Sunday, April 19, 2026



 



ব্যালট বক্সে উৎসবের কোলাজ 
শৌভিক রায় 

চা বাগানের সবুজ চিরে চলে যাওয়া পরিচিত পথটি চিনতে পারিনি সেদিন।  দু`ধারে নানা রঙের পতাকা আর  রংবেরঙের কাগজের শেকল নিয়ে ছায়া ঢাকা শান্ত সে রাস্তা একদম বদলে গিয়েছিল।  বিভিন্ন বর্ণের, ধর্মের মানুষ দলে দলে হাঁটছিলেন সেই পথে। 

বাগানের প্রান্তে বিরাট মাঠ। সে মাঠে সপ্তাহে একদিন হাট বসলেও, সেদিন অন্য ব্যাপার। ভোট প্রচারে শহর থেকে নেতা আসবেন। সমাবেশ করবেন। ফলে  ছোটখাটো উৎসব। সারা বছর ধরে দুটি পাতা একটি কুঁড়ি তোলা হাত ঝড় তুলছিল ধামসা মাদলে। মংলু আর শনিচরা ত্রিপল টানিয়ে, টেবিল বিছিয়ে পান-বিড়ির দোকান দিয়ে বসে গিয়েছিল মাঠের একদিকে। মওকা বুঝে গঞ্জের রামাধীন বাদামওয়ালাও হাজির। তবে ওই গরমে ভিড় ছিল বেশি কুলফিওয়ালার সামনে। 

কিশোর বয়সে দেখা সেই ছবি আজও ভুলিনি। ভোট এলেই তখন চা বাগানগুলো অচেনা হয়ে উঠত। যেখানে সারা বছর দারিদ্র আর নিষ্পেষণ নিত্য সঙ্গী, সেই চা বাগান সেজে উঠত উৎসবের আমেজে। তবে শুধু চা বাগান নয়। ভোট উৎসবে মহানগর থেকে গ্রাম ছবিটা ছিল একই। গমগমে মাইক, উত্তাল মিছিল, রাস্তার মোড়ে মোড়ে জনসমাবেশ, দেওয়াল লিখন, রোড শো, নেতাদের ঘনঘন আগমন সব কিছু মিলে প্রতিটি জনপদ বদলে যেত।   

মনে আছে এই উৎসবের আবহাওয়াতেই প্রথম পথ-নাটক দেখেছিলাম। এভাবে যে রাস্তাতেও নাটক করা যায়, সেটা শিখিয়েছিল ভোট। পাশাপাশি মনে পড়ছে গানের কথা। কত ধরণের গান যে শোনা যেত ভোট  এলে! আর সে সব গান গাইতেন জাঁদরেল সব মানুষেরা। গ্রামবাংলায় সেই সময় চলত কবির লড়াই। নাটক, গান বা কবিতার বিষয়বস্তু মূলত ভোট হলেও, খুব সূক্ষভাবে দেশ গঠনের একটা বার্তাও থাকত। আসলে বছর চল্লিশ-পঞ্চাশ আগে স্বাধীনতার খানিকটা রেশ রয়ে গিয়েছিল সবার মনে। বাপ-ঠাকুরদার মুখে শুনে পরাধীন ভারতকে উপলব্ধি করতে পারতেন সবাই। ভোট মানে যে গঠন ও উন্নয়নের পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, কমবেশি বুঝেছিলেন সকলেই। প্রচারে নেমে সব রাজনৈতিক দলও এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতেন। তাই সে সময় ভোটের চেহারা ছিল আলাদা। জোর দেওয়া হত বাড়ি বাড়ি সংযোগ, মিটিং, মিছিল ইত্যাদির ওপর। টেলিফোনে, খবরের কাগজে বিরাট বিজ্ঞাপনে, টিভির বিতর্কেও যে ভোট প্রচার করা যায়, সেটা কেউই ভাবেননি।
    
অন্যান্য বহু বিষয়ের মতো আজকাল ভোটেও কর্পোরেট সংস্কৃতি ঢুকে পড়েছে। বড় বড় ফ্লেক্স, কাট আউট, সুসজ্জিত গাড়ি, গাড়ির ওপর থেকে দুই ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজনের ওপর পুষ্পবৃষ্টি, নৃত্যরত পুরুষ-মহিলা ইত্যাদি আজকাল ভীষণ চোখ ধাঁধানো। অতীতের সেই ম্যাড়মেড়ে মিছিল আর বস্তাপচা স্লোগান কবে যে এরকম ঝলমলে হয়ে গেল, কে জানে! ভোটের মিটিংয়ে, মঞ্চসজ্জাতেও ব্যাপক পরিবর্তন। খুঁটি পুঁতে যেভাবে আজকাল মঞ্চ ও শ্রোতাদের বসার জায়গা তৈরি করা হয়, সেটি তো রীতিমতো দর্শনীয়। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ড্রোন ক্যামেরার গৌরবময় উপস্থিতি। রক ব্যান্ডের অনুঠানের মতো পোডিয়ামে এগিয়ে পিছিয়ে নেতা কর্মীদের জনসংযোগেও নতুনত্বের ছাপ।সত্যি বলতে, ভোটের সঙ্গে বড় বড় উৎসবের সেভাবে আর কোনও পার্থক্য নেই। 

কখনো কখনো মনে হয়, উৎসবের এই আবহ গণতন্ত্রকে প্রাণবন্ত করে তুললেও, যুক্তিবোধকে কি খানিকটা আড়াল করে রাখে না? `রুটি-কাপড় আর বাসস্থান`-এর প্রাথমিক চাহিদা ভুলে, মানুষ কি এই জৌলুসে ভেসে যায় না? আচ্ছন্ন হয়ে থাকে না কি তাঁর নিজস্ব বোধ ও চিন্তা?  এই ব্যাপারে বোধহয় গ্রাম আর শহরের কোনও পার্থক্য নেই। বহু মানুষই এই চাকচিক্যে এতটাই প্রভাবিত হন  যে,ভোট প্রদানের সময় নিজের ভালমন্দ বুঝতে পারেন না। ফলে, ভোটবাক্সে তার প্রভাব দেখা যায়। বাজিমাত করে যান তাঁরা, যাঁদের গিমিক বেশি। ভোটের এই হাওয়া ছুঁয়ে যায় প্রায় সবাইকেই। আলাদা করে এখানে পার্থক্য করা যায় না কোনও ভোটারকেই। ভাবনার নিজস্ব জগতে সকলেই বোধহয় পরিযায়ী হয়ে যান তখন।  

কিছু ক্ষেত্রে অতীতের মতো, ভোট আজও অনেকের বাড়তি উপার্জনের মাধ্যম। মাত্র কয়েকদিন আগে কথা বলছিলাম খালেদ মিয়ার সঙ্গে। এক রাজনৈতিক দলের প্রচার সভার মঞ্চ তৈরি করছিলেন তিনি। নির্দ্বিধায় বললেন, `ভোট এলে প্রচুর কাজ পাই। আমাদের ভালই হয়।` হুবুহু একই কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর প্রচার সভায়, নিজের সাবেক ব্যবসা ছেড়ে, দুদিনের জন্য ফলবিক্রেতা বনে যাওয়া যুবকটি। তাঁর সংযোজন, `পুজোর সময়ও এরকমই দোকান দিই পাড়ার প্যান্ডেলের কাছে। পার্থক্য কিছু নেই। ওটা দেবী পুজো, এটা ভোট পুজো।` 

তবে পরিবর্তনও এসেছে বহু। আজকাল ভোটকেন্দ্রের কাছে মেলা বসে যাওয়া ব্যাপারটি আর নেই বললেই চলে। সকাল-বিকেল চায়ের আড্ডায় সেভাবে ঝড় তুলে দেওয়া আলোচনাও প্রায় বন্ধ। দেওয়াল লিখনে উধাও হয়ে গিয়েছে বুদ্ধিদীপ্ত স্লোগান, তীক্ষ্ন শ্লেষ আর ব্যঙ্গ। দেওয়াল লিখতেন এমন এক শিল্পী দুঃখ করলেন, `আজকাল আমরা ব্রাত্য। কেউই আর ডাকে না।` খুব ছোট দল ছাড়া, রিকশায় মাইক রেখে স্লোগান দেওয়া মানুষগুলি উধাও হয়ে গিয়েছেন কবে! মিলিয়ে গেছে কাজের ফিরিস্তি দিয়ে ছড়িয়ে হ্যান্ডবিলও।     

এত পরিবর্তন সত্ত্বেও, পরিযায়ী শ্রমিক, খেটে খাওয়া দিনমজুর থেকে শুরু করে প্রান্তিক মানুষদের কাছে ভোট কিন্তু আজও বড় ব্যাপার। আসলে এই সময়েই তাঁরা তাঁদের মনুষ্যত্ব ফিরে পান। সারা বছরের অবজ্ঞা আর বঞ্চনার জাঁতাকল থেকে সাময়িক মুক্ত হন। টিভির পর্দায় বা দূর মঞ্চে দেখা বিখ্যাত মানুষজন কাঁধে হাত রাখেন। কাছে টানেন। পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতো কথা বলেন। কেউ কেউ তো একধাপ এগিয়ে প্রণাম পর্যন্ত করে ফেলেন। আবার বাড়ির হেঁসেলে ঢুকে রান্নায় সাহায্য করতে, ভোটারের চুলদাড়ি কেটে দিতেও পিছপা হন অনেকে। ভোটপ্রার্থীদের এরকম  কাণ্ডকারখানা অনেক সময় হাসির সৃষ্টি করলেও, বেশ চমকপ্রদ।সেরকমই মজা লাগার সঙ্গে সঙ্গে বিরক্তিও আসে টিভির টক শো বা বিতর্ক সভায় বক্তাদের সমস্বরে চিৎকারে।

 প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ রাজনৈতিক দলগুলি এখন যত উৎসবের আবহ তৈরি করুক না কেন, মানুষের মনে ক্রমশ জেগে উঠছে নানা প্রশ্ন। এটিই বোধহয় আধুনিক ভোটের সবচেয়ে বড় চিত্র। আগে, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা সেভাবে প্রশ্নের সম্মুখীন হতেন না। তাঁদের প্রতি সাধারণ মানুষের খানিকটা যেন দূরত্ব ছিল। তবুও  বিপদে-আপদে তাঁদের কাছে আশ্রয় খুঁজতেন নিরাশ্রয় মানুষ। কিন্তু সেই পরিবেশ আর নেই। এখন মানুষ প্রশ্ন করছেন। কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিতে চাইছেন তাঁর প্রদত্ত ভোটের হিসেবে। পার্থক্য আজ এখানেই। এটা হওয়াও উচিত। কেননা উৎসব মানে অগ্রগতির জয়যাত্রা। আর সেটি তখনই সম্ভব, যখন প্রত্যেকের সার্বিক উন্নয়নের সঙ্গে বৌদ্ধিক বিকাশও ঘটবে। ভোট উৎসব তাই সাধারণ নয়, তার তাৎপর্য সবসময় আলাদা। 

কিন্তু বর্তমান প্রজন্মকে ভোটের হাওয়া ঠিক কতটা আন্দোলিত করতে পারছে? এখনও অবধি যে চিত্র দেখছি, তা কিন্তু আশাপ্রদ নয়। আসলে তাঁদের সামনে না আছে অনুসরণ করার মতো নেতা, না রয়েছে অনুকরণ করার মতো কাজ। প্রচন্ড আগ্রাসী এক সর্বক্ষয়ী অবক্ষয়ে আজ ক্রমশ ভাঙন সর্বত্র। তার বিপুল প্রভাব পড়ছে এই প্রজন্মের ওপর। ভোট সম্পর্কেই উদাসীন হয়ে উঠছেন তাঁরা। ভারতীয় গণতন্ত্রের পক্ষে এটি কিন্তু অশুভ সংকেত। রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন আজ এমন জায়গায় যে, তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অধিকাংশই। আর সেই শূন্যস্থানে ঢুকে পড়ছে কিছু ধান্দাবাজ দুশ্চরিত্র। তারা উৎসব বোঝে না, গণতন্ত্র তো অনেক দূরে। 

ভোটের হাওয়ার এই নাচনে তাই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। যে উৎসবকে একদিন প্রাণে ধরে একটি রাষ্ট্র গুটিগুটি পায়ে চলতে শুরু করেছিল, তার চেহারায় বহু পরিবর্তন এলেও, কখনও ভাবা যায়নি এরকম এক সংকটময় সময় আসতে পারে। মিথ্যাচার, মারামারি, হানাহানি, রক্তক্ষয়, কদর্য ভাষা ইত্যাদি সব কিছু গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ উৎসবকে আজ প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তার জন্য দায়ি নিজেরাই। অথচ এই উৎসবের হাত ধরেই আমরা সারা বিশ্বের কুর্নিশ আদায় করতে পারতাম অনায়াসে। 

(প্রকাশিত: রংদার রোববার, উত্তরবঙ্গ সংবাদ, উনিশে এপ্রিল, ২০২৬)

* আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা উত্তরবঙ্গ সংবাদ 

Wednesday, April 15, 2026