বিহুর দিনে অহোমরাজের রাজধানীতে
শৌভিক রায়
`দিখৌ নৈ এৰিব নোৱাৰোঁ / জাঁজী নৈ এৰিব নোৱাৰোঁ ` (আমি দিখৌ নদী ছেড়ে যেতে পারব না/ আমি জানজি নদী ছেড়ে যেতে পারব না)......
রঙালি বিহু দেখব বলে বৈশাখের প্রথম দিনে পৌঁছে গিয়ে ছিলাম শিবসাগরে। কিন্তু এত জায়গা থাকতে হঠাৎ শিবসাগর কেন? কারণ ছিল অবশ্যই। আসলে এই শহরটি ১৬৯৯ থেকে ১৭৮৮ পর্যন্ত অহোম রাজাদের রাজধানী ছিল। ছয়শ বছর রাজত্ব করেছিলেন অহোম রাজারা। প্রথম শতাব্দীতে চিনের ইউনান প্রদেশ থেকে এই অহোমরা ইন্দোচিন ও উত্তর মায়ানমারে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। কালক্রমে তাঁরাই হয়ে উঠেছিলেন অসমের প্রবল পরাক্রমশালী শাসক। অবশ্য শিবসাগর ছিল অহোম রাজাদের চতুর্থ রাজধানী। মাওমরিয়ান বিদ্রোহীদের হাত থেকে বাঁচতে রাজা গৌরীনাথ সিংহ দশ হাজার অনুগামী নিয়ে এখানে আশ্রয় নিয়ে ছিলেন।
ফলে, অতীতে রংপুর নামে পরিচিত এই জায়গাটির সমৃদ্ধ ইতিহাস যেমন মন টানছিল, তেমনি দেখতে চেয়েছিলাম এখানকার বিহুর আয়োজন। সত্যি বলতে, ঠকিনি। জগৎবিখ্যাত রংঘরের সামনে জমকালো বিহু উৎসব চোখ ধাঁধিয়ে দিল মুহূর্তেই। অহোম রাজাদের বংশধরের হাতির পিঠে আগমন, আট থেকে আশি পর্যন্ত আবালবৃদ্ধবনিতার গান আর নাচ, জাঁকজমক সত্যিই দর্শনীয়। তবে রংঘরের বিহু উৎসবে কিছুটা যেন কৃত্রিমতা রয়েছে। বেশি ভাল লেগেছে, সাধারণ মানুষের বিহুর সাজে পথে নেমে পড়ে, একে অন্যকে হলুদ রঙে রাঙিয়ে দেওয়া আর বাড়ি বাড়ি গিয়ে শুভেচ্ছা জানানো। আনন্দ উৎসবে সেদিন সবাই এক। সামাজিক, আর্থিক অবস্থান সেখানে গৌণ। প্রকৃতির আর মনের রং মিশে গিয়ে সবাই যেন একই পথের পথিক।
রংঘর আসলে একটি প্যাভিলিয়ন। এখানে বসে রাজা সামনের খোলা মাঠে হাতি সহ নানা জন্তুর খেলা দেখতেন। ১৭৪৪ সালে রাজা প্রমত্ত সিংহ এটি তৈরি করেন। দুইতলার এই নির্মাণটি স্থাপত্যের দিক থেকেও অনন্য। শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে কিমি ছয়েক দূরের রংঘর এলাকায় সেদিন লোকে লোকারণ্য। তিনসুকিয়া, ডিব্রুগড়, জোড়হাট ইত্যাদি নানা জায়গা থেকে অনেকেই এসেছেন বিহু দেখতে। এই রাজ্য থেকে অবশ্য শুধু আমরাই। রংঘরের আরও একটি গুরুত্ব আছে। ১৯৭৯ সালে, অসমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হিতেশ্বর সইকিয়ার শহর শিবসাগরের এই রংঘরেই জন্ম নিয়েছিল আলফা।
রংঘরের উল্টোদিকে তলাতল ঘর কারেংঘর নামেও পরিচিত। এই প্রাসাদের চারটি তল মাটির ওপরে, তিনটি মাটির নিচে। নিচের তলে ছিল সেনানিবাস আর রানিমহল। সুড়ঙ্গপথও ছিল অতীতে। যদিও সেটি বন্ধ এখন। রঙালি বিহুর শোভাযাত্রা শুরু হয় এখান থেকেই। সেটিতে অংশ নেওয়া সৌভাগ্য মনে হল। ভাল লাগছিল আক্ষরিক অর্থে `রংপুর` বা `আনন্দের শহরের` অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎসবে অংশ নিয়ে। যেভাবে প্রাচীনকাল থেকে এখানকার মানুষেরা তাঁদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন, তা সত্যিই শ্রদ্ধার। কাছের গোলাঘরটিও প্রসিদ্ধ। মেলা বসেছিল পুরো এলাকাটিতে।
শিবসাগর সংলগ্ন জয়সাগরের এই এলাকা থেকে ছয় কিমি দূরে এবার এলাম বড়পুখুরিতে। `বড়পুখুরি` যে সত্যিই এত বড়, ধারণা ছিল না। দিঘির শহরের মানুষ আমি। কিন্তু এই বিরাট জলাশয়কে ঠিক কী বলা যাবে, বুঝে উঠতে সমস্যা হচ্ছিল। মানচিত্রে `শিবসাগর ট্যাঙ্ক` নামে চিহ্নিত হলেও, স্থানীয় মানুষরা আদর করে `বড়পুখুরি` নামে ডাকেন তাকে। ১৭৩৪ সালে রাজা শিব সিংহের মহিষী রানি বড় রাজা অম্বিকা ২৫৭ একরের এই বিরাট জলাশয় নির্মাণ করেন। রাজার নামে জলাশয়ের নাম রাখা হলেও, আদতে এটি কিন্ত মহাদেব শিবকে উৎসর্গ করা হয়। জয়সাগরেও এরকম একটি জলাশয় আছে। সেটির আয়তন ৩১৮ একর। মায়ের স্মৃতিতে, ১৬৯৭ সালে, অহোমরাজ রুদ্র সিংহ তৈরি করেছিলেন সেটি। জয়সাগরের পারে দেখা যায় জয়ডোল নামের বিষ্ণু মন্দিরের সঙ্গে শিবডোলের।
তবে বড়পুখুরির দক্ষিণ তীরের শিবডোল বেশি পরিচিত। উত্তর-পূর্ব ভারতের তো বটেই, সারা দেশের মধ্যেই অন্যতম উঁচু শিব মন্দির এটি। মন্দিরের একদিকে দেবীডোল অর্থাৎ মা দুর্গার মন্দির। অন্যদিকে বিষ্ণুডোল। ১৭৩৪ সালে নির্মিত ৩২ মিটার উঁচু শিবডোল আর একই চত্বরে থাকা অন্য দুটি মন্দিরে ঢুকতেই, পবিত্র বাতাবরণে, মন প্রসন্ন হয়ে গেল। বড়পুখুরির বিভিন্ন দিকে থাকা অহোম তাই জাদুঘর, আনন্দরাম বড়ুয়া উদ্যান, অর্জুন ভোগেশ্বর বড়ুয়া স্মৃতিস্তম্ভ, শিবসাগর যুবদল থানেশ্বর দত্ত প্রেক্ষাগৃহ, বৌদ্ধ বিহার, টেনিস কোর্ট, সার্কিট হাউস, সংশোধনাগার ইত্যাদিও এই এলাকার আকর্ষণ বাড়িয়েছে।
প্রাচীন সমৃদ্ধ শহরটি থেকে ফেরার সময় তাই বোধহয় মন বলছিল বারবার, `আগলে যাবও নোৱাৰোঁ / উভতি চাবও নোৱাৰোঁ` (আমি আর এগোতে পারছি না/ আমি পিছনে ফিরেও তাকাতে পারছি না।)
(প্রকাশিত: রংদার রোববার/ উত্তরবঙ্গ সংবাদ/ ১৮ মে, ২০২৫)
ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা কার্যকরী সম্পাদক ও উত্তরবঙ্গ সংবাদকে

No comments:
Post a Comment