ধ্রুবতারা নাকি সাদা অর্কিড?
শৌভিক রায়
সাদা অর্কিডের দেশ। সঙ্গে সবুজের বিস্তার। সে চা-বাগানই হোক কিংবা চারদিকের পাইন আর বার্চ।
এই সাদা সবুজে ভাসতে ভাসতেই প্রায় পাঁচ হাজার ফিট ওপরে উঠে পড়া! আরও কিমি বত্রিশ গেলে শৈলরানি দার্জিলিং। তবে আপাতত এখানেই থামা। কেন জানি না ভোরের ধ্রুবতারাকে ছেড়ে আর যেতে ইচ্ছে করছে না।
না, বাড়িয়ে বলছি না। খারসাং শব্দটির অর্থ ভোরের ধ্রুবতারা। অবশ্য খারসাং নামে জায়গাটিকে চিনবার মানুষ কম। তার পরিচিতি কার্শিয়াং হিসেবেই। ব্রিটিশদের মুখে এই নামটি পরিবর্তিত হয়েছে ১৮৩৫ সালের পর, যখন সিকিমের রাজা এই জায়গাটি তাদের উপহার দেন। তবে `খারসাং রূপ` তত্ত্বটিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সেই অর্থে এই জনপদ সাদা অর্কিডের দেশ বলেও পরিচিত।
পর্যটন মানচিত্রে কার্শিয়াং একটু অবহেলিত। খুব স্বাভাবিক সেটা। কেননা দার্জিলিঙের অমোঘ টান কে আর কবে উপেক্ষা করতে পেরেছে। তবে এবার ধনুক ভাঙা পণ করেছিলাম। কার্শিয়াঙের ওপরে আর উঠছি না।
চেনা পথে শুকনা রোহিনী হয়ে দ্রুতই পৌঁছে গেলাম কার্শিয়াঙে। ওই পথে যে যায়নি, সে বুঝবে না পথ কতটা সুন্দর হতে পারে। চা-বাগান, সুদৃশ্য মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট, জঙ্গল আর নীল আকাশ পেছনে নিয়ে উত্তুঙ্গ পাহাড় মুহূর্তে পাগল করে দেয় নিতান্ত বেরসিককেও। আমাকেও দিচ্ছিল। সেটা শেষ হতে না হতেই কার্শিয়াঙের মাটি ছুঁল আমাদের গাড়ি।
শুরু করলাম গিদ্দা পাহাড় দিয়ে। বাঙালির আইকন নেতাজির পরিবারও আস্ত একটা বাড়ি কিনে ফেলেছিলেন এই পাহাড়ে। সেই বাড়ি এখন নেতাজি ইনস্টিটিউট অফ এশিয়ান স্টাডিজ। সুদৃশ্য এই বাড়িটিতে রয়েছে নেতাজি মিউজিয়াম এবং সেন্টার ফর দা স্টাডিজ অফ হিমালয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস সোসাইটি এন্ড কালচার। ১৯২২ সালে Rowley Lascelles Ward-এর থেকে এই বাড়িটি কিনেছিলেন নেতাজি সুভাষের দাদা শরৎচন্দ্র বোস। ১৯২৫-এ এই বাড়িতে পা রেখেছিলেন দেশপ্রিয় চিত্তরঞ্জন দাস ও তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবী। শোনা যায়, নিশিযাপনও করেন তাঁরা।
শরৎচন্দ্র বোস নিজে এই বাড়িতে ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৫ অবধি গৃহবন্দী ছিলেন। ১৯৩৬ সালে নেতাজিকেও এই বাড়িতে সাত মাস গৃহবন্দী অবস্থায় কাটাতে হয়। কিন্তু বিশ্বস্ত সহচর কালু সিং লেপচার মাধ্যমে নেতাজি কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। ১৯৩৮ সালের হরিপুরা কংগ্রেসের ভাষণ রচনা করা ছাড়াও, এই বাড়ি থেকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে স্বাধীনতা ও ধর্ম নিরপেক্ষতা নিয়ে নেতাজির পত্রালাপ চলত।
স্বাধীনতার পর ১৯৫০ থেকে ১৯৫৪ অবধি এই বাড়িতে বসু পরিবারের যাতায়াত ছিল। কিছু চিঠি, নেতাজির ইউনিফর্ম, অতীত আসবাবপত্র এখন দ্রষ্টব্য এখানে। শরৎচন্দ্র বোসের নিজের হাতে লাগানো ক্যামেলিয়া গাছটি অতীতের স্পর্শ নিয়ে আজও ফুল দিয়ে চলেছে।
এই বাড়িতে কালু লেপচার মেয়ে মতি মায়া লেপচা ২০১৬ অবধি মালির কাজ করতেন। সিঙ্গাপুরের Stonebench- এর গবেষক জাবির রহমান বলছেন, নেতাজি ও এমিলি শেঙ্কেলের মেয়ে বলে পরিচিত অনিতা বসু পাফের এক সন্তানের নামও মায়া। হতে পারে বিষয়টি একেবারেই কাকতালীয় অথবা কালু লেপচার পরিবারকে স্মরণে রাখা।
সম্প্রতি এই বাড়ির কাছেই তৈরি হয়েছে ভিউ পয়েন্ট। কার্শিয়াঙের বিস্তীর্ণ এলাকা, সবুজ চা-বাগান, বয়ে চলা মহানন্দা আর আঁকাবাঁকা পথের প্যানোরামা সত্যিই অসাধারণ। কোনও তুলনা হয় না তার। অনন্ত সময় এখানে বসেই কাটিয়ে দেওয়া যায়। শহরের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরের এই ভিউ পয়েন্ট নিঃসন্দেহে আজকের কার্শিয়াঙের অন্যতম সেরা।
ডাউহিলে পৌঁছতেই কুয়াশা চাদর বিছিয়ে দিল চারদিকে। এমনিতেই ডাউহিল অতিপ্রাকৃতিক ব্যাপারে জন্য পরিচিত। তাই আধো-অন্ধকারে তৈরি হওয়া রহস্য ভালোই লাগছিল। চারদিকে ঘন জঙ্গল। কখনও কুয়াশা ঢেকে দিচ্ছে, কখনও গাছের ফাঁক দিয়ে এক ফালি রোদ পাহাড়কে চুমু দিচ্ছে। দেখে নেওয়া গেল বিখ্যাত ডাউহিল স্কুল। খানিকটা দূরে ডাউহিল আমিউজমেন্ট ও ডিয়ার পার্ক পার করেই ফরেস্ট স্কুল ও মিউজিয়াম। দেরাদুনের ফরেস্ট স্কুল ও মিউজিয়ামের পাশে অতি সামান্য মনে হলেও, নির্জনতা ও নিস্তব্ধতায় জায়গাটি অদ্বিতীয়। ড্রাইভারকে ছেড়ে দিয়ে হেঁটে বেড়াই ডাউহিলের জঙ্গলে। প্রজাপতি আর পাখিদের হুটোপুটি যেমন দারুণ লাগে, তেমনি অতি শান্ত পরিবেশে নিজের পায়ের শব্দই চমকে দেয় মাঝেমধ্যে!
কার্শিয়াং টুরিস্ট লজের রেস্টুরেন্টের লাঞ্চ ও ডিনার কার্শিয়াং ভ্রমণের নতুন আবিষ্কার। প্রায় শতাব্দী-প্রাচীন এই কাঠের রেস্টুরেন্টটি হেরিটেজ গোত্রীয়। সুস্বাদু খাবারের সঙ্গে সঙ্গে কাঁচের বিরাট বিরাট জানালা দিয়ে কার্শিয়াঙ পাহাড় দেখাও অনবদ্য অভিজ্ঞতা বৈকি! উল্টোদিকেই চার্চ গেট। অতীতে এটি হল্ট স্টেশন ছিল। দার্জিলিঙের রেলের আধিকারিকদের কোয়ার্টার ছিল এখানেই। পাহাড়ের মাথায় সেই জায়গাটি এলিসিয়া প্লেস নামে পরিচিত। ১৮৮০ থেকে ১৮৯৬ অবধি কার্শিয়াং স্টেশনের অবস্থান ছিল এখানেই। কাছেই ছিল সেন্ট আলফোনসাস স্কুল।
একটা কথা বলা বোধহয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না। দার্জিলিং-কার্শিয়াং-কালিম্পঙ কিন্তু স্কুলের জন্য বিখ্যাত। কার্শিয়াং ভ্রমণে তাই স্কুল দেখার জন্য কিছু সময় বরাদ্দ করা উচিত। হয়ত স্কুলের ভেতর ঢোকা যাবে না কিন্তু বাইরে থেকে দেখলেও সেগুলির আভিজাত্য সম্পর্কে একটা ধারণা করা যায়। এগুলি বেশিরভাগই বোর্ডিং স্কুল। তবে ডে-স্কলাররাও পড়ছে। স্কুল বাড়িগুলির স্থাপত্য নিয়েও লেখা যেতে পারে বড় প্রবন্ধ। সারা ভারত থেকে ছাত্ররা ভর্তি হচ্ছে এইসব স্কুলে।
তবে রেল স্টেশনের মাথায় এক কিমি চড়াইয়ে ঈগলস ক্র্যাগ থেকে সানসেট না দেখলে কার্শিয়াং দেখা ঠিক শেষ হয় না। কাছেই রয়েছে ভুবনবিখ্যাত মকাইবাড়ি চা-বাগান। অতটা বিখ্যাত না হলেও ক্যাসেলটন চা-বাগানটিও দেখা যেতে পারে। খানিকটা দূরে গয়াবাড়ি পার করে পাগলাঝোরা অতীতের সেই সুনাম ধরে রাখতে না পারলেও, আজও স্মৃতিতে হানা দেয়।
আসলে কার্শিয়াং স্মৃতির শহর। মার্ক টোয়েনের মতো প্রখ্যাত লেখক ১৮৮৫ সালে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে গেছেন এখানে। রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, সিস্টার নিবেদিতা, অতুলপ্রসাদ প্রমুখের মতো ব্যক্তিত্বরা পা রেখেছেন এই শহরে। ছিমছাম এই শহরকে যেমন ঘিরে রয়েছে চা-বাগান, তেমনি শহরের বাড়িগুলিকে ঢেকে রেখেছে রংবেরঙের ফুল গাছ। আর দার্জিলিং পাহাড়ের সকলের খাবার স্কোয়াশ ঝোলে বহু বাড়ির সবজি বাগানে। রোহিনী আর কার্শিয়াং দুই মিলে সপ্তাহের শেষে দুই তিনদিন মনে করায় সেই বিখ্যাত কথাগুলি- Who is more happy, when, with heart's content,/ Fatigued he sinks into some pleasant lair/Of wavy grass, and reads a debonair/ And gentle tale of love and languishment? (To One Who Has Been Long in City Pent: John Keats)
(ছবি- লেখক)











No comments:
Post a Comment