Tuesday, October 30, 2018

ডুয়ার্সের টোটোরা

শৌভিক রায়


তাদিং পাহাড়ের গায়ে পশ্চিম সূর্যের আলো।বিচ্ছুরিত হয়ে সে আলো ঢুকেছে 'ডেইচি-কো-সিরি'তে। সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ি ভুট্টা খেত দেখব বলে। অনেকবার দেখা হলেও ছাত্র বিপ্লবের উৎসাহে জল ঢালতে মন চায় না। আঁকাবাঁকা পথে কখনো একটু উঁচুতে উঠে কখনো নীচুতে নেমে ঘুরে বেড়াই সারা গ্রাম। সুপুরি গাছের আধিক্য পাহাড়ের ঢালে, বেশ দূরে নদীর আভাস আর আর এক পাহাড়ের গায়ে বাড়িঘর। বিপ্লব জানালো ওটা ফুন্টশোলিং। নদীটি তবে হতেই হয় তোর্ষা। আর এই তোর্ষা পেরিয়ে পৌঁছেছি এখানে। তবে একা তোর্ষা নয়, মাদারিহাট থেকে এখানে পৌঁছতে পার হতে হয়েছে আরও অনেক নদী আর পাহাড়ী ঝোরা। 
তাও এখন রাস্তা অনেক ভাল। আশির দশকের শুরুর দিকে যখন এখানে প্রথম আসি তখন মনে হয়েছিল সভ্যতার থেকে যেন অনেক দূরে চলে এলাম। নব্বই দশকের শেষেও অবস্থা প্রায় একই ছিল। বিদ্যালয় থাকলেও অবস্থা ছিল তথৈবচ। আধুনিক শিক্ষা-সংস্কৃতি সবেতেই পিছিয়ে এক অদ্ভুত জায়গা। রাস্তার দশা? থাক সে কথা। এখন  রাস্তা অনেকটা ভাল। তবে সম্পূর্ণ নয়। গা ছমছমে জঙ্গল আর শুকনো নদী পার হতে হয় আজও। 
নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে এতো যে কথা তা কাকে নিয়ে! সূত্র দিয়েছিলাম একদম শুরুতেই- তাদিং পাহাড়। যাক আর ফেনিয়ে কাজ নেই! আসলে এতো কথা টোটোপাড়ার জন্য। টোটোপাড়াকে নিয়ে। সাবেক জলপাইগুড়ি (বর্তমান আলিপুরদুয়ার) জেলার ছোট্ট একটি গ্রাম টোটোপাড়া। এখানে থাকেন টোটো নামের আদিবাসীরা। ডুয়ার্সের মিশ্র জনজাতির ইতিহাসে টোটোদের স্থান সবসময়ই আলাদা, সেটা খানিকটা তাদের বিলুপ্তপ্রায় সংখ্যার জন্যও যেমন তেমনি তাদের জীবনযাত্রার জন্যও। উত্তরবঙ্গের জনজাতিদের মধ্যে তাই একটি আলাদা স্থান দখল করে আছেন টোটোরা। আজও অনেকটাই অজানা তাদের সব। জীবনের মূলস্রোতে তারা আসছেন আজ ঠিকই, তবে অত্যন্ত নগণ্য সংখ্যায়। প্রকৃতির কোলে, নিজস্ব ঘেরাটোপে স্বচ্ছন্দ হলেও ধীরে ধীরে তাদের প্রবেশ ঘটছে মূল সমাজজীবনে।
প্রশ্ন আসছে, কারা এই টোটো। কোথা থেকে এলেন তারা? 
প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী চারুচন্দ্র স্যান্যালের হাত ধরে টোটোদের সম্পর্কে বিশদ জানা গেলেও 1815 সালে বাবু কৃষ্ণকান্ত বসুর 'Accounts of Bhotan'-এ টোটোদের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। পরবর্তীতে সন্ডার্স সাহেবের জরিপ প্রতিবেদন-সহ কিছু সরকারী নথিপত্রে তাদের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিক্রমকেশরী রায়বর্মনের গবেষণাও টিবেটো-মঙ্গোলয়েড গোষ্ঠীর এই জনজাতির ওপর আলোকপাত করে। যদিও প্রামাণ্য ইতিহাস মেলে না তবু মনে করা হয় টোটোদের আদি নিবাস উত্তর ভুটানের আতুং (য়াতুং)। কেন কিভাবে তারা ভুটানের ডিয়াংছু হয়ে টৌটোপাড়ায় এলেন তার কোনো ইতিহাস মেলে নি। অনেকে বলেন নদী পার হওয়া সম্ভব হয় নি বলে তারা টোটোপাড়াতেই থেকে যান। মূল ভুখন্ড থেকে পাহাড়-নদী দিয়ে বিচ্ছিন্ন থাকা এই এলাকায় তারা তাদের নিজস্ব রীতিনীতি মেনে গঠন করেন নিজেদের সমাজ। থেকে যান নিজেদের মতো। 
লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সমগ্র টোটোসমাজ বাদু-বে, বাংগো-বে, বউধ্-বে, দাংকো-বে, দান্ত্র-বে, দিরিংচাংগো-বে, লিংকাইজি-বে, মাংচিং-বে, মাংকো-বে, নৃবি-বে, মান্ত্র-বে, নূরেন বাংগো-বে, পিশুচাংগো-বে ইত্যাদি তেরোটি গোত্রে বিভক্ত। অতীতে তেরোটি এলাকা তেরো গোষ্ঠির জন্য নির্দিষ্ট থাকলেও টোটোপাড়ায় আজ নানা জাতির অনুপ্রবেশে এই স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখাটা টৌটোদের পক্ষে সত্যিই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে নিজ গোত্রে বিয়ে রীতিবিরুদ্ধ। আবার সম্প্রদায়ের বাইরে বিয়েও নিষিদ্ধ, যদিও ভাঙছে এই প্রথা ধীরে ধীরে। টোটো পরিবারে আসছে পরিবর্তন। পরিবারের প্রধান হিসেবে বিবাহিত পুরুষ সবকিছুর অধিকারী। কিন্তু এই অধিকার তাকে ছাড়তে হয় তার পুত্রের বিবাহের পর। আগে পুত্রের বিবাহের পর বাড়ি ছেড়ে প্রধানকে আশ্রয় নিতে হত খামারবাড়ি 'নিয়াংকো-শা'য়। 'নাকো-শা' অর্থাৎ বাড়ির দায়িত্ব বর্তাতো পুত্রের ওপর। উত্তরাধিকার সূত্রে সে হত কুলদেবতা 'চিমা'র উপাসক। 
             নাকো-শা বা বাড়ির প্রসঙ্গে বলি সাধারণতঃ উঁচু বাঁশের মাচার ওপর তৈরী হত এই বাড়ি। নাকো-শা বিভক্ত হচ্ছে অতিথিদের জন্য 'ডেইচি-কি-সিরি', 'সিরি' অর্থাৎ পরিবারের লোকেদের শোওয়ার ঘর, রান্নাঘর 'মেরাং' এবং কুলদেবতা চিমার ঘর 'জিরি'তে। কিন্তু চিরাচরিত এই নাকো-শা'ও পাল্টে যাচ্ছে দ্রুত। জায়গা নিচ্ছে শহুরে বাড়ি। বিপ্লব বেচারী আমার জোরাজুরিতে খুঁজেপেতে টোটোদের সেই বাড়ি দেখাচ্ছিল। সেই বাড়িতেই 'ডেইচি-কি-সিরি' থেকে বেরিয়ে এবার চলা ভুট্টাখেত দেখতে।
চাষবাস, বনজ সম্পদ সংগ্রহ ছিল টোটোদের মূল জীবিকা। তবে চাষবাসের ব্যাপারটি আসে অনেকটাই পর। আসলে ইতিহাস বলছে টোটোরা একসময় ছিল ভুটানরাজের দাস প্রজা। ভারবহন করা ছিল তাদের মূল পেশা। তাই চাষের সময় ছিল না বললেই হয়। অবসর সময়ে যেটুকু চাষ তাও সেই ঝুম চাষ পদ্ধতিতে। বনজ সম্পদ সংগ্রহে প্রাধান্য পেত কমলালেবু ও বাঁশ। কিন্তু কমলালেবু চাষও আজ আর নেই। অত্যাধিক সংগ্রহে কমছে বাঁশ। চিরাচরিত পদ্ধতিতে চাষের দিকে ঝুঁকেছে টোটো সমাজ। ব্যবহৃত হচ্ছে লাঙল-গরু। ধান, ভুট্টা, আলু ইত্যাদি চাষ করছে টোটোরা। পাশাপাশি পড়াশোনা করলে যে সরকারী চাকরীও জুটবে সেটা বুঝেছে টোটোরা। তাই স্কুলের পড়া শেষ করে তারা এখন কলেজ শিক্ষা নিচ্ছে। প্রবেশ করছে চাকরীতে।
আশির দশকের শুরুতে যখন প্রথম যাই টোটোপাড়াতে তখনও টোটোরা সাবেক পোশাকে দেখেছিলাম। মহিলাদের কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা থাকতো 'মেরা' নামের বস্ত্রখন্ডে। থাকতো কোমরবন্ধনী 'বিজি', বক্ষবন্ধনী 'তুমবা'। বিবাহিতা মহিলাদের বোঝা যেত 'পারি'র সাহায্যে। পুরুষদের সারা শরীর ও হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা থাকতো 'বাওহা' দিয়ে। 'আংদুং' (টোটো পোশাক) পরিহিত, ইরিংবা জীবিং(চুড়ি), তি-সে (গলার হার), নারসি (আংটি) সজ্জিত টোটো পুরুষ বা মহিলা আজ আর দেখা যায় না সেভাবে। আধুনিকতার ছোঁওয়ায় পুরুষরা প্যান্ট-শার্ট, মহিলারা শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, টপ-জিনস সবকিছুই পড়ছেন। দেখছেন টিভি, ব্যবহার করছেন স্মার্টফোন। টোটোপাড়ায় আজ আর শোনা যায় না টোটোদের প্রাচীন লোকসঙ্গীত বা 'লেতিগেহুয়া'দের গান। দ্রুত জায়গা নিয়েছে শস্তা-চটুল হিন্দি গান। টোটোদের লোককথা, লোকগীত , মন্ত্র এখন রীতিমতো চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে কেননা বর্তমান প্রজন্ম এসবের কথা সেভাবে জানে না।
নিজস্ব গ্রামশাসন ব্যবস্থায় কাজি বা সুব্বা ধর্মীয় ও সামাজিক নানা ব্যাপারে মতামত দেন। এবাদেও রয়েছেন গাপু যার কাজ মূলতঃ জমি-সংক্রান্ত। তবে সময়ের পরিবর্তনের সাথে নিজস্ব গ্রামশাসন ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন এসেছে। এখন গ্রাম পঞ্চায়েতই সব। 
সামাজিক ব্যবস্থায় টোটোদের নিজ সম্প্রদায়ের বাইরে বিয়ে নিষিদ্ধ আবার একই গোত্রে বিবাহও বারণ। বিবাহ-বিচ্ছেদ, বিধবা বিবাহ, বহুবিবাহ, পুনর্বিবাহ ইত্যাদিও চালু রয়েছে। তবে একটি অদ্ভুত প্রথা রয়েছে। 'শামবেহেও' অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে  বাগদত্তা হলেও ততদিন বিবাহ হয় না যতদিন না কনেক গর্ভবতী হচ্ছে। গর্ভধারণের পর পাঁচ বা সাত বা নয় মাসের মাথায় বিবাহ অনুষ্ঠান হয় 'জিপেও-বেহোয়েআ' (এক্ষেত্রে কনের বয়স বেশী হয় বরের চেয়ে, কনে হতে পারে বিবাহবিচ্ছিন্না বা বিধবা) অথবা 'দেব-বহোয়েআ' (বর কনে দুজনেই মানানসই) পদ্ধতির মাধ্যমে। সন্তান জন্মের পর ঘরে তৈরী মদ 'ইউ' সন্তানের মুখে ছোঁয়ানো হয়। সাতদিন পর নিজ গোত্রের পুরোহিত 'পাউ' নামকরণ করেন নবজাতকের 'মোদি-পাই-পোয়া' অনুষ্ঠান করে। 'বোদি-লাউ-মে' অনুষ্ঠিত হয় তিনমাস পর এবং এর পর মা শিশুকে বেঁধে নেন নিজের পিঠে। আগে সন্তান জন্মগ্রহণের সময় 'বাই-ডাঙ্গি' বা চিকিৎসকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও আজকাল স্বাস্থ্যকেন্দ্রমুখী হচ্ছে টোটোসমাজ। 
চিরায়ত ধর্মের প্রতি বিশ্বাস রাখা টোটোদের মূল ধর্মীয় উৎসব 'ওমচু' আর 'ময়ূ'। টোটোরা এই সময় মেতে ওঠেন উৎসবে। জামাকাপড় কেনা, ভাল খাবার আত্মীয়স্বজনদের পাঠানো এবং 'বাকুং' বা ঢোল বাজানো চলে উৎসব যাপনে। নদী, প্রকৃতি ও প্রকৃতির মধ্যে থাকা অনেককিছুকেই দেবতাজ্ঞানে মানা টোটোদের শান্ত সমাহিত স্বভাবকেই যেন প্রকাশ করে।
সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুতে পরিবর্তন এলেও আজও টোটোপাড়া তার নিজের মতো। তবে একথা অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই যে নিজেদের স্বাতন্ত্রতা বজায় রেখেও তথাকথিত 'মূলস্রোতে' আসবার আপ্রাণ প্রচেষ্টা করছেন টোটোরা। উচ্চ শিক্ষার অভাবের জন্য কিছুদিন আগেও কোচবিহারের বিদ্যালয়ে দেখা যেত টোটো ছাত্রদের। আজ টোটোপাড়ার বিদ্যালয়েই তারা পড়ছে। বিদ্যালয় জীবন শেষে বীরপাড়া বা আলিপুরদুয়ার কলেজ হচ্ছে তাদের ঠিকানা, কেউ চলে যাচ্ছে টেকনিক্যাল লাইনে। চাকরীতেও যোগ দিচ্ছেন শিক্ষিত টোটো যুবক-যুবতী। টোটোপাড়াতে সেরকম স্বাচ্ছন্দ্য না থাকলেও জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই মজুদ। 


ভুট্টা খেতে পৌঁছে যাই অবশেষে। বিপ্লব বলে এখানে নিয়ে আসবার আসল কারণটা। টৌটোপাড়ার শেষ সীমা এটাই। এখান থেকে সৃর্যাস্তও দারুণ লাগে। সত্যিই তাই। অস্তমিত সূর্যের লাল কিরণছটা বিপ্লবের মুখে তখন। আত্মপ্রত্যয় ভরা সে মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবি টোটোরা থাকুন তাদের মতো তাদের সব নিয়ে। আধুনিকতার আলো পড়ুক অবশ্যই তাদের গায়ে কিন্তু সে আলো যেন কখনোই অনুজ্জ্বল না করে দেয় টোটোদের নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতি-বিধি.....

(প্রকাশিত- অঙ্কুরোদগম / কোচবিহার  )

No comments: