অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদারের 'আধুনিকতা ও বাংলা উপন্যাস'
শৌভিক রায়
সাহিত্য-প্রেমী মানুষ মাত্রেই অধ্যাপক শ্রী অশ্রুকুমার সিকদার নামটির সাথে পরিচিত। দীর্ঘদিনের অধ্যাপক শ্রী অশ্রুকুমার সিকদারের ছাত্রদের কাছে তো বটেই, সাহিত্যমনস্ক যে কোন ব্যক্তির কাছেই তিনি নিজে একটি প্রতিষ্ঠান। সাহিত্য কি, সাহিত্য কেন, সাহিত্য কিভাবে...এই সম্পর্কিত পাঠ নিতে গেলে যাঁদের লেখা ও অনুধাবণ পাঠযোগ্য তাঁদের অন্যতম একজন ব্যক্তিত্ব হলেন শ্রী অশ্রুকুমার সিকদার। ওঁর মতো ব্যক্তিকে নিয়ে বলতে পারাটা সৌভাগ্যস্বরূপ। তার ওপর যদি দায়িত্ব চাপে ওঁর কোন গ্রন্থকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার তবে সে দায়িত্ব পালনে ভয়-মিশ্রিত আনন্দ জাগে কেননা এমন একজনকে নিয়ে বলা আমার মতো অকিঞ্চিৎকরের হয়তো সাজে না। তবু কিছু বলবার চেষ্টা করা।
নবীন যদুর বংশ, আধুনিক কবিতার দিগবলয়, কবির কথা কবিতার কথা, বাক্যের সৃষ্টি: রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ও রোটনস্টাইন, রবীন্দ্রনাট্যে রূপান্তর ও ঐক্য ইত্যাদি সহ অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদারের গ্রন্থ তালিকা দীর্ঘ। সেই দীর্ঘ-তালিকা থেকে 'আধুনিকতা ও বাংলা উপন্যাস' বেছে নিয়েছি পরিচয় করাবার জন্য। বইটির প্রথম প্রকাশ 1988 সালে। কিন্তু আজ তিরিশ বছর বছর অতিক্রান্ত হয়েও বইটির আবেদন একই রকম। সাহিত্য ভাবনা ও আলোচনার ক্ষেত্রে বইটির নিবিড় পাঠ একজন সচেতন পাঠককে কেবলমাত্র ঋদ্ধই করে।
গ্রন্থটিতে মোট সতেরোটি অধ্যায়ে রবীন্দ্র-উপন্যাস থেকে শুরু করে সমরেশ বসুকে নিয়ে আলোচনা এবং সংযোজন হিসেবে 'মানিক বন্দোপাধ্যায়ের নিয়তি' অধ্যায়টি স্থান পেয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদার আলোচনা করছেন রবীন্দ্র-উপন্যাস নিয়ে। তাঁর মতে 'বাংলা উপন্যাসের আধুনিকতার ঐতিহ্য সন্ধান করতে গেলে শুরু করতে হয় রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের 'পিতৃপদবাচ্য', বাংলা উপন্যাসের আধুনিকতার সূত্রপাতও তাঁরই হাত ধরে।' এই সূত্র ধরে একে একে আলোচনায় এসেছে 'গোরা', 'চোখের বালি', 'চতুরঙ্গ', 'ঘরে-বাইরে', 'যোগাযোগ', 'দুই বোন' ইত্যাদি উপন্যাসগুলির কথা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই অধ্যাপক অশ্রুকুমার শিকদারের তীক্ষ্ণ ধীশক্তি উপন্যাসগুলির ভেতর থেকে তুলে এনেছে ছড়িয়ে থাকা মণিমানিক্য। রবীন্দ্রনাথের কলমে কিভাবে উপন্যাসের 'সময়পরাম্পরাগত বিন্যাস' ভাঙচুর হয়েছিল, ক্রিটিক্যাল রিয়ালিজমে স্বামী সহবাসও কিভাবে অশুচি ও অসতীত্ব হয়ে উঠতে পারে তা বিশ্লেষণ করে রবীন্দ্র-উপন্যাসে আধুনিকতার প্রয়োগকে স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন তিনি। পাঠকের মনে নতুন দিশা দেখাতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। ভাবতে শিখিয়েছেন নতুন আঙ্গিকে। অবাক হয়ে দেখতে হয় রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসগুলি কতোটা আধুনিক ছিল তাঁর সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে। দ্বিতীয় অধ্যায়টিতেও লেখকের অত্যন্ত সুন্দর বিশ্লেষণ জারি থাকে। 'যুগলের নিঃসঙ্গতা' শীর্ষক অধ্যায়টিতে লেখক দেখান কিভাবে মানুষ আত্মিক সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আস্থা হারিয়ে ফেলছে প্রত্যয়ে আর প্রমূল্যে। পাশ্চাত্যের বিখ্যাত লেখকদের তুলনা টেনে এনে রবীন্দ্রনাথের লেখায় চরিত্রগুলির পরমশূন্যতাময় বিচ্ছিন্নতাকে চিহ্নিত করেছেন। এই নিঃসঙ্গতার পেছনে রবীন্দ্রনাথের নিজের জীবন অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করেছেন লেখক। উদাহরণ সহযোগে দেখিয়েছেন কিভাবে নিঃসঙ্গতার শিকার হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ এবং কিভাবে তার প্রভাব পড়েছিল তাঁর সৃষ্ট গল্প-উপন্যাসে।
তৃতীয় অধ্যায়ে শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের বিষয় ও বিন্যাসে অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদার চরিত্র সৃষ্টিতে শরৎচন্দ্রের দক্ষতা দেখিয়েছেন। পাশাপাশি এটাও প্রমাণ করেছেন প্লট শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের ক্ষেত্রে চরিত্রকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে। আবার চরিত্র সৃষ্টিতেও শরৎচন্দ্র 'হৃদয়বৃত্তি ও বহিরঙ্গ ঘটনার সংঘাতের উপর জোর দিয়েছেন'। ষরল আখ্যানবস্তুতে তাঁর উপন্যাসে একান্নবর্তী পরিবারই মোটামুটিভাবে সব উপন্যাসের মূল প্রসঙ্গ। লেখকের মতে, সনাতন রীতিতে লিখতে অভ্যস্ত শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে আঙ্গিক সচেতনতার অভাবে উপন্যাসে আধুনিকতার পূর্বাভাস পাওয়া যায় না। সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার প্রতি শরৎচন্দ্রের পক্ষপাত থাকায় গণতান্ত্রিক ভাবনার মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তনটি ধরতে পারেন নি বলেই লেখকের বিশ্বাস। দীর্ঘ আলোচনায় লেখক এই সিদ্ধান্তে আসেন যে 'বাংলা উপন্যাসে আধুনিকতার বিবর্তনে শরৎচন্দ্রের ভূমিকা সামান্য'। কিন্তু তাঁর প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। যাঁরা তাঁর প্রভাবমুক্ত হতে পেরেছিলেন যেমন জগদীশচন্দ্র গুপ্ত বা মানিক বন্দোপাধ্যায় তাঁরা বাংলা সাহিত্যকে আধুনিকতা দিতে পেরেছিলেন।
বাংলা উপন্যাসের আধুনিকতার বিচারে অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদার মনে করেন একমাত্র জগদীশচন্দ্র গুপ্ত ছাড়া কল্লোল-পন্থী ঔপন্যাসিকরা উপন্যাসকে আধুনিকতার দিকে না নিয়ে গিয়ে পিছিয়ে দিয়েছিলেন অনেকটা। তাঁর পর্যবেক্ষণ হল- '...শরৎচন্দ্রের লঘুকরণ থেকে উদ্ধার করা দূরের কথা, শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে জীবনকে পর্যবেক্ষণের যে মহৎ চেষ্টা ভাবালুতার চোরাবালি অতিক্রম করেও বেঁচে ছিল, 'কল্লোল-পন্থীগণ সেই চেষ্টাকে আরো বেশি লঘু তরল ও অবাস্তব করে ফেলেছেন, করে ফেলেছেন রোমান্টিক মরীচিকায় বিভ্রান্ত।'
পঞ্চম অধ্যায়টি বরাদ্দ হয়েছে জগদীশ গুপ্তের জন্য। লেখকের মতে পোস্ট-রেনেসাঁস অ-মানবতন্ত্রী সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য প্রকট জগদীশ গুপ্তের লেখায়। তাঁর 'অসাধু সিদ্ধার্থ', 'গতিহারা জাহ্নবী', 'রোমন্থন', 'সুতিনী', 'মহিষী' ইত্যাদি বিভিন্ন উপন্যাসের দীর্ঘ আলোচনা শেষে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে রবীন্দ্রনাথ-প্রভাতকুমার-শরৎচন্দ্র প্রমুখের প্রভাবমুক্ত হয়ে জগদীশ গুপ্ত যে শৈলীর জন্ম দিলেন তা আক্ষরিক অর্থেই আধুনিক কেননা তাঁর উপন্যাস পড়লে পাঠকের মূল্যবোধ নাড়া খায়। তাঁর স্বকীয় জীবনোপলব্ধি থেকে রচিত উপন্যাসগুলি বাংলা উপন্যাসের আধুনিকতার যাত্রাপথে মাইলস্টোন হয়ে রয়েছে।
পরবর্তী অধ্যায়ে বিভূতিভূষণের 'পথের পাঁচালী' ও 'অপরাজিত' প্রসঙ্গ টেনে আলোচক পরিষ্কার খুঁজে পান জৈবিক সমগ্রতা যা আধুনিকতার বিচ্ছিন্নতা ও নির্বেদের রূপায়ণ। এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদার টোমাস মান, জেমস জয়েসের মতো লেখকদের তুলনা এনেছেন। এটা তো ঠিক 'পথের পাঁচালী'র ভূমিকা বাংলা উপন্যাসের যাত্রাপথে ঠিক কোন জায়গায় তা নিরূপণ করার প্রয়োজন হয় না। তাই যখন লেখক দেখান উপন্যাসের গতি রৈখিক হয় না, হয় বৃত্তাকার, তখন আমরা পরম বিস্ময়ে দেখি নিশ্চিন্দিপুরের গ্রাম থেকে বেরিয়ে অপু সেই গ্রামেই ফিরে আসে এবং কাজলের শৈশবের মধ্যে ঘটে আরও এক বৃত্তের সূত্রপাত।
'তারাশঙ্কর: দ্বন্দ্বের শিল্পী, দ্বন্বের শিকার' শীর্ষক সপ্তম অধ্যায় থেকে শুরু করে তেরো নম্বর অধ্যায় 'বিশ্বাসের সঙ্কট ও সমরেশ বসু' অবধি আলোচনায় এসেছেন ধূর্জটিপ্রসাদ, অন্নদাশঙ্কর রায়, গোপাল হালদার, মানিক বন্দোপাধ্যায়, জীবনানন্দ, সতীনাথ ভাদুড়ী, কমলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ মজুমদার, সমরেশ বসু প্রমুখের উপন্যাসকে কাটাছেঁড়া করেছেন লেখক। তারাশঙ্করের প্রথম উপন্যাস 'চৈতালি ঘূর্ণি' দিয়ে শুরু হওয়া আলোচনা 'ধাত্রীদেবতা', 'পঞ্চগ্রাম', 'গণদেবতা', 'হাঁসুলী বাঁকের উপকথা' ছুঁয়ে 'বিচারক', 'সপ্তপদী', 'বিপাশা' ইত্যাদিতে শেষ হচ্ছে।
বাস্তবের মাত্রা, কালের মাত্রা তারাশঙ্কেরকে বাস্তবতার প্রতি দায়বদ্ধ করেছিল। নৈতিক প্রশ্নে, ইতিহাসের বর্ণময়তায়, বিচিত্র সাধনার অধ্যাত্মিক গূঢ়তায় সৃষ্ট দ্বন্দ্বই তাঁর উপন্যাসগুলিকে আধুনিক করেছিল। লেখক মনে করেন, 'তারাশঙ্করের প্রায় সব উপন্যাসে ঐতিহ্য - আধুনিকতার, অতীত-বর্তমানের, সেকাল-একালের বিরোধের কথা পুনরাবৃত্তভাবে ফায়ার ফায়ার আসে।`
অন্নদাশঙ্করের 'সত্যাসত্য`তে উজ্জয়িনী ও তার আত্ম-অন্বেষণ বাংলা উপন্যাসের আধুনিকতার আর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। একইভাবে ধূর্জটিপ্রসাদের 'অন্তঃশীলা', 'আবর্ত`, 'মোহনা` ইত্যাদি আধুনিক চেতনাপ্রবাহের মিশ্রনে উপন্যাসকে এক ধাক্কায় অনেকটা এগিয়ে দিয়েছিল। রাজনৈতিক বাস্তবতা ফুটে উঠেছিল গোপাল হালদারের 'ত্রিদিবা`তে। বস্তুত, রাজনীতি ছাড়া জীবন যে চলমান নয় এবং রাজনীতি আধুনিক জীবনের অঙ্গ সেকথা বোধহয় চোখে আঙ্গুল দিয়ে গোপাল হালদার প্রথম প্রমান করেন। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের 'জননী', 'পদ্মানদীর মাঝি`যে বাস্তবতার জন্ম দেয় সেই ধারায় যেন অনুসরণ করেন কমলকুমার মজুমদার, সমরেশ বসু প্রমুখ যথাক্রমে 'অন্তর্জলি যাত্রা`, 'বিবর`,'তিনপুরুষ` ইত্যাদি উপন্যাসে। উঠে এসেছে মানিক বন্দোপাধ্যায়ের 'পুতুলনাচের ইতিকথা`, কালকূট নামে সমরেশ বসুর 'অমৃতকুম্ভের সন্ধানে`, 'শাম্ব` ইত্যাদি উপন্যাসগুলোর কথাও। মাঝে আলোচনায় এসেছেন জীবনানন্দ 'অদ্ভুত অপৃথিবী`, অমিয়ভূষণ 'গড় শ্রীখন্ড' এবং অতি অবশ্যই সতীনাথ ভাদুড়ী তাঁর আধুনিক এপিক 'ঢোঁড়াইচরিতমানস` নিয়ে।
একটি বিরাট সময়কে আলোচনায় ধরে অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদার তাঁর এই গ্রন্থে বিদগ্ধ আলোচনায় পাঠকের চেতনাকে এমন জায়গায় নিয়ে যান যাতে পাঠক বুঝতে পারেন উপন্যাস হিসেবে কি পড়া উচিত আর কি নয়। আধুনিকতার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে কালের নিয়মে তা চলবে। আজ থেকে পঞ্চাশ-একশো বছর পর আবার কোনো অশ্রুকুমার সিকদার বর্তমান সময়ের উপন্যাস চেনাবেন এভাবেই যত্ন করে ভবিষ্যতের পাঠকদের।
* প্রকাশিত - অপরাজিতা অর্পণ (সম্পাদক- লক্ষ্মী নন্দী)
শৌভিক রায়
সাহিত্য-প্রেমী মানুষ মাত্রেই অধ্যাপক শ্রী অশ্রুকুমার সিকদার নামটির সাথে পরিচিত। দীর্ঘদিনের অধ্যাপক শ্রী অশ্রুকুমার সিকদারের ছাত্রদের কাছে তো বটেই, সাহিত্যমনস্ক যে কোন ব্যক্তির কাছেই তিনি নিজে একটি প্রতিষ্ঠান। সাহিত্য কি, সাহিত্য কেন, সাহিত্য কিভাবে...এই সম্পর্কিত পাঠ নিতে গেলে যাঁদের লেখা ও অনুধাবণ পাঠযোগ্য তাঁদের অন্যতম একজন ব্যক্তিত্ব হলেন শ্রী অশ্রুকুমার সিকদার। ওঁর মতো ব্যক্তিকে নিয়ে বলতে পারাটা সৌভাগ্যস্বরূপ। তার ওপর যদি দায়িত্ব চাপে ওঁর কোন গ্রন্থকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার তবে সে দায়িত্ব পালনে ভয়-মিশ্রিত আনন্দ জাগে কেননা এমন একজনকে নিয়ে বলা আমার মতো অকিঞ্চিৎকরের হয়তো সাজে না। তবু কিছু বলবার চেষ্টা করা।
নবীন যদুর বংশ, আধুনিক কবিতার দিগবলয়, কবির কথা কবিতার কথা, বাক্যের সৃষ্টি: রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ও রোটনস্টাইন, রবীন্দ্রনাট্যে রূপান্তর ও ঐক্য ইত্যাদি সহ অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদারের গ্রন্থ তালিকা দীর্ঘ। সেই দীর্ঘ-তালিকা থেকে 'আধুনিকতা ও বাংলা উপন্যাস' বেছে নিয়েছি পরিচয় করাবার জন্য। বইটির প্রথম প্রকাশ 1988 সালে। কিন্তু আজ তিরিশ বছর বছর অতিক্রান্ত হয়েও বইটির আবেদন একই রকম। সাহিত্য ভাবনা ও আলোচনার ক্ষেত্রে বইটির নিবিড় পাঠ একজন সচেতন পাঠককে কেবলমাত্র ঋদ্ধই করে।
গ্রন্থটিতে মোট সতেরোটি অধ্যায়ে রবীন্দ্র-উপন্যাস থেকে শুরু করে সমরেশ বসুকে নিয়ে আলোচনা এবং সংযোজন হিসেবে 'মানিক বন্দোপাধ্যায়ের নিয়তি' অধ্যায়টি স্থান পেয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদার আলোচনা করছেন রবীন্দ্র-উপন্যাস নিয়ে। তাঁর মতে 'বাংলা উপন্যাসের আধুনিকতার ঐতিহ্য সন্ধান করতে গেলে শুরু করতে হয় রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে। রবীন্দ্রনাথ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের 'পিতৃপদবাচ্য', বাংলা উপন্যাসের আধুনিকতার সূত্রপাতও তাঁরই হাত ধরে।' এই সূত্র ধরে একে একে আলোচনায় এসেছে 'গোরা', 'চোখের বালি', 'চতুরঙ্গ', 'ঘরে-বাইরে', 'যোগাযোগ', 'দুই বোন' ইত্যাদি উপন্যাসগুলির কথা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই অধ্যাপক অশ্রুকুমার শিকদারের তীক্ষ্ণ ধীশক্তি উপন্যাসগুলির ভেতর থেকে তুলে এনেছে ছড়িয়ে থাকা মণিমানিক্য। রবীন্দ্রনাথের কলমে কিভাবে উপন্যাসের 'সময়পরাম্পরাগত বিন্যাস' ভাঙচুর হয়েছিল, ক্রিটিক্যাল রিয়ালিজমে স্বামী সহবাসও কিভাবে অশুচি ও অসতীত্ব হয়ে উঠতে পারে তা বিশ্লেষণ করে রবীন্দ্র-উপন্যাসে আধুনিকতার প্রয়োগকে স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন তিনি। পাঠকের মনে নতুন দিশা দেখাতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। ভাবতে শিখিয়েছেন নতুন আঙ্গিকে। অবাক হয়ে দেখতে হয় রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসগুলি কতোটা আধুনিক ছিল তাঁর সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে। দ্বিতীয় অধ্যায়টিতেও লেখকের অত্যন্ত সুন্দর বিশ্লেষণ জারি থাকে। 'যুগলের নিঃসঙ্গতা' শীর্ষক অধ্যায়টিতে লেখক দেখান কিভাবে মানুষ আত্মিক সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আস্থা হারিয়ে ফেলছে প্রত্যয়ে আর প্রমূল্যে। পাশ্চাত্যের বিখ্যাত লেখকদের তুলনা টেনে এনে রবীন্দ্রনাথের লেখায় চরিত্রগুলির পরমশূন্যতাময় বিচ্ছিন্নতাকে চিহ্নিত করেছেন। এই নিঃসঙ্গতার পেছনে রবীন্দ্রনাথের নিজের জীবন অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করেছেন লেখক। উদাহরণ সহযোগে দেখিয়েছেন কিভাবে নিঃসঙ্গতার শিকার হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ এবং কিভাবে তার প্রভাব পড়েছিল তাঁর সৃষ্ট গল্প-উপন্যাসে।
তৃতীয় অধ্যায়ে শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের বিষয় ও বিন্যাসে অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদার চরিত্র সৃষ্টিতে শরৎচন্দ্রের দক্ষতা দেখিয়েছেন। পাশাপাশি এটাও প্রমাণ করেছেন প্লট শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের ক্ষেত্রে চরিত্রকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে। আবার চরিত্র সৃষ্টিতেও শরৎচন্দ্র 'হৃদয়বৃত্তি ও বহিরঙ্গ ঘটনার সংঘাতের উপর জোর দিয়েছেন'। ষরল আখ্যানবস্তুতে তাঁর উপন্যাসে একান্নবর্তী পরিবারই মোটামুটিভাবে সব উপন্যাসের মূল প্রসঙ্গ। লেখকের মতে, সনাতন রীতিতে লিখতে অভ্যস্ত শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে আঙ্গিক সচেতনতার অভাবে উপন্যাসে আধুনিকতার পূর্বাভাস পাওয়া যায় না। সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার প্রতি শরৎচন্দ্রের পক্ষপাত থাকায় গণতান্ত্রিক ভাবনার মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তনটি ধরতে পারেন নি বলেই লেখকের বিশ্বাস। দীর্ঘ আলোচনায় লেখক এই সিদ্ধান্তে আসেন যে 'বাংলা উপন্যাসে আধুনিকতার বিবর্তনে শরৎচন্দ্রের ভূমিকা সামান্য'। কিন্তু তাঁর প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। যাঁরা তাঁর প্রভাবমুক্ত হতে পেরেছিলেন যেমন জগদীশচন্দ্র গুপ্ত বা মানিক বন্দোপাধ্যায় তাঁরা বাংলা সাহিত্যকে আধুনিকতা দিতে পেরেছিলেন।
বাংলা উপন্যাসের আধুনিকতার বিচারে অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদার মনে করেন একমাত্র জগদীশচন্দ্র গুপ্ত ছাড়া কল্লোল-পন্থী ঔপন্যাসিকরা উপন্যাসকে আধুনিকতার দিকে না নিয়ে গিয়ে পিছিয়ে দিয়েছিলেন অনেকটা। তাঁর পর্যবেক্ষণ হল- '...শরৎচন্দ্রের লঘুকরণ থেকে উদ্ধার করা দূরের কথা, শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে জীবনকে পর্যবেক্ষণের যে মহৎ চেষ্টা ভাবালুতার চোরাবালি অতিক্রম করেও বেঁচে ছিল, 'কল্লোল-পন্থীগণ সেই চেষ্টাকে আরো বেশি লঘু তরল ও অবাস্তব করে ফেলেছেন, করে ফেলেছেন রোমান্টিক মরীচিকায় বিভ্রান্ত।'
পঞ্চম অধ্যায়টি বরাদ্দ হয়েছে জগদীশ গুপ্তের জন্য। লেখকের মতে পোস্ট-রেনেসাঁস অ-মানবতন্ত্রী সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য প্রকট জগদীশ গুপ্তের লেখায়। তাঁর 'অসাধু সিদ্ধার্থ', 'গতিহারা জাহ্নবী', 'রোমন্থন', 'সুতিনী', 'মহিষী' ইত্যাদি বিভিন্ন উপন্যাসের দীর্ঘ আলোচনা শেষে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে রবীন্দ্রনাথ-প্রভাতকুমার-শরৎচন্দ্র প্রমুখের প্রভাবমুক্ত হয়ে জগদীশ গুপ্ত যে শৈলীর জন্ম দিলেন তা আক্ষরিক অর্থেই আধুনিক কেননা তাঁর উপন্যাস পড়লে পাঠকের মূল্যবোধ নাড়া খায়। তাঁর স্বকীয় জীবনোপলব্ধি থেকে রচিত উপন্যাসগুলি বাংলা উপন্যাসের আধুনিকতার যাত্রাপথে মাইলস্টোন হয়ে রয়েছে।
পরবর্তী অধ্যায়ে বিভূতিভূষণের 'পথের পাঁচালী' ও 'অপরাজিত' প্রসঙ্গ টেনে আলোচক পরিষ্কার খুঁজে পান জৈবিক সমগ্রতা যা আধুনিকতার বিচ্ছিন্নতা ও নির্বেদের রূপায়ণ। এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদার টোমাস মান, জেমস জয়েসের মতো লেখকদের তুলনা এনেছেন। এটা তো ঠিক 'পথের পাঁচালী'র ভূমিকা বাংলা উপন্যাসের যাত্রাপথে ঠিক কোন জায়গায় তা নিরূপণ করার প্রয়োজন হয় না। তাই যখন লেখক দেখান উপন্যাসের গতি রৈখিক হয় না, হয় বৃত্তাকার, তখন আমরা পরম বিস্ময়ে দেখি নিশ্চিন্দিপুরের গ্রাম থেকে বেরিয়ে অপু সেই গ্রামেই ফিরে আসে এবং কাজলের শৈশবের মধ্যে ঘটে আরও এক বৃত্তের সূত্রপাত।
'তারাশঙ্কর: দ্বন্দ্বের শিল্পী, দ্বন্বের শিকার' শীর্ষক সপ্তম অধ্যায় থেকে শুরু করে তেরো নম্বর অধ্যায় 'বিশ্বাসের সঙ্কট ও সমরেশ বসু' অবধি আলোচনায় এসেছেন ধূর্জটিপ্রসাদ, অন্নদাশঙ্কর রায়, গোপাল হালদার, মানিক বন্দোপাধ্যায়, জীবনানন্দ, সতীনাথ ভাদুড়ী, কমলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ মজুমদার, সমরেশ বসু প্রমুখের উপন্যাসকে কাটাছেঁড়া করেছেন লেখক। তারাশঙ্করের প্রথম উপন্যাস 'চৈতালি ঘূর্ণি' দিয়ে শুরু হওয়া আলোচনা 'ধাত্রীদেবতা', 'পঞ্চগ্রাম', 'গণদেবতা', 'হাঁসুলী বাঁকের উপকথা' ছুঁয়ে 'বিচারক', 'সপ্তপদী', 'বিপাশা' ইত্যাদিতে শেষ হচ্ছে।
বাস্তবের মাত্রা, কালের মাত্রা তারাশঙ্কেরকে বাস্তবতার প্রতি দায়বদ্ধ করেছিল। নৈতিক প্রশ্নে, ইতিহাসের বর্ণময়তায়, বিচিত্র সাধনার অধ্যাত্মিক গূঢ়তায় সৃষ্ট দ্বন্দ্বই তাঁর উপন্যাসগুলিকে আধুনিক করেছিল। লেখক মনে করেন, 'তারাশঙ্করের প্রায় সব উপন্যাসে ঐতিহ্য - আধুনিকতার, অতীত-বর্তমানের, সেকাল-একালের বিরোধের কথা পুনরাবৃত্তভাবে ফায়ার ফায়ার আসে।`
অন্নদাশঙ্করের 'সত্যাসত্য`তে উজ্জয়িনী ও তার আত্ম-অন্বেষণ বাংলা উপন্যাসের আধুনিকতার আর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। একইভাবে ধূর্জটিপ্রসাদের 'অন্তঃশীলা', 'আবর্ত`, 'মোহনা` ইত্যাদি আধুনিক চেতনাপ্রবাহের মিশ্রনে উপন্যাসকে এক ধাক্কায় অনেকটা এগিয়ে দিয়েছিল। রাজনৈতিক বাস্তবতা ফুটে উঠেছিল গোপাল হালদারের 'ত্রিদিবা`তে। বস্তুত, রাজনীতি ছাড়া জীবন যে চলমান নয় এবং রাজনীতি আধুনিক জীবনের অঙ্গ সেকথা বোধহয় চোখে আঙ্গুল দিয়ে গোপাল হালদার প্রথম প্রমান করেন। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের 'জননী', 'পদ্মানদীর মাঝি`যে বাস্তবতার জন্ম দেয় সেই ধারায় যেন অনুসরণ করেন কমলকুমার মজুমদার, সমরেশ বসু প্রমুখ যথাক্রমে 'অন্তর্জলি যাত্রা`, 'বিবর`,'তিনপুরুষ` ইত্যাদি উপন্যাসে। উঠে এসেছে মানিক বন্দোপাধ্যায়ের 'পুতুলনাচের ইতিকথা`, কালকূট নামে সমরেশ বসুর 'অমৃতকুম্ভের সন্ধানে`, 'শাম্ব` ইত্যাদি উপন্যাসগুলোর কথাও। মাঝে আলোচনায় এসেছেন জীবনানন্দ 'অদ্ভুত অপৃথিবী`, অমিয়ভূষণ 'গড় শ্রীখন্ড' এবং অতি অবশ্যই সতীনাথ ভাদুড়ী তাঁর আধুনিক এপিক 'ঢোঁড়াইচরিতমানস` নিয়ে।
একটি বিরাট সময়কে আলোচনায় ধরে অধ্যাপক অশ্রুকুমার সিকদার তাঁর এই গ্রন্থে বিদগ্ধ আলোচনায় পাঠকের চেতনাকে এমন জায়গায় নিয়ে যান যাতে পাঠক বুঝতে পারেন উপন্যাস হিসেবে কি পড়া উচিত আর কি নয়। আধুনিকতার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে কালের নিয়মে তা চলবে। আজ থেকে পঞ্চাশ-একশো বছর পর আবার কোনো অশ্রুকুমার সিকদার বর্তমান সময়ের উপন্যাস চেনাবেন এভাবেই যত্ন করে ভবিষ্যতের পাঠকদের।
* প্রকাশিত - অপরাজিতা অর্পণ (সম্পাদক- লক্ষ্মী নন্দী)
No comments:
Post a Comment