মার্সিডিঞ্জ বেঞ্জ দুটি দেখে প্রথমটায় চমকে গেছিলাম। একটির রেজিস্ট্রেশন ১৯৬৬ সালের, আর একটির ১৯৬৭ সালের। অর্ধশতক পার করে ফেলা গাড়িদুটি, আরও কিছু অন্য গাড়ির সঙ্গে, শোভা পাচ্ছে মালবাজারের এই পেট্রল পাম্পে। চালসা থেকে মালবাজারের দিকে আসতে মাল নদী পার করে সামান্য এগোলেই রায় এন্ড কাজিনসের এই পাম্পটি। পাম্প লাগোয়া ছোট্ট টি স্টল, তাতে পাওয়া যায় রায় পরিবারের মালিকানাধীন মিশন হিলস চা-বাগানের লোভনীয় দার্জিলিং চা। এখানে একটা তথ্য উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ভারতের টি-বোর্ড মোট ৮৭টি চা-বাগানকে দার্জিলিং চায়ের লোগো ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। মিশন হিলস সেই বাগানগুলির একটি। ভাবতে ভাল লাগে, বাঙালির সামগ্রিক অবক্ষয়ের এই মুহূর্তে যে দুই চারটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে আমরা এখনও গর্ব বোধ করি, তার মধ্যে মালবাজারের এই রায় পরিবার অন্যতম। কপর্দক শূন্য অবস্থায় উদ্বাস্তু হয়ে, ১৯৪৫ সালে দেশভাগের আগে এপারে চলে আসা এই পরিবারের প্রধান, সদ্য প্রয়াত নীলমনি রায়, নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়, বটলিং প্
Monday, March 31, 2025
রূপসী মালবাজার: ইতিহাসের হাত ধরে
শৌভিক রায়
আসলে মালবাজার জনপদটিই বোধহয় এরকম, যার পরতে পরতে বিস্ময়। আদ্যন্ত চা-শহর মালবাজারের নৈসর্গিক দৃশ্য এতটাই সুন্দর যে বছরের যে কোনও সময় মুগ্ধ হতে হয়। একের পর এক তরঙ্গায়িত চা-বাগান, অদূরের নীল পাহাড়, নানা জাতি-উপজাতির মানুষ এবং সমৃদ্ধ ইতিহাস মালবাজারকে ডুয়ার্সের অন্য জনপদগুলি থেকে আলাদা করেছে। একটি নদী জনপদটিকে মালার মতো ঘিরে রেখেছে বলে সম্ভবত জনপদটির নাম হয়েছে মাল। সংস্কৃত 'মাল' শব্দটি মালা বা মাল্য বোঝায়। গরুবাথান অঞ্চলে ভুটান পাহাড়ে সৃষ্ট মাল নদী এই জনপদটিকে মালার মতো ঘিরে রেখেছে বলে অনেকে মনে করেন যে এই স্থানটির নাম হয়েছে মাল। আবার মালপাহাড়ি নামের প্রাচীন জনগোষ্ঠীর বাসস্থান ছিল বলে মাল নামটির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। দ্রাবিড় ভাষায় 'মাল' শব্দটির অর্থ উঁচু জমি। মাল নামটির পেছনে ডুয়ার্সে দ্রাবিড়দের আগমন ও বসবাসের ইতিহাসটিকে কিন্তু উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। জনশ্রুতি, এই স্থানটি আশেপাশের অঞ্চল থেকে উঁচু বলে বন্যার হাত থেকে রেহাই পেতে একসময় ভুটানিরা এখানে মাল রাখত। মালবাজার নামকরণের পেছনে সেই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আবার একসময় জলপাইগুড়ি জেলায় মালজোত, মিয়াদি জোত ও পোড়ো জমির জোত দেখা যেত (১৮৬৬ সালে জলপাইগুড়ির প্রথম কমিশনার টুইডির তথ্য অনুযায়ী), মালবাজারের নাম সেই মালজোত থেকে এসে থাকতে পারে বলে অনেকের অনুমান। অধ্যাপক স্বপন কুমার ভৌমিকের 'ইতিকথায় পশ্চিম ডুয়ার্স ও মালবাজার` বইটিতে মালবাজারের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব হরেন্দ্রনাথ ঘোষের উল্লেখ আছে, যাঁর মতে ১৮৮৯-৯৫ সালে জমি জরিপের কাজে আসা ব্রিটিশ সার্ভেয়ার ম্যালকম সাহেবের সংক্ষিপ্ত নাম মাল সাহেব থেকে মালবাজারের উৎপত্তি হয়েছে। কিন্তু নাম আর কী এসে যায়! সময়ের বিবর্তনে ছবির মতো সুন্দর মালবাজার তার পিকচার পোস্টকার্ড সৌন্দর্য খানিকটা হারালেও আজও পশ্চিম ডুয়ার্সের রানি ও অঘোষিত রাজধানী।
রাঙামাটি চা-বাগানের চাইবাসা ডিভিশনের প্রাচীন সমাধিস্থল
রায় এন্ড কাজিনসের মার্সিডিজ বেঞ্জ
মৈত্রী বৌদ্ধ বিহার
মরিয়াম ইডাকের সমাধি
ক্যালটেক্স মোড়
একটা সময় মালবাজার বলতেই বুঝতাম প্রয়াত মন্ত্রী পরিমল মিত্রকে। আধুনিক মালবাজারের রূপকার হিসেবে যদি তাঁকে চিহ্নিত করা হয়, তবে বোধহয় খুব একটা ভুল হবে না। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট প্রথমবার মন্ত্রিসভা গঠন করলে পরিমল মিত্র বন ও পর্যটন দপ্তরের মন্ত্রী হন। ১৯৮৫ সালে মৃত্যুর মুহূর্ত অবধি তিনি মন্ত্রী ছিলেন এবং তাঁর সময়েই তৈরী হয় মাল উদ্যান, মাল টুরিস্ট লজ-সহ বেশ কিছু সরকারি দপ্তর এবং কলেজ। অবশ্য কলেজ প্রতিষ্ঠা হওয়ার আগেই তিনি দেহত্যাগ করেন। তবে কলেজ স্থাপনের তাঁর কৃতিত্ব তাতে একটুও কমেনি। বরং তাঁর অবদানকে মাথায় রেখে ১৯৮৫ সালে কলেজ শুরু হলে, কলেজের নাম তাঁর নামেই রাখা হয়। চালসা থেকে মালবাজারে ঢুকতে মাল নদীর পাশে পরিমল মিত্র স্মৃতি মহাবিদ্যালয় এভাবেই মনে করায় মালবাজারের অন্যতম রূপকারকে। ভোলা যায় না ডঃ নারায়ণ ব্যানার্জি, বিমল দাসগুপ্ত প্রমুখের অবদান। আবার বয়েজ টাউন সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা জন রবার্ট থ্যাটসের কথা যদি স্মরণ না করি, তবে অন্যায় হবে। ১৯৭৩ সালে এই অনাথ আশ্রমটি প্রতিষ্ঠিত হয়। শুধু মালবাজার নয়, উত্তরের বিভিন্ন জায়গা থেকেই এখানে অনাথ শিশুরা আশ্রয় পেত। এই শিশুদের পড়াশোনার জন্য ওই একই বছরে প্রতিষ্ঠা হয় সিজার স্কুলের। ভাবতে বিস্মিত হতে হয় যে, ইংল্যান্ডে জন্ম নিয়েও ফাদার জন রবার্ট থ্যাটস মালবাজার তথা ডুয়ার্সকে নিজের করে নিয়েছিলেন। মা ভেরোনিকার, যাঁর ডাক নাম ছিল সিজার, স্মৃতিকে অমর করে রাখবার জন্য ফাদার জনের সিজার স্কুল ও বয়েজ টাউন মালবাজারের অন্যতম গর্ব। কিছুদিন সিজার স্কুলে চাকরির সুবাদে ফাদারকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম। কুকুরপ্রেমী মানুষটিকে দেখে কখনই মনে হয় নি যে, তাঁর ঠাকুরদা ছিলেন হুগলির মহসিন কলেজের অধ্যক্ষ এবং তিনি নিজে স্বয়ং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্কের এম এ এবং আমেরিকার ডেট্রয়েটটের খ্রিস্টান মিশনারি ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তাঁকে ঘিরে বিতর্ক চললেও আমৃত্যু তিনি মালবাজারেই ছিলেন।
ইংরেজদের প্রসঙ্গ ওঠায় মালবাজারের নিকটবর্তী রাঙামাটি চা-বাগানের চাইবাসা ডিভিশনের সমাধিস্থলের কথা উল্লেখ করতেই হয়। পশ্চিম ডুয়ার্স তো বটেই, সমগ্র ডুয়ার্স অঞ্চলে এত প্রাচীন সমাধিস্থল আর আছে কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা যে, অযত্নে অবহেলায় আজ সেই ঐতিহাসিক সমাধিস্থলটি নষ্ট হতে বসেছে। অথচ সেদিন যাঁরা তাঁদের প্রিয়জনদের এখানে শায়িত করেছিলেন, তাঁরা কোনোদিন ভাবেন নি যে, এই সমাধিস্থলের এরকম অবস্থা হতে পারে। যেমন ধরা যাক, রাঙামাটি চা-বাগানের তদানীন্তন ম্যানেজার ডব্লিউ ডি কাউলের কথা। ১৯১৯ সালে তিনি তাঁর প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়সী পত্নী মরিয়াম ইডাকে এখানে সমাধিস্থ করেন। সমাধির ওপরে তৈরি করেন শ্বেত পাথরের অনিন্দ্যসুন্দর এক পরী, যার চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে অদ্ভুত বিষাদ। বর্তমানে সেই পরীর ডানা দুটি অক্ষত থাকলেও, হাত দুটি ভেঙে গেছে। ফলকে উৎকীর্ণ লেখাটিও কষ্ট করে পড়তে হয়। আবার, ১৮৫৪ সালে স্কটল্যান্ডে জন্ম নেওয়া জন উইলিয়াম থমসন, চা-বাগানের সূত্রেই, ডামডিমে আসেন। কিন্তু ডুয়ার্সের পরিবেশ তাঁর সহ্য হয় নি। ১৮৮৯ সালে তাঁর মৃত্যু হলে তাঁকে এখানে সমাধিস্থ করা হয় পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে। একইরকমভাবে, ১৯২৩ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে সমাধিস্থ হন ফ্রেডেরিক চার্লস জর্ডান। তাঁর কর্মস্থল ছিল সাতখাইয়া চা-বাগান। জানা যাচ্ছে যে, বাগরাকোট চা-বাগানের উইলিয়াম ভ্যালেন্টাইন শিয়ারার ছিলেন টি-প্লান্টার। ১৯১৮ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুতে তাঁর ভাই ও বোন, পিটার কালটার ও আবার্ডিন, স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করেন। এখানেই রয়েছে ১৮৮০ সালে মৃত রোডেরিক ম্যাকলিডের সমাধিটিও। প্রাচীনত্বের দিক থেকে, এই সমাধিটির গুরুত্ব বুঝতে অসুবিধা হয় না। অন্যদিকে, লিস রিভার চা-বাগানের জন অ্যান্ডার্সন পার্থ দম্পতি ১৯৩৪ সালে তাঁদের ২৭ বছর বয়স্ক সন্তান জেমসের জন্য যখন সমাধিটি তৈরি করেন, তখন তাঁদের মানসিক অবস্থাটিও সহজে বোঝা যায়। হয়ত একইরকম মানসিক অবস্থা নিয়ে, মিনগ্লাস চা-বাগানের মালিক জন রাইট তাঁর সন্তান জর্জকে সমাধিস্ত করেন। মৃত্যুর সময় জর্জের বয়স ছিল মাত্র আটাশ বছর। ১৯০৫ সালে নির্মিত তাঁর সমাধিতে উৎকীর্ণ রয়েছে চোখে জল এনে দেওয়া কবিতা। রাঙামাটি চা-বাগানেই কর্মরত অবস্থায় জন জেমস লিথাল লোগান ৫১ বছর বয়সে মারা যান। ১৯৪৭ সালে তিনি সমাধিস্ত হন। অন্যদিকে, বড়দিঘি চা-বাগানের সুইনটন থমাসের মৃত্যু ১৯৬৮ সালে এবং সম্ভবত তিনিই হলেন সমাধিস্থ হওয়া শেষ ব্যক্তি। এঁরা সকলেই শুয়ে রয়েছেন চা-বাগানের সবুজ বিস্তারের মাঝে এই বিরাট সমাধিস্থলে। রয়েছেন আরও অনেকে। কিন্তু সবার সমাধির পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয় না, কেননা সময়ের থাবা শ্বেতমর্মরে লেখা লিপিকে মুছে দিয়েছে। এখন জানতে ইচ্ছে হতে পারে যে, ডুয়ার্সের এই অঞ্চলে এত সংখ্যক ইংরেজ এসেছিলেন? কারণ ছিল ১৮৭৪ সালে হুতান সাহেবের চা-বাগান প্রতিষ্ঠা ডুয়ার্সে চা-শিল্পের সম্ভাবনাকে খুলে দিয়েছিল। এর ফলে দলে দলে ইংরেজ ভিড় জমিয়েছিলেন অরণ্য ও হিংস্র বনচারীর ডুয়ার্সে। অবশ্য সে এক অন্য গল্প। শুধু উল্লেখ্য যে, হাউটন সাহেবের সেই চা-বাগান ছিল মালবাজারের খুব কাছেই, আজকের গজলডোবায়।
ডুয়ার্সে চা-চাষের সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েই চা-শিল্পের যে বিকাশ শুরু হয়েছিল, তাতেই বোধহয় লেখা ছিল মালবাজারের ভবিষ্যৎ। কেননা গজলডোবায় রিচার্ড হাউটনের প্রথম চা-বাগান প্রতিষ্ঠার পর মালবাজারকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল একের পর এক চা-বাগান। আর সেই সব চা-বাগানে কাজে যোগ দিতে ইংরেজ থেকে শুরু করে বাঙালি, নেপালি, পাঞ্জাবি, আদিবাসী, এমন কি চিনা সম্প্রদায়ের মানুষেরও আগমন হয়। ১৮৯৩ সালে বেঙ্গল ডুয়ার্স রেলওয়ের অধীনে মালবাজারে গড়ে ওঠে বড় জংশন স্টেশন। আজ কালের নিয়মে সেই জংশন স্টেশনের গুরুত্ব হ্রাস পেলেও বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, এই রেল স্টেশনের হাত ধরেই ডুয়ার্সের ইতিহাস বদলাতে শুরু করেছিল। আর এই রেলস্টেশনের জন্যই রুজিরুটির টানে ভারতের অন্য প্রদেশ থেকেও মানুষজন এসে মালবাজারকে কসমোপলিটান চেহারা দিতে শুরু করেছিল। অবশ্য এই চেহারা বদল শুরু হয়ে গিয়েছিল ১৮৭৫ সাল থেকেই, কেননা মোটামুটি সেই সময় থেকেই চা-বাগানগুলির প্রতিষ্ঠা শুরু হয়েছিল। আজ এই রেলপথ শুধু অতীত স্মৃতিই বহন করছে। কেননা ১৯৪৯-৫০ সালে Assam Link Project-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত নিউ মাল স্টেশন আজ মালবাজারের সঙ্গে রাজ্য তথা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সংযোগ রক্ষাকারী স্টেশন হিসেবে কাজ করে চলেছে। শিলিগুড়ি জংশন থেকে নিউ মাল হয়ে আলিপুদুয়ার জংশন পর্যন্ত ১৮০ কিমির রেলপথ দেশের অন্যতম সুন্দর রেলপথ বলে পরিচিত, যদিও বন্যপ্রাণী রেলপথে চলে আসায় অনেকসময় তাদের মৃত্যু হয় বলে এই রেলপথ কুখ্যাতিও কুড়িয়েছে।
মালবাজারের ক্যালটেক্স মোড় অতীতের মতো আজও গুরুত্বপূর্ণ। বয়সের দিক থেকে পশ্চিম ডুয়ার্সের দ্বিতীয় প্রাচীন এই পেট্রল পাম্পটি সম্ভবত ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠা করে California Texas Oil Comapany আর তার থেকেই এই এলাকার নাম হয়ে গেছে ক্যালটেক্স মোড়। এই এলাকার কাছেই পানোয়ার বস্তি। শোনা যায় যে, 'পানছুকরি' নামে এক মহিলার নাম থেকে এই বস্তির নাম। মালবাজারের বয়স্ক মানুষেরা আজও বিশ্বাস করেন যে, সেই মহিলা ছিলেন অধুনালুপ্ত হায় হায় পাথার চা-বাগানের ইংরেজ ম্যানেজারের রক্ষিতা। ক্যালটেক্স মোড়ের কাছেই আর এক বস্তি হল গুরজং। স্টেশন রোড এবং এই এলাকাগুলো ছাড়া সেভাবে মালবাজারে সেভাবে জনবসতি ছিল না। কিন্তু স্বাধীনতার পর, বিশেষ করে দেশভাগ হলে, ডুয়ার্সের অন্য কানপদগুলির মতোই মালবাজারেও শরণার্থীর ঢল নামে। ধীরে ধীরে তৈরি হয় আরও কিছু কলোনি। এই সময়েই মালবাজারে প্রতিষ্ঠিত হয় মাল আদর্শ বিদ্যাভবন। অতীতে ব্রিটিশদের সার্জন কুঠি এখানেই ছিল। তবে এই বাড়িটির মালিকানা ছিল মালিকানা ছিল জলপাইগুড়ির নবাবদের। সেই সময় ডঃ নারায়ণ ব্যানার্জি-সহ মালবাজারের বিশিষ্ট মানুষেরা জলপাইগুড়িতে দরবার করলে এই বাড়ি ও জমি দান করা হয়। এই ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন নবাব পরিবারের প্রতিনিধি কিবরিয়া সাহেব। ১৯৫৫ সালে শিল্পোদ্যোগী বীরেন্দ্র চন্দ্র ঘোষ তাঁর রূপালী চা-বাগানের একটি অংশ দান করেন এবং রেলওয়ে ঠিকাদার ভবানী ব্যানার্জি বহু টাকা অনুদান দেন বিদ্যালয় ভবন তৈরির জন্য। তাঁর মায়ের নামেই তৈরি হয় সুভাষিণী বালিকা বিদ্যালয়টি। সিজার স্কুলের পাশাপাশি এই দুটি বিদ্যালয় দীর্ঘদিন একটি বিরাট অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থার মূল কান্ডারি ছিল। কালের নিয়মে আরও কিছু বিদ্যালয় মালবাজারের শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।
আধুনিক মালবাজার পরিমল মিত্র স্মৃতি মহাবিদ্যালয় থেকে শিলিগুড়ি অভিমুখে রেলব্রিজ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। পথের পাশেই মাল উদ্যান নিঃসন্দেহে মালবাজারের অন্যতম আকর্ষণ। উদ্যানের মাঝে বয়ে চলা শঙ্খিনী ঝোরা, নানা ধরণের ফুল, এক্যুইরিয়াম, পাম গাছের সারি ,প্যাগোডা ইত্যাদি সব মিলে অনুপম সৌন্দর্যের এই উদ্যানে বহু বাংলা ছবির শুটিং হয়েছে। অবশ্য মালবাজার ও সংলগ্ন এলাকা এতটাই সুন্দর যে এখানে মাঝে মাঝেই ছবি করবার জন্য এসেছেন চলচ্চিত্র জগতের বহু মানুষ। মালবাজারের কাছেই লুকসান বাজারে 'হাটবাজারে' ছবির জন্য এসেছিলেন অশোককুমার, বৈজয়ন্তীমালা। 'কাঁচ কাটা হীরে' ছবির জন্য সৌমিত্র চ্যাটার্জি, লিলি চক্রবর্তী প্রমুখেরা মালবাজারে বেশ কিছুদিন ছিলেন। ভানু বন্দোপাধ্যায়, মাধবী চক্রবর্তী শুভেন্দু চ্যাটার্জি-সহ ছায়াছবির আরও বহু বিখ্যাত মানুষ মালবাজারে পদার্পন করেন। তবে মালবাজারের মানুষেরা কোনোদিনই ভুলতে পারেন না দলাই লামার মালবাজারে ঘন্টা তিনেক অবস্থানকে। একই ভাবে তাঁরা মনে রেখেছেন বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদের ক্ষণিক অবস্থানকে। এখনও প্রবীণ মানুষদের চোখে ভাসে ১৯৬১ সালের সেই সন্ধ্যার কথা যেদিন পন্ডিত রবিশঙ্কর মালবাজারে সেতা র বাজিয়েছিলেন। কে ভুলবে ১৯৬৪ সালের সেই সোনামাখা দিনগুলিকে যখন বিশ্ববরেণ্য সত্যজিৎ রায় এখানে তাঁর ছবির শুটিং করছেন! আজকের মালবাজারে ক্রমাগত গাড়িঘোড়ার চলাচল, ব্যস্ততা দেখে বোঝা দায় যে, ছোট্ট এই জনপদ কত বিখ্যাত মানুষদের স্পর্শে ধন্য !
আজকের মালবাজারে বড়দীঘি অঞ্চলে উত্তরবঙ্গ বৌদ্ধ সংঘ আশ্রম শিবোহম বালাজি মন্দির, নানু বাবুর পুকুর অন্যতম দর্শনীয় স্থান। এছাড়া মালবাজারের কাছেপিঠে ছড়িয়ে রয়েছে এত কিছু যে, একবারে সেসব বর্ণনা করা সম্ভব নয়। আসলে এই শহরের প্রায় সর্বত্রই রয়েছে ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসে লেগে রয়েছে চা-বাগান প্রতিষ্ঠার দিন থেকে আজকের দিনটি কথাও। সেইসব কথার আকার ও আয়তন এতটাই বড় যে, স্বল্প পরিসরে তার বর্ণনা প্রায় অসম্ভব। যেমন, রানিচেরা চা-বাগানে ছিল নদীর তীরে যে ওয়েস্টার্ন ডুয়ার্স ক্লাবটি দেখা যায়, সেটি আসলে ১৯০২ সালে প্রতিষ্ঠিত মালবাজার ইউরোপিয়ান ক্লাব। আজকের পুষ্পিকা বিদ্যালয়ের স্থানে ছিল এই ক্লাবটি আর এখানে প্রতি সন্ধ্যায় জমে উঠত ইউরোপিয়ান টি প্লান্টার-সহ চা-বাগানের শ্বেতাঙ্গদের আড্ডা। ভারতীয়দের প্রবেশ এখানে ছিল না। ক্লাবের সামনে বিরাট মাঠে গল্ফ ও পোলো খেলা হত। ১৯৬১ সালে ক্লাবটিকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং সামনের মাঠে সরকারি আবাসন গড়ে ওঠে। আজও ছিল নদীর পাশে রানীচেরা চা-বাগানে এই ক্লাবের ভেতর দেখা যায় ১০০ বছরের পুরোনো বিলিয়ার্ড বোর্ড ও পিয়ানো। উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় গল্ফ প্রতিযোগিতার আয়োজনও হয় নদীর গা ঘেঁষা ১৮ টি গল্ফ হোল সমৃদ্ধ বিরাট মাঠটিতে।
অতীত এখানে এতটাই সমৃদ্ধ ছিল যে, ১৯৪৮ সালে মালবাজারে Dooars Union Bank যাত্রা শুরু করেছিল। যদিও সে ব্যাঙ্কের অস্তিত্ব বেশিদিন ছিল না, কিন্তু ডুয়ার্স অঞ্চলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সেই তৈরি হওয়া সেই ব্যাঙ্ক প্রথম ব্যাঙ্কের মর্যাদা বহন করে। আবার মালবাজারের নানুবাবু (সুশীল কুমার দাস) ডুয়ার্সে প্রথম সংকর প্রজাতির মাছ চাষ জোড়েন বলে প্রচলিত। তাঁর তৈরি গোবর প্লান্ট, নার্সারি ইত্যাদিও একসময় ছিল দেখবার মতো। সাহিত্য সংস্কৃতি জগতেও একসময় মালবাজার বেশ পরিচিত ছিল, তবে মালবাজারের অন্য অনেককিছুর তুলনায় তা যেন একটু ফিকে। তবে একথা অনস্বীকার্য যে, মালবাজারকে কেন্দ্র করেই চালসা, ওদলাবাড়ি, লাটাগুড়ি, ডামডিম ইত্যাদি মালবাজারের সন্নিহিত অঞ্চলগুলিতে সংস্কৃতির স্পর্শ লাগে। একসময় নাটক, যাত্রা, সংস্কৃতিক কর্মকান্ড ইত্যাদি কমবেশি লেগে থাকত আর সবচেয়ে ভাল লাগত যেটা তা হল যে, সেইসব অনুষ্ঠানে উঠে আসত ডুয়ার্সের মিশ্র সংস্কৃতি। আজ অন্তর্জাল ও সমাজ মাধ্যম এইসব কর্মকান্ডে খানিকটা ব্যাঘাত ঘটালেও অতীতকে ভিত করেই ইমারত তৈরির প্রচেষ্টা যেন চলছে!
প্রকৃতি ও মানব-ইতিহাসের তালমিলে মালবাজারের মতো এত সুন্দর জায়গা বোধহয় ডুয়ার্সে আর দ্বিতীয়টি নেই। অদূরে হিমালয়ের সুউচ্চ পাহাড়শ্রেণী, একদিকে ভুটান পাহাড়ের হাতছানি, একের পর এক চা-বাগানের সবুজ বিস্তার, তরঙ্গায়িত ভূমি আর বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ নিয়ে মালবাজার অনন্য। এখানে ইতিহাস কথা বলে, কান পাতলেই শোনা যায় সেই ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসকেই সঙ্গী করে চিনে নিতে হয় ডুয়ার্সের এই রূপসীকে।
(ঋণ স্বীকার- ইতিকথায় পশ্চিম ডুয়ার্স ও মালবাজার: স্বপন কুমার ভৌমিক
প্রয়াত প্রিয়তোষ পন্ডিত, প্রিন্সিপাল, সিজার স্কুল
পরম শ্রদ্ধেয় প্রয়াত জ্ঞানবাবু)
ছবি- লেখক
** প্রকাশিত- এখন ডুয়ার্স
Friday, March 28, 2025
Thursday, March 27, 2025
সেই বৃক্ষের কাছে
শৌভিক রায়
যে গ্রামের নাম টিরনা, সে সুন্দর হবেই। চেরাপুঞ্জির বাজার থেকে একুশ কিমির যাত্রায় ভাবছিলাম সেটাই। ভাবনাটা মিলে গেল। ছবির মতো এরকম সুন্দর জনপদ দেখিনি আগে।
এখান থেকেই গভীর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে নামতে হবে ৩৫০০ সিঁড়ি। পথে পড়বে দু-দু'টো ঝুলন্ত ফুটব্রিজ আর তার নীচে ভীমবেগে বয়ে চলা পাহাড়ী নদী! যাচ্ছি লিভিঙ রুটব্রিজ দেখতে। নির্দিষ্ট করে বললে ডাবল ডেকার লিভিঙ রুটব্রিজ দেখতে। এটা দেখতেই আসা চেরাপুঞ্জিতে।
মেঘালয়ের এই অংশে অত্যাধিক বৃষ্টিপাতের ও ট্রপিক্যাল ফরেস্টের জন্য প্রকৃতি দুর্গম। খাসি প্রজাতির লোকেরা তাই অভিনব পদ্ধতিতে ব্রিজ বানিয়ে থাকেন। বয়স্ক রাবার গাছের শেকড়গুলিকে তারা এমনভাবে লালন করেন যে, সেগুলি ব্রিজের আকার নেয়। নদীর ওপরে যেখানে চলাচল অসম্ভব, সেখানে এই রুটব্রিজই ভরসা। প্রায় বছর পনের লাগে একটি রুটব্রিজ তৈরী করতে। কেননা শেকড়কে হতে হয় ততটাই শক্ত যাতে সে মানুষের ওজন নিতে পারে। একবার তৈরী হলে রুটব্রিজ টিকে যেতে পারে পাঁচশো বছর।
টিরনা থেকে ৩৫০০ সিঁড়ি ভেঙে উমশিয়াং যাবার কারণ এই রুটব্রিজ।এই ব্রিজটি ডাবল ডেকার, অর্থাৎ দু'টো তল এর। ন্যাশনাল জিওগ্রাফি জানাচ্ছে, পৃথিবীতে এরকম ব্রিজ এই একটিই। আরও কাণ্ড হ'ল, ব্রিজ নির্মিত নয়, গড়ে উঠেছে নিজেই!
ট্রেক আগেও করেছি। সিঁড়িও ভেঙেছি পালিতানা, পক্ষীতীর্থম বা শ্রাবণবেলগোলায়। কিন্তু এখানে ব্যাপারটা আলাদা। এই সিঁড়িগুলো অনেকটা বেশী খাড়াই। চাপাও। তাই পায়ের ওপর চাপ পড়ছে তুলনায় বেশী। নজর রাখতে হচ্ছে তীক্ষ্ণ, যাতে পা ঠিক জায়গায় পড়ে। কোথাও কোথাও টানা আটশো সিঁড়ি নেমে গেছে। চারদিকে পাহাড় আর গভীর জঙ্গল। কোনও কোনও জায়গায় অরণ্য এত দুর্ভেদ্য, আলোও ঢোকে না ঠিকঠাক। রাস্তা জনশূন্য।
একবার থামতে হ'ল। রাস্তা নেই। সামনে পাহাড়ী নদী। ঝুলছে ফুটব্রিজ। তাতে খানিক এগোতেই শুরু হ'ল দুলুনি। নীচে বিরাট বিরাট পাথর আর তার ফাঁকফোকড় দিয়ে বইছে প্রবল বেগে নদী। দাঁতে দাঁত চেপে পৌঁছে গেলাম ওপারে। আবার শুরু ওঠা। খানিকটা এগোতেই আবার একটি ব্রিজ। এটি অনেকটা লম্বা। তবে ভয় কেটে গেছে। সামান্য যেতেই দেখা হয়ে গেল একটি রুটব্রিজ সঙ্গে। বসে পড়ি আনন্দে। পুত্র তাগাদা দেয়। থামা চলবে না। এখনও গন্তব্য আসে নি। তাই এগিয়ে যাই। প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছে আর বোধহয় পারবো না। তবু এক অদম্য জেদ নিয়ে চলতে থাকি।
অবশেষে চোখের সামনে ডাবল ডেকার লিভিং রুটব্রিজ। বিশ্বাসই করতে পারছি না। একটি গাছ থেকে শেকড় বেরিয়ে দু'টো ব্রিজ হয়ে ওপরে নীচে দাঁড়িয়ে আছে ! বেশ লম্বা। নীচে বইছে নদী। শোনা যাচ্ছে পাথরের বুকে আছড়ে পড়া জলের শব্দ। ঝুলছে সরু সরু ঝুরি। নদীতে সামান্য দূরে দু'একজন কাপড় ধুচ্ছে। বড় বড় পাথরের অনেকগুলিতেই শ্যাওলা জমে পেছল পেছল ভাব। নদীর স্বচ্ছ জলে মাছের দল। চোখের সামনে বিশ্বের একবোদ্বিতীয়ম ডাবল ডেকার রুটব্রিজ। নিমেষেই মিলিয়ে যায় সব ক্লান্তি। প্রণাম করি সেই বৃক্ষকে। তার সহনশীলতা মুহূর্তেই পড়িয়ে দেয় জীবনের পাঠ।
ফিরতি পথে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা কেবল। বুকে হাঁপ ধরে ভীষণ। থেমে থেমে চলি। বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে। প্রতি মুহূর্তেই মনে হয় আর বোধহয় পারবো না। কিন্তু যে সহনশীলতার শিক্ষা মাত্র নিয়ে এলাম বৃক্ষের থেকে, উজ্জীবিত করে সে-ই। এগোই। থামি। আবার এগোই। আমাকে পেরিয়ে যান স্থানীয় এক বৃদ্ধ ও এক প্রৌঢ়া। মৃদু হাসেন। প্রৌঢ়া বলেন, "ওয়াক স্লোলি।" হাসি। সত্যিই বলেছেন। ধীরে ধীরে এগোতে এগোতে এক সময় শেষ হয় সিঁড়ি। উঠে আসি টিরনা গ্রামে। কোমরে, পায়ে তখন অসম্ভব ব্যথা শুরু হয়েছে। দরদর করে ঘামছি। বুকে চাপ চাপ ব্যথা। গাইড টাকা নেয়। হ্যান্ডসেক করে। বলে ,"কাম এগেন।" মাথা নেড়ে বলি, "ইয়েস আই মাস্ট।"
(প্রকাশিত- খোঁজ)
Sunday, March 23, 2025
ছোট্ট মন্দির। তাকে ঘিরেই মিথ নানা। যদিও হলদিবাড়ির কাশিয়াবাড়ি কালীমন্দিরটির ভগ্ন দশা। সংস্কার দরকার দ্রুত।
অন্যদিকে হলদিবাড়ি থেকেই মানিকগঞ্জ পেরিয়ে সাতকুড়ার ত্রিস্রোতা মন্দির। গর্ভেশ্বরী ও গর্তেশ্বরী মন্দির এখানে। সঙ্গে ত্রিস্রোতা মহাপীঠ কালীমন্দির। বলা হচ্ছে, উত্তরবঙ্গের একমাত্র শক্তিপীঠ এটিই। দেবীর আঙুলবিহীন বাঁ পা নাকি এখানে পড়েছিল। কোচবিহার থেকে তিনবিঘা ছুঁয়ে, জয়ী সেতুর পারাপারের আনন্দ নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম দোল পূর্ণিমার পরদিন। সবাই ব্যস্ত তখন রং খেলতে।
Saturday, March 22, 2025
বারাণসী, বৃত্তপথের কারসাজি
(অন্তিম পর্ব/ বুদ্ধ পথই শেষ কথা)
শৌভিক রায়
অটো ড্রাইভার ছান্নু প্যাটেল নিয়ে এলেন শ্রীকৃষ্ণ ভাণ্ডারে। পরিচ্ছন্ন দোকানে এই সকালেই যথেষ্ট ভিড়। সারাদিনের নামে বেরোনোর আগে বারাণসীর কিছু বিশেষ খাবার চাখা হল। তার মধ্যে মন কাড়ল মালাইয়ো। আপাতত গন্তব্য সারনাথ। `সারঙ্গ` অর্থাৎ মৃগ আর তাদের দলপতি `নাথ` থেকে জায়গাটির নাম সারঙ্গনাথ বা সারনাথ। তবে অতীতে ঋষিদের আশ্রমের জন্য ঋষিপত্তন বলেও পরিচিত ছিল বারাণসীর ১০ কিমি দূরের একদা ছোট্ট গ্রামটি। আজ অবশ্য আর গ্রাম নয় সেটি। নগরায়ণ এখন এতটাই ব্যাপ্ত যে, কোনটি গ্রাম আর কোনটি শহর, বোঝা শক্ত।
সারনাথের খ্যাতি বিশ্বময়। নির্বাণ প্রাপ্তির পর, এখান থেকেই সিদ্ধার্থ, তাঁর পাঁচ শিষ্যের মধ্যে, প্রথম ধর্মচক্র প্রবর্তন অর্থাৎ পরম শান্তি মহাজ্ঞান ও নির্বাণ প্রাপ্তির অষ্টমার্গের পথ বা বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন। খ্রিস্টের জন্মের চারশো বছর আগে থেকে ১২ শতক পর্যন্ত ভারতের শিক্ষাদীক্ষার পীঠস্থান ছিল সারনাথ। ফা-হিয়েন এবং হিউয়েন সাঙের বর্ণনায় পাওয়া যায় সারনাথের কথা। পাঁচ থেকে ক্রমে ৬০ জন শিষ্য হলে এখানে সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ছড়িয়ে পড়েছিল বুদ্ধের অহিংসার বাণী সারা ভারতে।
সারনাথের অন্যতম আকর্ষণ ধামেক স্তুপের সামনে দাঁড়িয়ে চোখ ভিজে উঠল। মনে পড়ল, একদিন আমাকে আর দাদাকে স্তুপের সামনে দাঁড় করিয়ে বাবা আগফা ক্যামেরায় সাদা-কালো ছবি তুলেছিলেন। জনশ্রুতি এই স্তুপে রাখা আছে বুদ্ধের অস্থি। এখানেই বুদ্ধ তাঁর প্রথম পাঁচ শিষ্যকে পাঠ দিয়েছিলেন। আটকোণা স্তুপ বুদ্ধধর্মের অষ্টমার্গকে অনুসরণ করে গড়ে তোলা হয়েছে। নিচের ব্যাস ২৮ মিটার, মাঝখানে ১৩ মিটার এবং চুড়ো ৩১ মিটার। স্তুপের গায়ে নানা নকশা করা। সেগুলি গুপ্ত যুগের হলেও, স্তুপের ইঁট খ্রিস্ট পূর্ব ২০০ বছরের অর্থাৎ মৌর্যকালের। সুসজ্জিত স্তুপের সামনে আমাকে দাঁড় করিয়ে ছবি তুলল রীনা। আর উল্টোদিকের এক্সক্যাভেশন সাইটকে পেছনে রেখে আমাদের দুজনের ছবি তুলে দিল কোরিয়া থেকে আসা এক মিষ্টি ছেলে। এতটাই ভাল সে যে, ওর স্মৃতি রাখলাম সেলফি তুলে।
ধামেক ছাড়াও চৌখণ্ডি ও ধর্মরাজিক স্তুপ রয়েছে এখানে। রয়েছে অশোক পিলার। মহাবোধি সোসাইটি টেম্পলটিও ভারতের প্রাচীন মন্দিরগুলির একটি। ধামেক স্তুপের কাছের এই মন্দিরটি গুপ্ত যুগে ইঁট নির্মিত ছিল। পরবর্তীতে জরাজীর্ন অবস্থা হলে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ধর্মপালের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশ থেকে সাহায্য নিয়ে মন্দিরটি আবার গড়ে তোলা হয়। মন্দিরে রাখা আছে সোনার বুদ্ধমূর্তি। কাছেই রয়েছে বোধিবৃক্ষ। শ্রীলঙ্কার অনুরাধাপুর থেকে এনে ১৯৩১ সালে এই গাছটি পোঁতা হয়। গাছের তলায় মহানামা, ভদ্দিয়, ওয়াপ্পা, অস্মজী ও কোন্দানোয়ের মূর্তি। এঁরাই বুদ্ধের সেই পাঁচ শিষ্য। মন্দির চত্বরে ধর্মপালের স্মৃতিস্তম্ভটিও দর্শনীয়। এখানেই আমাদের সঙ্গে দেখা হল ভিয়েতনাম থেকে আসা একদল পর্যটকের সঙ্গে।
সারনাথে জাপান, তিব্বত, থাইল্যান্ড ইত্যাদি বৌদ্ধ ধরে দেশ থেকে বিভিন্ন মন্দির তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকটিই অত্যন্ত সুন্দর। অনবদ্য তাদের স্থাপত্য। জাপানি বৌদ্ধ মন্দিরে, প্রসাদ হিসেবে, সন্ধেবেলায় চকলেট দেওয়া হয়। মোটামুটি সব দেখে ঢুকে পড়লাম মিউজিয়ামে। অত্যন্ত যত্নে এখানে রাখা হয়েছে বুদ্ধমূর্তি, সম্রাট অশোকের তৈরি ধর্মচক্রের ওপর চার সিংহ, ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে প্রাপ্ত নানা ভাস্কর্য। ফরাসি, ইংরেজি, হিন্দি ইত্যাদি নানা ভাষায় টুরিস্ট গাইডরা নানা বিষয় বোঝাচ্ছেন বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা নানুষদের। আমাদের অবশ্য গাইড নেই। প্রয়োজনও নেই। সব কিছুতেই স্ক্যানার রয়েছে। গুগুল লেন্স দিয়ে স্ক্যান করে দেখে নিলেই হল।
সব দেখতে দেখতে অনেকটাই বেলা হয়ে গেল। ছান্নুজি বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন ঠিক কী দেখতে চাই। ফলে ফিরতি পথে নিয়ে চললেন বারাণসীর অখ্যাত সব রাস্তা দিয়ে। এই অঞ্চলে গরীব মুসলিমদের বাড়িই বেশি। অন্য ধর্মের মানুষও আছেন। দারিদ্র তাদের এক করে দিয়েছে। বারাণসী সিটি রেল স্টেশনের কাছ দিয়ে অবশেষে আসা গেল রাজপথে। গন্তব্য রামনগর রাজবাড়ি। ১৭ শতকে বারাণসীর সবচেয়ে আলোকিত আর ঝলমলে মহল ছিল কাশীরাজের এই মহল। অবশ্য আজও যথেষ্ট সম্ভ্রম জাগিয়ে তোলে সেই প্রাসাদ। এখানে এখনও রাজবংশের উত্তরাধিকারীরা থাকলেও, একটি অংশ আমাদের মতো সাধারণদের জন্য উন্মুক্ত। সেখানেই দেখা গেল কাশীরাজের অতীত বিত্ত ও বৈভব। রয়েছে অস্ত্রাগার, দুষ্প্রাপ্য গাড়ি, রুপোর পালকি, হাওড়া, হাতির দাঁতের বিভিন্ন সামগ্রী। আমাকে বিশেষ করে আকৃষ্ট করল কাশী মহারাজকে উপহার দেওয়া বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লার তরবারি। ১৮৭২ সালে বি. মূলচাঁদের তৈরি ঘড়িটিও অনবদ্য। এটিতে সূর্য, চন্দ্রের অবস্থান, সময়-তারিখ-বার ইত্যাদি সব দেখা যায়। গঙ্গার ধারে রাজপরিবারের মন্দিরটিও দুর্দান্ত। এখানে দাঁড়ালে আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। তবে আজকাল সর্বত্র রিল শিকারিদের ভিড়। নিষেধাজ্ঞা সত্বেও যেভাবে রাজবাড়ীর মধ্যে তাদের তাণ্ডব চলছিল, তাতে মনে হচ্ছিল, এসব দেখে সাহস পর্যন্ত রাজবাড়ীর দরজা না বন্ধ হয়ে যায়!
...... কোনও কোনও ভ্রমণ শেষ হয় অতীতের হাত ধরে। এই লেখার শুরুতেই বলেছিলাম, আসলে এবারের বারাণসী আসলে নিজেকে ফিরে দেখা। বাবা-মায়ের হাত ধরে, ঠাকুমা-ঠাকুরদা স্নেহ মেখে যে পথে ঘুরেছি একদিন, আবার দেখা সেসব।
মিথ্যে বলব না, এবারের বারাণসীর শেষ দিনে মনে হচ্ছে, আরও কিছু বাকি রয়ে গেল হয়ত! যতই বলি না কেন, পৃথিবীতে শূন্য কিছু থাকে না, আসলে প্রিয়জনদের অভাব কখনও মেটে না। কোমরে হাত দিয়ে একটু টেনে টেনে চলা কোনও বৃদ্ধাকে দেখে তাই মনে হয়েছে, ওই তো ঠাকুমা! আবার ন্যুব্জ হয়ে যাওয়া বৃদ্ধটির মধ্যে দেখেছি ঠাকুরদাকে। আর বাবা-মা তো সবসময় সঙ্গে আছেন তাঁদের মমতা আর ভালবাসা নিয়ে গঙ্গার ধারে, বিশ্বনাথ মন্দিরে, বারাণসীর অলিগলিতে, সারনাথে। শক্ত করে ধরে রেখেছেন হাত। অগণিত এই যে জনতা তারাই তো আমার আসল জন, আপন জন। তাদের মধ্যেই লুকিয়ে আমার পরিবার পরিজন। তবু এ এক অন্য পরিভ্রমণ।
বারাণসী জংশনে ট্রেন ঢুকল যখন, রাত তখন একটা। পাঁচটা রাত আর ছয়টি দিন। আমার হিসেবে কত? না-ই বা বললাম। হিসেবে তো আসলে মেলে না কখনও। তার ওপর সেটা যদি হয় বারাণসী, তবে তো মিলবে না আরও......
* ছবি- শৌভিক ও রীনা
Subscribe to:
Comments (Atom)










































