Tuesday, December 11, 2018

বিষাদপ্রতিমার সাথে
শৌভিক রায়

এক

দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে সরু প্যাসেজটায়। এই গ্রীষ্মকালেও গায়ে একটা হালকা চাদর। অবশ্য নামেই গ্রীষ্ম। আজকাল এদিকে শীতের শেষ থেকেই বৃষ্টি নেমে যায়। ঠান্ডার আমেজ কাটতে এখনও অনেকদিন। যদি বা দু'একদিন গরম পড়ে হুড়মুড়িয়ে এমন বৃষ্টি আর হাওয়া শুরু হবে যে গরম পালাবে সাথে সাথে। তাছাড়া সেন্ট্রালাইজড এসির এই নার্সিং হোমটা বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা। সেদিক থেকে দেখতে গেলে চাদরটা বেমানান না। চুলগুলো এলোমেলো। কয়েক গাছা চুল কপালে এসে নেমেছে। ঠোঁট দেখে মনে হচ্ছে হালকা লিপস্টিক বোলানো। তবে ন্যাচারাল কালার। কিন্তু সবচেয়ে টানছে চোখ দু'টো। এক অদ্ভুত বিষন্নতা দুই চোখে। কি গভীর চোখ। উদাসী। একটা হাত হুইল চেয়ারে রাখা। হুইল চেয়ারের লোকটি কে? বাবা? তাই-ই হবে। প্যাসেজের শেষে বন্ধ দরজা মাঝে মাঝে খুলছে। পেশেন্ট ঢুকছে স্ক্যানে। যাদের হয়ে যাচ্ছে বেরোচ্ছে তারা। খানিক আগেও নার্সিং হোমকে মনে মনে গাল দিচ্ছিল শতায়ু। পেশেন্টদেরকে এভাবে নিয়ে এসে লাইনে বসিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু এখন আর দিচ্ছে না। বরং মনে মনে বলছে লাইনটা আরও একটু বেশী হলে ভালো হতো।
দু'দিন থেকে সেজোপিসীর জন্য নার্সিং হোমে বেশ খানিকটা সময় দিতে হচ্ছে শতায়ুকে। তার অবশ্য তাতে সমস্যা নেই। হাতে তার অঢেল সময়। বেকার হলে যা হয় আর কি! নার্সিং হোম-টোম একেবারেই না পসন্দ্ শতায়ুর। কিন্তু মায়ের দীর্ঘনিঃশ্বাস, বাবার না কথা বলা বাড়ির থেকে অনেক ভালো বলে সেজোপিসীর মেয়ে মহুয়াদি তার হেল্প চাওয়ায় সেজোপিসীর পুরো দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে সে।
এই তিনদিনেই নার্সিং হোম আর সেজোপিসীর বায়নাক্কায় ত্রাহি ত্রাহি দশা হলেও বাড়ির চেয়ে নার্সিং হোমটাকেই তার নিরাপদ বলে মনে হয়েছে। বাবার ওই গম্ভীর মুখ আর মায়ের দীর্ঘনিঃশ্বাস তো দেখতে আর শুনতে হচ্ছে না! শতায়ু বুঝেই পায় না তার দোষটা ঠিক কোথায়। চাকরীর পরীক্ষা সে দিচ্ছে। মানে যেগুলি হচ্ছে আর কি। বেশীর ভাগই তো বন্ধ। দিচ্ছে যেগুলি সেগুলিরও রেজাল্ট হচ্ছে না। হলে একটা লাগবেই এটা নিশ্চিন্ত শতায়ু। তাছাড়া একদম যে বসে রয়েছে সে তাও নয়। কয়েকজন বন্ধু মিলে তারা একটা এমপ্লয়মেন্ট অপরচুনিটি নামে সংস্থা খুলেছে। চাকরী পাইয়ে দেওয়া লক্ষ্য তাদের। যদিও তার নিজেরই হাসি পায় এটা ভেবে যে তার সংস্থা তাকেই চাকরী দিতে পারছে না! তবু তো কিছু আসে তার সংস্থা থেকে। সামান্য হলেও আসে। টিউশন রয়েছে। তাতেও একদম খারাপ আসে না। টিউশনের টাকা থেকেই গত পূজায় বাবাকে একটা শার্ট আর মা'কে শাড়ি দিয়েছিল। গম্ভীর মুখে বাবা শার্টটা নিয়েছিল। মায়ের যথারীতি দীর্ঘনিঃশ্বাস। তবে ওরা যে খুবই খুশী হয়েছে সেটা বুঝেছিল শতায়ু নবমীতে। বাবা আর মা ওই দিনটায় একসাথে প্রতিমা দেখতে যান পূজা স্পেশাল জামাকাপড়ে। পাড়ার প্যান্ডেলে বসে শতায়ু দেখেছিল বাবা  তার দেওয়া শার্ট আর মা ওই শাড়িটা পড়ে এসেছে। শতায়ু বুঝেছিল সে এইসময় পাড়ার প্যান্ডেলে থাকবে না ভেবে বাবা মায়ের আসা। কাছে গেলে দু'জনেই লজ্জা পাবে বুঝে শতায়ু নিজেই লুকিয়ে পড়ে তিরতিরে সুখ নিয়ে।
কিন্তু বাড়িতে সর্বক্ষণ ওই গম্ভীর মুখ আর দীর্ঘনিঃশ্বাস শতায়ুর একদম ভালো লাগে না। তার চেয়ে এটা ভালো। এসি-তে বসে থাকা, টাকা পয়সা জমা করা ছাড়া কাজ নেই। হেডফোনে গান শোনা, মাঝে মাঝে ক্যাফেতে গিয়ে কফি খাওয়া আর উঁকি মারা। এটা ঠিক সেজোপিসীর বায়নাক্কা আছে অনেক। হয়ও নি তেমন কিছু। তবু খারাপ লাগছে না সব মিলে। তার ওপর যদি ওরকম বিষাদপ্রতিমা থাকে তবে তো...!! চোরাচোখে তাকায় শতায়ু। একই ভাবে দাঁড়িয়ে।

দুই

হঠাৎই হুইল চেয়ারে বসে থাকা বিষাদপ্রতিমার বাবার মাথা নুইয়ে পড়ে। চেয়ার থেকে পড়ে যাবার উপক্রম। বিষাদপ্রতিমার সাথে শতায়ুও হাত বাড়িয়ে দেয় পতন রুখতে।
"বাবা, বাবা...."
 "আর কতক্ষণ রে মা! পারছি না আর।"
শতায়ুর মেজাজ খারাপ হয়ে যায় আবার। বন্ধ দরজায় টোকা দেয়।
" কি ব্যাপার বলুন তো? পেশেন্টদের এভাবে আটকে রেখেছেন। এটা একটা সিস্টেম হলো?"
" এই স্যার এর পরেই আপনার পেশেন্ট।"
" আপনার পেশেন্ট!! খুব বাজে সিস্টেম। শুনুন আগে ওই ভদ্রলোকেরটি হবে। আমার পেশেন্ট পরে যাবে।"
বিষাদপ্রতিমার মুখে হালকা বিস্ময়। চোখে কৃতজ্ঞতা।
"আপনার বাবাকে নিন তো আগে।"
"আপনাকে যে কি ব'লে..."
"দিতে হবে না। এখন নিন আগে। সরুন। আমি নিয়ে যাচ্ছি। এই যে আয়ামাসি, আর কতো আড্ডা দেবে? পেশেন্ট ফেলে এদিক ওদিক ক'রে যাচ্ছো। সোজা গিয়ে ড: দাসকে বলবো। ধরো ওঁকে।"
পেশেন্ট নিয়ে আয়ামাসী ভেতরে ঢুকে গেলে মুখ ফেরায় শতায়ু।
"আপনার সাথে আর কে আছে?"
"এই মুহূর্তে আমি একাই। রাতে ছিলাম। ছেলেদের তো অ্যালাও করে না। ভাই আসবে একটু পর।"
"হুমম, রাতে ছিলেন। চা খেয়েছেন? খাননি। যান ক্যাফে থেকে খেয়ে আসুন। আমি আছি।"
"কিন্তু আপনার পেশেন্ট...."
"অসুবিধে নেই। আপনার বাবার স্ক্যান শেষ হতে হতে আপনি এসে যাবেন। নিশ্চিন্তে যান।"

তিন

অনেকগুলি মেসেজ ইনবক্সে। একটা একটা ক'রে দেখছে শতায়ু। অকাজের মেসেজ সব। এটা দেখেই অফলাইন হবে।
- গুড মর্নিং
পাঠাচ্ছে সহেলি ঘোষ।
কে এ? প্রোফাইলটা চেক করে শতায়ু। বিশেষ কিছু নেই। প্রোফাইল পিকচার একটাই। কিছু আপলোডস্। জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানিয়েছে অনেকে। এই এক মিউচুয়াল ফ্রেন্ড। ওহহ এই মেয়েটি বেশ কিছুদিন আগে রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছিল। শতায়ু রিকুয়েস্টটা অ্যাকসেপ্ট করেছিল। কিন্তু ওটুকুই। প্রোফাইল পিকচারটা বেশ ঝলমলে। ভদ্রতা করে শতায়ু উত্তর দিল-
- থ্যাঙ্কু। গুড মর্নিং।
প্রায় সাথে সাথেই উত্তর এলো-
- কেমন আছেন?
- ভালো। কিন্তু আপনাকে....
- চেনেন নি তো?
- না মানে ঠিক বুঝতে পারছি না।
- নার্সিং হোমে দেখা হয়েছিল আপনার সাথে।
- নার্সিং হোম?
- ভুলে গেলেন? গরমের সময়। আমার বাবা ছিলেন। খুব হেল্প করেন আপনি সেদিন। বাবাকে পৌঁছে দিয়েছিলেন বেডে। ক্যাফেতে আয়াকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছিলেন। আমার তো তখনও চা খাওয়াই হয়নি। অবশ্য মনে না থাকবারই কথা। ছয়মাসের ওপর হয়ে গেছে।
বিষাদপ্রতিমা!! ঝপ ক'রে মনে পড়ে গেলো শতায়ুর। ইসস, ছবি দেখে চিনতেই পারে নি। - আরে হ্যাঁ হ্যাঁ। মনে পড়েছে। সরি, প্রোফাইল পিক দেখে বুঝতেই পারিনি। কিছু মনে করবেন না।
- না না মনে করবো কেন! আমি বুঝতে পারছিলাম যে চিনতে পারেন নি।
- হ্যাঁ একদমই বুঝতে পারিনি।
- সেটাই স্বাভাবিক। ওইটুকু সময় দেখা। তাও পেশেন্ট নিয়ে। মনে না থাকাটাই স্বাভাবিক।
- কিন্তু আপনি তো রেখেছেন।
- আমার ব্যাপারটা আলাদা। আপনাকে ধন্যবাদটাও দিতে পারিনি সেদিন।
- কিসের ধন্যবাদ?
- খুব উপকার করেছিলেন সেদিন। অনেক খুঁজেছিলাম আপনাকে। পাই নি।
- আমার সেজোপিসীর ছুটি হয়ে গেছিলো ওদিনই।
- ওহহ।
- কিন্তু এখানে কিভাবে পেলেন? আপনি তো আমার নাম জানতেন না।
- আমার আপনার মিউচুয়াল ফ্রেন্ডের লিস্টে আপনার ছবি দেখে চিনেছি। এখন তো নামটাও জানি।
- আপনি চিনে গেলেন, রিকুয়েস্ট পাঠালেন আর আমি চিনলাম না!! ছি ছি।
- তাতে কি? এখন তো চিনলেন।
- তা চিনলাম। এবার বলুন আপনার বাবা কেমন আছেন?
- বাবা এখন ভালো।
- বাঃ। ভাই?
- ভাইয়ের কথা মনে আছে? হ্যাঁ ও ভালো আছে।
- বেশ বেশ।
- আজ রাখি?
- হ্যাঁ হ্যাঁ রাখুন। খুব ভালো লাগলো।
- আমারও।

ভোম্বল লাগে শতায়ুর নিজেকে। ছি ছি। বিষাদপ্রতিমাকে চিনতেই পারলো না?
খুব বিচ্ছিরি হ'ল ব্যাপারটা।
 যাকগে, কি আর করা।

চার

বিকেল থেকেই বৃষ্টি। এই সময় বৃষ্টি হ'লে ঠান্ডাটা বেশ জাঁকিয়ে পড়ে। সন্ধ্যে থেকেই লেপের তলায় ঢুকেছে শতায়ু। ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষা শেষ। কোন ভাবনা নেই। মোবাইলটা হাতে নিয়ে মেসেজ করে শতায়ু। সহেলিকে।
- আমার কিন্তু চাকরী নেই।
- তো?
- না তাই বললাম।
- হঠাৎ চাকরীর কথা কেন?
- বাদ দাও। একটা কথা।
- কি?
- আমাকে কি বলে ডাকো তুমি?
- মানে?
- আজ পর্যন্ত কোন সম্বোধন  তো করো নি।
- ও, কি বলে ডাকবো তুমি বলে দাও।
- ডাকবে তুমি আর বলবো আমি?
- কেন বলবে না? আমি "তুমি" করে বলতে বলিনি "আপনি" ছেড়ে?
- ওতো যুক্তি দিও না তো।
- দিচ্ছি না।
- তো বলো।
- কি হবে তাতে?
- একটা জিনিষ বুঝবো।
- কি বুঝবে?
- ওটা সিক্রেট। বলা যাবে না।
- তাহলে আমিও বলবো না।
- বলো না!!
- খেতে যাও। রাত হয়েছে।
- আগে বলো।
- বড্ড ছেলেমানুষি করো শতায়ু।
- কি? কি? কি বলে ডাকলে?
- শতায়ু।
- যাক।
- কেন কি হলো?
- কিছু না। আমি কিন্তু বেকার।
- জানি তো।
- পারবে?
- আমি তো চাকরীর সাথে থাকবো না।
- সহেলি...সত্যি?
- হুমম
- একবার বলো।
- সব বলতে হয় না। কিছু বুঝতে হয়।
- বোঝাও নি কেন?
- বুঝতে চাওনি কেন?
- সহেলি...
- উমম...এবার যাও। খেয়ে নাও।


পাঁচ

বাবার মুখে হাসি। মায়ের দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়ছে না। সহেলীরও প্রাথমিক জড়তাটা কেটে গেছে। ইনবক্সে সেই গুড মর্নিং মেসেজ দিয়ে শুরু হয়েছিল। তারপর কেটে গেছে অনেকগুলি মাস। মোটামুটি প্রতিদিন কথা ছাড়াও দেখা হয়েছে কখনও সিটি সেন্টারে, কখনো সেভকে বা মধুবনে। তারপর আজ সটান বাবা মায়ের কাছে। বাবার কান্ড দেখে শতায়ু অবাক। যে লোকটা কথাই বলে না সে কেমন বকবক করে চলেছে। মায়ের দীর্ঘনিঃশ্বাস আর বাবার কথা না বলা নিয়ে পাখি পড়া পড়িয়ে নিয়ে এসেছিল শতায়ু সহেলীকে।
- কিন্তু মা তোকে যে তিনটি মাস একা কাটাতে হবে।
বাবার এই টুকরো কথাটা কানে এলো শতায়ুর। দু'জনে কি এতো কথা বলছে কে জানে। আর তিনমাস একা থাকার কথাই বা আসছে কেন সেটাও শতায়ু বুঝতে পারলো না। সেদিন যখন সহেলীর কথা বাড়িতে বললো শতায়ু বাবা একটা কথাও বলে নি। মায়ের দীর্ঘনিঃশ্বাস ঘনঘন পড়তে শুরু করেছিল। আজ মোটামুটি একটা যুদ্ধের আবহের জন্য রেডি ছিল শতায়ু। কিন্তু সব কিছু যেন বেশিই স্বাভাবিক।
সহেলীকে এগিয়ে দিতে যায় শতায়ু। চলে যাবার আগে একটা খাম দেয় সহেলী শতায়ুর হাতে। বলে-
" তোমার বাবা তোমায় দিতে বলেছেন।"
খামের মুখটা খোলা। সহেলী হাত নেড়ে যেতে যেতে বলে গেল,
" তিন মাস কিন্তু। দিনে তো পারবে না। রাতে ম্যানেজ করবে দিনেরটা, যেভাবেই হ'ক। আমি একা থাকতে পারবো না। আর শোন, আমার বাবা-মায়ের সাথে কথা হয়েছে তোমার বাবা-মায়ের। তুমি ফিরলে পাঁচ মাসের পর সারাদিন জ্বালাবো।"
হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে সহেলীর যাওয়া দেখে শতায়ু। তারপর সম্বিত ফিরতেই খামটার ভেতর হাত ঢোকায়।

অ্যাপয়ন্টমেন্ট লেটার। তিনমাস পুনেতে ট্রেনিঙ নিতে হবে।

শতায়ুর মনে হয় কয়েকদিন থেকেই বাবার মুখে হাসি দেখছিল। আর মায়ের দীর্ঘনিঃশ্বাসটাও শোনে নি।


প্রকাশিত - হেমন্তলোক

No comments: