Thursday, May 8, 2025


 

উটপাখির মতো মুখ গুঁজে থেকে না দেখাটাই আসল ব্যর্থতা
শৌভিক রায়
বড্ড উচ্চকিত সময়। হকচকিয়ে যেতে হচ্ছে। কে যে কী, বোঝা যাচ্ছে না কিছুই। চারদিকের এই ডামাডোলে যদি সত্যি বলে কিছু থাকে এই মুহূর্তে, তা হল নিজস্বতা। আর সেই নিজস্বতায় দেখছি, কীভাবে যেন বদলে যাচ্ছে সব।
জন্ম থেকে জেনে এসেছি এক দেশ এক প্রাণ। তাই যেখানে যা অন্যায় দেখেছি, চেষ্টা করেছি সবাই, নিজের মতো তার প্রতিবাদ রাখতে। বিরুদ্ধ মত ছিল না, এমনটা নয়। কিন্তু কখনই তা দেশের সংহতি নষ্ট করে নয়। অন্যায়কে `জাস্টিফাই` করে নয়। কিন্তু দেশের মধ্যে যে এত দেশ, বুঝিনি সেটা। ব্যর্থতা নিজেরই।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতামত সকলেরই থাকে। সেই মত আলাদা হতেই পারে। যিনি সেটা দিচ্ছেন তাঁর যুক্তিটি বোঝার চেষ্টা করাই সহনশীলতা। শিষ্টাচার। কিন্তু নিজেকে জাহির করে, অন্যের কথাকে নস্যাৎ করে দেওয়া আসলে একধরণের মৌলবাদী মানসিকতা। বলতে দ্বিধা নেই, এই মুহূর্তে সেই ধরণের মানুষের সংখ্যা বেশি।
তবু এটুকু সহ্য করা যায়, যদি বিষয়টি নিজেদের মধ্যে হয়। কিন্তু যখন আক্রমণটি নিজের রাষ্ট্রকে এবং তাও বিদেশী মদতে, সন্ত্রাসবাদীদের হাতে, তখন কীভাবে এই কথাগুলি আসে! কীভাবে একটি নারকীয় ঘটনাকে `জাস্টিফাই` করার অপচেষ্টায় বিষয়টিকে গুলিয়ে দেওয়া হয়? এটুকু কি মাথায় আসে না যে, ধর্মের নামে আঘাত হানার পেছনে সুগভীর চক্রান্ত রয়েছে? এক ধর্মের মানুষ ক্রমান্বয়ে যদি অন্য ধর্মের মানুষকে এভাবে আক্রমণ করে, তবে তারাও তো চুপ থাকবে না। এভাবেই তো বাড়বে বিভেদ। চলবে হানাহানি।
মৌলবাদী শক্তিগুলি এটাই চায়। একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়াই বাঁধানোই তাদের কাজ। বিশেষ করে ভারতের মতো বহুত্ববাদের দেশে সেটা কিন্তু খুব সহজেই করা যায়। অতীতে আমরা এরকম দৃষ্টান্ত বারবার দেখেছি। সম্প্রতি এই রাজ্যেও তার ঘৃণ্য প্রকাশ দেখলাম পরপর কয়েকটি ঘটনায়। এই সব ঘটনাগুলিই চরিত্রে এক। কিন্তু সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে তাদের ব্যাখ্যা এক একজনের কাছে এক একরকম। আর এখানেই প্রশ্ন জাগে। আখেরে আমরা কী চাই? বিভেদ নাকি মিলন? মনে রাখা প্রয়োজন, নিজের প্রয়োজনে উদারতা দেখানো আর সামান্য স্বার্থ বিঘ্নিত হলেই নখ-দাঁত বের করা মানুষগুলি কিন্তু আক্রমণকারীদের চাইতে কম বিপদ্দজনক নয়!
অবাক লাগে যখন দেখি, সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব নেওয়ার পরেও, আমাদের অনেকের সন্দেহ মেটে না। মদতদাতা রাষ্ট্র ঘৃণ্য কাণ্ডকে স্বাধীনতার যুদ্ধে একধাপ এগিয়ে যাওয়া বলে বর্ণনা দিলেও, আমরা চোখ বন্ধ করে থাকি। নিহত মানুষদের পরিজনেরা বারবার `ধর্ম জিজ্ঞাসা করে গুলি চালিয়েছে` বললেও, আমাদের মনে হয়, কেউ তাঁদের শিখিয়ে দিয়েছে এসব বলতে!
এই যদি অবস্থা হয়, তবে আর কী বলার! কেউ কেউ আবার মৃতের তালিকা প্রকাশ করে দেখাবার চেষ্টা করছেন, কোন ধর্মের কত সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মজা হল সেই তালিকায় এই বঙ্গের নিহতদের নাম পর্যন্ত নেই!
আজও বিশ্বাস করি সাধারণ নাগরিক কখনই সন্ত্রাস চায় না। তাঁদের কাছে যুদ্ধ ইত্যাদি এক অসম্ভব ব্যাপার। তাঁরা ভিন্ন ধর্মের হয়েও পরস্পর বেঁধে বেঁধে থাকতে চান। যেখানে আজ কাশ্মীরের সাধারণ জনতা পথে নেমে প্রতিবাদ করছেন, সেখানে এক শ্রেণির মানুষ কেন উঠেপড়ে লেগে সর্ষের মধ্যে ভূত দেখছেন, সেটা বুঝতে কষ্ট হয় না। এই ভণ্ডামি আসলে উট পাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে কিছু না দেখার সামিল। সুরক্ষা প্রদানের ব্যর্থতা, গুপ্তচর বিভাগের কিছু না জানতে পারা ইত্যাদি সব মেনে নিয়েও বলা যায়, মুখ তুলে সত্যকে দেখবার সময় হয়েছে। যদি সেটি না দেখা যায়, তবে দোষ অন্যের নয়, নিজের!
(প্রকাশিত: প্রবাহ তিস্তা তোর্ষা/ সম্পাদক- শ্রী কৃষ্ণ দেব)

No comments: