প্রবীণ নাগরিকরা আমাদের বোঝা নন
শৌভিক রায়
পার্কে বসে থাকা শ্বেতাঙ্গ বয়স্ক মানুষটিকে সকালের শুভেচ্ছা জানাতেই, তিনি কেঁদে উঠেছিলেন। কাঁদতে কাঁদতেই জানিয়েছিলেন যে, বিগত তিন মাসের মধ্যে কেউ তার সঙ্গে কথা বলেনি। অথচ তার পুত্র-কন্যা সবই রয়েছে। কিন্তু তাঁদের সমাজের নিয়ম অনুসারে তাঁরা সবাই দূরে থাকেন। বিপত্নীক মানুষটির সর্বক্ষণের সঙ্গী এখন একটি গোল্ডেন রিট্রিভার প্রজাতির কুকুর। তার সঙ্গে আর যা হোক, কথা বলা যায় না। ঘটনাটি শুনেছিলাম আমেরিকা প্রবাসী এক বন্ধুর কাছে।
আমাদের দেশে এখনও এতটা না হলেও, প্রবীণ নাগরিকদের অবস্থা কিন্তু খুব কিছু ভাল নয়। এজওয়েল ফাউন্ডেশনের ২০২৪ সালের একটি রিপোর্ট বলছে, ভারতে এই মুহূর্তে নিঃসঙ্গ প্রবীণদের সংখ্যা হল ১৪.৩ শতাংশ। এদের মধ্যে আবার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ হলেন বয়স্কা মহিলা। অনেকে অবশ্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতার জন্য একক নিঃসঙ্গ জীবন বেছে নিয়েছেন। কিন্তু অধিকাংশই পরিবারের মধ্যেই থাকতে চান। কিন্তু নানা কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। ফলে ক্ষীণদৃষ্টি ও অশক্ত শরীরের এই প্রবীণ নাগরিকেরা একা থাকতেই বাধ্য হচ্ছেন। বয়সজনিত রোগব্যাধি, মানসিক অবসাদ ও উদ্বেগকে সঙ্গী করে যেন দিনগত পাপক্ষয় করে চলেছেন।
এমনিতেই আমাদের দেশে প্রবীণ নাগরিকদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা পৌঁছবে ১৯২ মিলিয়নে। বিপুল সংখ্যক এই প্রবীণ নাগরিকেরা ইতিমধ্যেই পরিবার তো বটেই, সম্ভবত রাষ্ট্রেরও মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছুদিন আগে 'ন্যাশনাল টাস্ক ফোর্স অন কোভিড ১৯'-এর এক নির্দেশ স্পষ্ট বলা হয়েছিল, ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বা মিউকরমাইকোসিসে আক্রান্ত হলে, চিকিৎসার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন তরুণরা। তাদের চিকিৎসার পর যদি ওষুধ বা পরিষেবা উদ্বৃত্ত হয়, তবেই বয়স্কদের চিকিৎসা করা হবে। এই নির্দেশ প্রমাণ করে, রাষ্ট্র বয়স্ক নাগরিকদেরকে কী চোখে দেখে।
সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনেও বা প্রবীণদের প্রতি আমরা কতটা যত্নশীল? আমরা কতজন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে কতক্ষণ কথা বলি? কতটা ধৈর্য্য নিয়ে তাদের কথা শুনি? তাঁদের চিকিৎসার ব্যাপারে আমরা কতটা আন্তরিক হই? তাঁদের নিঃসঙ্গতা দূর করবার জন্য আমরা কতটা সচেষ্ট! অথচ আমরা নিজেরা কিন্তু ছোটবেলা থেকে আমাদের পাওনাগন্ডা বুঝে নিয়েছি। কোনও রেয়াত করিনি! আর আজ যখন তাঁদের আমাদের কিছু দেওয়ার সময় হয়েছে, তখন আমরা তাঁদের দূরে সরিয়ে রাখছি অথবা নমো-নমো করে কর্তব্য সারছি।
প্রবীণদের প্রতি আমাদের এই মনোভাব কিন্তু নতুন নয়। সব দেশে, সব কালে চিত্রটি বোধহয় কমবেশি এক। কবি ইয়েটস এই জন্যই বৃদ্ধদের হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখা ছেঁড়া কোটের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। আমরা একবারও ভাবি না, অশীতিপর এই মানুষগুলো যাবেন কোথায়। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তাঁরা যদি আমাদের কাছে সামান্য যত্ন না পান, তবে তার দায়ভার আমাদের। কথায় বলে, শেষ ভাল যার সব ভাল। আর সেই শেষটাকে ভাল করবার দায়িত্বটাও আমাদের। আজ ওরা প্রবীণ বলে যদি তাঁদের গুরুত্ব না দিই, যদি তাঁদের পেছনে ফেলে রাখি, তবে সেটা চরম অমানবিকতা। কেননা গোবর হয়ে ঘুঁটে পুড়তে দেখেও যদি শিক্ষা না নিই তবে দোষ কার?
(লেখক শিক্ষক। কোচবিহারের বাসিন্দা)
* প্রকাশিত- উত্তর-সম্পাদকীয়/ উত্তরবঙ্গ সংবাদ/ অগাস্ট ৯, ২০২৫
ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা উত্তরবঙ্গ সংবাদ

No comments:
Post a Comment