নিজের ভাবনায়:
বিশ্ব নাট্যদিবস ও কিছু কথা
(সকল নাট্যকর্মী অগ্রজ ও অনুজদের জন্য শ্রদ্ধাসহ)
শৌভিক রায়
(সকল নাট্যকর্মী অগ্রজ ও অনুজদের জন্য শ্রদ্ধাসহ)
শৌভিক রায়
আজ বিশ্ব নাট্য দিবস। অনেকে অবশ্য কোন বিশেষ দিনকে কোন বিশেষ অভিধায় মানা পছন্দ করেন না। সেটা সম্পূর্ণই ব্যক্তিগত অভিরুচী। কিন্তু তা স্বত্ত্বেও আমরা নারীদিবস, শিশুদিবস, কবিতাদিবস ইত্যাদি পালন করে থাকি। সেরকমই একটি দিন আজ- নাট্য দিবস।
'ড্রামা' শব্দটি এসেছে এমন একটি গ্রীক শব্দ থেকে যার মানে 'Action', আবার এই শব্দটি এসেছে ক্ল্যাসিকাল গ্রীক শব্দ 'I do' থেকে। নাটকের ক্ষেত্রে যে দুটি মুখোশ (আমার ব্যক্তিগত মতামত অবশ্য ও দুটি মুখ। কেননা মুখ না থাকলে মুখোশ তো আর আসতো না!) ব্যবহার করা হয়- একটি হাস্যমুখর আর অন্যটি বিষাদময় তার পেছনেও রয়েছে দুই গ্রীক মিউজ- Thalia ও Melpomene....এরা দুজনে যথাক্রমে কমেডি ও ট্র্যাজেডির মিউজ বলেই পরিচিত।
লেখার শুরুতেই এই কথাগুলি বললাম একটাই কারণে কেননা গ্রীস দেশ বাদে নাটক নিয়ে আলোচনা বৃথা। ইতিহাস বলছে প্রাচীন এথেন্সে Dionysus-এর সম্মানে যে hymns (নির্দিষ্ট করে বললে dithyrambs) গাওয়া হত সেগুলিই পরবর্তীকালে কস্টিউম ও মুখোশ পড়ে কোরাসের মাধ্যমে প্রকাশ করা হত সেই উৎসবে। এভাবেই সূচনা হয় নাটকের।
কিন্তু নাটক কেন? অন্য কোন মাধ্যম নয় কেন?
আসলে নাটক এমন একটি মাধ্যম যা মানুষের সামনে অভিনয় করে প্রদর্শনের মাধ্যমে দেখানো হত যে কিভাবে সামান্য বিচ্যূতিও একজন রাজা বা সেনাপতি বা সমাজের উচ্চবর্গের মানুষের পতনের কারণ হতে পারে। তাই সাধু সাবধান। তুমি-আমি নগণ্য। যত্নশীল হতে হবে আমাদের সবক্ষেত্রে। অবশ্য এই ব্যাপারটি ট্র্যাজেডির ক্ষেত্রে। কমেডির ক্ষেত্রে নয়। কমেডি ছিল সম্পূর্ণ আমোদের ব্যাপার। দৈনন্দিন একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে জীবনে হাসি বা আনন্দের দরকার সর্বযুগে সর্বদেশে প্রয়োজন আর তারই প্রয়োগ দেখা যেত কমেডিতে। গ্রীক নাট্যকাররা অবশ্য সবসময়ই, অন্ততঃ ট্র্যাজেডির ক্ষেত্রে, দৈব শক্তি বা দৈব দুর্বিপাকের ওপরেই নির্ভর করেছেন। উদ্দেশ্য একটাই যে দেবতার বিধান রাজাকেও ছাড় দেয় না। তাই সাধারণ যারা তারা যেন নিজেদের কখনই অসাধারণ না ভাবেন। কিন্তু কিছু গ্রীক নাটকের ক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিগত মত হল নাট্যকার নিজের অজান্তেই সেই বিখ্যাত কথাটি Character is destiny কেই যেন প্রমাণ করছেন। ধরা যাক ইদিপাসের (উচ্চারণটি অয়দিপাউসও হতে পারে) কথাই। নিজেকে ধর্মের ষাঁড় শুনেই পালিত বাবা মা-কে (তখনও তিনি জানেন না যে তিনি পালিত) প্রশ্ন না করে ডেলফির মন্দিরে চলে যাওয়া, তিনমাথার মোড়ে আচমকাই রেগে গিয়ে সম্মুখসমরে রাজপুরুষকে হত্যা করা, থিবসের নিয়ম অনুযায়ী ইয়োকাস্টাকে বিয়ে করে নেওয়া (বিয়ের মত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার বলেই বলছি) ইত্যাদি নানা সিদ্ধান্ত কি প্রমাণ করে না যে ইদিপাসের চরিত্রে হঠকারিতা মারাত্মকভাবে ছিল? এখানে কি Character is destiny হচ্ছে না? হ্যামলেট, লিয়ার, ম্যাকবেথ, ওথেলোকে মাথায় রেখেও কেন জানি ইদিপাসকেই আমার মনে হয় Character is destiny-এর পথপ্রদর্শক। অবশ্য এ আমার একান্তই নিজস্ব ধারণা।
পারফর্মিঙ আর্টের এই ধারাটি এমনই একটি মাধ্যম যেখানে সাহিত্য তার চূড়ান্ত রূপকে স্পর্শ করেছে। আমার তো মনে হয় যদি শেক্সপিয়ার শুধু ওই চারটি নাটকই (কিং লিয়ার, হ্যামলেট, ম্যাকবেথ আর ওথেলো) লিখতেন তবে একইরকম ভাবেই বন্দিত হতেন। কিং লিয়ার বা ওথেলো বা ম্যাকবেথে যে কবিত্ব রয়েছে তার তুলনা বিশ্বসাহিত্যে আর কোথায়? আর হ্যামলেটের সলিলোকি? ম্যাকবেথ তো by heart এক কবি, by brain একজন খুনী। এরকম কম্বিনেশন আর কোথায়? লিয়ারের শেষ জীবনের কথাগুলি পৃথিবীর হতাশতম মানুষের কথাগুলিকেই তো তুলে ধরছে যিনি আক্ষরিক অর্থেই সর্বহারা। এমন সাহিত্য সৃষ্টি একমাত্র নাটকেই সম্ভব হয়েছে। একই ব্যাপার দেখি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ক্ষেত্রেও। রবীন্দ্র-নাটক প্রায় প্রত্যেকটিই উচ্চ সাহিত্যের অসাধারণ উদাহরণ সে কথা কি বলার অপেক্ষা রাখে? নাকি আমার মত অর্বাচীন সে কথা বললেই হবে!
তাই যখন প্রিয় চয়নদা (প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব শ্রী দীপায়ণ ভট্টাচার্য) বা শুভদা (নাট্যব্যক্তিত্ব শ্রী শুভব্রত সেনগুপ্ত) বা দীপায়ণ (নাট্যকর্মী শ্রী দীপায়ণ পাঠক) যখন বলেন 'সাহিত্য সেভাবে বুঝি না' তখন হেসে উড়িয়ে দিই তাঁদের কথা। নাটকের সাথে সাহিত্যের কোন বিরোধ নেই বরং বিশ্বসাহিত্যে বিখ্যাত রচনাগুলির অনেকাংশই নাটকেই পাওয়া যায়, যেমন কালিদাসের 'অভিজ্ঞান শকুন্তলম', বেকেটের 'Waiting for Godot', মিলারের 'Death of a Salesman', টেনেসি উইলিয়ামসের 'The Glass Menagarie', হাবিব তনবিরের 'চরণদাস চোর', ময়মনসিংহ ব্যালাড 'মাধবমালঞ্চী কইন্যা', রিচার্ড ন্যাসের 'The Rainmaker'...এবং আরও কতশত অজস্র নাম।
না...কোন নির্দিষ্ট ভাবনা নিয়ে কোন থিসিস বা প্রবন্ধ লিখতে বসি নি। এককালে নাট্যচর্চার সাথে যুক্ত ছিলাম। ভালবাসি এই মাধ্যমটিকে। আজ বিশ্বনাট্য দিবসে মনে পড়ছে সেই সমস্ত মানুষদের যাঁরা 'ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায়' (ধার করলাম ভাই দিব্যেন্দু ভৌমিকের কথা। ও নিজেও তাই। পাগলের মত কাজ করে চলেছে কোন কিছুর প্রত্যাশা না করে।), গাঁটের পয়সা খরচা করে এদিক ওদিক নাটক করে বেড়ায়, চেষ্টা করে চলে মানুষের সুকুমার প্রবৃত্তিগুলিকে জাগিয়ে তোলার শুধুমাত্র নাটককে ভালবেসে, বদলে কোন কিছুর আশা না করে। হয়তো নেই রিহার্সাল দেওয়ার ঘর, নেই ভাল মঞ্চ, নেই মিডিয়ার হৈ চৈ করা আলো। তবু এরা কাজ করছেন। ধরে রাখছেন পৃথিবীর প্রাচীনতম একটি ধারাকে। তবু তাঁরা তাঁদের মত চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছেন।
'ড্রামা' শব্দটি এসেছে এমন একটি গ্রীক শব্দ থেকে যার মানে 'Action', আবার এই শব্দটি এসেছে ক্ল্যাসিকাল গ্রীক শব্দ 'I do' থেকে। নাটকের ক্ষেত্রে যে দুটি মুখোশ (আমার ব্যক্তিগত মতামত অবশ্য ও দুটি মুখ। কেননা মুখ না থাকলে মুখোশ তো আর আসতো না!) ব্যবহার করা হয়- একটি হাস্যমুখর আর অন্যটি বিষাদময় তার পেছনেও রয়েছে দুই গ্রীক মিউজ- Thalia ও Melpomene....এরা দুজনে যথাক্রমে কমেডি ও ট্র্যাজেডির মিউজ বলেই পরিচিত।
লেখার শুরুতেই এই কথাগুলি বললাম একটাই কারণে কেননা গ্রীস দেশ বাদে নাটক নিয়ে আলোচনা বৃথা। ইতিহাস বলছে প্রাচীন এথেন্সে Dionysus-এর সম্মানে যে hymns (নির্দিষ্ট করে বললে dithyrambs) গাওয়া হত সেগুলিই পরবর্তীকালে কস্টিউম ও মুখোশ পড়ে কোরাসের মাধ্যমে প্রকাশ করা হত সেই উৎসবে। এভাবেই সূচনা হয় নাটকের।
কিন্তু নাটক কেন? অন্য কোন মাধ্যম নয় কেন?
আসলে নাটক এমন একটি মাধ্যম যা মানুষের সামনে অভিনয় করে প্রদর্শনের মাধ্যমে দেখানো হত যে কিভাবে সামান্য বিচ্যূতিও একজন রাজা বা সেনাপতি বা সমাজের উচ্চবর্গের মানুষের পতনের কারণ হতে পারে। তাই সাধু সাবধান। তুমি-আমি নগণ্য। যত্নশীল হতে হবে আমাদের সবক্ষেত্রে। অবশ্য এই ব্যাপারটি ট্র্যাজেডির ক্ষেত্রে। কমেডির ক্ষেত্রে নয়। কমেডি ছিল সম্পূর্ণ আমোদের ব্যাপার। দৈনন্দিন একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে জীবনে হাসি বা আনন্দের দরকার সর্বযুগে সর্বদেশে প্রয়োজন আর তারই প্রয়োগ দেখা যেত কমেডিতে। গ্রীক নাট্যকাররা অবশ্য সবসময়ই, অন্ততঃ ট্র্যাজেডির ক্ষেত্রে, দৈব শক্তি বা দৈব দুর্বিপাকের ওপরেই নির্ভর করেছেন। উদ্দেশ্য একটাই যে দেবতার বিধান রাজাকেও ছাড় দেয় না। তাই সাধারণ যারা তারা যেন নিজেদের কখনই অসাধারণ না ভাবেন। কিন্তু কিছু গ্রীক নাটকের ক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিগত মত হল নাট্যকার নিজের অজান্তেই সেই বিখ্যাত কথাটি Character is destiny কেই যেন প্রমাণ করছেন। ধরা যাক ইদিপাসের (উচ্চারণটি অয়দিপাউসও হতে পারে) কথাই। নিজেকে ধর্মের ষাঁড় শুনেই পালিত বাবা মা-কে (তখনও তিনি জানেন না যে তিনি পালিত) প্রশ্ন না করে ডেলফির মন্দিরে চলে যাওয়া, তিনমাথার মোড়ে আচমকাই রেগে গিয়ে সম্মুখসমরে রাজপুরুষকে হত্যা করা, থিবসের নিয়ম অনুযায়ী ইয়োকাস্টাকে বিয়ে করে নেওয়া (বিয়ের মত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার বলেই বলছি) ইত্যাদি নানা সিদ্ধান্ত কি প্রমাণ করে না যে ইদিপাসের চরিত্রে হঠকারিতা মারাত্মকভাবে ছিল? এখানে কি Character is destiny হচ্ছে না? হ্যামলেট, লিয়ার, ম্যাকবেথ, ওথেলোকে মাথায় রেখেও কেন জানি ইদিপাসকেই আমার মনে হয় Character is destiny-এর পথপ্রদর্শক। অবশ্য এ আমার একান্তই নিজস্ব ধারণা।
পারফর্মিঙ আর্টের এই ধারাটি এমনই একটি মাধ্যম যেখানে সাহিত্য তার চূড়ান্ত রূপকে স্পর্শ করেছে। আমার তো মনে হয় যদি শেক্সপিয়ার শুধু ওই চারটি নাটকই (কিং লিয়ার, হ্যামলেট, ম্যাকবেথ আর ওথেলো) লিখতেন তবে একইরকম ভাবেই বন্দিত হতেন। কিং লিয়ার বা ওথেলো বা ম্যাকবেথে যে কবিত্ব রয়েছে তার তুলনা বিশ্বসাহিত্যে আর কোথায়? আর হ্যামলেটের সলিলোকি? ম্যাকবেথ তো by heart এক কবি, by brain একজন খুনী। এরকম কম্বিনেশন আর কোথায়? লিয়ারের শেষ জীবনের কথাগুলি পৃথিবীর হতাশতম মানুষের কথাগুলিকেই তো তুলে ধরছে যিনি আক্ষরিক অর্থেই সর্বহারা। এমন সাহিত্য সৃষ্টি একমাত্র নাটকেই সম্ভব হয়েছে। একই ব্যাপার দেখি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ক্ষেত্রেও। রবীন্দ্র-নাটক প্রায় প্রত্যেকটিই উচ্চ সাহিত্যের অসাধারণ উদাহরণ সে কথা কি বলার অপেক্ষা রাখে? নাকি আমার মত অর্বাচীন সে কথা বললেই হবে!
তাই যখন প্রিয় চয়নদা (প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব শ্রী দীপায়ণ ভট্টাচার্য) বা শুভদা (নাট্যব্যক্তিত্ব শ্রী শুভব্রত সেনগুপ্ত) বা দীপায়ণ (নাট্যকর্মী শ্রী দীপায়ণ পাঠক) যখন বলেন 'সাহিত্য সেভাবে বুঝি না' তখন হেসে উড়িয়ে দিই তাঁদের কথা। নাটকের সাথে সাহিত্যের কোন বিরোধ নেই বরং বিশ্বসাহিত্যে বিখ্যাত রচনাগুলির অনেকাংশই নাটকেই পাওয়া যায়, যেমন কালিদাসের 'অভিজ্ঞান শকুন্তলম', বেকেটের 'Waiting for Godot', মিলারের 'Death of a Salesman', টেনেসি উইলিয়ামসের 'The Glass Menagarie', হাবিব তনবিরের 'চরণদাস চোর', ময়মনসিংহ ব্যালাড 'মাধবমালঞ্চী কইন্যা', রিচার্ড ন্যাসের 'The Rainmaker'...এবং আরও কতশত অজস্র নাম।
না...কোন নির্দিষ্ট ভাবনা নিয়ে কোন থিসিস বা প্রবন্ধ লিখতে বসি নি। এককালে নাট্যচর্চার সাথে যুক্ত ছিলাম। ভালবাসি এই মাধ্যমটিকে। আজ বিশ্বনাট্য দিবসে মনে পড়ছে সেই সমস্ত মানুষদের যাঁরা 'ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায়' (ধার করলাম ভাই দিব্যেন্দু ভৌমিকের কথা। ও নিজেও তাই। পাগলের মত কাজ করে চলেছে কোন কিছুর প্রত্যাশা না করে।), গাঁটের পয়সা খরচা করে এদিক ওদিক নাটক করে বেড়ায়, চেষ্টা করে চলে মানুষের সুকুমার প্রবৃত্তিগুলিকে জাগিয়ে তোলার শুধুমাত্র নাটককে ভালবেসে, বদলে কোন কিছুর আশা না করে। হয়তো নেই রিহার্সাল দেওয়ার ঘর, নেই ভাল মঞ্চ, নেই মিডিয়ার হৈ চৈ করা আলো। তবু এরা কাজ করছেন। ধরে রাখছেন পৃথিবীর প্রাচীনতম একটি ধারাকে। তবু তাঁরা তাঁদের মত চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছেন।
আজও যদি তাঁদের কাছে ঋণ স্বীকার না করি, তাঁদের সাথে করমর্দন করে যদি 'ধন্যবাদ'টুকুও না বলি তবে কবে আর বলব!!
No comments:
Post a Comment