকীর্ণ রাস্তার জনবহুল তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুরের জেলা সদর। খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক থেকেই অতীতের তাম্রলিপ্ত বা তমালিকা বা তামলিট্টি দেশি বিদেশী মানুষদের আকর্ষণ করেছে। উৎকল ও বঙ্গের মধ্য দেশ হিসেবে তমলুককে একসময় বিভাস বলেও ডাকা হত। আজকের তমলুকের অন্যতম আকর্ষণ প্রাচীন রাজবাড়িটি। ইন্দো-ইসলামীয় এবং নব্য-ধ্রুপদী স্থাপত্য শিল্পের এক অপূর্ব মিশ্রণ এই রাজবাড়িটির প্রথম রাজা ময়ূরধবজ বা ময়ূরবর্ধন। অধ্যাপক দীপক সেনগুপ্ত জানাচ্ছেন,  'তমলুকের রাজবাড়ি খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে ময়ূরবংশীয় রাজাদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল এবং সেই রাজা না কি দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় উপস্থিত ছিলেন। দীপেন্দ্রনারায়ণ রায় তার একটি রচনায় লিখেছেন –“তাম্রলিপ্ত বা তমলুককে নিক্তিতে মাপা হলে তা শুরু করতে হয় রাজা ময়ূরবর্ধনকে দিয়ে। বাংলাদেশের ঢাকা থেকে প্রাপ্ত বা তমলুক রাজবাড়ীতে রক্ষিত মরংকত বংশ তালিকা থেকে দেখা যায় বর্তমান প্রজন্মটি ৬৪ তম এবং মেয়েদের ধরলে তা ৬৫ ও ৬৬ তম চলছে। দৌহিত্ব ধরে এগোলে এই রকম একটি সুপ্রাচীন বংশ ভারতবর্ষে আর কোথাও আছে কিনা আমার জানা নেই।” বহু ইতিহাসের সাক্ষী এই রাজবাড়িতে এসেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস, কাজী নজরুল ইসলামের মতো মানুষেরা। এই বাড়ির অন্যতম সদস্য সুরেন্দ্রনাথ রায় স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছিলেন। ২০০৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তমলুক রাজবাড়ি জাতীয় সৌধ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া এই রাজবাড়ীর যে একসময় অপূর্ব সুন্দর ছিল সেটা বুঝতে অসুবিধে হয় না। বটের ঝুড়ি নেমে যাওয়া ভেঙে পড়া রাজবাড়ীর প্রাচীন দেওয়ালে আজও কত ইতিহাস লেখা রয়েছে কে জানে! রাজবাড়ীর ডানদিকে রাধামাধব ও রাধারমণ মন্দিরটিও অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। আবার তমলুকের বর্গভীমা মন্দিরটি একটি বিস্তীর্ন অঞ্চল জুড়ে সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত পবিত্র স্থল। একান্ন পীঠের অন্যতম বলে মনে করা হয় এই মন্দিরটিকে। মন্দিরের গঠনশৈলী ও স্থাপত্য  গবেষণার বিষয়। অধ্যাপক দীপক সেনগুপ্তের মতে, ' প্রচলিত রয়েছে যে, মারাঠারা যখন দক্ষিণবঙ্গে লুঠতরাজ ও ধ্বংসকার্য চালায়, তখন কিন্তু তারা তমলুকে এসে দেবী বর্গভীমাকে মূল্যবান দ্রব্যাদি শ্রদ্ধার্ঘ হিসাবে প্রদান করে। ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি কালাপাহাড়ের আক্রমণ থেকেও মন্দিরটি রক্ষা পেয়েছিল। এমন কি রূপনারায়ণ নদীর বন্যাও মন্দির অবধি এসে থেমে যায় বলে জনশ্রুতি।` বর্গভীমা মন্দির ছাড়াও ২৫০ বছর পুরোনো রামজীউ মন্দির, রাজা আনন্দনারায়ণ রায় নির্মিত জগন্নাথ মন্দির, জিষ্ণুহরি মন্দির, গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর মন্দির ইত্যাদি তমলুকের অন্যতম দ্রষ্টব্য। অন্যদিকে অনেকের মতে, আর্কিওলজিকাল মিউজিয়ামটি আজকের তমলুকের অন্যতম সেরা আকর্ষণ। বহু প্রাচীন নিদর্শন, পাণ্ডুলিপি পটচিত্র, টেরাকোটা মূর্তি সমৃদ্ধ এই মিউজিয়াম দেখলে বোঝা যায় যে, একসময় এই অঞ্চলটি কতটা সমৃদ্ধ ছিল! আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমরা স্থানিক ইতিহাস ভুলে গেছি। তাই আজকের তমলুক কিছুটা হলেও যেন উপেক্ষিত। অথচ এই মাটিতে জন্ম নিয়েছিলেন মাতঙ্গিনী হাজরার মতো মহিয়সী নারী।  তাঁর মূর্তি দর্শনে সেদিনের কথা ভেবে গর্ব হলেও, মন খারাপ হয় শহরের সংকীর্ণ, ঘিঞ্জি রাস্তা দেখে। তবে রূপনারায়ণের কূল ভুলিয়ে দেয় সবকিছু। এখানে প্রকৃতি এত উদার যে, তমলুক মুহূর্তে হয়ে ওঠে না ফিরতে চাওয়ার ভালবাসার শহর!

তমলুক শেষ করে দ্রুত পৌঁছে যাই মহিষাদল। তাম্রলিপ্তের সুবর্ন যুগের কিছু পরে মহিষাদলের পত্তন। মনে করা হয় যে, এক সময় এই এলাকাটি বঙ্গোপসাগরের গর্ভে ছিল। পরে পলি জমে চর ও জঙ্গল তৈরি হয়। জঙ্গল কেটে বসতি গড়ে ওঠে। মহিষাদলের সেরা আকর্ষণ সেখানকার রাজবাড়ী।  এই  রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা জনার্দন উপাধ্যায়। তিনি মোগল সম্রাট আকবরের অধীন সেনাবাহিনীর উচ্চপদে কাজ করতেন। প্রাবন্ধিক সামসুদ্দিন বিশ্বাস জানাচ্ছেন, 'ষষ্ঠদশ শতকে উত্তরপ্রদেশ থেকে জনার্দন উপাধ্যায় ব্যবসার জন্য নদীপথে মহিষাদলের উপকণ্ঠে গেঁওখালিতে আসেন। সে সময় এলাকার রাজা ছিলেন কল্যাণ রায়চৌধুরী। রাজধানী ছিল গড়গুমাই। কল্যাণ রায়চৌধুরির থেকে মহিষাদলের স্বত্ব কিনে তিনি নতুন রাজা হন। রাজা আনন্দলাল উপাধ্যায়ের পুত্র সন্তান ছিল না। তাঁর মৃত্যুর পর রানী জানকী রাজত্বের দায়িত্ব নেন। এরপর তার জামাতা ছক্কনপ্রসাদ গর্গের ছেলে গুরুপ্রসাদ গর্গ রাজা হন। সেই থেকে মহিষাদলে গর্গদের রাজত্ব।' মহিষাদলে রাজাদের দু’টি রাজবাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে রঙ্গিবসান রাজবাড়ি আনুমানিক ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে তৈরি হয়। আর ফুলবাগ রাজবাড়ি  আনুমানিক ১৯৩৪ সালে তৈরি হয়। রাজবাড়ি চত্বরে রয়েছে  গোপাল জিউর মন্দির ও রামবাগে রামজীউর মন্দির। রঙ্গিবসান রাজবাড়িতে এখন সংস্কারের কাজ চলছে।  নতুন রাজবাড়িটির দোতলায় এখনও রাজ পরিবারের সদস্যেরা করলেও নীচের তলায় রয়েছে সংগ্রহশালা। দশ টাকা টিকিটে এই সংগ্রহশালায় দেখা যায় রাজবাড়ীর বিপুল ঐশ্বর্যের অনেককিছুই। বিলিয়ার্ডস থেকে শুরু করে রয়েছে অজস্র  তৈলচিত্র, পালকি, বাসনকোসন, সোফাসেট, অস্ত্রশস্ত্র, শিকার করা স্টাফ করা বিভিন্ন জীবজন্তু, ফৈয়জ খাঁ থেকে শুরু করে বড়ে গোলাম আলি, কুমার মুখার্জি, কণ্ঠে মহারাজের মতো বিখ্যাত মানুষজনের ব্যবহৃত তানপুরা, তবলা, হারমোনিয়াম ইত্যাদি। ছোট্ট শান্ত শহর মহিষাদলের পরিত্যক্ত রাজ হাই স্কুল ভবনটিও অত্যন্ত সুন্দর। ১৮৫১ সালে রাজা লছমন প্রসাদের দেওয়ান রামনারায়ণ গিরির উদ্যোগে নির্মিত বড় পুল থেকে পুরোনো স্কুলটি দেখতে দেখতে মন খারাপ হয়ে ওঠে। আজ সেই রাজাও নেই, সেই রাজত্বও নেই ঠিকই, কিন্তু মহিষাদলের প্রায় প্রতিটি জায়গায় সে আমলের চিহ্ন লেগে রয়েছে। অতীত যেন সর্বদাই নীরবে নিজের কথা বলে চলেছে।

একদিনের ঝটিকা সফর সেরে যখন ফিরছি  তখন বিকেলের সূর্য স্তিমিত। দুপুরের সেই তরতাজা সূর্য আর নেই! মানব সভ্যতাও ঠিক এরকম। অতীতের প্রসিদ্ধ ব্যস্ত তাম্রলিপ্ত-মহিষাদল আজ কৌলিন্য হারিয়ে সাধারণ দুটি জায়গায় পরিণত। কিন্তু একথা ঠিক যে, সেই অতীতের ওপর নির্ভর করে বর্তমান দাঁড়িয়ে থাকে আর  অতীত না থাকলে বর্তমানের মূল্য কোথায়?  


(প্রকাশিত- প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা)      



রাজবাড়ি, তমলুক



রাজবাড়ি, তমলুক






রাজবাড়ি, তমলুক



মাতঙ্গিনী হাজরার মূর্তি, তমলুক




মাতঙ্গিনী হাজরার মূর্তি, তমলুক




গোপাল জিউর মন্দির, মহিষাদল






গোপাল জিউর মন্দির, মহিষাদল



রঙ্গিবসান রাজবাড়ি, মহিষাদল




ফুলবাগ রাজবাড়ি, মহিষাদল





মহিষাদলের পরিত্যক্ত রাজ হাই স্কুল





রাজবাড়ি, তমলুক



  

Thursday, August 19, 2021

 কাবলিওয়ালার ছেলে

শৌভিক রায়

মির্জা খানের সঙ্গে সঙ্গে তার সঙ্গীরাও আমাকে খেপাতেন- `এ শুব্বু ! টুমি কোবে বিয়া কোরবা! হামরা সোব টুমার বিয়া খাব।` আমার বয়স তখন চার পাঁচ হবে!
আমার বিয়ে খাওয়ার সৌভাগ্য মির্জা খানের হয় নি। আমি কিন্তু সেই ছোটবেলাতে মির্জা খানের বিয়ে খেয়েছিলাম। আর সেই সুবাদেই কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউও দেখেছিলাম। তাদের একটি ফুটফুটে ছেলেও জন্মেছিল কিছুদিন পর। কোনও একবার মির্জা খান বউ ছেলে দেশে রেখে এলেন। দেশে অবশ্য তার আগের পক্ষের বউ ছিল। শুনেছিলাম বাঙালি মহিলাটি দিব্যি মানিয়ে নিয়েছিলেন সেখানে।
দিনহাটার সেই মহিলা নিশ্চয়ই আজও বেঁচে আছেন। কিন্তু তিনি আফগানিস্তানের কোথায় আছেন সেটা জানি না আর। মির্জা খান‌ও আছেন কিনা জানিনা। থাকলেও তার বয়স নিশ্চয়ই আশি পার করে গেছে! যতদূর জানি, দ্বিতীয় বিয়ে হলেও, ভিনদেশী হলেও, মির্জা খান, মানে আমার কাবলিকাকা, তাকে খুব যত্নে রেখেছিলেন। আজ এই মধ্যবয়সে এসে মনে হয়, দিনহাটার হতদরিদ্র সেই মহিলাটিও বোধহয় বেঁচে গিয়েছিলেন কাবলিকাকুকে পেয়ে!
দিনহাটা তখন ছোট্ট একটি শহর। গোধূলি বাজারে আমাদের বাড়ির উল্টোদিকের মসজিদের চেহারা আজকের মতো হয় নি। তার সামনের মাঠের ঘাসগুলো ছিল খোঁচা খোঁচা। বেশ শক্ত। আমরা তাতেই ফুটবল খেলতাম। মসজিদের পেছনে গোপালকাকুদের বাড়িতে কয়লা বিক্রি হত। পাশের রাস্তা ধরে এগোলে পশু চিকিৎসালয় পার করে ডাকবাংলো আর তার খানিকটা পরে মায়ের দিনহাটা গার্লস হাই স্কুল। স্কুল শেষে মা ওই রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরতেন। মায়ের সঙ্গে কোনও কোনও থাকতেন মানি (শ্রীমতি সন্ধ্যা সাহা), ঝর্ণা মাসি (শ্রীমতি ঝর্ণা নাগ), গৌরী পিসি (শ্রীমতি গৌরী সরখেল), জয়তি মাসি (শ্রীমতি জয়তি ইশোর)।
মসজিদ আর ওই রাস্তার পরেই দিনহাটা হাই স্কুল। কোনও কোনও বিকেলে আমরা স্কুলের মাঠে খেলতাম। থানাও ছিল ছোট্ট। থানার মাঠে তপনকাকু নামে এক পুলিশ কর্মচারী মাঝে মাঝে আমাদের শারীরিক কসরত করাতেন। পয়লা জানুয়ারি হলের মাঠে পাইওনিয়ার ক্লাবের স্পোর্টসের বিরাট আসর বসত। বছরের অন্য সময় ফুলদিঘিতে সাঁতার প্রতিযোগিতা হত। গার্লস স্কুলের পেছন দিকে লম্বা দিঘিটা আমরা এড়িয়ে চলতাম। ওখানে নাকি চন্দ্রবোড়া সাপ পুকুর থেকে উঠে এসে রাস্তায় রোদ পোয়াত!
গোপালনগর শরণার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় অনেকদিন বাবার সবচেয়ে ছোট ভাই আশুকাকু আমাকে স্কুলে দিয়ে আসত। বাস স্ট্যান্ডটা তখন গোধূলি বাজার পার করেই। সকালবেলায় বাসগুলো ইঞ্জিন স্টার্ট করে ঘ্যা ঘো আওয়াজ করত। আশীষ চক্রবর্ত্তী ডাক্তারের চেম্বার চৌপথিতে হলেও বাড়ি ছিল আমাদের বাড়ির মোটামুটি উল্টোদিকে। ওনার বাড়ির পাশে ছিল একাদশী ভান্ডার। আমার খুব মজা লাগত এই নামটা।
সেই দোকান আর মসজিদের মাঝে হোমিওপ্যাথ ডাক্তার মানিক সোমের দোকানের পেছনে বেশ কয়েকটা ঘর নিয়ে থাকতেন কাবলিকাকু ও তার দেশোয়ালি ভাইয়েরা। তাদের লম্বা লম্বা শরীরে আতরের গন্ধ ভুরভুর করত। চোখে লাগানো থাকত সুরমা। মাথায় ফেট্টি বেঁধে সাইকেল চালিয়ে মির্জা খান, মানে আমার কাবলিকাকু, আর তার সঙ্গীরা ব্যবসার কাজ করতেন। না, তিনি মিনির কাবলিওয়ালার মতো ফল-বিক্রেতা ছিলেন না। তাদের সবার ছিল সুদের ব্যবসা। দিনহাটা আর তার আশেপাশে ঘুরে ঘুরে তারা টাকা দেওয়া নেওয়া করতেন। দুই তিন বছরে একবার আফগানিস্থান যেতেন। মাস ছয় বা আরও বেশি থেকে আবার ফিরে আসতেন।
সেই সময় দিনহাটার অনেকে জানতেন যে, আমি কাবলিওয়ালার ছেলে। কেননা বাবা ফালাকাটায়। মা স্কুলে। বড় কাকিমা যৌথ পরিবার সামলাচ্ছেন। ঠাকুমা আছেন তার হেলপার। ঠাকুরদা আর দুই কাকু দোকান নিয়ে ব্যস্ত। একজন চাকরি সূত্রে দিনহাটার বাইরে, আর একজন গ্রামে গ্রামে ঘুরছেন। ভাল খেলোয়াড় ছোটকাকু খেলা নিয়ে আজ গৌহাটি তো কাল শিলিগুড়ি! অতএব আমি ছাড়া গরু।
আমার দায়িত্ব নিয়েছিলেন কাবলিকাকু। কখনও সাইকেলে, কখনো কোলে চাপিয়ে সারা দিনহাটা টহল দিতেন। সেই ফুল চেন কাভার, ব্যাটারি দিয়ে আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা থাকার সাইকেলের সামনের রডে আমার জন্যই একটি বেবি সিট লাগিয়েছিলেন তিনি। সেখানে গ্যাঁট হয়ে বসে আমিও দিব্যি তাঁর সঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম। সত্যি বলতে দিনহাটার অনেক গলিঘুজি পথ চিনেছিলাম কাবলিকাকুর জন্যই। সেই ছোট্টটি থাকতেই!
আমাদের বাড়ির সব অনুষ্ঠানে কাবলিকাকুর বিশেষ উপস্থিতি থাকত। অতিথি বিদায় হলে, তিনি বড় কাকুর ঘরে তার সঙ্গীদের নিয়ে বাঙালি খানা বেশ আরাম করেই খেতেন! আমাদের বাড়িতে চেয়ার টেবিলে ব্যবহার করলেও, তাঁদের নিজেদের ঘরে অবশ্য মেঝেতে গোল করে খেতে বসতেন। মেঝেতে থাকত পুরু কার্পেট। দেওয়ালে ধর্মীয় পেন্টিং ঝুললেও নামাজ পড়তেন মাঝেমাঝে। দেশ থেকে ফিরলেই আমাদের বাড়িতে আখরোট, বাদাম ইত্যাদি আসত। আমাদের বাড়ির বহু ব্যাপারে কাবলিকাকুর মতামতও যথেষ্ট গুরুত্ব পেত।
ফুটবল খেলতে গিয়ে মাথায় চোট পেয়ে অকালে চলে গিয়েছিলেন তরতাজা যুবক ছোটকাকু। শোক তীব্র ব্যাকুল করল। খানিকটা বাউন্ডুলেও হয়ে যাচ্ছিলাম। বাবা ফালাকাটায় নিজের কাছে নিয়ে গেলেন। সেখানে একা একা থাকবার জীবনে মায়ের পর সবচেয়ে বেশি মনে পড়ত কাবলিকাকুর কথা। হয়ত তাঁরও মনে পড়ত। দুই একবার এসেছিলেন আমাদের ফালাকাটার বাড়িতে। আর আমি ছুটিতে দিনহাটায় মায়ের কাছে গেলেই দৌড়তাম তাঁর কাছে।
মাঝে এক দুই বছর তিনি ছিলেন না। দেশে গেছিলেন। খুব অল্প দিনের জন্য যখন ফিরলেন আমি তখন ক্লাস সেভেন। আমার ভাঙা উইং স্যাং পেনটা চেয়ে নিলেন তিনি। ওটা রাখবেন নিজের কাছে। 'ওহিটা দেখলে মুনে ওবে ইন্ডিয়াতে শুব্বু আছে'। এরপর আর একবার তাঁকে দেখলাম ক্লাস টেনে পড়বার সময়। যখন আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়ি, তখনও একবার এসেছিলেন। খবর পেলাম আমাকে দেখবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। চটজলদি গেলাম দিনহাটায়। বয়সের ছাপ পড়লেও ঋজু শরীরে তখনও শক্তপোক্ত পাঠান। আমাকে দেখে অবাক চোখে বললেন, 'টুমি বড়া হয়ে গেলা। হামি বুড়া হইলাম।'
আর দেখা হয় নি কাবলিকাকুর সঙ্গে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকটা ভুলে গেছি তাঁকে। কখনও রাস্তাঘাটে কাবলিওয়ালা দেখলে হঠাৎ তাঁর কথা মনে হয় কদাচিৎ! শুনেছি তাঁর সেই বাঙালি বউয়ের ছেলে বাবার ব্যবসা সামলানোর জন্য এদেশে মাঝে মাঝে আসত। সে অবশ্য একদমই ওদেশের মানুষের চেহারা পেয়েছে। তাকেও দেখেছিলাম সেই কবে! তার বয়সও নিশ্চয়ই এখন পঁয়তাল্লিশ বা তার আশেপাশে হবে।
বিগত দুই চারদিন থেকে আফগানিস্থানের পরিস্থিতি দেখে কাবলিকাকুর কথা ভীষণ মনে হচ্ছে। আদৌ কি আছেন তিনি? থাকলেও, আছেন কেমন? তাঁর সেই ঋজু শরীর কি ঝুঁকে পড়েছে? এখনও কি দু'চারটে বাংলা শব্দ মনে আছে তাঁর? মনে আছে কি দিনহাটার মতিলাল সরকার লেন দিয়ে খানিকটা এগিয়ে তিনি তাঁর সাইকেলে 'শুব্বু'কে ধান ক্ষেত দেখাতে নিয়ে যেতেন? কিংবা কলেজ হল্ট স্টেশন পেরিয়ে গড়ের পাশ দিয়ে এবড়োখেবড়ো কাঁচা রাস্তায় যেতে যেতে বলতেন, 'দিনহাটা বহুত হরা আছে! হামাদের মুলুকের মাফিক বানজারা নেহি।'
'আমার শৈশব' বইটিতে দেখতে পাচ্ছি, 'যাঁরা আমাকে কোলে পিঠে করে বাইরে নানা কিছু দেখিয়ে দেখার আগ্রহ জাগাতেন' কলামে কাবলিকাকুর উল্লেখ। আফসোস, তাঁর কোনও ছবি নেই আমার কাছে। তবে তাঁর উদ্যোগে দিনহাটা মসজিদের সামনে চার বছর বয়সে তোলা একটি ছবি পেলাম নিজের.....
এখনও পৃথিবীর কত জায়গা এরকম। সবুজ হরিয়ালি কোথাও, কোথাও আবার বানজারা। Wasteland... নষ্টভূমি।
আমাদের মানুষদের মতোই!!
* সেই ছবি.....



বিশ্ব ফোটোগ্রাফি দিবস: ছোট্ট আলোকপাত

শৌভিক রায়
`A picture is worth a thousand words....`
ক্যামেরা বলতে আজ যা বুঝি তা থেকে একেবারেই ভিন্ন ক্যামেরায় ১৮২৬ সালে পৃথিবীর প্রথম স্থায়ী ছবিটি তুলেছিলেন ফরাসি Joseph Nicephore Niepce হেলিওগ্রাফি ব্যবহার করে তাঁর তোলা ক্যামেরায় প্রথম যে ছবিটি তোলা হয় তার নাম ছিল "View from the Window at Le Gras"।
১৮৩৭ সালে Joseph Nicephore Niepce ও Louis Daguerre তৈরি করলেন daguerreotype ক্যামেরা। ফোটোগ্রাফির ইতিহাসে শুরু হল এক নতুন অধ্যায়। ১৮৩৯ সালে ফরাসি একাডেমি অফ সায়েন্স ছবি তোলার এই পদ্ধতিকে স্বীকৃতি দিল। সে বছরই ১৯ অগাস্ট ফরাসি সরকার daguerreotype ক্যামেরার স্বত্ব কিনে নিলেন এবং বিশ্ববাসীকে উপহার দিলেন তার মুক্ত ব্যবহারের। ১৯ অগাস্ট দিনটি সেজন্যই বিশ্ব ফোটোগ্রাফি দিবস হিসেবে পালিত হয়।
১৮৮০ সালে কোডাক উপভোক্তাদের জন্য ক্যামেরা বাজারে নিয়ে এলেও ১৯৪০ নাগাদ ক্যামেরার বহুল ব্যবহার শুরু হল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নারকীয়তা উঠে এলো ছবিতে, ফোটো-জার্নালিজম অন্য মাত্রা পেল।
ক্রমশ আধুনিক জীবনে যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে উঠল ক্যামেরা। গত শতকের ষাটের দশকের মাঝামাঝি পোলারয়েড ইনস্ট্যান্ট ইমেজ সিস্টেম আসে। এরপর এস এল আর এবং ডি এস এল আর ফোটোগ্রাফির জগতে বিপ্লব সৃষ্টি করে। স্মার্ট ক্যামেরা, ক্যামকর্ডার আজকের ফোন বা ল্যাপটপ ক্যামেরার জনক বলা যেতে পারে।
(তথ্য ঋণ - FIRSTPOST, NDTV)
ছবি- শৌভিক রায়
স্থান- গোদাক



Sunday, August 15, 2021

 পঠলগড়ি

শৌভিক রায় 


চশমার কাঁচে এখনও লেগে পঠলগড়ি  
স্ট্র আর সিপারে খেলছে উপহাস, 

কাঁপা হাত বলেছিল জিশুরা এরকমই, 
ভাঙলেও মচকায় না তবু, 

ঠান্ডা মেঝেতে সাপেদের শীতলতা থাকলেও, 
আসলে সব সাপ এক নয়

হ্যান্ডকাপ হাতে তাই উঠছ দেবরথে 
ঝরছে পাতা টুপটাপ অগুনতি সুরে.... 

Thursday, August 12, 2021

প্রকাশিত: উত্তরবঙ্গ সংবাদ ৬ অগাস্ট, ২০২১




সূর্যোদয়ের দেশে অলিম্পিকেও নবসৃষ্টির স্বাক্ষর 

শৌভিক রায় 

প্রথম পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের ছিয়াত্তরতম বর্ষে, জাপানে ২০২০ সালের অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হওয়া নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ । ১৯৪৫ সালের ৬ই অগাস্ট প্রথম পরমাণু বোমা 'লিটল বয়` বিস্ফোরণের জন্য, জাপানের হিরোশিমা শহরে, সৈনিক ও সাধারণ মানুষ মিলে লক্ষাধিক লোক মুহূর্তের মধ্যে নিহত হয়েছিলেন। বিস্ফোরণের অভিঘাতে ট্রেনের মতো ভারী যান রেলওয়ে ট্র্যাক ছেড়ে শূন্যে উঠে বনবন করে ঘুরতে শুরু করেছিল।

বিস্ফোরণের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় দশ কিমি দূরে থাকা বাড়িঘরের কড়িবর্গা ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়েছিল। প্রচন্ড উত্তাপে গবাদি পশু থেকে শুরু করে মানুষের শরীরের চামড়া খসে গিয়েছিল। সকাল থেকে শুরু হওয়া  বীভৎস সেই তান্ডব থেমেছিল সন্ধ্যেবেলায়। কেননা ধ্বংস হওয়ার মতো কোনও কিছু আর অবশিষ্ট ছিল না তখন। 

বিস্ফোরণের বহু বছর পরেও মারাত্মক গামা রশ্মির প্রভাবে জাপানে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্মগ্রহণ  কয়েক দশক আগেও অত্যন্ত সাধারণ বিষয় ছিলহিরোশিমার তিনদিন পরে নাগাসাকিতে ফেলা দ্বিতীয়  বোমাটি এরকমই ক্ষতি করেছিল। অন্যদিকে, বিশ্বযুদ্ধে জাপানের অন্যান্য শহর যেমন টোকিও, ওসাকা, কোবা ইত্যাদিও কমবেশি বিদ্ধস্ত থাকলে,ও দুটি পরমাণু বোমার প্রভাব ছাপিয়ে গিয়েছিল সবকিছু। 

 হিরোশিমার নারকীয় ঘটনার নয় দিনের মাথায় জাপান আত্মসমর্পণ করে। শেষ হয় রক্তক্ষয়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। মিত্র শক্তি জাপানকে সাত বছরের জন্য দখল করে নেয়। নতুন করে জাপানের সংবিধান লেখা হয়। রাজার ক্ষমতা কাটছাঁট করা হয়। সরকারের বদল হয়। জাপানি সেনাবাহিনী-সহ বহুকিছুর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি  হয়। 

রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সামরিক সবদিক থেকে প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া সেই দেশ কিন্তু মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছরের মধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৯০ সালে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির মর্যাদা পায় জাপান। আজ, ২০২১ সালে জিডিপির হিসেবে অনুযায়ী জাপান বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি। গড় আয়ুর দিক থেকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ তালিকায় রয়েছে জাপান। 

যে দেশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সারা পৃথিবীর করুণার পাত্র ছিল, যার অর্থনীতির ওপর নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছিল, সেই দেশ আজ অন্যদেশের ঈর্ষার পাত্র। শিল্পে তাদের উন্নতি যেমন চোখ ধাঁধানো, তেমনি উন্নততর জীবনযাত্রায়  স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশগুলির সঙ্গে টেক্কা দিচ্ছে জাপান। 

কিন্তু এর রহস্য কোথায়? আসলে ছিয়াত্তর বছর আগের সেই অপমান ও লাঞ্ছনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আজকের উন্নত জাপানের রহস্য। যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ নতুন করে গড়ার কাজে, জাপান জোর দিয়েছিল 'কাইজেন`-এর ওপর। 'কাইজেন' বলতে জাপানিরা বোঝে যে, ব্যর্থতা কোনও খারাপ ব্যাপার নয়, বরং ব্যর্থতা সাফল্যের পথে একটি পদক্ষেপ মাত্র! 

তাই প্রাকৃতিক সম্পদের অপ্রতুলতা, প্রতিকূল আবহাওয়া, দীর্ঘ সমুদ্র তটরেখা, ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হওয়া সত্বেও, সব দুর্বলতাকে নিজেদের শক্তিতে পরিণত করে জাপানের প্রত্যেক নাগরিক নিজেদের শ্রেষ্ঠ শ্রম দিয়ে চলেছেন প্রতিনিয়ত। চলতি অলিম্পিককেও জাপানিরা অন্য মাত্রা দিয়েছেন। 

নষ্ট হয়ে যাওয়া মোবাইল ফোনের ধাতু থেকে তৈরি  হয়েছে এবারের মেডেল। প্রশান্ত মহাসাগর থেকে প্রাপ্ত প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে পোডিয়াম বানানোর পাশাপাশি, মশাল বাহকদের জন্য প্লাস্টিকের জলের বোতল থেকে টি শার্ট তৈরী করা হয়েছে। তাঁরা প্রমান করেছেন যে, কোনও কিছুই ফেলনা নয়, বরং ছোট ও নষ্ট হয়ে যাওয়া জিনিসের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে প্রচুর সম্ভাবনা। 

প্রথম পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের ছিয়াত্তর বছর পর জাপান তাই আবার ইতিহাস লিখল। যুদ্ধের পর চরম দুর্দশা থেকে টালমাটাল পায়ে উঠে দাঁড়ানো একটি দেশ আজ এমন এক রাজসূয় যজ্ঞের দায়িত্বে, যার ভার সবাই নিতে পারে না। কিন্তু জাপান দেখিয়ে দিয়েছে যে, অদম্য জেদ আর কর্তব্য নিষ্ঠার ফলে সবকিছু সম্ভব হয়। যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে জাপান তাই যেন বিশ্ববাসীকে বলে চলেছে নির্মাণেই সভ্যতা, ধ্বংসে নয়! আজ হিরোশিমা দিবসে, অলিম্পিকের শান্তি ও সৌহার্দ্যের বাণী এভাবেই মিশে যাচ্ছে সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের সঙ্গে।  

(লেখক পেশায় শিক্ষক)

বালকের হস্তি বর্ণন

শৌভিক রায়





ফালাকাটার খাসমহল ময়দানে বছর চার-পাঁচ বাদে সার্কাসের আসর বসত। বিএলআরও অফিসের পাশে বিরাট পাকুর গাছটার নিচে ইয়া মোটা মোটা লোহার শেকলে তাদের বেঁধে রাখা হত। স্কুল যাতায়াতের পথে ড্যাবড্যাবে চোখে তাদের দেখতাম আমরা। বন্ধু পুটন ছড়া কাটত, 'হাতি তোর গোদা পায়ে লাথি'।
বালকের প্রথম হস্তি দর্শন এভাবেই হয়েছিল। অবশ্য তার আগেই রাজেশ খান্নার 'হাতি মেরা সাথি' দেখে কেঁদেছি। ধর্মেন্দ্র হেমামালিনির 'মা` দেখেও ওই একই দশা। তবে ফিল্মের হাতিদের ক্যারিশমা ছিল অন্যরকম। কিন্তু বেঁধে রাখা এই হাতিদের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ত। ওভাবেই জল ফেলতে ফেলতে সামনে রাখা খাবার খেত তারা। সে কী খাওয়া! গোটা কয়েক কলাগাছ, পাহাড় প্রমাণ ঘাস ইত্যাদি প্রায়শই দেখতাম। চোখে জল নিয়ে, দিনের তিনটি শো-তে তারা খেলা দেখাত। তখনও সার্কাসে হাতির খেলায় 'সত্যম শিবম সুন্দরম' গানটা আজকের মতো পেটেন্ট হয়ে যায় নি! তবু সেই হাতিরা গণেশ পুজো করত। টুলে বসত বা দাঁড়াত। জোকারের মোটা দাগের ভাঁড়ামির সঙ্গে আরও কিছু কসরৎ দেখাত! ওদের বিরাট শরীরে ঐ পুঁচকে ল্যাজ দেখে বেশ হাসি পেত।
তখন হাতিরা লোকালয়ে এত আসত না। আসলে জঙ্গল ছিল প্রচুর। জঙ্গলে খাবারও ছিল পর্যাপ্ত। তাই তাদের খাবারের জন্য এদিক ওদিক হানা দেওয়ার কোনও প্রয়োজন ছিল না। কদাচিৎ দলছুট কোনও হাতির কথা শোনা যেত। অবশ্য তখন আজকের মতো এত মিডিয়া, নিউজ পোর্টাল ইত্যাদিও ছিল না। লোকের হাতে ছিল না এত সর্বগুণসম্পন্ন সেল ফোন যা বাগিয়ে পটাপট ছবি বা ভিডিও তোলা যেত! তবে উত্তরের নানা রাস্তায়, বিশেষ করে যেগুলি অরণ্যের মধ্যে দিয়ে গেছে, সেসবে মাঝেমাঝে হাতিদের মাস্তানির কথা শোনা যেত লোকমুখে।
এরকমই এক সময় একবার আমাদের কয়েকজন ছাত্রকে স্কুল থেকে সরকারি উদ্যোগে জলদাপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। হাতির পিঠে চাপিয়ে জঙ্গলে ঘোরানো হয়েছিল। বিরাট বিরাট মহীরুহের নিচে ঢেঁকি শাকের বিস্তীর্ণ জঙ্গল দেখে বন্ধু প্রণব খুব কষ্ট পেয়েছিল ফালাকাটা বাজারের বুড়ি শাকওয়ালির জন্য। চারদিকে এত শাক অথচ তোলার কেউ নেই! যাহোক, সেসময় হলং নদীতে ভেসে আসা তিন মাসের বাচ্চা হাতির পরিচর্যা চলছিল বিট অফিসে। বিরাট এক ফিডিং বোতলে তাকে দুধ খাওয়ানো হচ্ছিল। আমাদের সবেধন নীলমণি আগফা ক্যামেরাটা দিয়ে তার ছবি তুলে পেছন ফিরেছি কি ফিরিনি হঠাৎ আমি শুন্য উঠে গেলাম। ল্যান্ড করার পর বুঝলাম যে, আর কেউ নয়, সেই তিন মাসের বাচ্চাটা পেছন থেকে গুঁতো দিয়েছে। হাতি যে কী বিপুল বলশালী বুঝেছিলাম সেদিন। ব্যথা পেলেও আমার কিন্তু বেশ মজা লেগেছিল। পরবর্তী জীবনে ষাঁড়ের গুঁতো, বিছের কামড় ইত্যাদির নানা অভিজ্ঞতা হলেও ছোট্ট শিশুর সেই হালকা ছোঁওয়া আজও ভুলিনি। ও যেন অনেকটা টিনটিনের সেই ছোট্ট হাতিটার মতো....দুষ্টু কিন্তু বড্ড আদুরে!
২০০০ সালের এক বিকেলে কালিম্পঙ থেকে ফিরছিলাম। সঙ্গে বাবা, রীনা আর ছোট্ট ঋতভাষ। সেভক পার করে এসেই দুদ্দাড় ব্রেক চেপে গাড়ি থামিয়ে দিলেন ড্রাইভার। দেখি মহানন্দা অভয়ারণ্য থেকে বেরিয়ে এসেছে এক বিরাট শরীরের হাতি। গাড়ি ব্যাকগিয়ারে অনেকটা পিছিয়ে গেলেও তার কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। সে রাস্তা দখল করে দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে। বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে, দুদিকে গাড়ির সারি জমিয়ে একসময় দুলকি চালে তার যখন প্রস্থান হল ততক্ষণে সন্ধ্যে হব হব করছে। আর একবার এক হাতি পরিবারের দেখা মিলেছিল জয়ন্তীর থেকে ফেরার পথে। কর্তা কর্ত্রী দুজনে মাইল তাদের ছানাপোনাদের সামলাতে এত ব্যস্ত ছিলেন যে, আমাদের মতো অকিঞ্চিৎকরদের দিকে তাকানোর সময় ছিল না তাদের!
ডুয়ার্সের নানা জঙ্গলে ঘুরবার সুবাদে খানিক আগেও তাদের উপস্থিতি টের পেয়েছি বেশ কয়েকবার। কিন্তু চাক্ষুস দেখা মেলে নি। অবশ্য এখন যা দিনকাল তাতে শহর বা শহর ঘেঁষা জনপদেও তাদের দেখা মিলছে। নগর যত বাড়ছে তত কমছে তাদের নিজস্ব এলাকা। টান ধরছে খাদ্যভাণ্ডারে। ফলে, মানুষের মতো তারাও যেন শহরমুখী!
এই সেদিনও জানতাম না যে, হাতিদের জন্য একটা দিন ধার্য করা হয়েছে। অবশ্য 'ওয়ার্ল্ড এলিফ্যান্ট ডে'-এর বয়স বেশি নয়। ক্যানাডিয়ান প্যাট্রিসিয়া সিমস ও থাইল্যান্ডের রানি শিরিকিটের সংস্থা 'এলিফ্যান্ট রিইন্ট্রোডাকশন ফাউন্ডেশন`-এর উদ্যোগে ২০১২ সালের ১২ অগাস্ট দিনটিকে বেছে নেওয়া হয়েছিল হাতিদের সম্পর্কে জন সচেতনতা বাড়াতে। উল্লেখ করতে হয় মাইকেল ক্লার্ক, শিবাপর্নো দারদারানন্দ প্রমুখের কথাও। উইলিয়াম স্যান্টারের কথনে `রিটার্ন টু দা ফরেস্ট` ছবিটিও সেদিন বিশেষ মাত্রা যোগ করেছিল। ধীরে ধীরে এই সচেতনতা উদ্যোগে যোগ দিয়েছে শতাধিক হাতি প্রেমী সংস্থা। সারা পৃথিবী জুড়ে তারা হাতিদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবহিত করে চলেছেন। এদের উদ্যোগে ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে 'ওয়ার্ল্ড এলিফ্যান্ট সোসাইটি'। ২০২১ সালের এই দিনটিতে বাস্তুতন্ত্রে হাতিদের গুরুত্ব বিষয়ে বিশেষ প্রচার অভিযান চালানো হচ্ছে। ১৬ এপ্রিল আলাদা করে পালন করা হয় 'সেভ দা এলিফ্যান্ট ডে'।
আসলে বাস্তুতন্ত্রে একটি পিঁপড়েরও শক্তিশালী অবদান রয়েছে। আমাদের দেশ-সহ পৃথিবীর যেসব দেশে একদা রাজা-গজা ছিলেন, তাদের অত্যাচারে আর আমাদের বোকামিতে বহু প্রাণীই আজ বিপন্ন।তাদের দাঁতের লোভে আজ অবধি কত সংখ্যক হাতিকে খুন হতে হয়েছে তার কোনও হিসেবে নেই। তা বাদেও টিঁকে থাকবার লড়াইয়ে ধূর্ত মানুষের চালাকির শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছে বহু হাতি। ইলেকট্রিক শকেও পৃথিবীতে হাতি মৃত্যুর সংখ্যা কম নয়। তাদের গায়ে মশাল ছুঁড়ে, মাটিতে গর্ত করে, বুলেটে বিদ্ধ করে হাতিদের মারবার ঘটনাও বহু। চোরা শিকারিদের অস্ত্রে বহু হাতি ঘায়েল হয়ে চলেছে নিত্যদিন।
এই দীর্ঘ লেখা পড়ে আমাকে হাতি বিশেষজ্ঞ ভেবে ভুল করলে কিন্তু বোকামি হবে। সত্যি বলতে হাতিদের সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানি না আমি।
শুধু ভাল লাগে তাদের যূথবদ্ধ স্বভাব। জঙ্গলের কোন গভীরে নিঃশব্দ চলাফেরায় নির্জনতা গায়ে মেখে তারা সাক্ষী থাকে সেই পূর্ণচন্দ্র রাতের, যে রাতে আকাশ থেকে পরী আসে নেমে এই চরাচরে তাদের কানে ঘুমপাড়ানি গান শোনাযে বলে! ভাল লাগে তাদের বিশালত্ব, সারল্য আর তুচ্ছকে উপেক্ষা করার মানসিকতাকে। ভাল লাগে তাদের জ্ঞান-স্বভাব, শ্লথগতি চলা আর কোনও বাঁধাকেই বাঁধা মনে না করা!
মহাভারতের সহ-রচয়িতা হাতিকে তাই আজকের দিনে বিশেষ ভালবাসা....
ছবি- বন দপ্তরের হাতি, ছিপরা